ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আগের পর্বে আমি ২০০৬ সালের দেশযাত্রা নিয়ে অল্প-বিস্তর লিখেছি। আসলে আমি যদি ঘুণাক্ষরেও জানতাম যে জীবনের একটা পর্যায়ে আমি লেখালেখি শুরু করবো, তাহলে আরও অনেক পুংখানুপুঙ্খরূপে লিখতে পারতাম। যাই হোক ২০০৬ সালে দেশে গিয়েছিলাম পরিবারের পাঁচজন মিলেই। তারপর দেশ থেকে ফিরে এসেই খাতা কলম নিয়ে বসে গেছি, প্রথমে বছর গুনি, পরে মাস গুনি, তারপরে দিন গুনতে গুনতেই ২০০৮ সাল চলে এসেছে। ২০০৮ এ আমার স্বামী যাননি। আমি আর আমাদের তিন মেয়ে গেছিলাম দেশে। ঐ বছর আমাদের বড় মেয়ে মৌটুসী কলেজ গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেছে, মেজো মেয়ে মিশা স্কুল গ্র্যাজুয়েশান শেষ করেছে। দুই মেয়ের গ্র্যাজুয়েশান উপলক্ষে আমরা এখানে গ্র্যাজুয়েশান পার্টি করেছিলাম। ৭০ জন অতিথিকে নিমন্ত্রন করেছিলাম এবং নিজে হাতে সব রান্না করেছিলাম। ধান ভানতে শীবের গীত গাইছি, কারন অবশ্য একটা আছে। আমাদের দেশে যাওয়ার দিনটি ছিল পার্টির ঠিক পরের পরের দিন। আমিতো পার্টির আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, সাথে দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি।

এবারেও চার পাঁচ মাস আগে থাকতেই শপিং শুরু করেছিলাম। এত আগে শপিং করার একটাই কারন, আমেরিকাতে একেকটা অকেশানে ‘সেইল’ দেয়। আমার মত অতি সাধারন আয়ের মানুষের পক্ষে রেগুলার দামে জিনিস কেনা কঠিন। কারন আমি শুধু নিজের পরিবারের জন্য গিফট কিনিনা, মায়ের প্রতিবেশী, মায়ের পরিচিত জন, নিজের আত্মীয় স্বজনদের কথাও মাথায় রাখি। দেশে গেলে মাঝে একবার ইন্ডিয়াতে যাওয়ার চেষ্টা করি। ফলে তাদের জন্যও ছোটখাট জিনিস কিনি। আমার ভালো লাগে প্রত্যেককে কিছু না কিছু দিতে। সেজন্যই ‘সেইলে’র অপেক্ষায় থাকি। শ্যাম্পু, লোশান, সাবান এগুলোর যা ওজন হয়, আমাদের চার দ্বিগুনে আট লাগেজের প্রত্যেকটাই ওভারওয়েইট হয়ে যায়। তা সেবারও আট লাগেজের অবস্থা কাহিল দেখে আমি নিজেই কাহিল হয়ে পড়েছি। পার্টির কারনে আগের সাত দিন বিশ্রাম পাইনি, পার্টি শেষে সব গুছিয়ে, বরের জন্য রান্না করে খাবার ফ্রীজ করে দিয়ে এর ফাঁকেই লাগেজ তৈরী করা কি যে কঠিন, তা আমি সেবার টের পেয়েছিলাম।

যেদিন রওনা হলাম, আমাদের বিরাট টয়োটা ভ্যানে সবগুলো লাগেজ চাপিয়ে পাঁচজনতো গাড়ীতে উঠে বসলাম। আমার স্বামীই এবার আমাদেরকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করেছে। এবার একটা মজার ব্যাপার ছিল। আমাদের সাথে আমাদের আরেক বন্ধু পিংকীও রওনা দিয়েছিল। পিঙ্কীরা তখন আমাদের শহরে নতুন এসেছে। কলকাতার মেয়ে, আমাদের পুরো ফ্যামিলির সাথেই ওদের খুব বন্ধুত্ব হয়ে যায়। পিঙ্কী এয়ার ইন্ডিয়া বা লুফথানজা’তে টিকেট না কেটে শুধু আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য ‘এমিরেটস’এর টিকিট কেটেছে। আমরা ২০০৮ এ এমিরেটস এ গিয়েছিলাম। আমরা যার যার গাড়িতে করে বার্মিংহাম এয়ারপোর্টে পৌঁছেছি। পিঙ্কী খুব ফুরফুরে মেজাজে ছিল, কারন ওর বর সব্যসাচী খুব গুছানো মানুষ। ওর বরই ওর লাগেজ ওজন টোজন করে দিয়েছে। আমার বরও গুছানো, কিনতু আমার অবিবেচনার কাছে সকল গুছানো মানুষের হার মানতে হয়। এয়ারপোর্টে নেমেই হঠাৎ করে খেয়াল হলো আমার বড় মেয়ে মৌটুসীর হাতের ঘড়িটা কোথাও পড়ে গেছে। শুরু হলো আমার মাথা গরম হওয়ার প্রথম ধাপ। আমার চেহারার দিকে তাকিয়েই পিঙ্কী দৌড়ে গিয়ে রাস্তার উপর থেকে ভেঙ্গে যাওয়া ঘড়ি নিয়ে এসে আমাকে শান্ত হতে বললো। আমি দাঁত কিড়মিড় করেই থেমে গেলাম।

লাগেজ নিয়ে চেক ইন এ ঢুকেই মিশার ডাক পড়লো। মৌটুসী পাশেই মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে ছিল। মনে মনে একটু কষ্টও লাগছিল, কিনতু আমার তখন শিরে সংক্রান্তি। নিজের চোখেই দেখলাম পিঙ্কীর লাগেজ কি সুন্দর করে ঠিকঠাকভাবে বেল্টে চলে গেলো। আমি জানতাম আমার লাগেজ আটকাবে। মিশাকে বললাম, ” মিশা , আমার ভয় লাগছে। তুই ঐ কালো ছেলেটার কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়া। কালো ছেলেগুলো খুব ভালো হয়। ওরা বেশী ওজন দেখলেও কিছু বলবেনা। একটু সুন্দর করে হাসি দিয়ে কথা বলবি, দেখবি আমাদের লাগেজ ঠিকঠাক বেল্টে চলে গেছে”। আমার মিশা মেয়ে সাথে সাথে হাসতে হাসতে জোরে জোরে বলতে শুরু করলো, ” এই তোমরা কি কখনও কোন মা’কে বলতে শুনেছো, মেয়েকে বলছে ফ্লার্ট করতে। আমি নাকি ঐ কালো ছেলের কাছে গিয়ে হাসি দিলেই আমার লাগেজ ক্লীয়ার করে দিবে”। ব্যস, পিঙ্কী শুরু করে দিল হাসি। হাসি সংক্রমিত হতে শুরু করলো। মিশা কালো ছেলের কাউন্টারেনা গিয়ে এক সাদা মহিলার কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালো। আমার তখন বিপর্যস্ত অবস্থা। প্রতি লাগেজে পঞ্চাশ পাউন্ড এলাউ করে। আমার দ্বিতীয় লাগেজের ওজন হয়েছে আটান্ন পাউন্ড। বেল্ট থেকে ফিরে এসেছে। আরেকটার ওজন হয়েছে আটচল্লিশ পাউন্ড। এবার সাদা মহিলাটি মিশাকে বললো যে যে গুলোতে বেশী ওজন হয়েছে তার থেকে ওজন কমিয়ে কম গুলোতে ঢুকিয়ে দিতে। এমন সিগন্যাল পেয়েই আমার মাথা খুলে গেলো। আমার আট লাগেজের পাঁচটাই ছিল ওভারওয়েইট। একেকটা লাগেজ অনুমোদন পায় আর আমি অন্যটার থেকে ভারী ভারী শ্যাম্পুর বোতল, মিল্ক অব ম্যাগনেসিয়ার বোতল , লোশনের বোতল টেনে বের করে অন্যটাতে ঢুকিয়ে দেই। পিঙ্কীও আমাকে সাহায্য করছিলো। আমার তখন কেঁদে ফেলার অবস্থা। এভাবেই সবগুলো লাগেজ বেল্টে তুলে দিয়েছিলাম।

আমরা ভেতরে চলে যাওয়ার আগে আমার স্বামী আমাকে বললো, ” প্রতিবার তোমার এমন হয়, এটা কেমন কথা! দেশে যাবে, কোথায় আনন্দে থাকবে তা না, সারাটা পথ টেনশান করতে করতে যাও। যাই হোক, লাগেজের ঝামেলা গেছে, এবার বাকী পথ নিশ্চিন্তমনে যেও। মেয়েদের সাথে রাগারাগি করোনা। ওরাই তোমাকে ঠিকভাবে নিয়ে যাবে”। আমার তখন ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়েছে, যে কোন কথাই শুনতে ভালো লাগছিল। মৌটুসীর এতো দামী ঘড়িটা ভেঙ্গে যাওয়ার দুঃখও ভুলে গেছিলাম। এরপর প্লেনে উঠেই আমার খুব জল পিপাসা পেয়ে গেল। বার্মিংহাম থেকে আমেরিকান এয়ারলাইনসে হিউস্টন। হিউস্টন থেকে এমিরেটসে দুবাই। আমেরিকান এয়ারলাইনসে কিচ্ছু খেতে দেয়না, এমন ছোটলোক। আড়াই ঘন্টার জার্নিতে একটা জুসের ক্যান আর ছোট্ট এক প্যাকেট চিনেবাদাম, এই হলো খাবার। আমার তখন পিপাসায় কাতর অবস্থা, দুই ঘন্টা পরে বুড়ি এয়ারহোস্টেস জুসের ক্যান দিয়ে যেতেই বাংলাতেই একটা বকা দিলাম মনে মনে। তারপর হিউস্টনে পৌঁছে পাঁচ ঘন্টার জন্য নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম। পিঙ্কী থাকাতে খুব ভালো লাগছিল। পিঙ্কী খুবই সরল মনের এক মেয়ে। দারুণ স্টাইলিস্ট, বড়লোকের বউ, কিনতু আমাদের সাথে প্রাণ খুলে মিশে যায়। আমার মেয়েরাও স্টাইল জানে, ফলে পিঙ্কী আন্টির সাথে খুব দহরম মহরম খাতির।

ওয়েইটিং চেয়ারে বসে আছি। পিঙ্কী আমার কাছে গল্প করে যাচ্ছিল আমাদের পরিচিত আরেক ফ্যামিলির দাম্পত্য অশান্তির কথা। ও কোন কুটকচালি করছিলোনা, আমার সাথে শেয়ার করছিলো ওর ফিলিংস। পিঙ্কীর একমাত্র ছেলে ঋষি আমার ছোট মেয়ে ঋষিজার সম বয়সী হওয়াতে ওরা দুজনে মিলে খেলা করছিল, বাকী দুই মেয়ের একজন একটু পর পর নানা রকম তথ্য এনে হাজির করছিল। ততক্ষনে আমার মাথা ঠান্ডা। হঠাৎ করেই দুই বুড়া যাত্রী আমাদের কাছে এসে স্প্যানিশ ভাষায় কিছু জিজ্ঞেস করছিল। আমি জানতাম মিশা ও মৌটুসী স্কুলে স্প্যানিশ পড়েছে। বিশেষ করে মিশা মাত্র স্কুল গ্র্যাজুয়েশান করে এসেছে, ওরতো জানার কথা স্প্যানিশ। অথচ মিশা কিছুই বুঝতে পারছেনা বুড়াদের কথা। আমি সাথে সাথে রেগে গেলাম, ” এই মেয়ে তুমি কি শিখেছ এতদিন, এখন এক বর্ণও বুঝতে পারছোনা”। মিশা আমাকে উলটা ধমকী দিলো, ” তোমার খেদমত করতে গিয়ে সব ভুলে গেছি”। মৌটুসী এগিয়ে এলো। পাঁচ বছর আগে শেখা স্প্যানিশ জ্ঞাণ দিয়েই ও পারলো বুড়ো দুটোর কথা বুঝতে। ওদেরকে মৌটুসী যতটুকু সাহায্য করার তা করলো। মিশা ততক্ষনে সবার জন্য খাবার কিনে নিয়ে এসেছে দেখে ওর প্রতি আবার আমি নমণীয় হলাম।

হিউস্টন থেকে এমিরেটসে উঠেই মিশা, পিঙ্কী, মৌটুসী কাছাকাছি বসে গেলো। আমি দখল করলাম জানালার পাশের সীট। ওরা প্লেন ছাড়তেই মুভী চালিয়ে দিল, আর পকর পকর শুরু করে দিল। আমি জানালার কাঁচে মাথা রেখে আকাশের মেঘ দেখতে লাগলাম। মেঘেদের খেলা যারা বুঝতে পারে তাদের জন্য কত রকম খেলা যে অপেক্ষা করে! মাঝে মাঝে আমি মনিটরে দেখি কত ফিট উঁচুতে আছি, মাঝে মাঝে ম্যাপ দেখি, আন্দাজ করি প্লেন এখন ঠিক কোন দেশের উপর দিয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা একটু উঁকি দেয় আমার স্ক্রীণে, আমাকে জিজ্ঞেস করে কোন মুভী দেখতে চাই কিনা। আমি মুভী দেখিনা। বরং মেঘেদের খেলা দেখি। সুন্দরী স্মার্ট এয়ারহোস্টেস কাছে আসে খাবারের ট্রে নিয়ে, কখনও আসে ড্রিঙ্কসের ট্রে নিয়ে। আমাকে ভাবতে হয়না খাবার নিয়ে। আমার মিশা জানে আমার জন্য কোন খাবার ঠিক। আমার খাবার ও ঠিক করে দেয়। আর পিঙ্কী, মিশা, মৌটুসী তিনজনেই মোটামুটি সর্বভুক। ওরা সব সময় নতুন নতুন খাবার ট্রাই করে। সী ফুড ওদের বেশী পছন্দ। রেস্টুরেন্টে গেলেও এই তিনজনই শামুক, ঝিনুক, সী উইডস, আরও যত রকমের থলথলে ল্যাতল্যাতে খাবার আছে সেগুলো অর্ডার করে। বীফ ছাড়া ওরা সব খায়।

এমিরেটস দুবাই পৌঁছালে আমরা কয়েক ঘন্টা একসাথে থেকে ঘুরাঘুরি করি। মৌটুসী পারফিউমের দোকানে ঢুকে যায়। সেবার মৌটুসী আশি ডলার দিয়ে এক শিশি পারফিউম কিনতেই মিশা আমাকে টেনে নিয়ে গেলো দোকান গুলোতে। মিশা সব টেস্টার থেকে একটু একটু করে নিজের গায়ে স্প্রে করতে থাকলো, আমার গায়েও স্প্রে করে দিয়ে বললো, ” মা দিদিসোনা একটা বোকা, আশি ডলার দিয়ে পারফিউম না কিনে আমাদের মত মাগনা পারফিউম গায়ে মেখে ডলারটা দেশে নিয়ে ভাঙ্গালে পরে ঐ টাকায় কত কিছু কিনতে পারতো। তোমার এই মেয়ে পুরা বড়লোকী মেয়ে হইছে। আর আমি হইছি বুদ্ধিমতী”। আমি হাসি মিশার পাগলামী দেখে। এইবেলা অবশ্য পিঙ্কী মৌটুসীর সাথে। যাই হোক একটা সময় পরে আমরা দুই ভাগ হয়ে গেলাম। পিঙ্কীরা ধরলো দুবাই টু কলকাতা ফ্লাইট, আমরা ধরলাম দুবাই টু ঢাকা ফ্লাইট। দুবাই টু ঢাকা ফ্লাইটে নতুন কিছু ছিলনা। একই রকম বাংলা কথা চারিদিকে, বাচ্চাদের ট্যাঁ ট্যাঁ, মাঝখানে কোন কোন ধার্মিক ব্যক্তিকে দেখলাম আসা যাওয়ার প্যাসেজের মধ্যেই নামাজ পড়তে বসে যেতে।

এবার আমি আর বাথরুমে যাওয়ার কথা মাথাতেই আনিনি। কিনতু বাংলায় একই ঘোষণা দিয়েছিল এবারও। বাথরুম পরিষ্কার রাখার ব্যাপারে। এই ঘোষনা যতবার শুনি, আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। এতো বছর প্রবাসে কাটিয়েও বাঙ্গালীদের কিছু কিছু খাসলত থেকেই যায়। এবারও জানালা দিয়ে সূর্য্যোদয় দেখলাম, জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ দৃশ্যগুলোর একটি। নেপালের দিক দিয়ে যখন প্লেন বাঁক নেয়। হিমালয়ের সারি দেখে আমার চোখ আর মন ভরে যায়। আমার মেয়েরা তখনও মুভী দেখে। মাঝে মাঝে আমাকে ডিঙ্গীয়ে বাইরের দৃশ্য একটু দেখে নেয়। ঢাকার কাছাকাছি আসলেই মিশার মেকাপ বক্স ওপেন হয়ে যায়। আলতো করে গালে কপালে ফেসপাউডার বুলিয়ে নেয়, মাথার ঝাঁকড়া চুলে একটু ব্রাশ বুলিয়ে নেয়। আমাকেও একটু ফ্রেশ হতে বলে। আমি পাত্তা দেইনা। অপেক্ষায় থাকি কখন প্লেন মাটি ছোঁবে। একসময় প্লেন মাটি ছোঁয়, আমি আবারও মিশে যাই আমাদেরকে নিতে আসা স্বজনের মাঝে।