ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

যখন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়তাম, আমাদের বাংলা পাঠ্য বইয়ে একটি কবিতা ছিল, যার প্রথম চারটি লাইন ছিল,
“মাথায় কত প্রশ্ন আসে
দিচ্ছেনা কেউ জবাব তার’
সবাই বলে, মূর্খ ছেলে
বকিসনে আর খবরদার”।

কবিতাটির মূল চরণটুকুই আমার মনে আছে, কবিতার নাম বা কবির নাম মনে পড়ছেনা। কবিতাটির সাথে যে কার্টুন মার্কা ছবি সংজোযিত ছিল, সেখানে একটি ছেলে তার তর্জনী মাথার দিকে পয়েন্ট করে চোখ জোড়া গোল গোল করে মুখ হাঁ করে বোকার মত তাকিয়ে ছিল। জীবনে অনেকবার কবিতার এই চারটি চরণ মনে পড়েছে, তবে ইদানীং চরণগুলো মনে পড়ার সাথে সাথে নিজেকেই সেই ছবির ছেলেটির মত মনে হচ্ছে।

আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর মধ্যে হাডুডু, কাবাডি, ফুটবল উল্লেখযোগ্য। এই খেলাগুলোতে নির্দিষ্ট সংখ্যক খেলোয়ার দুই দলে অংশগ্রহণ করে থাকে। বেশ জনপ্রিয় এই খেলাগুলো। কিনতু একাধারে ঐতিহ্যবাহী এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটি হচ্ছে রাজনীতির খেলা। এশিয়া মহাদেশে, বিশেষ করে আমাদের দেশে রাজনীতির খেলা এমনই জনপ্রিয় যে দেশের আবালবৃদ্ধবণিতা জেনে না জেনে, বুঝে না বুঝে এতে অংশগ্রহণ করে থাকে। হাডুডু বা ফুটবল খেলার নির্দিষ্ট কতগুলো নিয়ম আছে বলে খেলা চলাকালীন সমর্থকদের মাঝে উত্তেজনা থাকলেও বৈচিত্র্য নেই। কিনতু রাজনীতির খেলাটিতে মুহূর্মুহূ উত্তেজনা, নানা বৈচিত্র্য থাকাতে এই খেলার খেলোয়ার ও দর্শক সবচেয়ে বেশী।

রাজনীতির খেলাতে প্রধান দুইটি পক্ষ থাকলেও অপ্রধান আরও অনেক পক্ষ থাকে, যারা ‘সব নদী সাগরে মিশে’ র মত করেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সাথে মিলে মিশে থাকতে চায়। খেলোয়ারের অভাব কোন পক্ষেই সাধারনতঃ দেখা যায়না। ‘টোকাই’ নামের যে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়ারবৃন্দ সাইড লাইনে থাকে, রাজনীতির ‘জ্বালাও-পোড়াও’ অংশটিতে তাদেরকে সব সময় হাতের কাছে পাওয়া যায়। বুদ্ধিজীবি নামের যে সর্বজ্ঞাণী খেলোয়ারবৃন্দ আছেন, তাঁদেরকে ‘গোল টেবিল বৈঠক’, ‘পত্রিকায় বিবৃতিদান’, ‘টক শো’ ‘লাল, নীল, গোলাপী, বেগুণী’ অংশে তাঁদেরকে পাওয়া যায়। খেলোয়ারের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। অতীতে সাংবাদিক বা কলাম লেখকেরা অংশগ্রহণ করতেন এই ‘রাজনীতি’ খেলাতে, কিনতু খেলাটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে বর্তমানে পুরো মিডিয়াই খেলাটিতে অংশগ্রহণ করে। মূল দলের সমর্থণে দলীয় সংবাদপত্র, টিভি, ওয়েবসাইট, ব্লগও পাওয়া যায় এখন, এরা সকলেই যার যার মত করেই অংশ নিয়ে থাকে ‘রাজনীতি’র খেলাতে। আর এই খেলার সবচেয়ে দামী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘জীবন উৎসর্গ’ বা ‘জান দেওয়া’ তে সাধারণ জনগন অংশ নেয়। এভাবেই ‘রাজনীতি’ নামের খেলাটি সারা দেশেই যুগ যুগ ধরে বছরের বারোমাস অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ‘রাজনীতি’ খেলাটি দিনে দিনে অনেক বেশী উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমনই উত্তেজনা খেলাটিতে যে ‘ক্রিকেটে’, ফুটবলেও এখন রাজনীতিকে পাওয়া যাচ্ছে। রাজনীতিকে আরও পাওয়া যাচ্ছে হাটে, বাজারে, অফিসে, ব্যাঙ্কে, চিকিৎসাকেন্দ্র, ব্যবসা-বানিজ্যে, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শেয়ার মার্কেট, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বানিজ্যে, গৃহিণীর রান্নাঘর হয়ে মাঝে মাঝে ‘নিষিদ্ধ পল্লী’ তে (নিষিদ্ধ পল্লী শব্দটি পড়ে যাদের কপাল কুঁচকে উঠবে, তাদের জন্য শুধু বলে রাখা ভালো, কিছুদিন আগেই জনৈকা সংসদ সদস্যা ও মাননীয়া মন্ত্রীর পালটা যুক্তির মধ্যেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল)।

‘রাজনীতি’কে আরও আকর্ষণীয়, আরও বেশী উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে নতুন যে উপাদানটি যোগ হয়েছে তার নাম ‘দূর্নীতি’। রাজনীতি নামের খেলাটির সূত্র ধরেই বাংলাভাষাতে ইদানীং যে শব্দটি সবচেয়ে বেশীবার উচ্চারিত হচ্ছে, তা হলো ‘দূর্নীতি’। বর্তমানের রাজনীতিতে সবচেয়ে পাওয়ারফুল হচ্ছে ‘দূর্নীতি’। মূলতঃ এই একটিমাত্র শব্দই রাজনীতিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গেছে। দূর্নীতি কখন ঢুকেছে রাজনীতিতে, সন তারিখ কেউ বলতে পারবেনা, কতটা গভীরে ঢুকে গেছে তাও নিরূপন করা সম্ভব না। এবং কোন শল্য চিকিৎসকের পক্ষেও সম্ভব নয় দূর্নীতির বিষাক্ত তীরটিকে রাজনীতির গভীর তলদেশ থেকে বের করে আনা। দূর্নীতিতে দুই তিনবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পর্যন্ত হয়েছে আমাদের দেশটি। মাঝে এক দুইবার চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও লড়াইয়ের মাঠে এখনও বাংলাদেশ প্রথম দিকেই আছে। ইদানিংকালের ঘটনাবলী দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে, বাংলাদেশ আবারও দূর্নীতিতে প্রথম স্থানটি ফিরে পেলে পেতেও পারে।

ইদানিং ছোটবেলায় পড়া সেই কবিতাটির চরণগুলো সারাটাক্ষণ মাথায় ঘুরপাক খায়। কথা বলার সময় সকলেই গলা ফাটিয়ে ফেলি ‘ আমার দেশ, আমার জন্মভূমি, আমার মাতৃভূমি, প্রিয় বাংলাদেশ, জয় বাংলা’ শ্লোগানে। আর কাজের সময় কাজটা সারি টেবিলের নীচে হাত ঢুকিয়ে। দূর্নীতি কোন পর্যায়ে গেলে পড়ে এক সরকারের আমলে ‘বিশেষ ভবন’ গড়ে উঠে, আরেক সরকারের আমলে মন্ত্রীর এপিএস কোটি কোটি টকার মালিক হয়! দূর্নীতির শেকড় কোথায় ঢুকলে পরে বর্নাঢ্যময় রাজনৈতিক জীবনের একেবারে শেষের দিকে এসে মন্ত্রীত্ব পেয়েও মত্রীত্ব হারাতে হয়! দূর্নীতি কতটা আঠালো হলে পরে শুধুমাত্র ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার লোভে ভাঙ্গা কোমড় নিয়েও বিদেশে বসে থেকেই মানুষ কলকাঠি নাড়ায়! দূর্নীতি ব্যাপারটা কতটা নেশালু হলে পরে যেন তেন প্রকারেন পদ্ধতিতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অথবা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠে। আর মরিয়া হয়ে একে ‘গুম’ করছে তাকে ‘অপহরণ’ করছে, কেউ কেউ নিজেরাই ‘হাপিশ’ হয়ে গিয়ে অন্য পক্ষকে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছে! রাজনীতির এমন দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে আরেক শ্রেণীর সুবিধাবাদীরা খুন, অপহরন, রাহাজানিসহ নানা রকম অসামাজিক কাজ করে চলেছে।

মন্ত্রীত্ব হারানো নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, একজন ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ জীবন সায়াহ্নে এসে গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তাঁর তো রাজনীতির ভালো দিক মন্দ দিক সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকার কথা, উনিতো জানতেন রাজনীতিতে তাঁর শত্রুর অভাব নেই, সব জেনেশুনে কি উনি এমন পচা শামুকে পা কাটতে চাইবেন? আর একটি প্রশ্ন জাগে, বিতর্ক থামাতে গিয়ে যিনি পদত্যাগ করার মত সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন, একদিন পরেই কেনো দফতরবিহীন মন্ত্রীর পদটি ফিরিয়ে দিতে পারলেননা! কি জানি, কেনো শুধু প্রশ্নই জাগে, উত্তর তো পাইনা।

‘গুম’ হয়ে যাওয়া অথবা অপহরন করা প্রসংগ আসতেই নতুন আরেকটি প্রশ্ন জেগেছে মনে, অতি সম্প্রতি আর একজন ডাকসাইটে নেতা ঢাকা শহরের মত এমন জনাকীর্ণ একটি জায়গা থেকে কিভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলেন! আর এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার অন্তর্ধানে যেখানে সকলের কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাওয়ার কথা, তা না হয়ে যেভাবে একপক্ষ আরেক পক্ষকে দোষারোপ করছে, দেখেশুনে মাঝে মাঝেই মাথায় প্রশ্ন জাগছে, ‘সবই সাজানো নয়তো?’ সরকারকে দোষারোপ করা যায় দেশের আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য, কিনতু আগে থাকতে না জানা থাকলে, ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কি বলা যায়, আইনশৃংখলা বাহিণীর লোকজন তাকে অপহরণ করেছে? তাছাড়া একই নেতা কয়েকমাস আগেও যেখানে নিখোঁজ হয়ে গেছিলেন, তারপরে জানা যায় কাউকে কিছু না জানিয়ে নেতা বিদেশে গেছিলেন চিকিৎসা করাতে। এবারও এমন কিছু হয়নিতো! সব কিছু যাচাই না করে কি পাঁচ ছয় ঘন্টার মধ্যেই বলে দেয়া যায় যে সরকার এটা করেছে? যে সরকারের মাত্র দুই দিন আগেই মন্ত্রীর এপিএসের কেলেংকারী নিয়ে এত কান্ড ঘটে গেলো, সেই সরকার বিরোধী দলের এমন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে অপহরণ করার মত বোকামি করবে? কি জানি, প্রশ্ন তো আমার মাথায় এসেছে, এটা নিশ্চয়ই আমার মাথার দোষ, আমি মনেপ্রাণে চাই অপহৃত সকল মানুষ নিরাপদে মুক্তি পাক। কোন বাবা মায়ের বুক যেনো না ভাঙ্গে, কোন স্ত্রী যেনো স্বামীহারা না হয়, কোন সন্তান যেনো পিতৃহীন না হয়, কোন বোন যেনো ভ্রাতৃহীন না হয়।

কিনতু ‘রাজনীতি’র খেল সোজা খেল নয়! রাজনীতির মধু চক্রে পড়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করতে হাত কাঁপেনা, দাপুটে রাষ্ট্রনায়ককে জেলে পাঠিয়ে আবার সেই পতিত মানুষটিকে নিয়ে টানাটানি করতেও কারো বিবেকে বাঁধেনা। রাজনীতি এমনই মিষ্টি যে তৃতীয় পক্ষও এর লোভ সামলাতে না পেরে দুই নেত্রীকে জেলে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজেরা কিছুদিন ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করতেও দ্বিধা করেনা। রাজনীতির মধু খেতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেনো অপেক্ষা করতেই থাকে একটি ‘লাশের’ জন্য। কোনমতে একটি লাশ ফেলতে পারলে শুরু হয়ে যায় দেশজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ খেলা। এই খেলাটিও অনেক উত্তেজনাপূর্ণ। বাসে বা গাড়ীতে একটু পেট্রোল ঢেলে ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে দিতে পারলেই হলো, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠতে দেখলে মনে এক ধরনের যুদ্ধজয়ের আনন্দ পাওয়া যায়! আগুনে পুড়ে মানুষ মারা গেলেতো কথাই নেই, নতুন একটি ইস্যু পাওয়া যায়, আরেকদিন আগুন নিয়ে খেলা করার জন্য। মানুষের তো অভাব নেই, দেশটিতে মানুষ তো গিজ গিজ করছেই, একটা বোমা ফেললেও এক বোমাতে ২৪ জনকে মেরে ফেলা যায়, বাসে পুড়ে একসাথে নয়জন দগ্ধ হয়ে মারা যায়। দারুন উত্তেজনা ‘রাজনীতি’র খেলাতে। এইজন্যই মনে হয় ঝুঁকি পূর্ণ জেনেও মানুষ রাজনীতি করতে চায়! সমস্যা হয় সৎ মানুষদেরকে নিয়ে। সৎ মানুষেরাতো কিছু না পেয়েই রাজনীতি করে থাকেন। তাহলে যাঁরা সৎ রাজনীতিবিদ, তাঁরা কিসের আকর্ষনে রাজনীতি করেন, এই প্রশ্নটির উত্তরও এখনও পাইনি। তবে আকর্ষণ তো আছেই, নাহলে সৎ মানুষগুলো কেনো আসবে এই খেলাতে! হতে পারে, ‘রাজনীতি’ আসলেই একটি চক্রযান যেখানে সৎ, অসৎ, দুর্নীতিপরায়ন সকলেই ঘুরপাক খাচ্ছে, ঘূর্ণির দোলানি যারা সহ্য করতে পারছে তারাই টিকে থাকছে, বাকীরা রাজনীতির চক্রযান থেকে ছিটকে পড়ছে।