ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েছেন, এটা দেশের প্রতিটি মানুষই জানে। টিভিতে, পত্রপত্রিকাতে ফলাও করে এর প্রচার চলছে। একজন হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে প্রচার চলবে, এমনটাই প্রত্যাশিত। হুমায়ুন আহমেদতো আর পাড়ার দোকানদার কেউ নন যে কোথা দিয়ে আসলো, কোথা দিয়েইবা বের হয়ে গেলো, কেউ দেখতেই পারলোনা। হুমায়ুন আহমেদ নিজের যোগ্যতাবলেই আজ এখানে এসে পৌঁছেছেন। আমি এখানে হুমায়ুননামা লিখতে চাইছিনা। কারন হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে আর দশজন যা জানে, আমি তার চেয়ে হয়তোবা একটু আধটু বেশী জানি। আমি বলছি অন্যকথা। হুমায়ুন আহমেদ এক সময় আমার স্বামীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী তথা বন্ধু ছিলেন। উনি যখন অসুস্থ হলেন, উনার সাথে দুই চারটি স্মৃতিকে জড়িয়ে একটি লেখা ব্লগে পোস্ট করেছিলাম, ‘হুমায়ুন ভাইয়ের জন্য যত প্রার্থণা’ নামে। সেই হুমায়ুন ভাই দেশে গেছেন তা টিভিতে আমার স্বামী দেখছেন। আমি ব্লগে এলোমেলো বিষয় নিয়ে লিখি তা আমার স্বামী জানেন। আজকেই বিকেলে আমি কাজ থেকে ফিরতেই উনি আমাকে বললেন, হুমায়ুন আহমেদের নতুন উপন্যাস শুরুর সাথে সাথেই এমন বিতর্ক শুরু হয়েছে যে পত্রিকাতে প্রতিদিন তা নিয়ে লেখা হচ্ছে। হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে লেখা হচ্ছে সেটা নিয়ে আমার স্বামী চিন্তিত নন, পাঠকেরা মন্তব্য করতে গিয়ে হুমায়ুন আহমেদের মেয়েদের নামে, তার দ্বিতীয় স্ত্রী শাওনের নামে এমন সব কুরুচীপূর্ণ কথা লিখেছে যে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তে হয়। পত্রিকার সম্পাদক দায়ী থাকার কথা এমন নোংরা মন্তব্য বিনা সেন্সরে প্রকাশিত হওয়ার জন্য। অনেকের বাড়ীতেই বাবা, মা, ছেলে মেয়ে অনলাইনে একই পত্রিকা পড়ছে, তারাতো লজ্জা পায়। এই বিষয়টির উপর আলোকপাত করে আমি যেনো কিছু লিখি, সেরকম একটি সাজেশানই উনি আমাকে দিয়েছেন।

যখন দেশে ছিলাম তখন বাড়ীতে দুইটার বেশী পত্রিকা রাখতামনা। বাংলা পত্রিকার আগাপাশতলা না পড়তে পারলে আমার ঘুম হতোনা। প্রথম প্রবাস জীবনে ঘরে কম্পিউটার ছিলনা বিধায় অনলাইনের ব্যাপারগুলোও ছিলনা। তাছাড়া নিজের কমপিউটার থাকলেইতো আর হলোনা, পত্র পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থাকতে হবেতো! কিনতু তখন এসবের কিছুই ছিলনা।সময়টা ছিল পঁচানব্বইয়ের দিকে। দেশ ছাড়ার আগে আমার স্বামী আমার জন্য ‘যায় যায় দিন’ নামের সাপ্তাহিকটি এক বছরের জন্য সাবস্ক্রাইব করেছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ণে থেকে সপ্তাহে দুইদিন সিডনী বেতার থেকে প্রচারিত আধাঘন্টার বাংলা অনুষ্ঠান শুনতাম আর দেশ থেকে আসা ‘যায় যায় দিনের’ দুইটি করে পৃষ্ঠা প্রতিদিন পড়তাম যেন সপ্তাহের প্রতিটিদিন বাংলা ম্যাগাজিনের সাথে অন্তঃত সম্পর্কটা অটুট থাকে। সাথে করে নিয়ে গেছিলাম কিছু ‘সানন্দা’। সানন্দা কখনওই পুরাণো হয়না। তাই এভাবেই মিলিয়ে ঝিলিয়ে আমার বাংলা পাঠের পিপাসা মিটাতাম।

২০০১ এ আমার দ্বিতীয়বারের প্রবাস জীবনের প্রথমদিকে সাথে করে নিয়ে আসা এক ট্রাঙ্ক বাংলা গল্পের বই দিয়েই বেশ ভালোভাবেই চালিয়ে নিচ্ছিলাম। তাছাড়া ২০০১ এর শেষের দিকে আমেরিকাতে এসে টুইন টাওয়ার ধ্বংসের বিষাদের সাথে যোগ হয়েছিল দেশ ছেড়ে আসার আগের নির্বাচন পরবর্তী সন্ত্রাসের দুঃসহ স্মৃতি। সব মিলিয়ে মনটা এমনিতেই কাতর হয়ে থাকতো, তাই গল্পের বইয়ের মধ্যেই ডুবে থাকতাম। দুই বছর পরেই আমার মাথায় আবার সংবাদপত্র পাঠের ভুত মাথা চাড়া দিয়ে উঠতেই কম্পিউটারে বসা শুরু করলাম। দেশে থাকতেই নিজেদের ঘরে কম্পিউটার ছিল এবং আমি তা কখনও ছুঁইয়েও দেখিনি। ভয় পেতাম কোন বাটন টিপতে কোন বাটন টিপে ফেলি, কম্পিউটার নষ্ট হয়ে যেতে পারে, সেই ভয় আমেরিকাতে এসেও রয়ে গেছিল বলে কম্পিউটারের বিশাল রত্ন ভান্ডার আমার কাছে অধরাই থেকে গেছিল। ঘরের সদস্যদের অভয়বাণী শুনে, বিশেষ করে আমার স্বামী যখন বলেছিলেন যে কম্পিউটারে বাটন টিপলেই যে কম্পিউটার নষ্ট হয়ে যাবে এমন ধারণা ত্যাগ করতে, তখন থেকে একটু একটু করে কম্পিউটারে বসা শুরু করলাম।

কমপিউটারে বসেই আমি পত্রিকা পড়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। তখন এতো ওয়েব সাইট ছিলনা বা থাকলেও আমি জানতামনা। খুব সহজে সব পত্রিকা একসাথে যেনো পেতে পারি তার জন্য আমার এক ভাই আমাকে ই-মেলা ডট কম এ যেতে বলেছিল। সেখানে গিয়ে বাংলাদেশ, ভারতের বাংলা পত্রিকার বিশাল সম্ভার দেখেই আমার মন ভরে গেলো। ইলেকট্রিসিটির সমস্যা নেই, হাতে প্রচুর অবসর সময়, আমাকে আর পায় কে! বাংলা পত্রিকার আদ্যোপান্ত পড়তাম এমনকি শোক সংবাদও বাদ দিতামনা। তখন পত্রিকাতে সংবাদ পাঠের নীচে পাঠকের মতামত দেয়ার অপশন ছিলনা। একেকটা সম্পাদকীয় বা খোলা কলম পড়তাম, অথবা বিশেষ কোন ফিচার পড়তাম, মাঝে মাঝে মনে হতো নিজের মতামত জানানোর উপায় থাকলে ভালো হতো। কিনতু তা আর হয়ে উঠেনি। তাছাড়া ইন্টারনেটের স্পীড এত স্লো ছিল যে পত্রিকা পড়তে পেরেই সন্তুষ্ট ছিলাম।

পরবর্তীতে আরও বেশী আধুনিক অবয়বে বেশ কিছু নতুন পত্রিকা বের হতে লাগলো। নতুন পত্রিকার সব কিছুই নতুন। নতুন ধরনের লেখা, ভিন্ন আঙ্গিকে সংবাদ পরিবেশনতো ছিলই, সাথে যোগ হয়েছে পাঠকের মতামত জানানোর জন্য স্পেস। পাঠকের মতামত পড়তেই আমার বেশী ভালো লাগতো। কারন একটি সংবাদ কার মনে কিভাবে কাজ করে, মতামত থেকে তা জানা যায়। পাঠকের মতামত পড়ে দেশের হালচাল বুঝা যায়। আমি সেইজন্যই পাঠকের মতামত অথবা কোন একটি বিষয়ের উপর পাঠক জরীপের ফলাফল খুব আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। কখনও কখনও আমিও দুই একটা মন্তব্য করেছি। তবে মন্তব্য করতে গেলে নাম ধাম, ই-মেইল আইডি দিতে হয় বলে আমি ওখানেই মতামত দেয়ার ব্যাপারে সমাপ্তি টেনেছি। কারন এগুলো স্মার্ট মানুষদের কাজ বলেই ধরে নিয়েছি।

কিনতু গত দুই বছর ধরেই পত্রিকা পাঠের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলছি। কারন বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার খুব সহজ হয়ে গেছে বলেই কিনা জানিনা, ইন্টারনেট এখন শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষের হাত ছাড়িয়ে রাম শ্যাম যদু মধুদের হাতে চলে গেছে। এইসব যদু মধুরা অনলাইনে মতামত দেয়ার সুযোগ পেয়ে যাহা খুশী তাহাই লিখে চলেছে। সংবাদের বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্ক নেই , অথচ তারা মতামত দেয়। মতামতে যত নোংরা ভাষা, কুৎসীত গালিগালাজ ব্যবহার করা যায় তার সবটুকুই তারা করে থাকে। মাননীয় নেতা নেত্রীদেরকে পতিতালয় ঘুরিয়ে নিয়ে আসে, প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী নেত্রীকেও রেহাই দেয়না এরা। পাঠকের মতামত পড়ে প্রথমদিকে আমি হতভম্ব হয়ে যেতাম। সবাইতো আর খারাপ কথা লিখেনা, ভাল কথা খুঁজতে গিয়ে দশটা খারাপ কথা পড়তেই হতো। কেউ বাধ্য করেনি পড়তে, তবুও আমি পড়তাম অনেকটাই কৌতুহলের বশে। দেখতে চাইতাম, মানুষ কত নীচে নামতে পারে। একজন কমেন্টদাতা আরেকজন কমেন্ট দাতার মা’কে, বোনকে নিয়ে তার শয্যায় তুলছে হরহামেশা, কেউ কাউকে চোখে না দেখেও বলে দিতে পারে একজন আরেকজনের মা বোনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বর্নণা! ভাবা যায়! এরাই আবার মা দিবসে মায়ের জন্য গোলাপ হাতে ঘরে ফিরে! এরাই মা’কে নিয়ে কত গান বাঁধে। এরাই নিজের মা’কে মাথায় রেখে অন্যের মা’কে কথার আঘাতে শয্যাসঙ্গিণী করে ফেলে। এগুলো বেশী দেখা যায় রাজনৈতিক সংবাদের বেলাতে প্রযোজ্য। একজনের সাথে আরেকজনের মতের মিল না হলেই একজনের পছন্দের নেত্রীকে নিয়ে টানাটানি করছে, না হয়তো মা বোনকে নিয়ে টানাটানি করছে।

আমি ব্লগে লিখতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। আমার নিজের লেখাতেও কত গালিগালাজ শুনেছি। একেকটা লেখা ব্লগে পোস্ট করেছি, তারপরেই পাঠকের প্রতিক্রিয়া দেখে দুই রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। ব্লগতো অনেক বেশী কাছের, ব্লগের পাঠকরা কেউ যদু মধু টাইপ নয়, এরা সবাই শিক্ষিত সমাজের মানুষ। আসল নাম গোপন রেখে ছদ্মনামে যাহা খুশী তাহা মন্তব্য করে যায়। পত্রিকার পাতায় মন্তব্য দেখে ভেবেছিলাম এরা বাপের পয়সা ধ্বংস করে ইন্টারনেটের মিসইউজ করে চলেছে। কিনতু ব্লগে ঢোকার পরে থেকে আমার ধারণা বদলেছে। এমন কদর্য ভাষাতে মতামত প্রদান দেখে একটি কথাই মনে হচ্ছে, আসলে কিছু মানুষের মধ্যে আছে রুচি, মননশীলতা, নিয়মানুবর্তিতার অভাব। এরা নিজেরা ভালো থাকেনা বলেই কাউকে ভালো থাকতে দিতে চায়না। একটি ব্লগে রীতিমত বলে দেয়া আছে, পাঠকের মন্তব্যের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। ঐ ব্লগটিতে সবচেয়ে বেশী নোংরা কথার চাষ হয়। সেখানে নোংরা ভাষা ব্যবহারকারীদের অনেকেই আবার বিদেশী ডিগ্রীপ্রাপ্ত। এইসব ডিগ্রীর নিকুচি করতে ইচ্ছে করে। আবার বিডিনিউজ২৪ এর ব্লগসহ আরও বেশ কিছু প্রগতিশীল ব্লগে পাঠকের মন্তব্য ব্লগ টিম কর্তৃক মডারেটেড হতে দেখি। ব্লগটীমকে তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ব্লগটীমের এই সহযোগীতার জন্যই আবার ব্লগে লেখার সাহস ফিরে পেয়েছি।

সংবাদপত্রে সংবাদের জন্য সম্পাদক দায়ী থাকেন। অনেক খবর নাকি সেন্সরড হয়েই পত্রিকাতে ছাপা হয়। তারপরেও মাঝে মাঝেই দেখি সম্পাদক ভুল বা অসত্য সংবাদ পরিবেশিত হলে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে থাকেন। তাই যদি হবে তাহলে পত্রিকার অনলাইন সংস্করনের ব্যাপারে সম্পাদক এমন নির্লিপ্ত কেনো? সব পত্রিকাতে না হলেও খুবই জনপ্রিয় কিছু পত্রিকার অনলাইন পাঠকের মন্তব্য সেন্সর করা উচিৎ বলে মনে করি এবং দাবীও করি। মেয়েরা ঘরে-বাইরে কত রকম বৈপরীত্যের ভেতর দিয়ে মানিয়ে গুনিয়ে চলছে, বাসে, ট্রামে, হাটে বাজারে, মার্কেটে, শপিং মলে কিছু অসাধু পিশাচের হাতের নোংরা স্পর্শে বিচলিত না হয়েও নিজের কাজ করে যাচ্ছে, এতেও পোষাচ্ছেনা ঐসব নপুংসকদের যারা যে কোন একটা উছিলা পেলেই মেয়ে নামের অতি নিরীহ প্রাণীটিকে লেখনীর মাধ্যমেই বলাৎকার করে চলেছে। আর অনলাইনের বদৌলতে সেইসকল মন্তব্য ছেলে বুড়ো, মা-কন্যা, বাপ-বেটা সকলেই পড়ছে। এখানেই লজ্জা বা অস্বস্তির কথা। তাই মনে হয় সবটুকু না পারলেও সম্পাদক সাহেব পাঠকের মতামত মনিটর করার জন্য একটা স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন! এতে করে দুর্বৃত্তদের দৌরাত্ম্য কমলে কমতেও পারে, মা-বোনেরাও একটু সস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে।