ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

মানুষের নাকি শখ আহ্লাদের শেষ থাকেনা। তবে শখ আহ্লাদের ধরণ বয়স বাড়ার সাথে সাথে বদলায়। একেক বয়সের একেক শখ! যেমন শিশু বয়সে শখগুলো হয় সম্ভব অসম্ভব, সব ধরনের। শিশুরাই মাঝে মাঝে আকাশের চাঁদ হাতে পেতে চায়। আবার শিশুদেরকেই একটাকা দামের ললিপপের লোভ দেখিয়ে অনেক কাজ খুশীমনে করিয়ে নেওয়া যায়। লাল জুতা, লাল জামা, একটা রঙিন বেলুন অথবা একটা ‘চাপলাশ ঘুড্ডি ও সূতা ভর্তি লাটাই’, এগুলোই শিশু বয়সের শখ। একটু বড় হতে হতে শখগুলো পালটে যায়, লাল জামা জুতোর বদলে ইচ্ছে করে নিজের একটি আয়না, ছোট ছোট কানের দুল পেতে আর ছেলেদের ইচ্ছে করে একটা হাত ঘড়ি, অথবা একটা ফুটবল, অথবা হাতে একটা ক্রিকেটের ব্যাট পেতে!

আমারও একটা ছোটবেলা ছিল, একটা কিশোরীবেলা ছিলো, তরুণীবেলা ছিলো, এখন এই মধ্যবেলা চলছে। অন্যসব মেয়েদের মতো আমারও শখগুলো বদলেছে বয়সের সাথে সাথে, শুধু একটিমাত্র শখ এখনও রয়ে গেছে। এবং তা বহাল তবিয়তেই বর্তমান আছে। দিনে দিনে বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে যে এই শখটা আমার মৃত্যু পর্যন্ত থেকে যাবে। আমার এই শখটির নাম হচ্ছে, ‘ক্যামেরার সামনে পোজ দেয়া’। হ্যাঁ, সেই ছোটবেলা থেকেই আমার ক্যামেরা দেখলেই সাথে সাথে ক্যামেরার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। এই মধ্য বয়সে এসেও আমার এই শখটির প্রাবল্যে কোন রকম হেরফের হয়নি।

আমি ছবি তুলতে খুব পছন্দ করি, তবে পছন্দ করি বললে মনে হয় কম বলা হয়, আমার এই শখ মাঝে মাঝে আমার প্রিয়জনদেরকেও বিরক্ত করে ফেলে। সেই কবে কোনকালে ছোট্ট বেলাতে আমাদের মা আমাদেরকে নারায়নগঞ্জের ‘প্রিন্স স্টুডিওতে’ নিয়ে ছবি তুলিয়েছিল, সেই দিনটির কথা এখনও মনে আছে। সেদিন ছবি তোলার সময় আমি মুখটাকে নাকি ‘গাপ্পা’ করে রেখেছিলাম, তাই ছবিতে দেখতে আমাকে হাঁড়িমুখ মনে হয়েছে। এমন উক্তি শুনে আমার জেদ হয়েছে মনে। সেই দিন থেকেই শুরু আমার এই শখের ভেতর দিয়ে পথচলা। তখন আমার বয়স পাঁচ কি সাড়ে পাঁচ হবে, পরিবারের সব ছোট ছোট সদস্যদেরকে নিয়ে আমার মা স্টুডিওতে গিয়েছিলেন। আমার মা খুব সৌখীন ছিলেন, শত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের জন্য অনেক কিছুই করার চেষ্টা করতেন। ‘৬৮-‘৬৯ এর দিকে সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়েরা বাচ্চাদেরকে স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে নানা ভঙ্গীতে ছবিতোলা, যাদুঘরে যাওয়া, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, সিনেমা দেখতে যাওয়া খুব কমই করতেন। তখনকার মায়েরা বাচ্চাদেরকে বছরে একবার মেলায় নিয়ে গিয়ে প্যাঁ পোঁ বাঁশী, চুড়ি, রান্নাবাটির খেলনা, এগুলোই কিনে দিতেন। মায়েদের এর চেয়ে বেশী কিছু করার স্বাধীনতা ছিলনা মনে হয়। আমার মায়ের মনে হয় স্বাধীনতা ছিল, শুধু সাধ্য ছিলোনা। তারপরেও আমার মা আমাদেরকে নিয়ে অনেক বেড়িয়েছেন, আমার অনেক ছবিও তুলিয়েছেন।

আমার মা আমাকে নিয়ে আরও অনেকবার স্টুডিওতে গিয়েছিলেন। তবে সেগুলো ছিলো কিছুটা উদ্দেশ্যমূলক। ছবি তুলিয়ে মনে হয় দেখতে চাইতেন, কালো মেয়ের ছবি কেমন আসে, বিয়ে দিতে গেলেতো ছবি দেখাতে হবে! হা হা হা! আমার মায়ের ধারণা, আমি মায়ের এই উদ্দেশ্যটুকু ধরতে পারতামনা। তবে আমিও না বুঝার ভান করে ছবি তুলতাম। তখন থেকেই আমি মনে মনে চাইতাম সিনেমার নায়িকাদের মত পোজ দিয়ে ছবি তুলতে। কিনতু পারতামনা, লজ্জা লাগতো স্টুডিওতে গিয়ে অমন পোজ দিতে। তারপরেও ফেসিয়াল এক্সপ্রেশানে একটু বাড়তি কিছু যোগ করার চেষ্টা করতাম, যেমন মুচকী হাসি, অবাক চাউনী, ঠোঁট টিপে হাসি, এমন ধরনের পোজ দিতাম। পাসপোর্টের ছবি তুলতে গেলে হতো মহাবিপদ। আমিতো স্ট্যাচু পোজ দিতে রাজী নই, কিনতু পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশানের জন্য বা পাসপোর্টের জন্য স্ট্যাচু পোজ দেয়ার একটা অলিখিত নিয়ম আছে আমাদের দেশে। হাসি দিয়ে পাসপোর্টের ছবি আমি প্রথম তুলেছি আমেরিকাতে এসে। এখানে যে কোন এক্সপ্রেশান দিয়েই ছবি তোলা যায়। স্ট্যাচু পোজ বাধ্যতামূলক নয়।

আমাদের সাধারন মধ্যবিত্তের সংসারে ক্যামেরা থাকার প্রশ্নই ছিলোনা। ফলে স্টুডিও ছাড়া অন্য কোথাও যদি কারো হাতে ক্যামেরা দেখতাম, যে কোন একটা উছিলা খুঁজে ক্যামেরার সামনে হাজির হওয়ার চেষ্টা করতাম। কিনতু ক্যামেরার মালিক যিনি, তার তখন ডাঁটই ছিলো অন্যরকম। ক্যামেরার মত এমন যাদুর বাক্স হাতে নিয়েতো আর সবার সাথে ক্যালানো যায়না! তাই ক্যামেরাওয়ালাদের ভাবসাবই ছিলো আলাদা। তারপরেও আমি দাঁড়িয়ে যেতাম লাইনে, বিনা আহবানে। আমার হাতে সেইসব ছবি কোনদিন আসবেনা জেনেও আমি দাঁড়াতাম ছবি তোলার জন্য। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠতে দেখলেই ধরে নিতাম আমার ছবি উঠেছে। তখনতো আর ফোকাস টোকাস এর বিষয়গুলো মাথায় ছিলনা। এখন ভাবি, তখন হয়তো কতজনেই আমাকে ঠকিয়েছে শুধু ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে।

বিয়ের আগে আমার বরের সাথে কথা বার্তার একপর্যায়ে আমার শখ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলাম, তিনটা মাত্র শখ আমার। গান শেখা,বেড়ানো আর ছবি তোলা। এ ছাড়া আমার অন্য কোন শখ নেই। ভাগ্যক্রমে আমার মায়ের পরে আমার জীবনে দ্বিতীয় আরেকজন এলো, যে কিনা আমার শখগুলো পূরণে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে। আমার বর আমাকে নিয়ে অনেক জায়গা বেড়িয়েছেন, পরবর্তীতে পুরো পরিবার নিয়েও প্রচুর বেড়িয়েছেন। আর আমার ছবি তোলার শখও পূরন করতে চেষ্টা করেছেন। তার নিজের দামী শখের ‘ক্যানন’ ক্যামেরা ছিল, জীবনে প্রথম আমি মনের খুশীতে পোজ দিয়ে ছবি তুলতে শুরু করলাম। আমার বরের শখ ছিলো ফটোগ্রাফী ও স্কেচ। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার বরের শখগুলো আস্তে আস্তে ছন্দ ও গতি হারাতে লাগলো। কিনতু ততদিনে আমার মেজোমেয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। অসাধারণ ওর ফটোগ্রাফীর সেন্স। ও অলরেডী বেশ কয়েকবার ফটোগ্রাফীতে এওয়ার্ড পেয়েছে খোদ আমেরিকাতে। তবে ওর নেশা প্রকৃতি, মানুষের ছবি তোলা ওর নেশা নয়। তারপরেও মায়ের আবদার রাখতেই হয়। তাই ও আমার অনেক ছবি তুলে দিয়েছে। কিনতু যেহেতু মানুষ ওর সাবজেক্ট নয়, তাই একসময় মেয়েও আমার ছবি তুলতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে।

শখের কাছে পরাজিত হতে রাজী নই আমি। তাই মনে হয় একেকটা সুযোগ এসে যায় আমার কাছে। আহাদ এসেছে এখানে পিএইচডি করতে। আহাদ বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারীং পাশ করেই চলে এসেছে এখানে। ছোট্ট মানুষ, সবাই ওকে ভালোবাসে। আমিও ভালোবাসি। তার চেয়েও আহাদ বেশী ভালোবেসে ফেলেছে আমাকে। ও কিভাবে যেনো টের পেয়েছে, এই আন্টির ছবি তোলার প্রতি খুব নেশা। ভাগ্যক্রমে আহাদের হাতে সবসময় খুব ভালো কোয়ালিটির এস এল আর ক্যামেরা থাকতো একসময়। আহাদ দারুণ দারুণ সব ছবি তুলে দিয়েছে আমাকে। একেকটা ছবি এতো সুন্দর হয়েছে যে বুঝার উপায় নেই, এটা আমি নাকি পেশাদার মডেল! (হা হা হা )। সেই আহাদেরও একসময় পড়াশুনার চাপ বেড়ে গেলো, ফলে ছবি তোলাতে ক্লান্তি এলো, কিন্তু আমার ক্লান্তি নেই। ছোট মেয়েটা আট নয় বছর হতেই ওর হাতে দিলাম ক্যামেরা তুলে। তখন আমি নিজেই ক্যামেরা কেনার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছি। ডিজিটাল ক্যামেরাতে ছবি প্রিন্ট করারও প্রয়োজন নেই। ছবি তোল আর পোস্ট করে দাও অর্কুট বা ফেসবুকে। মিথীলা শুরু করলো মায়ের ছবি তোলা। কিনতু ইদানিং দেখি মিথীলাকেও মাঝে মাঝে ক্লান্ত মনে হয়। অনেক কাকুতি মিনতি করতে হয় ছবি তুলে দেওয়ার জন্য।

আগে আমরা অনেক বেড়াতাম, তখন স্পটেরও অভাব ছিলোনা। কিনতু এখন আমরা আর তেমন বেড়াতে যাইনা, কারন আমাদের দুই মেয়ে বড় হয়ে গেছে, ওরা কলেজে চলে গেছে, আমার একটা ভাই ছিলো, যে সব ছুটিতে আসতো, ও ড্রাইভ করতো, আর আমরা কত জায়গা ঘুরে বেড়াতাম। সেই ভাইটিও বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেছে, আর আসেনা, আমার বর গাড়ী ড্রাইভ করতে পছন্দ করেনা, তাই আমার একটা শখের অপমৃত্যু হয়েছে। আমি আর বেড়াতে যেতে পারিনা। কিনতু ছবি তুলতেতো কোন ঘটনা লাগেনা। সুযোগ খুঁজে বের করি।

এখন আমার মেয়েদের সাফল্যগুলোকে উছিলা হিসেবে নেই। যাই মেয়েদের একেকটা প্রোগ্রামে, মেয়েদের ছবি যদি তুলি দুইটা , নিজের ছবি তুলি আটটা। কোন ভণিতা করিনা, সোজা বলি, ‘এই একটা শখইতো রয়ে গেছে, এই শখ আমার থেকে যাবে মৃত্যু পর্যন্ত। আমিতো কারো কাছে গাড়ী বাড়ি গয়নাগাঁটি কিছুই চাইনা। শুধু একটু বেড়াতে চাই আর ছবি তুলতে চাই। বেড়াতে পারিনা, কিনতু ছবিতো তুলতে কোন অসুবিধা নেই! কাজেই আমার ছবি তুলে দাও।” মাঝে মাঝে আমার মেজো মেয়েটার মনে বোধ হয় একটু মায়া লাগে, আমাকে ডেকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করায়, ছবি তুলে দেয়। নানা ভঙ্গীতে ছবি তুলে দেয়। তারপরে আবার সাবধান বাণি শুনাতে ভুলেনা, ‘সব ছবিই আবার ফেসবুকে আপলোড করে দিওনা। মানুষতো আর বুঝবেনা যে এটা তোমার শখ!” আবার কখনওবা বলে, “মা, তুমি আসলেই খুব ফটোজেনিক। তুমি খুব সুন্দর। তোমার ছবি এইজন্যই এতো ভালো আসে। তুমি আসলেই জানো, কিভাবে ক্যামেরার সামনে পোজ দিতে হয়।” এই কথাটা ও বলে আমাকে খুশী করার জন্য। আমি ওর কথা শুনে খুশীও হই আবার লজ্জাও পাই। ভাবি, হায়রে! আমার এই শখটা কেনো এখনও মরেনা! সাথে সাথেই আরেক মন বলে উঠে, আমার জীবন আমার, আমার শখগুলোও আমার। কে হাসলো, কে কাঁদলো এইসব চিন্তা করতে করতেই আমাদের একটা জীবন ফুরিয়ে যায়! তারচেয়ে নিজের মনেই নিজের শখগুলোকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার চেষ্টা করছি, কারো কোন ক্ষতিবৃদ্ধিতো করছিনা। আমার শখগুলো পূরণে যারাই এগিয়ে এসেছে, তাদের প্রতি একধরনের ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা বোধ করি, এটাও অন্যরকম এক তৃপ্তি।