ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আমি আগে মাঝে মধ্যে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট দুই একটি লেখা ব্লগে লিখতাম। লেখা পোস্ট হওয়ার পরবর্তী সমালোচনার ঝড়ে ক্ষত বিক্ষতও হয়েছি, মাঝে মাঝে সমালোচনার ভাষা এতই আক্রমণাত্মক ছিল, যা কিনা নোংরা সাম্প্রদায়িকতায় মোড়ানো থাকতো। আমি খুব আহত হতাম, পরে আমার কিছু শুভানুধ্যায়ী আমাকে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কোন লেখা লিখতে মানা করায় আমি আর লিখিনা। শুভাকাঙ্খী যারা তারা সব সময়ই অন্যের শুভ কামনা করে থাকে। আমাকে আমার বন্ধুরা বলেছিল বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামাতে। একেকজন একেক দৃষ্টিতে রাজনীতিকে দেখলেও মূল কথা ছিল, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামানো। কিনতু না লিখলেই কি আর মনের আকুতিগুলো থেমে থাকবে! শুভানুধ্যায়ীদের চোখ ফাঁকী দিয়ে মাঝে মাঝেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রাজনীতি নিয়ে দুই একটা লেখা লিখে ফেলি। এই জন্যই প্রবাদ আছে, ‘চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী’।

আমি একজন সচেতন মানুষ, থাকি পৃথিবীর গনতান্ত্রিক দেশে। এক বছর আমেরিকাতে থাকলেই অনেকে আমেরিকান হয়ে যায়, আর আমিতো আছি দশ বছরেরও বেশী সময় ধরে। আমেরিকার গনতন্ত্র উপভোগ করে চলেছি। আমেরিকাতে এমন অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে ইদানিং দেশের মানুষগুলোর কথা একটু আধটু মনে পড়ে বৈকি। শত হলেও আমারই মা-বাবা, ভাই বোন, বন্ধু-স্বজন, তারা কে কেমন আছে তা জানতে ইচ্ছে করে। মানুষের স্বভাবই এমন, আগে নিজের বুঝ বুঝা হয়ে গেলে তখন অন্যের ব্যাপারে একটু নাক গলাতে ইচ্ছে জাগে। তেমনিভাবেই আমিও একটু নাক গলাতে চেষ্টা করেছিলাম। সকলকেই একই প্রশ্ন করেছি, ” দেশের পরিস্থিতি কেমন মনে হয়”? একজন উত্তর দিয়েছে, “আপু, রাজনীতি বাদে অন্য কথা বলেন”। দেশের গণ্যমাণ্য একজনের কথা, ” দেশের রাজনীতির খ্যাতা পুড়ি”। তৃতীয় জন বলেছে, ” আন্টি, একটু সুযোগ পেলেই বিদেশে পালাবো, এই দেশে আরনা”। চতুর্থজন বলেছে, ‘নরক নরক, দেশের অবস্থা এখন নরক’। এদের প্রত্যেকেই এটুকু বলেই কথা এড়িয়ে গেছে, সকলেই তাই করছে, দেশের কথা না বলে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে চায়।

আমি প্রতি দুই বছরে একবার দেশে যাই, টাকাপয়সার ঝনঝনানি থাকলে প্রতি ছয় মাসে একবার যেতাম। এখানে দিনে রাতে খাটি, টাকা জমিয়ে রাখি, হাজার হাজার ডলার খরচ করে প্লেনের টিকিট কাটি। তবুও দেশে যাই, একা যাইনা, সাথে মেয়েদেরকে নিয়ে যাই। মেয়েগুলো যেন ওদের শেকড় হারিয়ে না ফেলে, তার জন্যই এমন অর্থদন্ডী দেই। দুই বছর পরে এবার আবার আমার যাওয়ার পালা। স্বাভাবিকভাবেই দারুন উত্তেজনা, দিন গোনা শুরু করেছি আরও চারমাস আগে থেকেই। কিনতু আমার যাওয়ার দিন যতই এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। আজ কয়টা দিন ধরে বাংলাদেশে এক দম বন্ধ করা পরিবেশ বিরাজ করছে।এই প্রথম আমি দোনামোনা করতে শুরু করেছি, আদৌ দেশে যাব কিনা ভেবে। কথা নেই বার্তা নেই, শুরু হয়ে গেছে গুম, অপহরণ, হরতালের বিভিষীকা।

আগেও অনেককেই নাকি গুম করা হয়েছে, আর গত সপ্তাহ থেকে বিএনপির ইলিয়াস আলীকে পাওয়া যাচ্ছেনা। কেউ বা কারা নাকি রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে চলে গেছে। আর অপহরণ বা নিখোঁজের কয়েক ঘন্টা পরেই সকলে জানতে পেরেছে এমন একটি ঘটনা রাতের আঁধারে ঘটে গেছে। সকলেই অবাক হয়ে গেছে। এও কি সম্ভব! আর বিরোধী দল থেকে সারাদেশে হরতাল ডাকা হয়েছে। মানুষ বুঝতে পারছেনা, একজনের অন্তর্ধান অথবা অপহরণের সাথে গোটা দেশের মানুষের কি সম্পর্ক! যিনি অপহৃত বা গুম হয়েছেন, তিনি বেঁচে আছেন নাকি তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে তা নিশ্চিত না হয়েই সারাদেশের আনাচে কানাচে বাসে গাড়ীতে আগুন লাগিয়ে নিরীহ মানুষগুলোকে হত্যা করা হচ্ছে, কিনতু কেন?

সভ্য মানুষ মাত্রেই কোন খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, ধর্ষন, অপহরণ, বোমাবাজি সমর্থন করেনা। যেদিন সকালে পত্রিকার পাতায় ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করার সংবাদ বের হয়েছে, আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছেই ব্যাপারটি খুব খারাপ লেগেছে। এমনকি যারা সরকারী দলে আছেন, তাঁরাও নানাভাবে নিজেদের মতামত দিয়েছেন ঘটনার নিন্দা জানিয়ে। হরতাল ডাকার আগে পর্যন্ত সবার সহানুভূতি ছিল ইলিয়াস আলীর পরিবারের প্রতি। আমার মত অনেক মা বা বোন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা করেছি এবং এখনও করছি, ইলিয়াস আলীকে যেনো তাঁর পরিবার অক্ষত দেহেই ফেরত পায়। সকলের সহানুভূতি যখন বিএনপির দিকেই ছিল, তখন কার প্ররোচনায়, কার উৎসাহে, কার উস্কাণীতে বিরোধী নেত্রী এমন লাগাতার হরতালের ডাক দিলেন! উনি কি বুঝতে পারছেন, সহানুভূতির হাওয়াতে টান ধরেছে, বাতাস উষ্ণ আর ভারী হয়ে উঠছে। হরতালের আগের দিন বাসে আগুন লাগিয়ে দিয়ে ঘুমন্ত ড্রাইভারকে মেরে ফেলা হলো, কেন? হরতালের দিন গুলীতে মারা গেছে আরও দুইজন, কেন? হরতালকে উপলক্ষ করে গাড়ীঘোড়াতে আগুন লাগানো হচ্ছে, কেন? উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে, পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেছে, কেন? ইলিয়াস আলীর সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের কি সম্পর্ক?

ইদানিং ব্লগ খুব জনপ্রিয় হয়েছে। অনেক সময় পত্রিকা ঠিকমতো পড়ার সময় না মিললেও ব্লগে একটু ঢুঁ মারলেই বর্তমান সময়ের সমস্ত ঘটনাবলী জানা যায়। নানা জনে নানা কথা বলছে। কেউ বলছে বিএনপি রাজনীতির মাঠ গরম রাখতে ইলিয়াসকে নিজেরাই লুকিয়ে রেখেছে, আবার কেউ বলছে ইলিয়াস নিজে যেহেতু বিতর্কিত রাজনীতিবিদ ছিল, তার শত্রুর অভাব ছিলনা, শত্রুরাই একাজ করেছে, যেহেতু এর আগে একবার ইলিয়াস আলী নিজেই কিছুদিনের জন্য হারিয়ে গিয়ে সংবাদের জন্ম দিয়েছিল, অনেকেই বলছে ইচ্ছে করে সরকারকে বিপাকে ফেলার জন্য সে এই কাজ করেছে, পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসলে তার মন্ত্রীত্ব পাওয়ার সম্ভাবনাকে পাকাপোক্ত করার আশায়। বিএনপি বলছে, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ‘দূর্নীতি’ আড়াল করতে ইলিয়াসকে সরকার থেকে আটকে রাখা হয়েছে।

সবই বুঝলাম, কিনতু এ ব্যাপারে দেশের মানুষের কি করার আছে। ক্ষমতার মাখন পালা করে আপনারাই খাচ্ছেন। দেশের মানুষকেতো মাখনের ছিঁটেফোঁটাও দিচ্ছেননা। তাহলে কেনো এক ইলিয়াস আলীর জন্য অন্যদেরকে মরতে হবে? বিএনপি আমলেই চিটাগাং এর জামালউদ্দিন সাহেবকে অপহরন করেছিল নিজের দলের লোকেরা, অপহরণের পর তাঁর ছেলেরা কত কান্নাকাটি করেছিল, তখনতো বেগম জিয়া অপহরণকারীদেরকে নির্দেশ দেন নাই জামালউদ্দিনকে জীবিত ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। কারো শাস্তিও হয়নি। নিজের দলের লোকেরাই সেদিন ভদ্রলোককে শেষ পর্যন্ত হত্যা করেছিল। অনেকেই এখন এই প্রসংগও টেনে আনছে। অনেকেই সুরঞ্জিত সেনের ‘দূর্নীতি’কে সমর্থন না করেই বলছে, এক সুরঞ্জিত নিয়েই যেখানে সরকার বিব্রত, সেখানে সরকার ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করতে চাইবে কোন যুক্তিতে!

আমাদের রাজনীতিবিদেরা জনগনের মঙ্গলের জন্য রাতে ঘুমায়না, দিনে ঘুমায়না, জনগনের চিন্তায় খাওয়া দাওয়াও করেনা ঠিকমত! তারা বক্তৃতা মঞ্চে গলা ফাটায় জনগনের ভালো চেয়ে, তারা সংবাদ সম্মেলন করে জনগনের মঙ্গলগীত গেয়ে। আজ সন্ধ্যাতেই বিএনপি নেতা সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছে, “কষ্ট করে হলেও হরতাল করে সরকারের অন্যায়ের বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ান’। হয়তো একটু পরেই সরকার থেকে বলা হবে, ‘হরতাল মানিনা মানবোনা, আপনারা হরতাল প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসুন’। জনগন কি করবে, কোন পথে যাবে? আমাদের রাজনীতি কেনো একই বৃত্তে ঘুরছে। পালা করে দুই দল ক্ষমতায় আসে। তার জন্য এক দল আরেক দলকে পাঁচটি বছর শাসন করার সুযোগ দেয়া উচিত। পান থেকে চুন খসলেই কথায় কথায় আন্দোলন অথবা হরতাল ডাকা মানেই সাধারন জনগনের ভোগান্তির একশেষ। ঘুণে ধরা পুরাণো এই খাঁচার বৃত্ত ভাঙ্গবো কেমন করে! দুই দিন আগেও ইলিয়াস আলীর জন্য সকলে মমতা দেখাচ্ছিল, এখন অনেকেই উলটো গীত গাইতে শুরু করেছে। অনেকেই বলতে শুরু করেছে, ব্লগে লিখছে,নেতাদের তত্বাবধানেই যে লুকিয়ে আছে, তাকে নাকি কেউ খুঁজে পাবেনা। কেউ কেউ তার অতীতের বিতর্কিত ইতিহাস টানছে, আরও বলছে, যার দৃশ্যতঃ কোন রোজগার নেই, তার ঢাকা শহরে এমন অট্টালিকা থাকে কি করে? এমন অট্টালিকা বানাতে গেলে অট্টালিকার সাথে অনেক শত্রুও তৈরী হয়। ঠোঁটকাটা যারা, তারা বলেন, ইলিয়াস আলী নিজেও নাকি কম মায়ের বুক খালি করে নাই –এই ধরনের নানা কথা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

আমি বলি, বাংলাদেশে দূর্নীতি নতুন কোন বিষয় নয়। তবে এতদিন দূর্নীতি টাকা পয়সার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন মনে হয় মানুষের জীবন নিয়ে দূর্নীতি শুরু হয়েছে। যে বা যারাই ইলিয়াস আলীকে সত্যি অপহরণ অথবা ‘সাজানো অপহরণ’ করে থাকুক, সেটাও দূর্ণীতি বইকি। এ কি বিড়ম্বণার মধ্যে পড়েছি সবাই। বোকা জনগনের ভোগান্তির শেষ নেই! জনগনের অবস্থা হয়েছে ভেজিটেবল স্যান্ডুইচের ভেতরের ‘ফালতু বিস্বাদ আলুর তরকারী’ র পুরের মত। সরকার ও বিরোধী দলের চাপে পড়ে এক্কেবারে ভর্তা অবস্থা। সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি অনুরোধ, রাজনীতির এই পুরাণো খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসুন। নয়তো বাংলার জনগনের কপালে আরও দূর্ভোগ আছে।

এত নির্মম নিষ্ঠুর হতে নেই! বদর বেগ নামের যে অসহায় ড্রাইভারটি আগুনে ঝলসে মারা গেলো, তার জায়গাতে প্রত্যেকে নিজেকে কল্পনা করুন, ভাবুন যে আপনি পরিবারের মুখের খাবার জোগাড় করতে বের হয়েছেন, ক্লান্ত দেহটি বিছিয়েছেন বাসের সীটের এক চিলতে পরিসরে, ঘুমের ঘোরেই টের পাচ্ছেন শরীরে আগুনের প্রচন্ড হলকা, জেগে উঠতেই এক মুহূর্ত শুধু দেখতে পেলেন সারা দেহ জ্বলছে, আপনি অসহায়, নড়া-চড়া করার ক্ষমতা নেই, দৌড় দিয়ে বের হতে পারলেননা, পুড়ে যেতে যেতেই কানে বাজছে পট পট করে মাথার চুল থেকে শুরু করে গায়ের চামড়া পুড়ে যাওয়ার শব্দ। আর ভাবতে ভালো লাগছেনা, বাংলাদেশের রাজনীতির গায়ে জনগন এখন বমি করতে শুরু করেছে। বমি এবার আপনাদের গায়ে এসে পড়বে। দোহাই লাগে, যে বা যারাই ইলিয়াস আলীকে অপহরণ করেছেন, তাকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে দিন। প্লীজ নাটক বন্ধ করুন। আজকের খবরেই জানলাম আগামী চার দিনের সময় দেয়া হয়েছে ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করে দেয়ার জন্য। সরকারের প্রতি অনুরোধ, যদি পারেন তো খুঁজে বের করুন, নাহলে নীরব থাকুন। এই মুহূর্তে কারোরই অপ্রাসঙ্গিক কোন মন্তব্য করা ঠিক নয়। অপ্রাসঙ্গিক কথার ফলে পরিস্থিতি অনেক জটিল হয়ে যায়। সবশেষে মনে প্রাণে চাই ইলিয়াস আলী অক্ষত দেহেই যেনো পরিবারের কাছে ফিরে আসেন। ইলিয়াস আলীর পরিবারের প্রতি সহানুভূতি রইলো।