ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

আগে প্রচলন ছিলনা, কিনতু বেশ কিছু বছর ধরেই বাংলাদেশে ‘মাদার’স ডে মহা ধুমধামের সাথে পালিত হয়ে থাকে। পত্র পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়, টিভি, রেডিওতে থাকে মায়েদের নিয়ে নানা অনুষ্ঠান। বিখ্যাত একটি বাণিজ্যিক সংস্থা থেকে ‘রত্নগর্ভা’ পদক প্রদান করা হয়ে থাকে দেশে প্রতিষ্ঠিত বা পরিচিত ব্যক্তিদের মায়েদেরকে। সেই মায়েদের মধ্যে প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রী বেগম জিয়ার মা প্রয়াত তৈয়বা মজুমদার যেমন আছেন, হুমায়ুদ আহমেদের মা মিসেস আয়েশা ফয়েজও আছেন। আমার মায়ের নাম অবশ্য নেই, কারন আমরা ভাই-বোনেরা কেউই রত্ন নই, আমার মা আর দশটি সাধারণ মায়ের মত গর্ভে সন্তান ধারন করেছিলেন, রত্ন ধারন করেন নি। আমার মা ‘রত্নগর্ভা’ পদক না পেলেও বাণিজ্যিক কোম্পাণীটির এমন সাধু উদ্যোগকে একজন মা হিসেবে অবশ্যই স্বাগত জানাই। তবে রত্নগর্ভা শব্দটি নিয়ে আমার মনে সব সময় একটু খটকা থেকেই যায়। কারন প্রতিটি মা একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই গর্ভে সন্তান ধারণ করেন। সব মেয়ের গর্ভের অভ্যন্তর একই কাঠামোতে সাজানো। সেখানে কারোর গর্ভেই আলাদা করে রত্ন তৈরীর মেশিন থাকেনা। তাই ‘গর্ভে’ থাকাকালীন সময়টুকুতে সব শিশুই একই রকমভাবেই বেড়ে উঠে। মোটামুটি দশ মাস মায়ের অন্ধকার গর্ভে নিরাপদে থেকে দেহের পূর্ণতা নিয়েই শিশু পৃথিবীর আলোতে আসে। বাচ্চা ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর সব শিশুকেই দেখতে একইরকম লাগে, একই সুরে তারা ট্যাঁ ট্যাঁ , ওঁয়াও ওঁয়াও করে সবাইকে জানান দেয় তার আগমন বার্তা। এই পর্যন্ত সবই ঠিক থাকে, বিভাজন শুরু হয় এর পর থেকে। বাচ্চা বড় হয়ে ‘রত্ন’ হবে নাকি ‘দস্যু’ হয়ে উঠবে, সেটা নির্ভর করে বাচ্চার মা-বাবা, পরিবার এবং সামাজিক পরিবেশের উপর। একা মায়ের পক্ষে কখনও সম্ভব হয় না ছেলে বা মেয়েকে ‘রত্ন’ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। আশেপাশের আরও হিতৈষীর সহযোগীতার প্রয়োজন হয়। তবে হ্যাঁ, যে মা যত বেশী সচেতন, যে মা যত বেশী বুদ্ধিমতী, জ্ঞানী, সেই মায়ের সন্তান পরিনত বয়সে রত্নই হয় বটে। কাজেই মা’কে যদি পুরস্কৃত করতেই হয়, তাহলে ‘রত্নগর্ভা’ উপাধীর বদলে ‘মা রত্ন’ অথবা ‘রত্ন মা’ উপাধী দিলেই বেশী যুক্তিযুক্ত মনে হয়।

আমার তিনটি মেয়ে। মেয়ে তিনটির প্রত্যেকেই ছোটবেলা থেকে লক্ষ্মী টাইপ ছিল। এইজন্য আমার পরিচিত সকলেই আমাকে ‘রত্নগর্ভা’ বলে মজা করতো অথবা আদর করেই হয়তো সম্বোধনটি করতো। আমিও শ্বাশ্বত বাঙ্গালী মায়েদের মত একটু তৃপ্তির হাসি হাসতাম। মনে মনে একটু গর্বও বোধ করতাম হয়তো। এর বেশী কিছু ভাববার অবকাশ ছিলনা এবং ভাবতামও না। আমি জানতাম, আমি গর্ভে রত্ন ধারন করিনি, সন্তান ধারন করেছিলাম। তবে মেয়েরা জন্ম নেয়ার পর থেকে শুরু করেছি রত্ন বানানোর প্রক্রিয়া। এক দুদিনের ব্যাপার তো নয়, বছরের পর বছর পেরিয়ে যায় ‘রত্ন’ তৈরী করতে। আমার ‘রত্ন’ তৈরীর প্রোজেক্ট যখন ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে, হঠাৎ করেই আমাদের পুরো পরিবার আমেরিকা চলে এসেছি। বাংলাদেশে ‘রত্ন’ তৈরীর প্রজেক্ট থেমে যায়।

আমেরিকাতে এসে মেয়েগুলো আমেরিকান স্কুলে ভর্তি হয়, আর দশজন এশিয়ান ছেলেমেয়েদের মত ওরাও পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে শুরু করে। আমিও বেশ খুশীমনে দেশে ফোন করে খুব গর্বের সাথে মেয়েদের সাফল্যের কথা বলে আনন্দ পাই। আমেরিকা আসার পূর্বে জীবনের একটা সময় অস্ট্রেলিয়াতেও ছিলাম তিন বছর। তখন আমার তৃতীয় মেয়ের জন্ম হয়নি, দুই মেয়ে খুব ছোট ছিল, ওরা স্কুলে চলে গেলেই আমি একা হয়ে পড়তাম। তাই অখন্ড অবসরে অড জব করতে শুরু করি। ঐ সময় আমি বিখ্যাত প্রসাধন সামগ্রী ‘ল’রিয়েল’ কোম্পানীর প্যাকেজিং ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছি কিছুদিন।

অস্ট্রেলিয়াতে গিয়েই তো আর অস্ট্রেলিয়ান হতে পারিনি, ছিলাম বিশুদ্ধ বাঙ্গালী। বিদেশী হালচাল তখনও রপ্ত হয়নি, অথবা ইচ্ছে করেই বিদেশী কালচার শিখতে চাইনি। তাই মাদার’স ডে বা ফাদার’স ডে সম্পর্কেও আমার কোন ধারনা ছিলনা। ল’রিয়েল কোম্পানীতে কাজ করার সময় মাদার’স ডে উপলক্ষে মায়ের জন্য নানা ধরনের প্রসাধন সামগ্রী দিয়ে ‘গিফট বক্স’ তৈরী করা হচ্ছিল। আমিও সেই প্যাকেজিং টিম এ কাজ করছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম নিজের মায়ের কথা। এক মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, মাদার’স ডে তে আমি কি করবো! আমি প্রশ্নটা শুনে একটু থতমত খেয়ে গিয়ে বলে ফেলেছিলাম, আমদের তো মাদার’স ডে নেই। যারাই আমার উত্তরটা শুনেছে তাদের প্রত্যেকের মুখে প্রথমে বিস্ময়, পরে কৌতুকের হাসি ছড়িয়ে পড়তেই আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। বুঝেছি উত্তরটা বোকার মত হয়ে গেছে। আমি সাথে সাথে বললাম, “আমাদের দেশে বছরের প্রতিটি দিনই মায়ের জন্য তোলা থাকে। তাই আলাদা করে ‘মাদার’স ডে পালন করা হয়না। ওরা কি বুঝেছিল, কতটুকু বিশ্বাস করেছিল কে জানে। কিনতু সমস্ত বিদেশীদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অমন একটি পরিস্থিতিতে পড়ে আমি এমন উত্তর দিতে পেরে মনে মনে অনেক খুশী হয়েছিলাম।

দ্বিতীয় দফায় যখন আমেরিকাতে আসি, ততদিনে পাশ্চাত্যের অনেক কৃষ্টির সাথে কিছুটা পরিচিতি হয়েছে। আমেরিকাতে মাদার’স ডে বা ফাদার’স ডে অনেক ঘটা করে পালিত হয়। ছোটবেলা থেকেই পাশ্চাত্যের সব কিছুতেই বিরূপ মনোভাব পোষন করেছি, এভাবেই আমরা বড় হয়েছি। বোধে ছিলনা, পাশ্চাত্যের সব কিছুই খারাপ নয়, সব কিছুই অতিরঞ্জিত বা মেকী নয়। বিশেষ করে ‘মা’ কে নিয়ে পশ্চিমাদের সম্পর্কে আমাদের ধারনাতে কিছু ভুল আছে। আমরা নিজেরাই ভেবে নিয়েছি, একমাত্র আমরাই বুঝ মায়েদের ভালোবাসি, আর কেউ বাসেনা। পরিনত বয়সে এসেই বুঝতে পারলাম পাশ্চাত্যে ‘মা’ কে সত্যিকারের ‘মা’য়ের সম্মান দেয়া হয়। মা’টি কুমারী নাকি বিবাহিতা, তা বিচার করা হয়না। দেশে থাকতে আমরা হরহামেশা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনেক কিছু নিয়েই সমালোচনা করতাম। বিশেষ করে মা বাবা বৃদ্ধ হলে ‘ওল্ড হোমে’ পাঠিয়ে দেয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে এক ধরনের নিষ্ফল আনন্দ পেতাম। কিনতু এখানে থেকে দেখেছি, বৃদ্ধ বাবা মায়েদের সাথে কথা বলে জেনেছি, আমরা অযথাই ‘ওল্ড হোম’ নিয়ে নিজেদের মনগড়া কথা বলি। আসলে ওল্ড হোমে থাকাটা অনেকেই জীবনের একটি অংশ মনে করে। ওল্ড হোমে থেকেও মায়েদের সাথে তার সন্তানের এতটুকুও দূরত্ব তৈরী হয়না। আসলে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে, মায়ের কোন জাত নেই, মা সব সময়ই মা, যুগে যুগে মা।

এদেশে কুমারী মা’কে দেখি আর ভাবি, আহারে! দেশে মাতৃত্ব সামাজিকভাবে স্বীকৃতি না পেলে মা হওয়ার সমস্ত গৌরব ধূলায় লুটিয়ে যায়। এখানে মা হওয়ার সাথে বিয়ের কোন সম্পর্ক নেই। বিবাহিতা অথবা কুমারী মেয়েরা হরহামেশাই মা হচ্ছে। এখানে ‘অবৈধ সন্তান’ বলে কিছু নেই, অবৈধ মা বলেও কিছু নেই। একজন ছেলে ও একজন মেয়ের মধ্যেকার সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়, কিনতু সন্তানের সাথে মায়ের সম্পর্কে কোন ফাটল ধরেনা। এখানেই ‘মা’ হওয়ার সার্থকতা। আমার সহকর্মী চ্যাসিটি মা হতে গিয়ে যে প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গিয়েছে, হিলারী ক্লিন্টন বা মিশেল ওবামাকেও একই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই মা হতে হয়েছে। নয়মাস শিশু গর্ভে ধারনকালীন সময়ে চ্যাসিটিকে যে সকল শারীরিক কষ্ট, মা হতে যাওয়ার আনন্দ বা মৃত্যুভয়ের শঙ্কা মিশ্রিত এক অনুভূতি ঢেকে রাখতো, হিলারী বা মিশেল এমনকি হলিউড কাঁপানো এঞ্জেলিনা জোলীকেও একই অনুভূতি আচ্ছন্ন করে রাখতো নিশ্চয়ই। এদেশে থেকেই উপলব্ধি হয়েছে, ‘মা’ হচ্ছে মা। সিঙ্গেল মাম এর সাথে তার সন্তানের যে সম্পর্ক, বিবাহিত মায়ের সাথেও সন্তানের একই সম্পর্ক।

মাদার’স ডে উদযাপন নিয়ে আগে আমার কোনই আদিখ্যেতা ছিলনা। আর দশজন বাঙ্গালীর মত করে আমিও বিশ্বাস করতাম, বছরের প্রতিটি দিনই মাদার’স ডে। কিনতু আমরা কি সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করি যে প্রতিটি দিনই মাদার’স ডে! আমরা মাতৃত্বের গুরুত্বই বা বুঝি কতটুকু। মা হতে গেলে একটি মেয়েকে রীতিমত মৃত্যুর ঝুঁকি নিতে হয়, মা হতে গেলে একটি মেয়েকে সমাজের কাছে বৈধতা অবৈধতার পরীক্ষা দিতে হয়। উন্নত বিশ্বে যেখানে ‘মা’ হতে পারাটাকেই গৌরবের মনে করা হয়, বৈধ অবৈধ মাতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়না সেখানে আমাদের দেশে বৈধ সন্তানের মা হতে গিয়েও কতরকম সামাজিক কৌতূহলের সম্মুখীন হতে হয়। সন্তান ছেলে না মেয়ে, এটাতো লাখ টাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। পুত্র সন্তান জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়ে কত মেয়েকে সতীনের ঘর করতে হয়, কত মেয়ের তালাক হয়ে যায়। এখনও অনেকের মাথাতেই আসেনা, একটি মেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গর্ভ ধারন করে ঠিকই, কিনতু সন্তানটি ছেলে নাকি মেয়ে হবে, তা নির্ধারণ করে প্রকৃতি এবং সেটা হয় পুরুষের মাধ্যমে।

বৈধ সন্তান জন্ম দিতেই মেয়েদের যখন এই অবস্থা, তার আবার অবৈধ? নবৈচ নবৈচ! মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ বলে গলা ফাটাই, মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি উচ্চারণ করার আগে ‘মহান’ শব্দটি যোগ করে বলি ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ’ অথচ মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরে আমরা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েই কথা বলি। মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকেই বলি যারা সমরে অংশ নিয়েছে। কিনতু যারা অস্ত্র হাতে তুলতে পারেনি, কিন্তু যুদ্ধের নয়টি মাস হায়েনাদের ধারালো দাঁত ও নখের আঁচরে জর্জড়িত হয়েছে, তাদেরকে কোন সম্মান দিতে পারিনি। লোকদেখানো ভালোবাসা দেখিয়ে তাদেরকে ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দিয়েছি। বীরাঙ্গনা বলে তাদের আত্মত্যাগকে অসম্মানিত করা হয়েছে। বীরাঙ্গনা কেন, তাদেরকেও মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবেনা কেন? কত যন্ত্রনা, কত লাঞ্ছনা তাদের দেহকে নীল করেছে, কত চোখের জলে তাদের দিবানিশি ভেসেছে, তার মূল্য কি শুধু এই ছোট্ট একটি ‘বীরাঙ্গনা’ শব্দেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে!

এই যে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই লাখ নারীকে পাকিস্তানী বাহিনীর সৈন্যরা জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছিল, সেই পাশবিকতার ফলে কত মেয়েই সন্তান সম্ভবা হয়েছিল। যুদ্ধের ডামাডোলে অথবা ক্যাম্পে থাকার কারনে ঐ সমস্ত অবাঞ্ছিত ভ্রূনগুলোকে হত্যা করা যায়নি( আমি দুঃখিত মা হয়ে এমন কথা বলতে হচ্ছে বলে), তাদের সকলেরই নিশ্চয়ই গর্ভধারণের নয়মাস পরেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। সেই বাচ্চাগুলোর কি গতি হয়েছিল? ওদের অনেককেই ‘এতিমখানায়’ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ঐ সকল নিরপরাধ শিশুদের ‘যুদ্ধশিশু’ নামে অভিহিত করা হয়। আর সেই সকল অসহায় নারীদের ভাগ্যে জুটেছে’ বীরাঙ্গনা’ খেতাব। ভাবতেই কান্না পায়, একজন মেয়ে (‘বীরাঙ্গনা’) অন্যের পাশবিক অত্যাচারের যে স্বীকৃতি গর্ভে ধারন করেছিল, নয়মাস তার শারীরিক অনুভূতি বা কষ্টগুলো কি কম ছিলো? শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি ছিল সামাজিক নিন্দার ভয়! কি মানসিক কষ্ট! যেভাবেই মেয়েগুলো গর্ভবতী হয়ে থাকুকনা কেন, তারাতো ঐ বাচ্চাগুলোর ‘মা’ ছিল। তারা কি পেয়েছে সেই মায়ের স্বীকৃতি? সমাজের ভয়ে অনেক বেদনা সয়েও পৃথিবীর বাইরে নিয়ে আসা তুলতুলে নিষ্পাপ শিশুটির দিকে কখনও কি মায়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে পেরেছে? বাচ্চাটির মুখ থেকে নিজেও মা’ ডাক শুনতে পেলো না, বাচ্চাটিও জানতেই পারলো না কোন অপরাধে সে মায়ের বুকের উষ্ণতা থেকে বঞ্চিত হলো।

একই ব্যাপার ঘটে কুমারী মায়েদের বেলা্য অথবা একজন পতিতার বেলায়। জীবিকার প্রথা অনুযায়ী অতিথির মনোরঞ্জন করতে গিয়ে কখনও না কখনও সমাজের অচ্ছ্যুত পতিত মেয়ের গর্ভেও নতুন প্রানের সৃষ্টি হতে পারে এবং তা হয়। তাদের সন্তানগুলোও সমাজে অচ্ছ্যুৎই থেকে যায়। ওইসব অচ্ছ্যুৎ ছেলেমেয়েরা তাদের জন্মদাত্রীকে প্রাণভরে মা ডাকতে পারে বলে মনে হয়না। জন্মদাত্রীও সন্তান জন্ম দিয়েই পেটের টানে, বাঁচার টানে তার পেশাতে মনোযোগী হয়ে পড়ে। মা হওয়ার যে কি গৌরব, তা সে জানতেই পারেনা। মুহূর্তের ভুলে যখন একটি কুমারী মেয়ে গর্ভধারণ করে ফেলে, তাকেও সমাজে নিগৃহীত হতে হয়। প্রেমিক পুরুষের প্রতি আবেগ ভালোবাসার বেখেয়ালেও কত মেয়ের জীবনে সর্বনাশ ঘটে যায়। সমাজ তখন একবারের জন্যও ভাবেনা, একা একটি মেয়ে তো আর যাদু দিয়ে মা হতে পারেনা, মা হতে গেলে বা কাউকে মা বানাতে গেলে মায়ের সাথে বাবারও অবশ্য প্রয়োজন হয়। কিনতু ‘কুমার বাবা’ বলে কোন শব্দ নেই বলেই হয়তো বাবাগুলো অনায়াসে কোন কিছুর দায় না নিয়েই কত মেয়ের সর্বনাশ করে ফেলে। সর্বনাশই তো, কুমারী অবস্থায় ‘মা’ হলে তাকে আমরা মায়ের স্বীকৃতি দেইনা, ফলে মেয়েটিও তার নাড়ী ছেঁড়া ধনটিকে লোকনিন্দার ভয়ে পৃথিবীর আলো দেখানোর সুযোগ পায়না। পরিবর্তে ধাইয়ের কাছে গিয়ে অথবা হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে গিয়ে গর্ভের সুরক্ষিত অন্দর থেকে তার বাবুটিকে খুঁচিয়ে বের করে নিয়ে আসে। কোন রকম অসতর্কতার কারনে যদি বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয়েই যায়, হয় সেই বাচ্চার গন্তব্য হয় ডাস্টবিন না হয়তো এতিমখানা। নয়মাসের কষ্ট এভাবেই সমাপ্তি পায়। এভাবেই তার মা হওয়ার গৌরব ধূলায় মিশে যায়। মা হওয়ার সমস্ত প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গিয়েও তারা ‘মা’ হতে পারেনা। ‘মাদার’স ডে তাদের মত ‘অগৌরবের’, ‘হতভাগী’, ’লক্ষীছাড়ী’ মায়েদের জন্য নয়। কারন সন্তান জন্ম দিলেও ওরা ‘মা’ নয়।