ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

স্ত্রী গত কয়েকমাস ধরে বিরাট ঢাউস এক মিনিভ্যান চালাচ্ছে, অনেকটাই বাধ্য হয়ে। আমেরিকার সবচেয়ে গরীব যে রাজ্য, সেখানে স্বামী স্ত্রী বেশ কয়েক বছর ধরে বাস করছেন। সেই রাজ্য এমনই এক রাজ্য, যেখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বলে কিছু নেই। কাজেই বাজার করতে গেলেও গাড়ী লাগে, হাসপাতালে যেতে গাড়ী লাগে, একপাড়া থেকে আরেক পাড়াতে যেতেও গাড়ী লাগে। স্বামী স্ত্রী দুজনেই চাকুরী করেন, তাদের কাজের শিডিউল আবার ডিফারেন্ট। একজন যদি সকালে বেরিয়ে যায় কাজে, আরেকজনের কাজ হয়তোবা দুপুরে। ফলে দুজনেরই দুইটা গাড়ী প্রয়োজন। অন্যসব বিলাস বাদ দেওয়া যায়, কিনতু গাড়ী বাদ দেওয়া যায়না। স্বামী ও স্ত্রীর জন্য দুইটা গাড়ী কেনা হলো। তবে পুরানো গাড়ী।

স্বামী স্ত্রীর সংসারে তিন সন্তান। ফলে মানুষ তারা পাঁচজন। এখানে সাধারণ গাড়ীগুলো পাঁচ সীটের হয়। বাংলাদেশে থাকলে এই পাঁচ সীটের গাড়ীতেই কুলিয়ে যেতো। এর কোলে, তার পিঠে বসে পাঁচ সীটে মোট নয়জন যাওয়া যায়। কারন দেশে থাকতে তাদের সাত সীটের পাজেরোতে মোট বারো জন যাত্রী নিয়ে ভ্রমন করার অভিজ্ঞতা আছে। শুধু যাত্রীই নয়, যাত্রীর সাথে লাগেজ থাকতো, এক্সট্রা সীট বানানোর জন্য ঘর থেকে মোড়া তুলে এনে গাড়ীতে বসিয়ে দেয়া হতো। করতেই হতো, কারন বংগবন্ধু সেতু দেখতে যাওয়া হবে, কাকে ফেলে যাবে, সবাইতো ছোট ছোট ভাইবোন, সবাই তাকিয়ে থাকতো এই দাদাভাই আর দিদিভাইটার মুখের দিকে। ফলে সবাইকে কোলে পিঠে করেই নেওয়া হতো সব জায়গাতে। সেই মানুষগুলো আমেরিকাতে এসে বিপদে পড়ে গেছে। পাঁচ জনের সীটে পাঁচজনই বসবে, এর বেশী হলে পুলিশ ধরবে। পাঁচজন মিলে কোথাও বেড়াতে যেতে হলে, মালসামান প্রচুর হয়ে যায়। সেগুলোর জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হয়। একেক জনের একেক ব্যাগ, তার উপর খানাদানার ব্যাগও থাকে। ফলে সব দিক বিবেচনা করে স্বামীর জন্য সাত সীটের বিশাল বড় টয়োটা সিয়েনা ভ্যান কেনা হয়েছিল, সেকেন্ড হ্যান্ড হলেও প্রায় নতুন ছিল গাড়ীটা। এই গাড়ীতে করে পরিবারের সবাই অনেক ঘুরেছে।

এখন স্ত্রীকে কাজে যেতে হলেও একটা গাড়ী লাগে। বাড়ী থেকে কাজের জায়গার দুরত্ব তিন চার মাইল। দেশে থাকলে হেঁটেই চলে যাওয়া যায়, পয়সাও বাঁচে, ব্যায়ামও হয়ে যায়। কিনতু এই গরীব রাজ্যে সকলেই আবার অলস, কেউ হাঁটেনা বলে পথচারীর জন্য কোন ওয়াকওয়ে নেই। গাড়ী একটা কিনতেই হলো, তবে খুবই লক্কর ঝক্কর মার্কা গাড়ী। স্বামীর মত ছিলনা এমন লক্কর ঝক্কর মার্কা গাড়ী কেনার ব্যাপারে, কিনতু স্ত্রী রত্নটি আবার বিশেষ টেটিয়া ধরনের। মাতব্বরী করে কোথা থেকে এক ফড়িয়া ধরে এনে তার কাছ থেকে ঐ গাড়ী কিনে ফেলেছে। বছর না ঘুরতেই গাড়ী বেগড়বাই করতে শুরু করেছে। এক সময় বেগড়বাই এর মাত্রা এমন বেড়ে গেলো যে মাঝ রাস্তায় গাড়ী থেমে যায়। স্ত্রী এমনিতে মুখেই পটপট, যে কোন পরিস্থিতিতে সে আবার মাথা ঠিক রাখতে পারেনা, নাকের জলে চোখের জলে একাকার করে ফেলে। এই যখন অবস্থা, স্বামী ভদ্রলোক বিরাট ভ্যান গাড়ীটাই স্ত্রীকে চালাতে দিল। গাড়ী চালিয়ে স্ত্রী কাজে যায়, আবার বাড়ী ফেরে, এভাবে বছর দুই ভালোভাবেই কাটিয়ে দিয়ে একদিন বাঁধালো এক বিপত্তি।

তাদের বাড়ীর ঢোকার মুখেই খুব সুন্দর জ্যাকারান্ডা গাছ আছে। গাছটির অনেক শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে থাকে। স্ত্রী একদিন কাজে যাওয়ার সময় গ্যারাজ থেকে গাড়ী বের করতে গিয়ে একটু আনমনা হয়ে যেতেই গাড়ীর পেছনটা গিয়ে জ্যাকারান্ডা গাছের ডালপালার মধ্যে আটকে গেলো। না বুঝেই স্ত্রী গাড়ীকে সামনের দিকে টেনে নিতেই গাছের ডালপালার সাথে লেগে গাড়ীর ব্যাক লাইট ভেঙ্গে গুড়ো হয়ে যায়, আর পেছনটা একেবারে বিরাট ‘ডেন্ট’ হয়ে যায়। কাজে দেরী হয়ে যাচ্ছে দেখে মহিলার মাথায় আর কিছুই কাজ করছিলোনা, কাজে চলে গেলো। কাজ থেকে ফেরার পময় খেয়াল করলো, কি গভীর ক্ষতি হয়ে গেছে গাড়ীতে। এই পোড়ার দেশে আবার গাড়ী ঠিক করাতে গেলে প্রচুর খরচ হয়, তাই স্ত্রী ভয় পেয়ে যায়। বাড়ী ফিরে আসার আগেই সে স্বামীটিকে ফোন করে জানিয়েছিল, ঘটনার কথা। তবে একটা ব্যাপারে স্ত্রী খুব ভালো, ভুল স্বীকার করতে তার জুড়ি মেলা ভার। সে যখনই ভুল করে, স্বামীকে তা না বলা পর্যন্ত পেটের ভেতর কথার গুড়গুড়ানি চলতেই থাকে। বাড়ী ফিরতেই স্বামী ভদ্রলোক সব দেখেশুনে স্ত্রীকে সান্ত্বণা দেয় এই বলে, ‘ আরে কি আছে জীবনে, গাড়ী ভেঙ্গেছে, ঠিক করা যাবে, বেশী পয়সা লাগলে না হয় অর্ধেক ঠিক করাবো, না হয় ‘ডেন্ট’ দেখা যাবে, কি আর করা, গাড়ীর শোকেতো আর পাগল হয়ে যাওয়া ঠিক না”। এইতো, এখানেই স্ত্রীর ভয়, স্বামী দেবতা কিছুই বললেননা, একটা বকাও দিলেননা, এটা কেমন কথা। সে নিজে হলেতো স্বামীর বারোটা বাজিয়ে ফেলতো!

সাত আট মাস পরে আজকে আবার ঘটেছে আরেক ঘটনা। স্ত্রী গাড়ী পার্ক করবে কাজের জায়গাতে। নির্দিষ্ট আইলে পার্ক করতে গিয়ে দেখে পাশেই একটা বিরাট হেভী সাইজের ওয়াগন থামানো আছে। এমন বড় বড় গাড়ি সব সময়ি থামানো থাকে ওখানে। অন্যদিন কিছুই মনে হয়না, আজকে কেনো জানি স্ত্রীর মনটা একটু কেঁপে উঠেছে মুহূর্তের জন্য, তারপরেই সে তার বিরাট ঢাউস টয়োটা ভ্যান ঢুকিয়ে দিয়েছে পার্কিং আইলে। সাথে সাথে ক্যাঁচ করে এক শব্দ। গাড়ির পেছন দিকটা আটকে গেছে ওই ওয়াগনের একমন ওজনের বাম্পারের সাথে। স্ত্রী চোখে সর্ষে ফুল দেখতে শুরু করেছে। নানাভাবে সে চেষ্টা করেছে গাড়ীটাকে এই ফাঁদ থেকে বের করতে, পারেনি। গাড়ী থেকে নেমে সে অন্য কাউকে খুঁজছিলো, এক বয়স্ক সহকর্মী পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, স্ত্রীটিকে এমন অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলো, “আর ইউ ওকে?”। উত্তরে স্ত্রী বললো, ” আমি মোটেও ওকে নেই। আমি কোনভাবেই এই জায়গা ছেড়ে নড়তে পারছিনা। তুমি এক কাজ করো প্লীজ, ওয়াগনের নাম্বার প্লেট থেকে নাম্বারটা টুকে ভেতরে গিয়ে একটু পেজ করে দাও, যেনো গাড়ীর মালিক এখানে আসে।” সহকর্মীটিকে স্ত্রীটি সবসময় হাই হেলো দিয়ে খোঁজ খবর করে, এই ব্যাপারে স্ত্রী ষোল আনার উপর আঠারো আনা। সেই সহকর্মী অফিসের ভেতরে চলে গেছে। স্ত্রী হতাশ হয়ে আছে, একেতো নিজের গাড়ীর এই অবস্থা, এরপর ওয়াগনের মালিক এসেইতো পুলিশ কল করবে, ইন্সিওরেন্স কার্ড চাইবে, স্ত্রীর মনের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। তবে স্ত্রীর ভাগ্যটি খুবই ভালো বলেই বিপদে তার অনেক বন্ধু জুটে যায়। কোথা থেকে এক কালো মহিলা এগিয়ে এসে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলো, সাথে সেল ফোন আছে কিনা। এই অবস্থায় প্রথম করণীয় কাজ হচ্ছে, ছবি তুলে রাখা, যাতে করে ওয়াগনের মালিক উলটাপালটা ক্লেইম না করতে পারে। স্ত্রী তার ফোনটি ঐ মহিলার হাতে দিয়ে বললো, ” যা করার তুমি করো। আর প্লীজ, যতক্ষণ এই সমস্যার সমাধান না হয় তুমি আমার কাছে থাকো। আমার মাথাটা এলোমেলো হয়ে আছে”।

ভদ্রমহিলা ছবি তুলে ফোন তার হাতে ফেরত দিতেই ওয়াগনের মালিক ভদ্রলোক কাছে এগিয়ে এলো। স্ত্রীটি তাকে জিজ্ঞেস করলো, ” এই ওয়াগনটি কি তোমার? প্লীজ আমাকে তুমি হেল্প করো। আমি কিছু জানিনা, কিভাবে এই সমস্যা থেকে বের হবো তাও জানিনা, আমার মাথা কাজ করছেনা।” ভদ্রলোক প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেছে তার এই সাধের ওয়াগনের এমন পরিনতিতে। স্টোরের ভেতর থাকা অবস্থায় তাকে কি বলা হয়েছিলো কে জানে, সে ধরেই নিয়েছে তার গাড়ী শেষ। পরে ভদ্রলোক ভালো করে দেখে নিল কোথায় আটকেছে, স্ত্রীটির হাত থেকে গাড়ীর চাবি নিয়ে এক মুহূর্তে ভ্যানটিকে ওয়াগনের পেটের ভেতর থেকে বের করে এনে গাড়ীর চাবি স্ত্রীর হাতে তুলে দিলো। ওদিকে কালো মহিলাটি ওয়াগন মালিককে বলে চলেছে, ” এই মেয়েতো এমন ভয় পেয়েছে, তোমার গাড়ীর তেমন কোন ক্ষতি হয়নি, শুধু একটু স্ক্র্যাচ পড়া ছাড়া। ওর গাড়ীটা ডেন্ট হয়ে গেছে। ভদ্রলোক স্ত্রীটির গাড়ীর জানালার কাছে এসে বললো, ” তুমি চিন্তা করোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আমার গাড়ীর স্ক্র্যাচ নিয়ে ভাবিনা। তুমি সাবধানে কাজে যাও। আর এটা নিয়ে একেবারেই ভেবোনা” বলেই সে তার গাড়ী নিয়ে চলে গেলো। স্ত্রীটি সেই কালো মহিলাটিকে কাছে ডেকে একটা ‘হাগ’ দিয়ে শুধু বলতে পারলো, ” থ্যাঙ্ক ইউ ভেরী মাচ, ইউ আর মাই এঞ্জেল, গড ব্লেস ইউ!”

কাজে ঢুকার আগ মুহূর্তে ছয় সাত ম্যানেজার এসে হাজির। ” আর ইউ ওকে, আর ইউ ওকে”, ” ইয়েস! আই’ম ওকে, অল প্রবলেম সলভড, থ্যাঙ্কস” বলে মেয়ে ভেতরে চলে গেলো। দুই ঘন্টা সে আকাশ পাতাল ভাবলো, একবার ভাবে স্বামীকে কিছুই বলবেনা, এমন লজ্জার কথা, যন্ত্রণার কথা স্বামীকে বলতে ইচ্ছে করছিলোনা। কিনতু বেশীক্ষণ থাকতে পারলোনা, নিজের অজান্তেই ফোন ডায়াল করলে স্বামী ভদ্রলোক ফোন ধরতেই দুই একটা ইতং বিতং কথা বলে আসল কথা বললো, ” শোন, আমি আজকে আবার গাড়ীটাকে আরেক গাড়ীর সাথে লাগিয়ে দিয়েছি। আমার খুব খুব খারাপ লাগছে কথাটা বলতে। তবে ঐ গাড়ীর ভদ্রলোক অনেক হেল্প করেছে, আমাদের ইনসিওরেন্স কোম্পাণীর কাছে কোন ক্লেইম করতে চায়নি। তার গাড়ীর তেমন কিছুই ক্ষতি হয়নি, কিনতু আমাদের গাড়ীতে বিরাট এক ডেন্ট হয়ে গেছে।” স্বামী বললেন, ” ঠিক আছে, কোন অসুবিধা নেই। ঐ গাড়ীর কোন ক্ষতি হয়নি, এটাই বড় কথা। আমাদের গাড়ীর ডেন্ট নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা। কাজ করো মন দিয়ে, এগুলো হবেই। জীবনে কত কিছু ঘটে। বেঁচে আছো সেটাই বড় কথা। এগুলো ঠিক হয়ে যাবে”। এইতো বিপদ! স্বামী যদি বকা দিত তবে স্ত্রীর অপরাধের সাথে স্বামীর বকা কাটাকাটি হয়ে যেতো। কিনতু স্বামী বকা না দেওয়াতে কিছুই কাটাকাটি হলোনা। মনের ভেতর এই যে একটা অনুতাপ বয়ে বেড়ানো, এর চেয়ে ধমক খাওয়া অনেক ভালো। কিনতু, না তা হবার নয়। স্ত্রীটির স্বামী আবার মহাপুরুষ, জগতের এই সব তুচ্ছ জিনিস নিয়ে কখনও তোলপাড় করেননা! আবার লোকে বলে অন্য কথা, স্ত্রীটির নাকি ভাগ্যটাই ভালো, তাই এতসব কান্ড করেও নাকি বহাল তবিয়তে জীবনটাকে পার করে চলেছে! কে জানে কোনটা ঠিক, স্বামী মহাপুরুষ না-কি স্ত্রী ভাগ্যবতী!