ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

স্কুলজীবনে নানা উপলক্ষে মাঝে মাঝেই স্কুল ছুটি থাকতো। তার মধ্যে একটি উপলক্ষ ছিল ‘মে দিবস’। ‘মে দিবসের’ ছুটি নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তেমন কোন উৎসাহ ছিলনা সঙ্গত কারণে। কারণ ‘মে দিবসে’ ছাত্রছাত্রীদের কোন কিছুই করার ছিলনা বাড়ী বসে ছুটি কাটানো ছাড়া। সকলেই জানতাম ‘মে দিবস’ মানে শ্রমিক দিবস যেদিন আসলে কলকারখানা, গাড়ী ঘোড়া বন্ধ থাকে বেলা বারোটা পর্যন্ত। আমরা বড় হয়েছি নারায়নগঞ্জ শহরে। নারায়নগঞ্জ হচ্ছে শ্রমিকদের জন্য খ্যাত। নারায়নগঞ্জ আদমজী জুট মিল, বাওয়ানী মিল, লক্ষী নারায়ন মিল, গেঞ্জীর হোসিয়ারী মিলে নারায়নগঞ্জ ছিল সত্যিকারের শ্রমিক সমৃদ্ধ শহর। ফলে মে দিবস সম্পর্কে অল্প বিস্তর আমাদের জানা ছিল।

এরপরে বড় হতে হতে গনসঙ্গীতশিল্পী শ্রদ্ধেয় ফকির আলমগীরের গান, ‘ হেনরীর হাতুরীর বীণ’ শুনেতো আমি মুগ্ধ হয়েছি। সেই গানের মধ্যে দিয়েই শ্রমিকদের প্রতি আলাদা এক অনুভূতি জন্ম নেয়। ওদের ন্যায্য দাবীর প্রতি একটু একটু করে দূর্বল হতে শুরু করি। বেশ ছোটকালে দেখতাম, আমাদের ঘরে মাঝে মাঝে অতিরিক্ত যে মানুষটি থাকতেন ‘অমুকের মা’ বা তমুকের মা’ নামে, তাদের প্রতি আমার মায়ের স্নেহ ঝরে পরতো। আমার বয়সী ছোট কাজের মেয়েকে আমার মত করেই রাখা হতো। একদামের জামা কাপড় আমাদের দুজনকেই দেয়া হতো। এমনটা যেমন দেখেছি আবার আমার নিজের চোখেই দেখেছি আশে পাশের বাড়ীর কাজের মানুষগুলো খুবই ছোটখাটো ভুল করেও পার পায়নি। খুব পরিচিত একজনকে দেখতাম কাজের মেয়ে ভুল করলে আর রক্ষা নেই! হাতের লাঠি দিয়ে ধড়াম ধড়াম করে পিটানো হতো। অনেক বছর পার হয়ে গেছে, মনে হয়না গৃহকর্মীদের প্রতি মানুষের আচরণে তেমন কোন পরিবর্তন এসেছে।

একসময় পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই ‘জোর যার মুল্লুক তার’ অবস্থা ছিল। একসময় ক্রীত দাস প্রথাও ছিল। অসহায় মানুষগুলোকে দিয়ে বিনা বেতনে দিবারাত্রি কাজ করানো হতো। এভাবে পশুর মত খাটতে খাটতে সেই বোবা মানুষগুলোও নড়তে চড়তে শুরু করেছিল। প্রথমে কারো না কারো মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই সারা দিনের বদলে ‘দিনে আট ঘন্টা কাজ’ করার কথা। সেই থেকেই প্রস্তাবটি নিয়ে অনেক বেশী সাড়া পাওয়া যায় সবার মাঝে। মে দিবস দাবীর আইডিয়াটির প্রথম সূচনা অস্ট্রেলিয়াতে। ১৮৫৬ সালে সকল শ্রমিক বছরে একটি দিন বিরতি পালন করতে চেয়েছে। বছরে একটি দিন মাত্র কর্ম বিরতি। ২১শে এপ্রিল দিবসটি পালন করা হয়েছিল। তবে এই ধরনের এক্সপেরিমেন্ট ছিল শুধুমাত্র ঐ বছরের জন্য। কিন্তু প্রথমবারই সাধারণ জনগন থেকে প্রচুর সাড়া পাওয়া গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার পরেই আমেরিকাতে শুরু হয় শ্রমিকদের ‘৮ ঘন্টা কাজ’ এর পক্ষে আন্দোলন।।১৮৮৬ সালে ‘শিকাগো’ তে ২০০০,০০ শ্রমিকদের একটি প্রতিবাদ সভা চলাকালীন সময়ে, পুলিশ বিনা উস্কানীতে সভাটি ছত্রভংগ করে দেয়। ঐ সভাটি ছিল শ্রমিকদের ‘৮ ঘন্টা কাজ’ এর দাবীতে। দিনরাত বিরতিহীন কাজের পরিবর্তে দিনের নির্দিষ্ট আট ঘন্টা কাজ করার দাবী নিয়ে আরও আগে থেকেই শ্রমিকদের মধ্যে জল্পনা কল্পনা চলছিল। শিকাগোর ‘হে মার্কেটে’ সভা চলাকালীন সময়ে পুলিশ নৃশংস আক্রমন চালায়। পুলিশের আক্রমনের প্রতিবাদে এক শ্রমিকের ছুঁড়ে দেওয়া ডিনামাইট বোমার আগুনে এবং পুলিশের গোলাগুলীতে প্রচুর শ্রমিক ,ও পুলিশ সদস্য মৃত্যুবরণ করে। এরপরে তারা সিদ্ধান্ত নেয় একই দাবীতে পরবর্তী সমাবেশ ১৮৯০ সালের ১লা মে তারিখে হওয়ার ব্যাপারে।

ইতোমধ্যে সারা ইউরোপে ‘৮ ঘন্টা কাজের’ সমর্থণে শ্রমিক সংগঠনগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠে। তাদের দাবী দিনে দিনে অনেক বেশী জোরালো হতে থাকে। ‘হে মার্কেট’ ম্যাসাকারের পরে ১৮৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লব দিবস উদযাপন উপলক্ষে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের প্রথম কংগ্রেসের ৪০০ সদস্যের যে অধিবেশন হয়েছিল, সেখানেই শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে রেমন্ড ল্যাভিন নামের এক শ্রমিক ১৮৯০ সাল থেকে ‘শিকাগো প্রতিবাদ’ দিবস উদযাপনের প্রস্তাব করেন। তার প্রস্তাবকে আমেরিকান সংগঠনের পক্ষে আরেক শ্রমিক সমর্থন করে। তখনই প্রস্তাব করা হয়, বিশ্বে শ্রমিকদের জন্য সরকারী ছুটির দিন থাকা উচিৎ। ১৮৯১ সালের দ্বিতীয় কংগ্রেস অধিবেশনেই ১লা মে দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়। ১৮৯৪ সালে আরেকবার শ্রমিক-পুলিশ দাঙ্গা হয়। ১৯০৪ সালে আমস্টার্ডামে আন্তর্জাতিক সামাজিক সংগঠকদের এক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বের সকল ‘সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি’ সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোকে আহবান জানানো হয়, তৃনমূল জনগোষ্ঠির দাবী অনুযায়ী ‘৮ ঘন্টা কাজ’ এর দাবী সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হওয়ার কথা। সভায় আরও জানানো হয় ১লা মে তারিখে সকল শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রাখার প্রস্তাব পাশের কথা। সেই থেকে শুরু, সেই থেকেই মে দিবস উদযাপিত হচ্ছে। পৃথিবীর খেটে খাওয়া মানুষগুলো বছরে একটি দিন পায় নিজেদের জন্য। এতেই তারা খুশী। এতেই শ্রমিকেরা সম্মানিত হয়।

১লা মে ‘মে দিবস’ অথবা শ্রমিক দিবস পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই মর্যাদার সহিত পালিত হয়ে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীর ৬০টি দেশে ১লা মে সরকারী ছুটির দিন। আমাদের দেশেও মে দিবসে কলকারখানা বন্ধ থাকে,রাস্তায় গাড়ীও চলেনা। আমাদের দেশে খেটে খাওয়া মানুষের দাবী আছে কি নেই তা আমি জানিনা, তবে দাবী থাকলেও তা পূরণ হয়না, সেটা জানি। এখনও নারী শ্রমিকেরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়। এখনও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলোতে শুধু প্রবেশদ্বারই আছে, বিপদ ঘটলে বাহির হওয়ার পথ নেই। প্রতিবছর কোন না কোন কারখানাতে যে কোন কারনেই আগুন লাগে, খাঁচার ভেতর থেকে বের হওয়ার কোন রাস্তা থাকেনা বলে একটাই তালাবন্ধ গেট খুলতে খুলতে কতজন যে প্রাণ হারায়, তবুও মালিকশ্রেণীর হুঁশ হয়না। শ্রমিকদের থেকে শ্রম আদায় করা হলেও তাদের জীবনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়না। আরও জানি, আমাদের দেশে সকলেই তক্কে তক্কে থাকে কাকে কত বেশী ঠকানো যায়। এভাবেই মালিক ঠকায় কর্মচারীকে, রাজনৈতিক নেতারা ঠকায় সা্ধারন জনগনকে, আইন ঠকায় অসহায় গরীব বিচার প্রার্থীকে এভাবেই চলেছি আমরা। আর এভাবেই মে দিবসের চেতনা শোষকের হাতে ধূলায় লুটায়!