ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

কিশোরবেলাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি কবিতা আমাদের বাংলা পাঠ্যবইয়ে পাঠ্য ছিল। নবীন আর প্রবীণের তুলনামূলক একটি কবিতা। যেখানে কবিতার প্রতিটি স্তরে স্তরে প্রবীণদেরকে নির্বোধ, বধীর, অন্ধ হিসেবেই দেখিয়েছেন কবি। কবিতার কয়েকটি চরণ আমার মনে গেঁথে আছে।

” ওই যে প্রবীণ, ওই যে পরম পাকা, চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা।
ঝিমায় যেনো চিত্রপটে আঁকা—-
ওরে নবীণ ওরে আমার কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা”।

এমন করেই কবি পুরো কবিতাটি লিখেছিলেন। আমি তখন থেকেই বার্ধক্যকে ভয় পাই। কেউ আমাকে নির্বোধ বলবে ভাবতেই ভয় লাগে। আমার চারিপাশে কত ধরনের মানুষ দেখি, এদের মধ্যে শুধু বয়স্করাই কি নির্বোধ? না , কবিগুরু পুরোপুরি ঠিক বলেন নাই। নির্বোধদের কোন বয়স থাকেনা। আমি আজকে কাজে গেছিলাম বেলা বারোটাতে। বারোটা থেকে রাত নয়টা শিফট। আমার বড় মেয়ে চার পাঁচ দিনের জন্য এসেছিল, আজকেই বিকেলে চলে গেলো ওর শহরে। আমার আজকে কাজে যেতে মন চাইছিলোনা, তবু বলে গেছিলাম লাঞ্চ ব্রেকে এসে ওকে রওনা করিয়ে দিয়ে ফিরে যাবো কাজে। কাজের জায়গায় আমি আমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, পেছন থেকে এক মহিলা জিজ্ঞেস করলো আমি এখানে চাকুরী করি কিনা। আমি বললাম যে হ্যাঁ এখানেই চাকুরী করি, তোমার কি প্রয়োজন বলতে পারো। দেখি যদি তোমাকে হেল্প করতে পারি।

মহিলা বয়স্ক, পাশে তার স্বামী, তার বয়সীই হবে। আমার কাছে এসে ব্যাগ থেকে একটি কাগজ বের করে দেখালো, মোবাইল ফোন সংক্রান্ত নানা তথ্য। তার ফোনে নাকি দেখাচ্ছে ‘নো নেটওয়ার্ক’ সাইন। ফোন কোম্পানীর কাছ থেকে নানা তথ্য দিয়ে পুরো কাগজ ভরিয়ে ফেলেছে। আমি কাগজের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে তার কাছ থেকে মোবাইলটি চাইলাম। বুড়ীর মনে খটকা লেগেছে মনে হয়। সে আবার তার কাগজটা দেখিয়ে নতুন করে বর্ণনা দিতে শুরু করায় আমি আবারও তার মোবাইলটি চাইলাম। এবার বুড়ী আমাকে জিজ্ঞেস করে ফেললো, ‘ তুমি কি ফোন সম্পর্কে কিছু জানো? তুমি কি আমাকে ব্যাখ্যা করতে পারবে নো নেট ওয়ার্ক মানে কি। তুমি বরং আমার এই কাগজটা পড়ে দেখো, কিছু বুঝো কিনা’। আমার মনটা এমনিতেই একটু বিরক্ত ছিল, এর মধ্যে বুড়ীর এত কথা শুনে উত্তরে আবারও তার কাছ থেকে তার ফোনটা চাইলাম। আর আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে আমার এখানে কাজ হচ্ছে ফোন সার্ভিস নিয়ে। আমি ফোনের মেকানিক নই, মেকানিক্যাল প্রবলেম ছাড়া অন্য প্রবলেম হলে সলভ করার চেষ্টা করতে পারবো। বুড়ী তবু দোনামোনা করছে দেখে পাশে থেকে বুড়োটা বললো,’ ফোনটা মেয়েটার হাতে দাও’।

আমি ফোন হাতে নিয়ে আমার রেজিস্টারে ঢুকে ফোনটা অন করতেই বুড়ী আবার বললো, ‘ তুমি জানো তো ফোনের ব্যাপারে?’ আমি বললাম, ‘ আমার কাজই তো ফোন নিয়ে’। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ফোনটা আমি যখন পরীক্ষা করছিলাম, এর মধ্যেই বুড়ী আরও চারবার একই প্রশ্ন করেছে, আমি ফোন সম্পর্কে কিছু জানি কিনা। এবার আমি ফোনটাতে টেস্ট কল করে বুড়ীর হাতে দিয়ে বললাম, তোমার ফোন ঠিকই আছে। তোমার বাড়ীতে নেটওয়ার্কের সমস্যা ছিল বলে ফোন কাজ করেনি। এখন কাজ করছে। বুড়ী ফোনের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করতে পারছিল না তখনও, আমাকে বললো, ফোন কোম্পানি থেকে আমাকে সিমকার্ড পাঠিয়েছে, সেটা একটু দেখবে? আমি বললাম, সিমকার্ড লাগবে না, তোমার ফোন তো ঠিকই আছে। এবার বুড়ো মুখ খুলল, ‘ এককথা বারবার বলছো কেনো, রীটা বলছে তোমার ফোন ঠিক আছে, ফোনতো ঠিকই আছে’। বুড়ী এবার বুড়াকে এক ধমক দিল, ‘ এই বুড়ো তুমি এখানে না থেকে অন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসো, যাও”। আমিতো অবাক হয়ে ভাবি , আরে! এ যে আমাদের দেশের চিত্র। বুড়ো আমার দিকে চোখ ব্লিঙ্ক করে ইশারা করে গেলো, যে এই জিনিস নিয়ে বুড়া আছে!। যাই হোক, বুড়িও ফিরে গেলো তবে মনে সন্দেহ নিয়ে। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কোম্পানী থেকে এত কষ্ট করে সিমকার্ড এনে কি লাভ হলো, যদি ফেলনাই গেলো। আমি বললাম, ফেলে দিওনা, রেখে দিও, সত্যি সত্যি যখন প্রয়োজন হবে তখন ব্যবহার করো।

এরপরেই লাঞ্চে বাড়ী ফিরেছি। মেয়েকে রওনা করিয়ে দিয়ে চল্লিশ মিনিট পরেই আবার কাজে ফিরে যাচ্ছিলাম। ডাউন টাউনে অনেক বেশী ট্রাফিক লাইট থাকে। একটা তালে চলতে না পারলে প্রতিটা স্পটেই লাল লাইটের কবলে পড়তে হয়। আমার স্বামী লাল লাইটের কবলে পড়ে তুলনামূলক বেশী। আমি তেমন পড়িনা কারন ঐ একটাই, রবি ঠাকুরের কবিতা আমাকে এখনও তরুণদের মত করে চালায়। আমি গাড়ীতে রোমান্টিক গানের ক্যাসেট চালাই নাহলে হিন্দী ‘শীলা কি জওয়ানি চালিয়ে শুনতে শুনতে যাই। আজকে আমার সামনের বিরাট ওয়াগনটা ২০ মাইল বেগে যাচ্ছিল। আমার মাথাটা গরম হতে শুরু করে। ৩৫ মাইল/ঘন্টার রাস্তা অন্যেরা চালায় ৫০ মাইল আর আমি চালাই ৪৫ মাইল গতিতে, সেখানে সামনের গাড়ী যাচ্ছে ২০ মাইল গতিতে, ফলে প্রতিটি সিগন্যালে গিয়ে থামতে হচ্ছে। ক্যাসেটে ঐ মুহূর্তে শুরু হয়েছে, ‘ চিকনি চামেলী, চুপকে একেলি’। ওয়ান ওয়ে রাস্তাতে গাড়ী ওভারটেকও করতে পারছিলামনা, লাঞ্চ ব্রেক শেষ হয়ে যায় যায় অবস্থা। গাড়ী চলেনা, অথচ গাড়ীর গান চলছে ধামাকা তালে। কি বিশ্রী অবস্থা। একসময় একটু ফাঁক পেয়ে গেলাম, গাড়ীর গতি বাড়িয়ে দিয়ে সামনের গাড়ির অথর্বটাকে দেখতে চাইলাম। তাকিয়ে দেখি , ড্রাইভিং সীটে এক ‘বুইড়া’ একহাতে স্টীয়ারিং হুইল ধরে আরেকহাতে মোবাইল ফোন ধরে মজাসে চলছে। গাড়ী চালানোর সময় ফোন ব্যবহার করতে নিষেধ করে নানারকম বিজ্ঞাপণ দেখানো হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যত একসিডেন্ট হয়, তার শতকরা ৯৯ ভাগ ঘটে তরুণ তরুণীদের মোবাইলে টেক্সট করতে করতে গাড়ী চালানো অবস্থাতে। একবার মনে হলো বুড়াকে একটা জোরসে প্যাঁক দিয়ে যাই, নিজেকে সংবরণ করে নিলাম।

এতো গেলো দুই বুড়ার কথা। নির্বোধ কি শুধু বুড়ারাই হয়, আসলে নির্বোধের কোন বয়স থাকেনা। আজকের দিনটাই খারাপ ছিল আমার জন্য। শেষ ঘন্টাতে এক মেয়ে আর দুই ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে আমার কাউন্টারে। বাচ্চা ছেলেমেয়ে, এত দামী দামী ফোন দেখে সব সময় একটু থামে, ধরে ছুঁইয়ে দেখে। আমি ভেবেছি তেমনি কেউ হবে। পরে দেখি মেয়েটা বলছে , ওরা ফোন সার্ভিস কন্ট্র্যাক্ট নিতে চায়। ক্রেডিট চেক করতে যা যা আইডি দরকার সবই নিয়ে এসেছে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে আর আমি সমস্ত ইনফরমেশান কম্পিউটারে এন্ট্রি করছিলাম। সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার চাইতেই মেয়েটি সাথী ছেলেটিকে ডাকছিলো। আমি বললাম, ‘ওর নাম্বার চাইনা, তোমার নাম্বার দাও’। মেয়েটি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, ‘দিস ইজ হার আইডি’। আমি থমকালাম। আরে! সত্যিতো আইডির ছবিতো ঐ ছেলের, না না ছেলে না ওটাতো মেয়ে! দুজনেই কালো, যাকে ছেলে ভেবেছি, সে ছেলেদের মত সাজপোষাক, হাবভাব ছেলেদের মত। আমার মাথাটা গরম হতে শুরু করেছে। কারন ততক্ষণে বুঝে গেছি, এরা কারা। আমেরিকাতে সমকামীরা সদর্পে ঘুরে বেড়ায় সকলের মাঝে। এত বছর ধরে থাওতে থাকতে এখন আর অবাক হইনা। তাছাড়া আমার সহকর্মীদের মধ্যেও দুই একজন সমকামী আছে, তাদের মধ্যে অন্য কোন অস্বাভাবিকতা দেখা যায়না। যাই হোক, আজকে আমার মাথা গরম হওয়ার কারন, ঐ কালো দুই সমকামী মেয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আশনাই করছিলো। আমার কিছুই বলার নেই, কারন গণতন্ত্রের দেশে ছেলে যদি মেয়েকে চুমু খেতে পারে সবার সামনে, তাহলে ছেলে ছেলেকে, মেয়ে মেয়েকে চুমু খাবে, কার কি বলার আছে!

আমি অনেক চাইছিলাম যেনো এদের ক্রেডিট স্কোর খুব খারাপ আসে। কিনতু এই মেয়ের ক্রেডিট স্কোর অটোমেটেড মোডে আসেনি। ফলে আমাকে কোম্পানিকে ফোন করতে হয়েছে। আর ঐ দুই প্রেমিকা ঢং করেই চলেছে। পরে দেখা গেলো ঐ মেয়ের ক্রেডিট স্কোর দারুণ ভালো। মানে বিরাট বড়লোকের দুলালী সে। কিনতু চলনে বলনে কেমন গা ঘিন ঘিন করা একটা ভাব। যাকে শুরুতেই মেয়ে ভেবেছি, সেই মেয়েটাই হচ্ছে নষ্টের গোড়া। বড়লোক বান্ধবীর ঘাড় মটকে ‘মটোরোলা ড্রয়েড এক্স টু’ ফোনতো নিলই, সাথে আমার এক ঘন্টা অতিরিক্ত সময় নিয়ে নিল। ছুটি হওয়ার এক ঘন্টা আগে শুরু করেছিলাম কাজ, দেড়ঘন্টা লেগেছে ওদের বিদায় করতে। বাসায় ফিরেছি রাত নয়টার বদলে রাত দশটায়।

সাম্যের দেশে থেকে এই দুই মেয়েকে নিয়ে কিছু লেখা ঠিক হয়েছে কিনা জানিনা, অন্যের রুচি নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। কিনতু আজকে আমার মনটা একেবারেই বিশ্রী রকম খারাপ হয়েছে। ছেলেতে মেয়েতে বন্ধুত্ব দেখেই আমরা অভ্যস্ত। তারপরেও ছেলে মেয়ে পাবলিকলি জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকলে, বা পাবলিকলি চুমু খেলে আমার কোন ক্ষতি না হোক, চোখের দেখাতে একটু অস্বস্তি তো লাগেই। তবু মনকে বুঝ দেই, যাকগে, ওদের লজ্জা নেই আমি লজ্জা পেয়ে কি করবো। এড়িয়ে যাই। আর আজকে আমার রাগ উঠে গেছে রীতিমত। ফোন সার্ভিস কন্ট্রাক্ট দেয়া আমার কাছে এখন জলভাত ব্যাপার হলেও মাঝে মাঝে দুই একটা কেইস বেশ জটিল হয়ে যায়। তাছাড়া অনেক নকল মানুষ ধরা পড়ে। আজকেই তো আমার ভুল হতে পারতো। তবে আমাকে সবাই জানে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি চুলচেরা মিলিয়ে দেখি যেনো কোনভাবেই ধরা না খাই। আজকের কেইস ছিল জটিল। এটা ওদেরও বুঝা উচিৎ ছিল। ওরা দেখেছে আমাকে ভীষন ব্যস্ত ওদের কাজটা নিয়ে। ওরা সঠিকভাবে কিছু বলতেও পারছিল না। আমার কাজ হচ্ছে সার্ভিস কন্ট্র্যাক্ট দেয়া, তাই নানাভাবে চেষ্টা করছিলাম সঠিক তথ্য নিতে। তথ্যে এদিক সেদিক হলে বিরাট ঝামেলা হয়ে যাবে। কত ফ্রড কেস্ ধরা পড়ে। আমি এমনিতে কখনও ধৈর্য্য হারাইনা, কিনতু আজকে মেজাজ খারাপ হচ্ছিল ঠিকই, তারপরেও আমি যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে আটকে গেছি, সেখানে দুই মেয়ে যথেচ্ছাচার করবে, সেটাকে নির্বুদ্ধিতা বলা ছাড়া আর কি বলার আছে! একবার ভাবছিলাম কষে একটা ধমক দেই যাতে এখানে নাটক না করে। কিনতু গনতন্ত্রের কাছে হাত-পা বাঁধা। আমাদের দেশে হলে অবশ্য অন্য কথা ছিল। অনার্স পড়ার সময় আমাদের ছেলে মেয়েদেরকে একসাথে গল্প করতে দেখলেই শফিউল্লা স্যার দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলতেন ” এই বদ পোলাপান সব, লেখাপড়া বাদ দিয়ে প্রেম করতে আসছো! কানটা ছিঁড়ে ফেলবো”। হা হা হা হা!! শফিউল্লা স্যার এখানে থাকলে কি করতেন কে জানে! হয়তো ওদের কান ছিঁড়ে ফেলতেন!