ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

বাংলাদেশে বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর আমেরিকাতে বারো মাসে মনে হয় চব্বিশ পার্বণ! প্রতি মাসে একটা না একটা কিছু আছেই। এখানে মুলতঃ সেপ্টেম্বার মাস থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সেশান শুরু হয়, তাই সেপ্টেমবার মাস থেকেই যদি উৎসব গননা শুরু করি, তাহলে সেপ্টেম্বার মাসে গ্র্যান্ড প্যারেন্টস ডে, অক্টোবারে ভুত উৎসব ‘হ্যালুইন’, নভেম্বারে থ্যাঙ্কস গিভিং ( টার্কী) উৎসব, ডিসেম্বারে ক্রিসমাস (স্যান্টা ক্লজ) উৎসব। জানুয়ারীতে নিউ ইয়ার’স, ফেব্রুয়ারীতে ভ্যালেন্টাইন’স ডে (ভালোবাসার সমারোহ), মার্চে সেইন্ট প্যাট্রিক’স ডে( সবুজে সবুজ) এবং মার্ডিগ্রা উৎসব (বেগুণী, সবুজ, সোনালী বিডস এর সমাহার)। এপ্রিলে ইস্টার সানডে (ইস্টার বানি (খরগোশ) উইথ চকোলেট ডিম) উৎসব। ক্রিসমাস ও ইস্টারের সাথে ধর্মীয় সম্পর্ক থাকলেও, উৎসব দুটি শিশুতোষ আনন্দে ভরপুর থাকে। ক্রিসমাস মানেই যেমন স্যান্টা ক্লজ, তেমনি ইস্টার সানডে মানেই চকোলেট ডিম নিয়ে ইস্টার বানি বা খরগোশ!

কেনো খরগোশ!

জীবনের মূল লক্ষ্যইতো সুখ আর সমৃদ্ধি। উৎপাদনের সাথে সমৃদ্ধি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চান্দ্রমাসের হিসেব অনুযায়ী ইস্টার উদযাপিত হয় বসন্তকালে, এপ্রিল মাসে। বছরের এই সময়টাতেই খরগোশ বাচ্চা প্রসব করে থাকে। একমাত্র খরগোশই একেকবারে প্রচুর বাচ্চা প্রসব করে। তাই প্রানীকুলের মধ্যে খরগোশকে ‘সিমবল অফ ফার্টিলিটি’ মনে করা হয়। ইস্টার খরগোশকে নিয়ে অনেক মিথ চালু থাকলেও, দ্বিতীয় শতাব্দীতে শুরু হওয়া ইস্টার উৎসবের ঐ সময়কালীন প্রেক্ষাপটে বিস্তৃতি ও সমৃদ্ধিই ছিলো ্মানুষের মূল চেতনা। তাই মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করে খরগোশ ঝুড়ি ভরে ভরে ডিম নিয়ে আসে এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে। চাঁদের হিসেব অনুযায়ী সাধারনতঃ এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় রবিবারটিতেই ইস্টার বানি আসে।

ইস্টার বানি এপ্রিলে আসলেও মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকেই এখানের স্টোরগুলোতে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। নানা সাইজের খরগোশ ও নানা রঙের ডিম দিয়ে দোকানগুলো সাজানো হয়। স্টাফড খরগোশ, গল্পের বইয়ে খরগোশ, এনিমেটেড ছবিতে খরগোশ, ডিভিডিতে খরগোশ, বাচ্চাদের পোষাকে খরগোশ, চুলের হেয়ার ব্যান্ডে খরগোশ, বাচ্চাদের প্লেট গ্লাস, ওয়াটার বটল, পায়ের জুতা মোজা সবকিছুতেই খরগোশের লোগো থাকে। ডিমগুলো নানা বর্ণের হয়ে থাকে, কারন সময়টা বসন্তকাল, প্রকৃতি সাজে নানা রঙে তাই বানির (খরগোশ) ডিমগুলোও হয় নানা রঙের। আর চকোলেট দিয়ে বানানো নানা সাইজের খরগোশ গাজর হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, শিশুদের কাছে টানে!

এগ হান্টিং
ইস্টার উৎসবের মূল আনন্দই হচ্ছে এগ হান্টিং। বাচ্চাদের ধারণা, ইস্টার বানি তাদের জন্য চকোলেট ডিম নিয়ে এসে বাড়ির চারিদিকে লুকিয়ে রেখে যায়। পরের দিন সবগুলো ডিম খুঁজে বের করাই তাদের একমাত্র কাজ। অনেক কঠিন এই খেলা, কারন বানি বাচ্চাদের সাথে মজা করতে ভালোবাসে। সে চকোলেট ডিম বাগানে রাখে, বারান্দার কোনে কোনে রাখে, ঘরের ভেতর ঢুকে কত জায়গায় যে লুকিয়ে রেখে তার ঠিক নেই। বালিশের নীচে, বেডের চার কোনাতে, খেলনার ঝুড়িতে, বুকসেলফ এর আড়ালে, টিভির আড়ালে (এটা বিপদজনক, চকোলেট খুঁজতে গিয়ে টিভি উলটে পড়ে দূর্ঘটনা ঘটেছে অনেকবার), কিচেনে চিনির বোয়ামে, এমনি আরও অনেক কিছুর আড়ালে রেখে যায় ডিমগুলোকে। সারাটাদিন পার হয়ে যায় ডিমগুলোকে খুঁজে বের করতে। শুধু কি নিজের বাড়িতে এগ হান্টিং চলে? গ্র্যান্ডমা, আন্টি, আঙ্কলদের বাড়িতেও যেতে হয়, বানি ওখানেও রেখে আসে ডিম।

বাচ্চারা শনিবারের রাতেই তাদের মাথার টুপী বা বাস্কেট বাগানের গাছের ঝোপে রেখে দেয়। তারা জানে, ইস্টার বানি রাতের আঁধারে এসে বাস্কেটগুলো ভরে দিয়ে যাবে ‘চকোলেট এগ’ দিয়ে। রবিবার ভোরে ঘুম ভেঙ্গেই বাচ্চারা ছুটে যায় বাগানে। আগের রাতে রেখে আসা হ্যাট বা বাস্কেট ভর্তি নানা রঙের ডিম দেখে তাদের খুশীর সীমা থাকেনা। তারা ঘরে এসে শুরু করে এগ হান্টিং। দিনের শেষে দেখা যায় ঝুড়ি উপচে পড়ছে চকোলেট ডিমে। পড়বে নাইবা কেনো, ইস্টার বানিতো বাচ্চাদের বন্ধু। স্যান্টা ক্লজের মতই বানিও সারা পৃথিবী দৌড়ে বেড়ায় আর বাচ্চাদেরকে ঝুড়ি ভর্তি ডিম দিয়ে আসে। শুধুওই কি ডিম, কত রকমের উপহারও নিয়ে যায় বাচ্চাদের জন্য। বাচ্চারা বানির কাছ থেকে পাওয়া চকোলেট সবার সাথে শেয়ার করে, একা একা সব খেয়ে ফেলেনা।

ইস্টার বানি কেনো আসে
এভাবেই একজন স্যান্টা ক্লজ অথবা একটি ইস্টার বানির কাছ থেকে বাচ্চারা জীবনে শেয়ারিং করতে শিখে, ‘দেওয়ার মধ্যেই আনন্দ’ শিখে, দুঃখীর মুখে হাসি ফোটাতে শিখে। বাচ্চা বয়সে শেখা এই মহৎ গুনগুলো জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত বহন করে যাওয়া খুবই কঠিন। কৈশোর পেরোলেই মানুষের মনে স্বার্থচিন্তা ঢুকে যায়, তখন মানুষ দিয়ে সুখ পায়না, নিয়ে সুখ পায়। আর তাই পৃথিবীতে এত হানাহানি, এত বেশী আগ্রাসন। তাই বুঝি এমনই অশান্তিময় সময়ে স্যান্টা ক্লজ বা ইস্টার বানি বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নেমে আসে এই ধরণীতে, ছুটে ছুটে যায় প্রতিটি শিশুর কাছে। চেষ্টা করে শিশুদের মধ্যে ভালোবাসার বীজ বপন করে দিতে। শিশুরা নির্মল, শিশুরা পবিত্র, এই শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যত। প্রতি একশত শিশুর মধ্যে একজন শিশুও যদি পারে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত আর্তের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে, তাহলেই পৃথিবীটা হয়ে উঠবে অনেক আনন্দের, অনেক ভালোবাসার। এই আশাতেই স্যান্টাক্লজ ও ইস্টার বানি এখনও পিঠে উপহারের ঝোলা নিয়ে ছুটে ছুটে আসে এই ধরণী মাঝে, শিশুদের কাছে।