ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমরা মিসিসিপিতে যখন এসেছিলাম, তখন বাংলাদেশ এর টিভি চ্যানেলগুলো পাওয়া যেতোনা ডিশ নেটওয়ার্কে। অনলাইনে সব পত্রিকার খবরগুলো পড়তাম, মাঝে মাঝে অনলাইন এ গিয়ে নাটক দেখতাম। চার বছর হলো আমরা ডিশ নেটওয়ার্কে বাংলাদেশ এর ৬টি চ্যানেলের একটি প্যাকেজ প্রোগ্রাম নিয়েছি। এই প্যাকেজ নেওয়ার পর আমাদের বাড়ীটা একটা মিনি বাংলাদেশ হয়ে গেছে। যতক্ষন ঘরে থাকি টিভিতে বাংলা চ্যানেল চলতেই থাকে।

আমি বাংলা চ্যানেলগুলো নিয়েছিলাম আরেকটি কারনে, আমার মিথীলা মা’কে বাংলা শেখানোর জন্য। টিভি সারাক্ষন অন করেই রাখতাম যাতে করে মিথীলার কানে বাংলা শব্দগুলো পৌঁছাতে পারে। আমার উদ্দেশ্য প্রাথমিকভাবে সফল হয়েছিলো। মিথীলা বাংলা খুব ভালোভাবেই শিখে উঠছিলো। এরপর আমার কি খেয়াল হলো, মিথীলার সামনেই টকশো গুলো দেখতে শুরু করলাম। এইবার হলো উল্টোফল। টকশোতে আসা টকারদের মুখের ভাষা শুনে মিথীলা বিভ্রান্ত হতে শুরু করলো। টকারদের অনেকেই এমনসব নোংরা, কুৎসিত ভাষাতে কথা বলে যে আমি নিজেও মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হই। আসলে আমি ব্যক্তিগতভাবে দেশের রাজনীতি নিয়ে যে সকল আলোচনা অনুষ্ঠান হয়, তা দেখে থাকি শুধুমাত্র দেশের পরিস্থিতি আঁচ করার জন্য। কিন্তু টিভি টকশোতে এসে কিছু টকার এমনই উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে দেখে ধারনা করা যায় এরা কোথা থেকে এসেছে, এদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু।

মিথীলাকে পাশে নিয়ে অনুষ্ঠান দেখতাম কারন আমি চাইতাম মিথীলা বাংলা ভাষাই শুধু নয়, বাংলাদেশ সম্পর্কেও জানবে, ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা বৈশাখসহ বাংলার সমস্ত ইতিহাস জানুক, নিজে থেকে শিখুক। সব কিছু তোতা পাখীর মত মুখস্থ করাতে আমার নিজেরও ভালো লাগেনা। কিনতু এতে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়েছে। টকশো দেখে মিথীলা খুব এনজয় করতো। ও শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামীলীগ, বিএনপির নামগুলো টকশো থেকেই শিখেছে। ওর মুখস্থ হয়ে গেছিলো, টকশো প্রচারের সময়। আমাকে ডেকে এনে বসাতো টকশো শুরু হলে। আমিতো খুশী যে মিথীলা এখন রাজনীতিও বুঝতে শিখেছে। ভুল ভাঙ্গলো একদিন। এক টকশোতে দেখি টকারদের মধ্যে মারামারি লেগে যাবার উপক্রম হয়েছে। আমি টিভি বন্ধ করতে যেতেই মিথীলা আমাকে টিভি বন্ধ করতে না করলো। সে আমাকে বললো, ” মা দেখো, একটু পরেই ওরা মারামারি করবে। তুমি যখন কাজে ছিলে আমি এই প্রোগ্রামটা দেখেছিলাম, তুমিতো ঝগড়া দেখতে পছন্দ করো, আরেকটু পরে দেখবে ওরা অনেক বকাবকি করবে। সবকথা আমি বুঝতে পারিনি, তুমি বুঝবে”।

মিথীলার কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। মিথীলাকে দুই বছর বয়সে নিয়ে এসেছি আমেরিকাতে। অসীম ধৈর্য্য নিয়ে ওকে বাংলা বলতে শিখিয়েছি, বাংলা পড়তে শিখিয়েছি, ক্লোজ আপ ওয়ান, ক্ষুদে গানরাজ দেখিয়ে বাংলা গানের সাথে পরিচয় করিয়েছি, সেই মিথীলা যখন দেখে টিভিতে এত বয়স্ক মানুষদের এভাবে ঝগড়া করতে, এই ছোট মানুষটার কাছে আমি লজ্জা পেয়ে যাই। এরপর থেকে আমি মিথীলার সামনে আর এই ধরনের প্রোগ্রাম দেখতামনা। তারপরেও মিথীলা একদিন আমাকে এসে বললো যে টিভিতে তৃতীয়মাত্রা শুরু হয়েছে, যদি ঝগড়াঝাটি দেখায় তাহলে ও আমাকে খবর দেবে। আমি হাসবো না কাঁদবো ভেবে পেলামনা। আমি বুঝতে পারলাম ও ধরেই নিয়েছে ঝগড়া দেখার জন্য বুঝি আমি টকশো দেখি। আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম যে ওগুলো আসলে ঝগড়া নয়, বাংলাদেশে আমরা সবাই ‘নিজের কথাটাই ঠিক’ ভাবি, তাই এত জোরে জোরে কথা বলি, আসলে ঝগড়া করিনা।

টকশোগুলোতে এমনিতে বেশীরভাগ সময় পুরুষ টকাররাই এসে থাকেন। সকলেই যে ঝগড়া করে থাকেন তা নয়। কয়েকজন টকার আমার কাছে খুব প্রিয়। তাঁদের মধ্যে ইসলামী ঐক্যজোটের মিসবাহুর রহমান অথবা জাতীয় পার্টির হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আবদুল মান্নান, অথবা বিএনপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, তুখোড় বক্তা মোজাম্মেল বাবু, এঁদের কথা আমি দুই কান ভরে শুনি, এতো সুন্দর করে এরা কথা বলে, সব কথার সাথে আমার মতের মিল হয়না, কিনতু তাদের কথা বলার স্টাইলটাই আমার ভালো লাগে। তারা নিজেরা বলে, অন্যকেও বলার সুযোগ দেয়। তাদের মুখ থেকে সুন্দর বাংলা বের হয়, অশ্লীল কটু কাটব্য বের হয়না। কিছু মহিলা টকারদেরকেও টকশোতে আসতে দেখতাম (দেখতাম বলেছি, কারন আমি এখন আর টকশো দেখিনা), খুবই দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, একমাত্র জাসদের শিরীন আপা ছাড়া আর কোন মহিলা টকারের কথা আমার পছন্দ হয়নি। শিরীন আপার কথা কান পেতে শোনার মত, কিছু কিছু মহিলার কন্ঠস্বর এতো কর্কশ যে, এদের কারনেই রমনীদেরকে ‘মুখরা’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ঐ সকল মহিলাদের কন্ঠস্বরই শুধু কর্কশ নয়, এদের দেহের অঙ্গভঙ্গী, বাচনভঙ্গী দেখে মনে হয় এরা কোনদিন ‘দেবী সরস্বতী’র আশীর্বাদ চায়ওনি, তাই পায়ওনি। কেউ কেউ অনুষ্ঠানে আসে একেবারে পার্টি সাজ দিয়ে, এতো চড়া মেকাপ, এতো গয়নাগাঁটি পড়ে এসে উপস্থিত হয় যে দৃষ্টিকটু লাগে। এদের মধ্যে আবার নামকরা শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবিও আছেন। আসলে এরা লক্ষ্মীর কৃপা পেয়েছে, কিনতু সরস্বতীর কৃপা বঞ্চিত হয়েছে।

উপরের কথাগুলো বললাম অনেক দুঃখে। গত দুই দিন ধরে সংসদে বসে নারী সদস্যদের কেউ কেউ এমন সব ভাষাতে বক্তব্য দেয়া শুরু করেছে, সুদূর প্রবাসে থেকে আমার মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। আমি টিভি দেখিনা, কিনতু পত্রপত্রিকা পড়েই এগুলো জানতে পারছি। আজকেই হঠাৎ করে আমার স্বামী আমার উপস্থিতিতেই টিভি অন করেছেন, ‘পড়বিতো পড় মালীর ঘাড়ে’র মত টিভিতে দেখাচ্ছিলো রাতের সংবাদ, এবং সংবাদের ঐ মুহূর্তেই চলছিলো সংসদে জনৈক সদস্যার উলম্ফঝম্প। কি বিশ্রী ভাষাতে সে কথা বলে যাচ্ছিলো, কি তার শারীরিক ভাষা, কি-ই বা তার মুখের ভাষা, সে নাচছিলো আর কুঁদছিলো, প্রধানমন্ত্রীকে কতজনের কোলে চড়াচ্ছিলো, ঐ মহিলা সদস্যা ভুলেই গেছিলো, তাকে দেখে সংসদের বাকী সবাই বিশেষ করে পুরুষ সদস্যরা মজা পাচ্ছিল। ঐ মহিলা ভুলেই গেছে, তার মত মহিলাদের কারনেই কিছু পুরুষ নারীজাতিকে ‘মুখরা’ ‘ঝগড়ুটে’ ‘কুচুটি’, ‘খান্ডারনি’ ‘দজ্জাল’ সহ নানা উপাধীতে ভুষিত করে আনন্দ পায়।

বিএনপির এই মহিলা সদস্যটিকে একবার টিভির টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’তে দেখেছিলাম। সে একই স্টাইলে দুই হাত নাচিয়ে নাচিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছিল, তৃতীয় মাত্রার মডারেটর সাহেব মুখ টিপে মুচকি হাসছিলেন আর এই কুৎসিত দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। সেদিনও আমার খুব অপমান লেগেছিল, আজকেও অপমান লেগেছে আমার স্বামীর উপস্থিতে নারী কর্তৃক নারীর এমন অপমান দেখে। আমি পত্রিকান্তরেই জেনেছি, আওয়ামীলীগের কিছু মহিলা সদস্যও সংসদে দাঁড়িয়ে কটুকাটব্য করে থাকে। তারাও আপত্তিকর ভাষাতে কথা বলে। টিভিতে দেখলাম, মাননীয় স্পীকার সাহেব অসহায় ভঙ্গীতে ‘থামেন, থামেন, চুপ করেন’ জাতীয় অর্ডার দিয়ে যাচ্ছিলেন। কেউ থামছিলোনা, পাশের অন্য মহিলা সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে ঐ রনরঙ্গীনীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলো।

বেকুব মেয়েরা নিজেদের মান অপমানবোধগুলো হারিয়ে ফেলেছে। একজন প্রধান মন্ত্রী বা বিরোধী নেত্রীকে নোংরা ভাষায় গালি দিয়ে শুধু মনের আক্রোশ মেটানো যেতে পারে, কিনতু একই সাথে যে দেশকে অসম্মান করা হচ্ছে, দেশের সংবিধানকে অসম্মান করা হচ্ছে, যা তাদের কখনওই করা উচিৎ নয়, তার উপর নারী জাতির অসম্মানতো হচ্ছেই, সেটা তারা বুঝতেই পারেনা। এমনই বেকুব এরা, নিজেরাই নিজেদের ‘নারীমুক্তি বা নারী অধিকারের’ মর্যাদাকে ভুলুন্ঠিত করছে। আমি আর কি করবো, অসহায় ভঙ্গীতে শুধু বলতে পেরেছি, ” টিভি বন্ধ করো, এগুলো দেখতে চাইনা”।

মনে হয় আমার মত অনেকেই হতাশ হয়ে থাকেন এইসব পাবলিকদের সংসদে দেখে, টিভিতে দেখে। অথচ জনগনের ট্যাক্সের টাকাতে চলে যে প্রতিষ্ঠান, জনগনের সেবা করাই তাদের মূল ঊদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এই ধরনের ব্যক্তিদের এইসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রন না জানানোই ভালো। আর আমন্ত্রন জানাতে হলে আমন্ত্রনলিপির সাথে কিছু বাধ্যতামূলক নিয়মাবলী দিয়ে দেয়া উচিত। মাঠেঘাটে বক্তৃতা করা যাবে, কিনতু জনগনের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত সংসদে বসে অথবা যে কোন প্রচার মাধ্যমে উপস্থিত হয়ে এমন কুৎসিত, কদর্য্য ভাষায় কথা বলা যাবেনা। এমন ভাষা ব্যবহারের জন্য তাদের ঘরের বাথরুমের সীমিত জায়গাটুকুই যত্থেষ্ট।