ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমরা যারাই প্রবাসে থাকি, দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সুখের সীমা নেই! চারিদিকে বিলাস-ব্যসনের ছড়াছড়ি, গাড়ী-বাড়ীর ঠাট-বাট, অফুরন্ত খাবার-দাবার, কোনকিছুর অভাব নেই। বাতাসে ধূলিবালি নেই, রাস্তায় যানজট নেই, বাতাসে গাড়ীর কালো ধোঁয়া নেই, রাস্তা ঘাটে পথচারী নেই, ভিখিরী নেই, চোরের উপদ্রব নেই, গরমে ঘামাচি হয়না, শীতে হাত পায়ের চামড়া ফাটেনা সবেতেই এক ধরনের নিশ্চিন্ততা! প্রবাসে রাজনীতি নেই তাই পথে ঘাটে গরম গরম বক্তৃতা বিবৃতি নেই, বিরোধী দল আছে কিনতু হরতাল নেই, সরকারী দল থাকলেও সরকারী দলের দাপট নেই, হরতাল নেই, জ্বালাও পোড়াও নেই, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশান জট নেই। বেকারত্ব আছে তবে বেকার ভাতাও আছে, কেউ না খেয়ে থাকেনা। মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে নিয়ে গেলে আগে চিকিৎসা পরে অন্যকথা, গরীব রোগীদের জন্য সরকারী অনুদান বা ফ্রী চিকিৎসাসহ সবই আছে।

প্রবাস জীবনে সবই আছে অথচ কিছুই যেনো নেই! সুখ আছে স্বস্তি আছে, শুধু শান্তি নেই। সারাটাদিন বিদেশী ভাষায় চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা, খাওয়ার সময় তিনবেলা হাত দিয়ে ভাত মেখে খাওয়ার বদলে ছুরী কাঁটা চামচে আওয়াজ না তুলে স্যানডুইচ, স্টেক খাওয়া, মা বাবাকে দেখতে হলেই স্কাইপে যাওয়া, বৃষ্টির দিনে বন্ধুদের সাথে চা মুড়ির আড্ডা মিস করা, রবীন্দ্র জয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের আনন্দ মিস করা–কাহাতক ভালো লাগে! আমার ভালো লাগেনা! আমার ভালো লাগেনা বলেই আমি বার বার ফিরে আসি। কষ্টের উপার্জন থেকে একটু একটু করে সঞ্চয় করি, অপেক্ষায় থাকি কখন আমার সঞ্চয় ফুলে ফেঁপে উঠবে, কখন আমি অনায়াসে প্লেনের টিকিট কাটতে পারবো! নতুন গাড়ীর বদলে পুরানো গাড়ী চালাই, সাধারন মানের বাড়ীতে থেকেই খুশী থাকি। ডায়মন্ড বসানো আংটি কিনিনা, ডলার জমাই আর দিন গুনি, মাস গুনি, এরপর বছর গুনি। দুই বছর শেষ হতেই বাক্স প্যাঁটরা গোছাতে শুরু করি। পরিবারের সকলকে নিয়ে রওনা দেই দেশের পথে।

আমি থাকি আমেরিকাতে। দেশে আসি সামারের ছুটিতে। কারন সামারেই বাচ্চাদের স্কুল-কলেজ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে। তাছাড়া এত পয়সা খরচ করে দেশে এসে দুইটা মাস অন্তত না থাকতে পারলে ভালো লাগেনা। দেশে আসার সময় আমাকে কয়েকবার ফ্লাইট পাল্টাতে হয়, সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। ফলে একদিনের পরিবর্তে দুই দিন লাগে দেশের মাটি স্পর্শ করতে। প্লেনের ভেতরের হিমঠান্ডা পরিবেশের মধ্যে থেকেই জানালার কাঁচে মুখ লাগিয়ে রেখে বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করতে থাকে আমার মত কিছু ক্ষ্যাপাটে বাঙ্গালী। মিডল ইস্ট থেকে আসা বাংলাদেশের ছেলেপেলেদের জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য শুনতে কি যে ভালো লাগে! দেশের টান এমনই এক জিনিস যে আকাশের উপরে থেকেই তারা প্রবাসী জীবনের কষ্টগুলোর সাথে দেশে থাকার সুখ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনায় মেতে উঠে। কি যে ভালো লাগে শুনতে যখন কেউ একজন বলে উঠে, ” মরুভূমিতে থাইক্কা থাইক্কা আরব বেডাদের অন্তরটাও মরুভূমি হইয়া গেছে। আমরার দেশে যেই বিষ্টি হয়, তার অর্ধেকও যদি হেই দেশে হইত, তাইলেই বাঙ্গালীগো মত মনডা নরম হইত”। এমন জ্ঞানের কথা একবার বলে আর মোটা কাঁচের জানালা দিয়ে চোখ ভরে দেখার চেষ্টা করে বাংলার শোভা। জানালার মোটা কাঁচ ভেদ করে কি আর বাংলার রূপ দেখা যায়! বাংলার রূপ দেখতে হলে বাংলার মাটিতে নামতে হয়। ওদের সাথে সাথে আমিও বাংলার মাটিতে নেমে আসার অপেক্ষায় থ্যাকি।

বিমান শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করার সাথে সাথেই আমার সহযাত্রীরা বিমানের নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করেই সীট বেল্ট খুলে দাঁড়িয়ে পড়ে আর দেশী স্টাইলেই হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয় লাগেজ নামানোর জন্য। বিমানবালারা এগিয়ে আসেন এই যাত্রীদেরকে আবার সীটে বসিয়ে দেয়ার জন্য। তখন ছেলেপেলেদের মুখে চোখে ফুটে উঠে এক ধরনের সারল্যমাখা হতাশা সকলের আগে নামতে না পারার দুঃখে। কি যে ভালো লাগে এমন সব দৃশ্য দেখতে। প্রাণভরে আমি দেখি। এরপরে বিমানবন্দরের ভেতরে ইমিগ্রেশানের লাইনে দাঁড়ানোর যে প্রক্রিয়া থাকে সেখানে দেশী পাসপোর্ট আর বিদেশী পাসপোর্টের আলাদা লাইনের দিকে না তাকিয়ে কিছু কিছু যাত্রী বিদেশী পাসপোর্টের লাইনেই হয়ত দাঁড়িয়ে যায় তাড়াতাড়ি বের হতে পারবে আশায়। সেখানেও তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয়, পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশী পাসপোর্টধারীদের লম্বা লাইনে। ওদের মুখটা করুন হয়ে উঠে, আমার মনটা খারাপ হয়। ওদের জন্য মমতা বোধ করি।

আমি আমাকে নিতে আসা গাড়ীতে উঠার সাথে সাথেই ড্রাইভার সাহেব থেকে শুরু করে সকলেই খুব সচেতন হয়ে পড়ে আমার সুখ সুবিধার কথা চিন্তা করে। যেন আমাদের গরম না লাগে, যেন আমাদের খাওয়া দাওয়াতে কোন রকম অসুবিধা না হয়! আমি খুবই বিব্রত বোধ করি আমাদের জন্য সকলকে এমন উতলা হতে দেখে। আবার ভালো লাগে যখন ভাবি এইতো আমার দেশ, এইতো আমার কৃষ্টি। এটাইতো হওয়ার কথা। বাঙ্গালী অতিথিপরায়ণ জাতি। আমাদের জীবনে অভাব আছে, দুঃখ আছে, ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ আছে, কিনতু তারপরেও আমাদের সকলের হৃদয়ের গভীরে সকলের জন্য মমতা আছে, টান আছে। এই মমতাবোধই আমাদেরকে এখনও হাজার হাজার মাইল দূর থেকে, বিলাসী জীবনের মোহ থেকে বার বার টেনে নিয়ে আসে। সুখী জীবনে অভ্যস্ত আমার মেয়েরা প্রতি বছর দেশে আসতে চায় শুধুমাত্র এই ভালোবাসা, আদর, স্নেহ মমতা পাওয়ার জন্য। কি প্রচন্ড গরম এখন বাংলাদেশে, আমাদেরকে নিয়ে সকলেই তটস্থ, আমাদের আরামের জন্য সকলেই খুব চিন্তিত! আর আমরা? আমরা থোড়াই কেয়ার করছি এই গরম, ট্র্যাফিক জ্যাম, ধূলা বালি, মানুষের কোলাহল! আমরা মহা আনন্দিত এই কোলাহলের মধ্যে থেকে। যতই কষ্ট লাগুক তারপরেও একটা অনুভূতিই কাজ করে চলেছে, ” দীন দুঃখিনী মা যে আমার এর বেশী তার সাধ্য নাই”। এইতো আমার দেশ, এই আমার ঠিকানা!