ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

মিসিসিপি নদীর নাম সেই ছোটবেলা থেকেই জানি। ছাত্রছাত্রী মাত্রেই জানে পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীগুলোর মধ্যে মিসিসিপি অন্যতম (চতুর্থ)। উত্তর আমেরিকার দীর্ঘতম নদী মিসিসিপির তীরে মিসিসিপি নামেই একটি রাজ্য আছে। আমেরিকা নামের ধনী দেশটির সবচেয়ে গরীব রাজ্য হচ্ছে এই মিসিসিপি। কালো জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত মিসিসিপিতে আমরা কিছু বাঙ্গালী বাস করি। গরীব রাজ্যে আমাদের বাঙ্গালীর সংখ্যাটিও খুবই নগন্য। মিসিসিপির রাজধানী জ্যাকসন-এ বাংলাদেশ- পশ্চিমবঙ্গের মিলিত বাঙ্গালী সংখ্যা একশ’র বেশী হবেনা। আর মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস স্টার্কভিলের বাঙ্গালীর সংখ্যা, আমাদেরকে নিয়েও ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের বেশী হবেনা। এর মধ্যে প্রায় বিশ জনই অস্থায়ী, কারন এরা পিএইচডি করতে আসা সব মেধাবী ছাত্র ছাত্রী, পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত। যে চার পাঁচটি পরিবার আছি, তারাও কর্মজগতেই ব্যস্ত। এমন এক সদা ব্যস্ত পরিবেশে আমার মত বাঙ্গালের বেঁচে থাকা খুব কঠিন। মন খারাপ থাকে প্রায়ই, বিশেষ করে দেশে যখন ঈদ, দূর্গা পূজা, পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীসহ নানা রকমের বাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসব মহাসমারোহে উদযাপিত হয়, ঠিক ঐ সময়টাতে সব ছেড়েছুঁড়ে একছুটে দেশে চলে যেতে ইচ্ছে করে।

যদিও আমাকে মোটামুটি পাকাপাকিভাবেই প্রবাসে থাকতে হবে ভেবে মন খারাপ হয়, কিনতু যারা পিএইচডি করতে এসেছে এখানে, তারাও মনে মনে সারাটাক্ষণ কাঁদে, দেশের জন্য, দেশে থাকা আপনজনের জন্য। সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়ে নানাভাবে। ইয়াং সব ছেলেমেয়েকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াতে গেলে পোলাও কোরমার বদলে যদি ভর্তা, নানারকম চচ্চড়ি, ইলিশ বা রুই মাছের ঝোল, শুটকী খেতে দেয়া যায়, খুশীতে ওদের মুখ ঝলমল করে উঠে। মাঝে মাঝে ঘরোয়া কোন গেট টুগেদারে রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি, লালন গীতি, হাছন রাজার গানের প্রতি এদের খুব টান। ছোটখাটো কোন উছিলা পেলেই মেয়েরা সব শাড়ী পড়তে ভালোবাসে, আর ছেলেরা পাঞ্জাবী পড়ে। যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা দেশে থাকতে মায়ের আঁচলের নীচে নিরাপদে ছিল, বাবার স্নেহে সিক্ত ছিল, তারাই আজ বিদেশ বিভুঁইয়ে এসে আমার মধ্যে মায়ের পরশ খুঁজে পেতে চায়। এইজন্যই আমরা ছোট্ট জনগোষ্ঠী হলেও অনেকটাই একান্নবর্তী পরিবারের মত আছি। ছোটখাটো মান অভিমান যেমন হয়, তেমনি কারো সুখে বা বিপদেও সকলে এক ডাকে ছুটে আসে।

আমি আছি কলম্বাস নামের ছোট্ট শহরে, যেখানে আমরা একটিইমাত্র বাঙ্গালী পরিবার। বাকীরা থাকে স্টার্কভিলে। আমেরিকার অন্যসব স্টেটে অবশ্য অন্যরকম চিত্র। নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, ক্যালিফোর্ণিয়াতে প্রচুর বাঙ্গালী। ওখানে এত বেশী বাঙ্গালী যে তারা যে কোন অনুষ্ঠান জেলাভিত্তিকভাবেও উদযাপন করতে পারে। মিসিসিপির স্টার্কভিলে আমাদের সে সুযোগ নেই, তাই বলে আমরা হাত গুটিয়ে বসেও নেই। আমাদের সকলের ইচ্ছে, আন্তরিকতা, পরিশ্রমে কোন কমতি নেই। আমরা প্রতিটি উপলক্ষ্যে সকলে একসাথে মিলে মিশে খুবই ঘরোয়া স্টাইলে সময়টুকু উপভোগ করি। আমাদের এখানে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ডঃ হক স্যার আছেন, যিনি সবাইকে উদার আহবান জানান যেনো ভেন্যু নিয়ে কোন রকম সমস্যায় পড়তে না হয়। উনার বাড়ী উনি খুলে দেন, নিজে পোলাও, বিরিয়ানী, চিকেন, মাটন রান্না করে সবাইকে আপ্যায়িত করেন। উনার এমন আন্তরিকতার কাছে আমরাও বশ মানি। আমরা অবশ্য আরও কিছু উপাদেয় খাবার রান্না করে, নিজেরাই গান বাজনা, কৌতুক, কবিতায় অনুষ্ঠানে পূর্ণতা আনার চেষ্টা করি। এভাবেই আমরা ঈদ, পূজা পুনর্মিলণীসহ নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকি। পহেলা বৈশাখও উদযাপন করেছি এর আগে।

এবারের পহেলা বৈশাখও উদযাপন করবো, তবে একেবারে নতুন আঙ্গিকে। এমনটাই চিন্তা করছি আমরা। বাংলাদেশ স্টুডেন্টস এসোসিয়েশান নতুন কমিটি গঠিত হলো গত সপ্তাহে। হাতে গোনা বালাদেশী হলে কি হবে, সব নিয়ম নীতি মেনে এসোসিয়েশান গঠিত হয়েছে। সেই এসোসিয়েশানে স্টুডেন্টস এর বাইরে আমার মত যারা আছে, তারা পরামর্শকের দায়িত্বে থাকবে। তবে আমরা কেউই বাংলাদেশের রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের মত গায়ের জোরে উপদেশ দেইনা। আমরা চেষ্টা করি, ছাত্রছাত্রীদের পাশে থাকতে। নতুন কমিটিতে বুয়েট থেকে পাশ করে আসা ফারহান সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে। সবার সম্মতিতে নির্বাচিত ফারহান খুব ভয় পেয়ে গেছে পড়াশুনার অবসরে কি করে এমন গুরু দায়িত্ব পালন করবে ভেবে! ফারহানকে অভয় দিচ্ছে বুয়েটের শিমু (ভাইস প্রেসিডেন্ট), সেক্রেটারি অপূর্ব নন্দী (বুয়েট), ট্রেজারার তাসমিন(বুয়েট), ওয়েব মাস্টার রিফাত(বুয়েট), কালচারাল সেক্রেটারী ঈশান(চিটাগাং)। উপদেষ্টা ডঃ হক, ডঃ খালেদ, ডঃ জীবেন উপদেশমালা নিয়ে তৈরী আছেন। ফরিদ, রনি, শাহীন, আহাদ, তুষার, তন্ময়, মারুফ, আবদুল্লা পাশেই থাকবে, এরা প্রত্যেকেই বাবা মায়ের আদরের দুলাল, কিনতু এখানে তাদের কর্ম দক্ষতা দেখলে তাদের বাবা মায়ের বুকটা গর্বে ভরে উঠবে।

আমি প্রতি দুই বছর পর পর দেশে যাই, ফেরার সময় সাথে করে নিয়ে আসি দেশীয় জিনিস। এভাবেই আমার ভাঙ্গা ঘরে জমেছে হাতপাখা, বেতের ঝুড়ি, ডালা-কুলা, হারমোনিয়াম, বাঁশের বাঁশী, বাংলা ছড়াছবির বই, তাঁতের শাড়ী, পোড়ামাটির গ্লাস ও জলের জগ, মাটির গয়না, নানা রকম পটারি, মুখোশ, লাল টিপ, কাঁচের চুড়ি, পায়ের নূপুর, কোমড়ের বিছা, শ’খানেক নানা ডিজাইনের পাঞ্জাবী, বাংলাদেশের নানা প্রতিচ্ছবিতে টি-শার্ট, চুলের ফিতা, মেহেদীর টিউব—আর কি লাগে পহেলা বৈশাখের পসরা সাজাতে!

খাবার আয়োজনে মাথায় রেখেছি পান্তা ভাতের কথা। পান্তাভাতের জোগান দেবো আমি, ওপার বাংলার সোমা, সাথে আরও কেউ। পান্তাভাতের সাথে নানারকম ভর্তা থাকবে। শাহীন-নিশো করবে সীমের ভর্তা, আহাদ-তাসমিন করবে টম্যাটো ভর্তা, সোমা-দীপ করবে চিংড়ি ভর্তা, শিমু-আবদুল্লা করবে ডিমের ভর্তা, আমি করবো আলুভর্তা। পান্তা থাকবে, সাথে ইলিশ থাকবেনা!! এ কেমন কথা! কিনতু এটাই সত্যি। ইলিশ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। ইলিশ আনতে হলে কাউকে না কাউকে পাঁচ ঘন্টা গাড়ী ড্রাইভ করে আটলান্টা যেতে হবে। এখানে সকলেই তাদের রিসার্চ, থিসিস নিয়ে ব্যস্ত। পড়াশুনা করতে আসা ছেলেমেয়েদের পড়াশুনাটাই ফার্স্ট প্রায়োরিটি হওয়ার কথা। তাই আমি ওদেরকে বলেছি, ইলিশের জন্য দূর্ভাবনা করে লাভ নেই। এখানে বড় বড় ফ্রেশ তেলাপিয়া পাওয়া যায়। সেই তেলাপিয়া মাছ আমি এমন করে ভেজে দেবো যে ইলিশের কাছাকাছি পর্যায়ে নিয়ে যাবো ( ইলিশের তুলনা ইলিশ, তাই কাছাকাছি যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি)। এই পর্যন্ত এতটুকু জেনেছি, বাকীদের কথা না জানলেও চলবে। কারন ফারহান এর মধ্যেই খুব নাম করে ফেলেছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ডালের ভর্তা বানিয়ে। ইনটারন্যাশনাল ফিয়েস্তাতে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা অলরেডী চটপটি, পকোড়া, সব্জী পোলাও, মিক্সড ভেজিটেবল, ফিরনী বানিয়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। মারুফের নতুন বউ রানতু এসেই কাজে লেগে গেছে। সে একাই এক ট্রে সব্জী পোলাও রেঁধে আমাদের মন জয় করে ফেলেছে। কাজেই খাবার নিয়ে কোন চিন্তা নেই। শাহীনের বউ নিশো (ডাক্তার) ভালো গান করে, আহাদের বউ তাসমিন(বুয়েট) কাজে কর্মে দারুন পাকা, সে কারনেই আমাদের দুশ্চিন্তা নেই। সংখ্যায় কম হলেও প্রত্যেকে দারুন গুনী।

কাউকেই জানানো হয়নি, আমি বাংলাদেশ থেকে আমেরিকান কাস্টমসের চোখ এড়িয়ে চ্যাঁপা শুটকী এনেছিলাম, এ পর্যন্ত কতজনকে যে শুটকী ভর্তা খাইয়েছি, সবার ধারনা এতোদিনে বোধ হয় আমার শুটকীর স্টক ফুরিয়ে গেছে। আমি সবাইকে সারপ্রাইজ দেবো পান্তার সাথে চ্যাঁপা শুটকীর ভর্তা দিয়ে। আমি এখানে সব ছেলে মেয়েদের মায়ের মত। আমাকে সবাই আন্টি ডাকতে ডাকতে আমাকে ইউনিভার্স্যাল আন্টির মর্য্যাদা দিয়ে ফেলেছে। আর আমিও মনে হয় তাদের মায়ের ভূমিকায় নিজেকে দেখে খুবই আহ্লাদিত বোধ করছি। সেই জন্যই এই প্রোগ্রামে আমি নানারকম পিঠা, নিমকী, দই, চিড়ার ব্যবস্থা করবো। আর ডঃ হকতো আছেন। উনি অনেকটাই মায়েদের মত করে সবাইকে খাওয়াতে ভালোবাসেন। উনি রান্না করবেন ভাত, মুরগীর ঝোল। ডঃ হক বলেন এক, করেন তার চেয়েও কয়েক গুন বেশী। পিঙ্কীর কথা এখনও জানা হয়নি, তবে বাঙ্গাল বাবা মায়ের মেয়ে পিঙ্কীর আত্মাটি বাংগালদের মতই বিশাল। তাকে শুধু দায়িত্ব একটা দিয়ে দিলেই হলো, সে আনন্দের সাথে দায়িত্ব পালন করে। দিপী ভাবি বর্তমানে ডালাসে চাকুরী করছেন, আমাদের অনুষ্ঠানের আগের দিন এসে পৌঁছাবেন স্বামী ডঃ খালেদ ও ছেলে মাহেরের কাছে। ভাবী এসে রান্না করে খালেদ ভাইকে টেনশানমুক্ত করবেন, যেমনটা আমি টেনশানমুক্ত রাখবো ডঃ রায়কে, অবশ্য তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সহযোগীতার পুরোটাই সদ্ব্যবহার করবো।

আমরা স্টার্কভিলের সকল বাঙ্গালীকেই নেমন্তন্ন করেছি। ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ হলেও, ঐদিন আমাকে কাজে ছুটতে হবে, দিপী ভাবি ডালাস থেকে এসে পৌঁছাবে ঐদিন বিকেলে, অথচ আমরা সকলের উপস্থিতি কামনা করি। তাই ১৫ই এপ্রিল আমাদের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ১৫ই এপ্রিল রবিবার দুপুরে ডঃ হকের বিশাল বড় বাড়ির আঙ্গিনাতে সবাই আসবে। মেলা বসাবো। বাচ্চাদের হাতে তুলে দেবো প্যাঁ পোঁ বাঁশী, মেয়েরা শাড়ি পড়ে মাথায় ফুল গুঁজবো, হাত ভর্তি চুড়ি, গলায় পোড়ামাটির মালা, কপালে লাল টিপ, ছেলেরা পড়বে পাঞ্জাবী। আমরা বাইরে থেকে শিল্পী ভাড়া করে আনতে পারবোনা, সেই ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই আমরা নিজেরাই শিল্পী হয়ে যাবো, সেই একটা দিন। একসাথে গাইবো, “ এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। আহাদ, নিশো, দীপ, পিঙ্কী, ঈশান, মৌটুসী গাইবে। মিশা নাচ করবে। শাহীন দাঁতের মাজন, খুজলী পাঁচড়ার মলম বেচবে, মিথীলা কবিতা আবৃত্তি করবে, বাকী যারা থাকবে, সবার দেখাদেখি তারাও কিছু না কিছু করবেই।

অনেকদিন আগে ঘরোয়া একটি অনুষ্ঠানে আমি একটি গান করেছিলাম, “আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশী কিনে এনেছি”, সেখানে এক জায়গাতে আছে “বাঁশী কই আগের মত বাজেনা”। গানটি শুনে আসরের সকলেই একটু আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে, বিশেষ করে শিমু। এরপর অনেকবার শিমু আমাকে গানটি গাইতে অনুরোধ করেছে, আমি এড়িয়ে গেছি। কারন আমি গানটির বিষাদময় দিকটিকে আর টেনে আনতে চাইনা। যা গেছে তা গেছে, হারিয়ে যাওয়া জিনিসের জন্য আক্ষেপ করতে চাইনা। আমি চাই নতুনকে বরন করতে। পদ্মাপারের মাঝি আমরা, দাঁড় বাইছি মিসিসিপিতে। আমরা মিসিসিপির তীরেই মেলা বসাতে চাই। সব নদীর জল সাগরে মেশে। পদ্মার সাথে মিসিসিপির যোগ হবে সাগরে গিয়ে। সকল গ্লানি মুছে যাবে, সকল জরা ঘুচে যাবে, আমরা মিসিসিপির তীরেই গাইবো, ‘আবার জমবে মেলা, বটতলা হাটখোলা’। সবার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করবো, ‘ শুভ নববর্ষ, ১৪১৯’!