ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

মঞ্জুর মোর্শেদ ফেসবুক নিয়ে একটি চমৎকার ফিচার লিখেছেন বিডিনিউজ২৪ব্লগে। লেখাটি খুবই চমৎকার এবং সময়োপযোগী। ফেসবুক কিভাবে সবাইকে সমাজ, সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে, সেটাই মোর্শেদ সুন্দর করে বুঝাতে চেষ্টা করেছে। আমি নিজেও মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হই ফেসবুক নিয়ে। তবে ব্যক্তিগতভাবে ফেসবুক আমাকে দিয়েছে অনেক, নিয়েছেও অনেক। দেওয়া-নেওয়ার হিসেব করলে দেখতে পাই, আমার ব্যক্তিগত লাভ হয়েছে অনেক বেশী। আর পারিবারিক লাভ আপাতত হতাশাজনক হলেও ভবিষ্যতে আশাব্যঞ্জক হলে হতেও পারে। ব্যাপারটা পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে আমার নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে হবে, সবার সাথে।

আমার পরিবারে আমরা স্বামী স্ত্রী ও তিন মেয়ে। এদের মধ্যে আমি ও দ্বিতীয় মেয়েটি খুবই বন্ধুবৎসল, আড্ডাপ্রিয়। বন্ধু ছাড়া আমাদের চলেনা। বাকী তিনজনও বন্ধুবৎসল, তবে তারা বইয়ের ভেতর ডুবে বেশী আনন্দ পায়। যখন দেশে ছিলাম, তখন সময়টা ছিলো অন্যরকম। মানুষজন চারপাশে নিয়েই আমি থাকতাম। কিনতু আমেরিকার এই বাঙ্গালী বিবর্জিত রাজ্যে এসে খুবই একা হয়ে যাই আমি। প্রায়ই দেখতাম মেজো মেয়েকে ফেসবুক নামের কি জানি কি একটা ওয়েবসাইটে ব্যস্ত। আঠারো বছর বয়সী মেয়েকে সবসময় ডাকলে কাছে পেতামনা, ফলে যত রাগ গিয়ে পড়তো ঐ ফেসবুকের উপর। বকা খেয়ে মেয়েও আমাকে উলটা ঝারি দিত, বলতো, ‘উলটাপালটা বকাবকি না করে তুমি আমার একাউন্টে আসতে পারো, দেখতে পারো আমি কি করি না করি। ফেসবুকে ঢুকেছি বলে আমার দেশের বন্ধুদের সাথে আবার যোগাযোগ করতে পারছি।” আমি ওর সাথে একদিন ওর একাউন্ট ভালো করে দেখলাম, কিছুই বুঝিনি। আমি দেখি মেয়ে সারাক্ষন গটাগট টাইপ করে চলে, কত আর বকা যায়, পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ করলেও না হয় একটা সুযোগ পেতাম বকাবকি করার। মেয়ে কিনতু আমার একাকীত্ব বুঝতে পারে। সে আমাকে একদিন বলে, ” মা তোমার ইউনিভার্সিটি লাইফের বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করতে হলে ফেসবুকে আসতেই হবে। আমি তোমাকে ফেসবুক একাউন্ট খুলে দিচ্ছি, বন্ধুদের সাথে, তোমার কাজিনদের সাথে গল্প করতে পারবে। একবার দেখো, ভালো না লাগলে ব্যবহার করবেনা, সব কিছু তোমার উপর।”

মেয়ে একদিন আমাকে ফেসবুক ওপেন করে দিলো, বললো, “একটা জগত সম্পর্কে কিছুই না জেনে মেয়ের সাথে এমন উলটা পালটা ব্যবহার করা ঠিক না।” ভয়ে ভয়ে ফেসবুকে ঢুকলাম। ভইয়ের কারন হচ্ছে, মানুষ যদি জানতে পারে মেয়ের সাথে মা-ও ফেসবুক করছে, কতই না হাস্যকর হবে ব্যাপারটা! তারপরেও সাহস করে ফেসবুকে ঢুকলাম, ঢুকেতো প্রথম প্রথম কিছুই বুঝতামনা। একে তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠা্তাম, কেউ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করলেই নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করতাম। এভাবেই তিনমাসের মধ্যেই ফ্রেন্ড বাড়তে থাকে। আর আমিও নিজেকে ধন্য মনে করতে শুরু করি।

সংবাদ জগত সম্পর্কে আমার অনেক আগে থাকতেই অনেক কৌতুহল ছিল। আমি ছাত্র জীবন থেকেই নামী দামী কলামিস্টদের লেখা পড়তাম। সেই সূত্র ধরেই আমার প্রিয় কিছু কলামিস্টকে পেয়ে যাই ফেসবুকে। নিজে থেকেই রিকোয়েস্ট পাঠাই। নামী দামীদের অনেকেই রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করে। তাদের ফ্রেন্ডলিস্টে ফ্রেন্ডের সংখ্যা দেখি পাঁচ হাজার, ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হতে শুরু করি। বুঝতে পারি, সেলিব্রিটিরা ফেসবুকে ঢুকে শুধু ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করতে, আর সবার মাঝে নিজেকে অনেক জনপ্রিয় হিসেবে প্রমানিত করতে। কারন তারা কারো সাথে সহজে কথা বলেনা বা কথা বলার সময় পায়না। অভিনেতা, নাট্যকার থেকে শুরু করে সকলেরই এক অবস্থা। এরপর থেকে আমি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো থামিয়ে দিলাম। নিজের মনের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা অহ্ং জেগে উঠলো। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ করে দিলাম।

অবশ্য ফেসবুকে ঢুকে আমার পুরানো বন্ধুদেরকে পেলাম। এই প্রথম ফেসবুকের প্রেমে পড়তে শুরু করলাম। ফেসবুকে ঢুকেছিলাম বলেই আমার এক বন্ধুর মাধ্যমেই দেশে গিয়ে আরও চল্লিশ জন বন্ধুর সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি শুধু বন্ধুই খুঁজিনি, মঞ্জুর মোর্শেদ যে কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তার লেখাতে, ফেসবুকে ঢুকে মানুষ শুধু প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করে আর ছবি আপডেট করে, বলতে দ্বিধা নেই, আমি নিজেই এই রোগে আক্রান্ত। এবং রোগটি আমাকে ভালোভাবেই আক্রান্ত করেছে। আমার এই উপসর্গের কারণেই অনেকেই আমাকে পছন্দ করে, আবার আমার বন্ধুদের অনেকেই আমাকে ত্যাগও করেছে।

আগে মেয়েকে দেখতাম অনলাইনে চ্যাট করতে, এবার আমিও সাহস করে শুরু করি চ্যাটিং। মজা পেয়ে যাই। কত পুরানো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হয়, সাথে নতুন বন্ধু তৈরী হয়। এভাবেই একসময় ফেসবুকের মাধ্যমেই পত্রিকার অনেক সাংবাদিকদের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলি। কথার আদান-প্রদানের ভেতর দিয়েই একবন্ধু আমাকে লেখালেখি করতে তাগাদা দেয়। স্কুলজীবনে বেশ কিছুদিন লেখালেখি করেছি্লাম, পুরস্কার পেয়েছিলাম, সংসারের পরিক্রমায় সেই সময়ের কথা ভুলেই গেছিলাম। কি মনে করে যেনো একটু একটু করে লিখতে শুরু করি। বন্ধুটি আমার লেখা তাঁর পত্রিকাতে ছাপিয়ে দেয়। এই একটা লেখা ছাপা হতেই আমার জীবনের আরেক অধ্যায় শুরু হয়। আমি আস্তে আস্তে পুরানো সত্বাকে ফিরে পেতে শুরু করি। ধীরে ধীরে খুব অগোছালোভাবেই লিখতে শুরু করি। পাশাপাশি কিনতু ফেসবুকে ছবি আপলোড করতেই থাকি। স্ট্যাটাসও পাল্টাতে থাকি। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসতেই থাকে, আমিও সেলিব্রিটিদের মত রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করতেই থাকি। প্রথম দিকে ফেসবুকের প্রাইভেসী কাকে বলে, সেটাও ভালো করে বুঝতামনা।

একসময় আমার মেয়েই আমাকে বললো, সব রিকোয়েস্ট একসেপ্ট না করতে, ছবির এলবাম কিভাবে লক করা যায় তাও শিখিয়ে দিলো। আমি একটু একটু করে সবই শিখতে শুরু করলাম। ফেসবুকে সময় বেশী দিতে লাগলাম। দিনে অফিসে থাকি, রাতে সংসারের কাজকর্ম সেরে ফেসবুকে বসতে বসতে দেরী হয়ে যায়। কিনতু বন্ধুরা আমাকে ডাকে, সেই ডাক অগ্রাহ্য করতে পারিনা, রাত বাড়তেই থাকে, ঘুমের সময় সীমা কমতেই থাকে। এমনও রাত গেছে যে রাত কাবাড় করে দিয়েছি ফেসবুকে বসে থেকে। অনেককেই বলতে শুনেছি, ফেসবুক হচ্ছে তরুণদের জন্য, বয়স্করা সেখানে বেমানান। এমনটা শুনে কেনো জানি মনের মধ্যে একটা খোঁচা লেগেছে, জেদ বেড়েছে, নিজের মনকেই বলেছি, বিজ্ঞানের আবিষ্কার সকলের জন্য, আমার জন্যও। সব কথায় কান দিতে নেই, এমনটা ভেবে মনকে সান্ত্বণা দিয়েছি।

এর মধ্যেই ফেসবুকের বন্ধুরা আমাকে নানা ওয়েবসাইট, নানা ব্লগের ঠিকানা দিতে থাকে। ব্লগে কি করে নাম রেজিষ্ট্রেশান করতে হয়, সেটাও শিখিয়ে দিয়েছে। বলে রাখা ভালো, আমার এই বন্ধুরা সকলেই বয়সে তরুণ। তারা জানে আমি একজন মাঝবয়সী মহিলা, তাদের মাতৃস্থাণীয়া। কিনতু কেউ আমাকে বয়স মনে করিয়ে দেয়না, আন্টি, কাকী বা চাচী ডাকলে যদি মনে কষ্ট পাই, সেই ভাবনা থেকেই আমার মেয়ের বয়সীরাও আমাকে দিদি ডাকে। আমি আবার আবেগে ভাসি, আমি তারুণ্যকে ভালোবাসি। আমাদের বয়সীরা বর্তমান প্রজন্মকে দোষারোপ করে বেশী, তাদের জয়গান করে কম। আমি তাদের সাথে একমত পোষণ করিনা। ফেসবুকে এসেই আমি এই প্রজন্মকে চিনতে পারছি। মাঝে আমাকে বিষন্নতায় পেয়ে বসেছিল। স্ট্যাটাসে এটা বহুবার লিখেছি। কি যে সাড়া পেয়েছি সকলের কাছ থেকে, আমার বিষন্নতা কেটে গেছে। আগে মৃত্যুচিন্তায় পেয়ে বসেছিল আমাকে, মৃত্যুর কথা এখন আর আগের মত ভাবিনা। আমি এখন জীবনকে দেখতে পাচ্ছি।

এই তরুণ বন্ধুদের উৎসাহে আমি ব্লগে লিখতে শুরু করেছি। একটু একটু করে বেশ কয়েকটা লেখা আমি ব্লগে পোস্ট করে ফেলেছি। কোন লেখাই মানোত্তীর্ণ হয়নি, অদূর ভবিষ্যতেও মানোত্তীর্ণ লেখা লিখতে পারবো, সে সম্ভাবনা নেই। কিনতু আমি লিখে আনন্দ পাচ্ছি, আমার একাকীত্ব কেটে যাচ্ছে। আমি ব্লগে এসেই কত তরুণ লেখকের দারুণ দারুণ সব লেখা পড়তে পারছি। কে বলে বর্তমান তরুণ সমাজ স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ বুঝেনা! ওরা আমাদের চেয়েও অনেক বেশী ভালো বুঝে সবকিছু। ব্লগে যে কোন কারেন্ট এফেয়ার নিয়ে ওদের লেখা আলোচনা সমালোচনা পড়ছি। খুব সাহস করে কারো কারো লেখার উপর দুই চারটা মন্তব্য করেও ফেলছি। ব্লগে ঢুকতেই একরাশ তরুণের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থণা পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করছি।

এবার আমার ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা বলি। হ্যাঁ, আমি আর আগের মত সংসারে সময় দিতে পারিনা। ঘরে চারপাশে জিনিসপত্র কাপড় চোপড় অগোছালো হয়ে পড়ে থাকে, রান্না ঘরে নানা রকম খাবার থাকেনা আগের মত। আগে খুব ঘন ঘন মানুষজনকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতাম, সেটাও কমে গেছে। কাজ থেকে ফিরেই স্বামীর সাথে একটু গল্পগুজব করতাম, মেয়ের সাথে একটু আহ্লাদীপণা করতাম। সেগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন সময় পেলেই কম্পিউটারে বসে যাই। সরাসরি লিখতে থাকি, কোন খসড়া করতে পারিনা, অতটুকু অতিরিক্ত সময় আমার হাতে নেই। এখন আর নিরালায় বসে কাঁদিনা একা থাকার কষ্টে। তবে এখন প্রতিদিন ছবি আপলোড করিনা। এটা কমে গেছে। সংসারে আগের মত সময় দিতে পারিনা, এই পরিবর্তনে মাঝে মাঝে আমারও খারাপ লাগে বৈকী! বাবার ঘরে থাকতে আমি ছিলাম বাবার ‘সন্তানরত্ন’, সংসার জীবনে ঢুকে আলসেমী করেই হোক বা সংসার জীবনের আনন্দেই হোক, নিজের ক্যারিয়ার গড়িনি। ডিগ্রী অর্জন করেছি যথেষ্ট, কিনতু কোন কাজে লাগাইনি। এখন আর সময় নেই, সময় ফুরিয়ে গেছে ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করার। আমি আর দশজন মেয়ের মতো সাধারন দৈনন্দিন সাংসারিক কথাবার্তা বলে আনন্দ পাইনা। বাইরের আধুনিক জীবন বরাবর আমাকে টানে। মাঝে মাঝে ভাবি, একটাই জীবন, দেখিনা আরেকটু এক্সপ্লোর করে, কত কিছুই অজানা থেকে যাবে জীবনে, রান্না বান্না ঘর সংসারতো করলাম অনেককাল, এবার সেগুলোর মৌলিক চাহিদাগুলো মিটিয়ে যদি আরও অন্য কিছু জানা যায়, শেখা যায়, ক্ষতি কি? এভাবেই আমি নিজেকে সান্ত্বণা দেই। তবে একজীবনে আমি যাদের জন্য করেছি, সেই সংসারের মানুষগুলো আমাকে নিরুৎসাহিত করেনা, শুধু আমার পাগলামী দেখে মুখ টিপে হাসে।

প্রিয় মঞ্জুর মোর্শেদের ফেসবুক নিয়ে এই লেখাটি আমার অপঠিত থেকে যেতো যদি আমি ফেসবুকে না আসতাম। এই ব্লগে আরও অনেক তরুণের দারুণ দারুণ সব লেখা অপঠিত থেকে যেত। ফেসবুকের নেশা না থাকলে ছেলেমেয়েগুলো অন্য কোন নেশাতে আসক্ত হতো। ভালো খারাপ সবকিছুতেই আছে। যে যেভাবে নেয়। কেউ কেউ ফেসবুকে বা ব্লগে ঢুকে অশালীন মন্তব্য করে, সেই সমস্ত মানুষ ফেসবুক ছাড়াও অন্য জায়গাতেও অশালীন আচরণ করে থাকে। এটা ফেসবুকের দোষ নয়। তবে এগুলো করতে করতেই এক সময় এই তরুণেরাই আরও অনেক কিছু আবিষ্কার করে ফেলবে। ঘাঁটাঘাঁটি না করলে ছাই থেকে ‘মনিরত্ন’ বের হবেইবা কি করে! ছাইয়ের ভেতরেওতো মুক্তোমানিক লুকানো থাকে!

[মঞ্জুর মোর্শেদের লেখা লিঙ্কটি নীচে দেয়ার চেষ্টা করলাম, জানিনা কতটুকু কি করতে পেরেছি!]

http://blog.bdnews24.com/manzurm/79085