ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

১৩ই মে, রবিবার বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মহা ধুমধাম করে ‘মা’ দিবস বা ‘মাদার’স ডে উদযাপিত হচ্ছ্বে। সাধারণতঃ মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটিতে ‘মাদার’স ডে পালিত হয়ে থাকে। যদিও কিছু কিছু দেশে তাদের রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন দিনেও মাদার’স ডে পালিত হয়ে ্থাকে। তবে মহাপরাক্রমশালী আমেরিকাতে যেহেতু মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মাদার’স ডে পালিত হয়, তাই এর সাথে তাল রেখে অধিকাংশ দেখেই একই দিনে মাদার’স ডে উদযাপিত হয়।

মাদার’স ডে কখন শুরু হয়েছিল, কোথা থেকেই বা শুরু হয়েছিল তা নিয়ে নানা ধরনের গল্প প্রচলিত আছে। যেমন প্রাচীনকাল থেকেই কোন কোন দেশে ধর্মীয়ভাবেই একটি নির্দিষ্ট দিনে মা’কে শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা জানানোর রীতি ছিল। মাতৃত্ব, সন্তানের সাথে নাড়ীর বন্ধন, মমতা- স্নেহ-ভালোবাসার ক্ষমতা মা’কে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। প্রাচীনকালে মা’কে নিয়ে গ্রীক উৎসব ‘সাইবেল’ (Cybele,) , রোমান উৎসব ‘হিলারিয়া’, ব্রিটিশ উৎসব ‘মাদারিং সানডে’ ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্যের সাথে উদযাপিত হতো। ধারনা করা হয়, বর্তমান সময়ে ‘মাদার’স ডে দিবসটি প্রাচীনকালের ‘মা’ উৎসবের আধুনিক সংস্করন।

আমাদের দেশে আগে ‘মা’ দিবস বা বাবা’ দিবস বলে কোন উৎসবের প্রচলন ছিলনা। কোন দিবস উদযাপন না করেই ‘মা’ কে নিয়ে মুনী ঋষি থেকে শুরু করে দরবেশ, পীর, ফকির, সুফী, সাধক, আউলিয়া, কবি, লেখক, গীতিকার, সুরকারসহ অনেকেই বহু যুগ ধরেই নানাভাবে ‘মাতৃবন্দনা’ করে গেছেন, কত গান, কবিতা রচনা করে গেছেন। কিনতু আলাদা করে ‘মা’ দিবস উদযাপনের কোন রীতি ছিলনা আমাদের সংস্কৃতিতে। কালের পরিক্রমায় আমাদের দেশেও পাশ্চাত্যের ছোঁয়া লেগেছে। উন্নত বিশ্বের আধুনিক সভ্যতার অনেক কিছুই আমাদেরকে প্রভাবিত করছে। তার মধ্যে মা দিবস, বাবা দিবস, বা ভালোবাসা দিবসের মতো নান্দনিক ব্যাপারগুলোও আছে।

পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলোতে ‘মা’ দিবস বা বাবা দিবস মহা ধুমধামের সাথে পালিত হয়। আমেরিকার মত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশটিতেও ‘মা’ দিবসে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে নামগোত্রহীন ছেলেটিও মায়ের জন্য দিনটিকে তুলে রাখে। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষ থেকে শুরু করে পরিবারের নির্দয়, উদাসীন মানুষটি পর্যন্ত মায়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। যে সন্তান কোনদিন নিজে হাতে রাঁধেনি, সেও চেষ্টা করে মায়ের জন্য স্পেশ্যাল কিছু রান্না করতে। প্রতিদিনের খরচ থেকে কিছু বাঁচিয়ে রাখে বছরের এই দিনটিতে মা’কে ভাল কিছু উপহার কিনে দেয়ার জন্য। যে মা মুভী দেখতে ভালোবাসে তাকে মুভী থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া, বাইরে দামী রেস্টুরেন্টে নিয়ে আপ্যায়ন করা, মায়ের পছন্দের ড্রেস, পারফিউউম কিনে দেওয়া থেকে শুরু করে আরও কত কি যে করে থাকে মায়েদের জন্য তার কোন ইয়ত্তা নেই। কার্ড, গোলাপের দামী তোড়া, কেক নিয়ে ছেলেমেয়েরা ভোর সকালেই এসে হাজির হয় মায়ের কাছে। এমনকি ওল্ডহোমে থাকা মায়ের জন্যও দিনটি হয়ে উঠে স্বর্গীয় আনন্দে ভরপুর।

আমেরিকায় ‘মাদার’স ডে’ জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে ১৯৩৪ সালে। ১৮৬৮ সালে এনা জার্ভিস নামের এক মা প্রথম উদ্যোগটি নিয়েছিলেন। যে সকল মায়েদের সন্তানেরা ‘আমেরিকান সিভিল ওয়্যার’ এ অংশগ্রহণ করেছিল এবং যারা শহীদ হয়েছিল, সেই সকল মা’কে একসাথে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন এনা জার্ভিস। বছরের একটি দিনকে ‘ মাদার’স ফ্রেন্ডশীপ ডে’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বাসনায় মিস জার্ভিস এই উদ্যোগটি নিয়েছিলেন। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া রাজ্যের একটি ‘সানডে স্কুলের’ শিক্ষিকা ছিলেন উনি। উনার এই উদ্যোগের পরে আরও অনেকেই চেষ্টা করেছে উদ্যোগটিকে সামনে এগিয়ে নিতে। কিনতু তেমনভাবে কেউ সফল হতে পারেনি। ১৯০৫ সালে এনা জার্ভিসের মৃত্যুর পরে উনার অসমাপ্ত কাজ চালিয়ে নিয়ে যায় তাঁর মেয়ে আনা জার্ভিস। নারী শান্তি সংগঠনের সাহায্যে আনা জার্ভিস ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সেই সানডে স্কুলেই তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯০৪ সালে একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্ক ই হেরিং সর্বপ্রথম ‘মাদার্স ডে’ কে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করার জন্য প্রথম আবেদন করেন। ১৯০৮ সালে আনা জার্ভিস মায়ের সেই সানডে স্কুলে সীমিত পরিসরে প্রথম ‘মাদার্স ডে’ উদযাপন করেন। তাছাড়া একটানা আবেদন নিবেদনের ধারাতেই ১৯১০ সালে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া রাজ্য সরকার মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারটিকে ‘মাদার্স ডে’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৯১৪ সালের ৯ই মে তারিখে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উডরো উইলসন প্রথমবারের মত ‘মাদার্স ডে’ কে জাতীয়ভাবে পালনের আবেদনে সম্মতি প্রদান করেন। জাতীয়ভাবে মাদার্স ডে পালন করার স্বীকৃতি পাওয়া যায় ১৯৩৪ সালে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট ‘মাদার্স ডে’ দিনটিকে সরকারী ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার সারা আমেরিকায় মহা উৎসাহে ‘মা’ দিবস পালন করা হয়। মহা সমারোহে উদযাপনের প্রক্রিয়াটি তরান্বিত করতে আমেরিকার বানিজ্যালয়গুলো সারা বছরই মুখিয়ে থাকে। মা’কে নিয়ে কত ধরনের নিত্য নতুন, অভিনব সব সামগ্রীর ডালা সাজিয়ে এরা নিয়ে আসে আমেরিকানদের সামনে। ভালো না লেগে উপায় কি! আমেরিকাতে মা’ কে ‘মা’ হিসেবেই দেখা হয়। সব মা’কে একই হ=কায়দায় সম্মান করা হয়। কত সুন্দর সুন্দর বাণী দিয়ে কার্ড তৈরী করা হয়। সন্তানের হাত থেকে কার্ডটি পেয়ে মায়ের চোখ আবেগে ভাসে। ‘একটি দিন শুধুই আমার’ এই ভাবনায় প্রতিটি মা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।

আমাদের দেশেও গত কয়েক বছর ধরেই মহা উৎসাহে মা দিবস পালিত হয়ে থাকে। ‘মা’ শব্দটি খুব ছোট্ট হলেও এই শব্দ উচ্চারণে এক স্বর্গীয় শান্তি পাওয়া যায়। যার যার মা তার তার কাছে দেবীতুল্য। বাংলাদেশে ঘটা করে ‘রত্নগর্ভা’ উপাধী দেয়া হয় নামী দামী ব্যক্তিবর্গের মা’কে। এই উপাধী দিয়ে গুটিকয়েক মা’কে সকল মা থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। কিনতু মায়ের মাতৃত্বতো আলাদা করার বিষয় নয়। ‘রত্নগর্ভা’ মায়েরা যে মমতায় সন্তানকে মানুষ করেছেন, ‘অরত্নগর্ভা’ মায়েরাও একই মমতায় সন্তান বড় করেছেন। রত্নগর্ভা মায়েদের গর্ভের ভেতরটা ‘অরত্নগর্ভা’ মায়েদের গর্ভের মতই একই অর্গ্যান দিয়ে সাজানো থাকে। কারো গর্ভের ভেতর ‘রত্ন’ বানানোর মেশিন থাকেনা। সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার পরে ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে টের পাওয়া যায় কে ‘রত্ন’ হবে আর কে ‘অরত্ন’ হবে। ছেলেমেয়ে মানুষের মত মানুষ করতে গেলে মায়েদের সাথে সাথে পরিবারের বা সমাজের আরও অনেকের সাপোর্ট দরকার হয়। তবেই ‘রত্ন’ তৈরী হয়। শুধুমাত্র একা মায়ের পক্ষে তার সন্তানকে ‘রত্ন’ তৈরী করা কঠিন বা অসম্ভব। সমাজের সহযোগীতা পেলে অনেক দীন দুঃখীর ছেলেমেয়েও জীবনে আলোর মুখ দেখে। সহযোগীতা পেলে ঘুঁটেকুড়াণীর ছেলেমেয়েও ‘রত্ন’ হতে পারে বৈকী! কিনতু মাতৃত্ব একক, মাতৃত্ব অতুলনীয়, মাতৃত্ব আলাদা করা যায়না।

আসলে মায়ের কোন ক্যাটাগরী থাকতে পারেনা। মা’ হচ্ছে মা। মায়ের কাছে সন্তান নিরাপদ, মায়ের কাছে সন্তানই সব। কথায় বলে সন্তান ‘কু’ হতে পারে কিনতু কুমাতা কখনও হয়না। সব মা চায় তার একটি সুস্থ সন্তান হোক। তারপরেও নানা কারণে ইদানিং প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের হার বেড়ে যাচ্ছে। সেই সকল প্রতিবন্ধী শিশুদের মায়েদের কথা স্মরণ করলেই বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, যারা কারো বিরুদ্ধে কোন নালিশ না করে পরম মমতায় নিজের বক্ষের উষ্ণতায় রেখে অসহায় প্রতিবন্ধী শিশুটিকে সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাঁচিয়ে রেখেছে। এই হচ্ছে মা’। এই হচ্ছে মাতৃেই হচ্ছে মা কি করে ‘রত্নগর্ভা’ অরত্নগর্ভা বলে ক্যাটাগরাইজড করা যায়! প্রধানমন্ত্রীর মায়েরা যে স্নেহে তাঁদের সন্তানদের বড় করেছেন, রাস্তার দীন ভিখারী মা’টিও একই মমতায় তার নাড়ীছেঁড়া ধনটিকে বড় করে থাকে। নিজের পেটে খাবার নেই, স্তনে দুধের ছিঁটে ফোঁটাও থাকেনা, তবু দীন দুঃখীনি মা তার আদরের মানিককে সেই শুকিয়ে যাওয়া স্তনের মধ্যেই চেপে ধরে রাখে পরম মমতায়। একেই বলে মাতৃত্ব। এই মাতৃত্বকে বড়লোকী কায়দায় ক্যাটাগরাইজড করে মাতৃত্বের মহিমাকে ছোটই করা হয়। তার চেয়ে ভালো লাগবে সকল মা যদি বছরের একটি দিন অন্তঃত শুধু মা হওয়ার গৌরবে গৌরবান্বিত হতে পারে। বছরের এই একটি দিন হোক সকল মায়ের জন্য।

পৃথিবীর সকল মা’কে মা’ দিবসের শুভেচ্ছা!!