ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

হাজার বছরের পথপরিক্রমায় ইতিহাসের বন্ধুর পথ অতিক্রম করে একটি আদর্শনিষ্ঠ স্বাধীন জাতি প্রতিষ্ঠার সুমহান লক্ষ্যে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, অসীম ধৈর্য্য-সাহস, আত্মত্যাগ ও বিসর্জনে ১৯৭১-এ অর্জিত হয় স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠিত হলো স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। বিশ্বমানবগোষ্ঠীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল বাঙালি জাতি। এ অর্জনের জন্য বিসর্জন দিতে হয়েছে ৩০ লাখ প্রাণ, ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জত; খালি হয়েছে লাখ লাখ মায়ের কোল, বোন হয়েছে স্বামীহারা, পিতা সন্তানহারা। পঙ্গুত্ববরণ করেছে হাজার হাজার ভাই।

পাকিস্তানি নরপশুরা এদেশকে কলোনি করে রেখেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার ও স্তূপীকৃত করা হতো। পাকিস্তানের মোট রাজস্বের ৬২ শতাংশ খরচ হতো দেশরক্ষা বাহিনীতে এবং ৩২ শতাংশ খরচ হতো কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনায়। এই একুনে ৯৪ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ হতো। ৮০ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানি দ্রব্য এদেশে বিক্রি করে তার অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হতো। সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং বিদেশি মিশনসমূহ তাদের সব ব্যয় পশ্চিম পাকিস্তানে করত। এ ব্যয়ের সাকল্যই পশ্চিম পাকিস্তানের আয়। ফলে প্রতিবছর পশ্চিম পাকিস্তানের আয় যে অনুপাতে বাড়ত, পূর্ব পাকিস্তান তার মোকাবিলায় ওই পরিমাণ গরিব হতো। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছিল এদেশ। যাবার বেলায় হায়নার দল গর্ব করে বলেছি- এ দেশকে এমন করে রেখে গেলাম যে, লাখ লাখ লোক না খেয়ে মরবে, আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না।
স্বাধীনতার শত্রু, তাদের দোসর ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির কবলে স্বাধীনতার ঊষলগ্নে চরম সঙ্কটের সম্মুখীন হলো বাংলাদেশ। কোটি কোটি ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন, বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, ধ্বংসকৃত নগর-বন্দর-পোতাশ্রয়ের পুনর্নির্মাণ, শিল্প, কারখানাগুলোকে উৎপাদনযোগ্যকরণ- ক্রমাগত অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি এবং যুদ্ধাবস্থায় নিষ্কর্মা কৃষকের ফেলে রাখা লক্ষ কোটি একর অনাবাদী জমিকে চাষাবাদ যোগ্যকরণ- অসংখ্য ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া, বিশেষ করে বিশ্বের ঘাটতি খাদ্যের বাজার হতে বরাবরের লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতি পূরণ করা, প্রতিটি সমস্যাই আশু সমাধানের দাবিদার। অন্যদিকে স্বাধীনতাত্তর সমস্যার সুযোগ নিয়ে কালোবাজারি, মুনাফাখোর, মুজতদার, অসাধু ব্যবসায়ী প্রভৃতি সমাজের দুষ্টু কীট চাঙা হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক স্ফীতি ঘটিয়ে বাংলার গণজীবনকে এক চরমতম দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে নিক্ষেপ করল। আমাদের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা জটিল থেকে জটিলতর হলো। সেই সঙ্গে শুরু হলো গুপ্তহত্যাসহ ষড়যন্ত্রের রাজনীতি।

এ চরম সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় জনগণের ক্ষমতায়নে মাত্র ৯ মাসের মধ্যে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণ-পরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। জনপ্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নে নিশ্চিত হয় জনগণের অংশগ্রহণ। প্রতিফলিত হয় জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিধ্বনি। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এ ৪টি মূলনীতিতে প্রণীত হয় পবিত্র সংবিধান। জনগণের মৌলিক অধিকার হলো যার মূল বিধি।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণপরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদিত অধিবেশনে শাসনতন্ত্রে বর্ণিত জাতীয়বাদ সম্পর্কে বলেন, “জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর। আজ বাঙালি জাতি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে; এই সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল যার ওপর ভিত্তি করে, এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে যার ওপর ভিত্তি করে সেই অনুভূতি আছে বলেই আমি বাঙালি, আমার ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদ।”

তিনি গণতন্ত্র সম্পর্কে বলেছেন, “আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র- সেই গণতন্ত্র যা সাধারণ মানুষের কল্যাণসাধন করে থাকে। মানুষের একটা ধারণা আছে এবং আগেও আমরা দেখেছি যে, গণতন্ত্র যেসব দেশে চলেছে, দেখা যায় সেসব দেশে গণতন্ত্র পুঁজিবাদের প্রটেকশন দেয়ার জন্য কাজ করে এবং সেখানে প্রয়োজন হয় শোষকদের রক্ষা করার জন্যই গণতন্ত্রের ব্যবহার। সে গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র এবং শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হলো- আমার দেশে যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে তাতে সেসব বন্দোবস্ত করা হয়েছে যাতে এদেশের দুখী মানুষ রক্ষা পায়, শোষকরা যাতে রক্ষা পায় তার ব্যবস্থা করা।”

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে বলেন, “আমাদের সমাজতন্ত্রের মানে শোষণহীন সমাজ। সমাজতন্ত্র আমরা দুনিয়া থেকে হাওলাত করে আনতে চাই না। সমাজতন্ত্রের মূল কথা হলো শোষণহীন সমাজ। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সেই দেশের আবহাওয়া, কি ধরনের অবস্থা, কি ধরনের মনোভাব, কি ধরনের আর্থিক অবস্থা সবকিছু বিবেচনা করে ক্রমশঃ এগিয়ে যেতে হয় সমাজতন্ত্রের দিকে এবং তা আজকে স্বীকৃত হয়েছে। রাশিয়া যে পন্থা অবলম্বন করেছে চীন তা করেনি; সে অন্যদিকে চলেছে।”
ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবো না। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারো নাই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দেয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে- তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না।”

শোষিতের গণতন্ত্রের নির্গলিতার্থ হলো- দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার নীতি। জোতদার, মহাজন, দুর্নীতিবাজ আমলা, সুদচক্রের শোষণ থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করার নীতি। ক্ষমতাকে দুষ্টুচক্রের কোটারি থেকে মুক্ত করে জনগণের ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা করা। শাসনতন্ত্রে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তর আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে জনগণের হাতে। সেই সাথে সাধারণ মানুষকে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করার অবাধ সুযোগ দিয়ে অন্যায়ের বিচার পাবার অধিকার প্রদানের মাধ্যমে শোষণহীন সমাজ (সমাজতন্ত্র) প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

ইংরেজ ও পাকিস্তান আমলে জমিদার, জোতদার, আমলাদের সরকারিভাবে নানা অপকর্মের নিরাপত্তা দেওয়া হতো। আমলাতন্ত্রের সেই প্রটেকশনের ওপর আঘাত করে শোষণহীন, শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সরকারি কর্মচারীদের অধিকার আর মজদুর-কৃষক তথা সাধারণ মানুষের অধিকারের মধ্যে কোনো প্রকার বৈষম্য রাখা হয়নি শাসনতন্ত্রে।

এবার আসি ধর্মনিরপেক্ষতার কথায়। সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত ধর্মনিরপেক্ষতার সিদ্ধান্ত একটি যুগপোযোগী সিদ্ধান্ত। যদিও সংবিধান প্রণয়নের আগে ও পরে এবং বর্তমানে এ বিষয়ে রয়েছে মতবিরোধ।

ধর্মের ভিত্তিতে ভারত থেকে বিভক্ত হয়ে জন্ম নিল মুসলমানদের রাষ্ট্র পাকিস্তান। যে আদর্শ নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনকারীরা পাকিস্তান কায়েমের সংগ্রাম করেছিল। ধর্মীয় নেতা, আলেম-উলামাদের ক্ষমতার লোভ, জমিদার শ্রেণীর ক্ষমতা কোটারি করার ষড়যন্ত্রে তা অর্থহীন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানকে আদর্শের দিক থেকে ইসলামী জীবন বিধানসম্মত না হলেও নামমাত্র ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ধর্মব্যবসায়ীরা ইসলামকে পুঁজি করে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে কোটারি করার চেষ্টা করে। শুরু হয় অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, দলন-মর্দন, শোষণ আর নিপীড়নের তা-ব। শ্রেণীস্বার্থের অন্ধকূপে বন্ধি হয় ‘ইসলাম’। ওরা একদিকে বক্তৃতা, সভা-সমাবেশে ইসলাম ইসলাম বলে চিৎকার করতে থাকে। অন্যদিকে ইসলামের পবিত্র মর্মার্থকে কুলষিত করে; ভয়ঙ্কর অত্যাচার, আতঙ্ক, অশান্তি আর বৈষম্যের গ-িতে ইসলামকে আবদ্ধ করে জাতির জীবনে বৈষম্যের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ঘটতে থাকে ধর্মের নামে নারী ধর্ষণ, নির্বিচারে মানুষ হত্যা, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, কোলের শিশুকে ছিনিয়ে নিয়ে আগুনে নিক্ষেপ করার মতো অমানবিক বর্বরোচিত ঘৃণীত ঘটনা।

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গণপরিষদে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্রের ওপর দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, “আমার দেশের প্রতি আমার বিরাট কর্তব্য রয়েছে। আর সৃষ্টিকর্তার প্রতিও রয়েছে আমার অন্তরের এক বিরাট তাগিদ। এ অবস্থায় আপনারা যখনই কেবল নামসর্বস্বভাবে পাকিস্তানে ইসলামী রাষ্ট্রের খেতাবে অলঙ্কৃত করে জনসাধারণকে ভাওতা দিচ্ছেন। তখন আমার কণ্ঠ প্রতিবাদমুখর না হয়ে পারে না।”

তিনি আরও বলেন, “একটা রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র এবং শাসন-মোতাবেক পরিচালিত তার শাসনযন্ত্রগুলো ইসলামী আদর্শ ও ইসলামী মূল্যবোধ অভিসারী হলেই তাকে সঠিকভাবে ইসলামী রাষ্ট্র বলা যায়। আমরাও ঠিক এ-ই চাই। আমরাও চাই, শাসনতন্ত্র এবং প্রশাসন ব্যবস্থায় ইসলামী আদর্শের পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন হোক। আপনারা যদি পারেন, ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধসহ এর আদর্শের সামগ্রিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে একটি শাসতন্ত্র প্রণয়ন করুন, সেটাই বাঞ্ছিত। সেটাই অভীষ্ট লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এর পরের প্রশ্ন হলো : কি ইসলামসম্মত আর কি ইসলামসম্মত নয়- মানে ইসলাম কি অনুজ্ঞা করে আর কি নিষেধ করে, কে তা নিরূপণ করবে? আর কোন্ নীতি বা মানদ- অনুসারে আপনারা এসব প্রশ্নের মীমাংসা করতে চান? এরইমধ্যে আলেম-সমাজ বলতে শুরু করেছেন যে, শাসনতন্ত্র ব্যাখ্যার ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় দানের মালিক মোখতার হচ্ছেন তাঁরাই এবং তাঁদের রায়কেই এক্ষেত্রে শেষ কথা বলে মেনে নিতে হবে। তাঁদের মত হচ্ছে, শাসনতন্ত্রকে অবশ্যই ইসলামী শাসনতন্ত্রের রূপ পরিগ্রহ করতে হবে এবং জনসাধারণকে মত-নিরপেক্ষ হয়ে তাঁদের মতামতই মেনে নিতে হবে। আপনারাও শাসনতন্ত্রে এ ব্যবস্থা করেছেন যে, আলেম সমাজ এক সংগে বসে কোরআন ও সুন্নার আদেশ নিষেধগুলো বাছাই করে এক সংগে সংবদ্ধ করবেন। এক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদের মধ্যে এবং তাঁদের ও জনসাধারণের মধ্যে মতবিরোধ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু কি ভাবে এ মতবিরোধ নিষ্পন্ন করা হবে?
সেদিন যারা ইসলামকে পুঁজি করে ক্ষমতাকে কোটারি করেছিল। সাধারণ মানুষের অধিকার লুটেছিল, বৈষম্যের আগুনে পুড়িয়েছিল শান্তির পতাকা। তারা আজও ইসলামকে পুঁজি করে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে নামসর্বস্ব ইসলামী হুকমত কায়েমের আন্দোলন করছে। এসব ধর্মব্যবসায়ীদের জুয়াচুরি, ব্যাভিচার, লুণ্ঠন, ক্ষমতার লোভ, আপন স্বার্থে ইসলামকে ব্যবহার করার চলমান অপপ্রয়াসের পরও কি এদেশে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আত্মঘাতি নয় কী?

আমি হলফ করে বলতে পারি, যদি এদেশের আলেম-উলামা এবং এসব নামসর্বস্ব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে অবস্থা এ রকম দাঁড়াবে যে, শিয়া, সুন্নী, চরমোনাই, শরসিনা, জামাত, আমিনী, ইসলামী আন্দোলন পরিষদসহ কয়েক ডজন সংগঠন নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠা করতে পরস্পরের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করবে; মারামারি হাঙ্গামা কাটাকাটি হানাহানিতে লিপ্ত হবে।

সংবিধান প্রণয়নের পর শাসনতন্ত্রের মূলনীতি ও এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াল স্বাধীনতার শত্রু, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীদের ষড়যন্ত্র এবং কালোবাজারি, মুনাফাখোর, মুজতদার, অসাধু ব্যবসায়ীদের কর্মকা-।

বাঙালির অর্জিত শাসনতন্ত্রের মূলনীতিগুলো বাস্তবায়নের আগেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে সপরিবারে নিহত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ শাসনতন্ত্রের মূলনীতিগুলো ক্ষমতাকে অট্টালিকার আলোকসজ্জা থেকে রাজপথে নামিয়ে সাধারণ মানুষের সম্পদে পরিণত করেছিল। ধর্মব্যবসায়ীদের স্বার্থে করেছিল কুঠারাঘাত। শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় আমলাতন্ত্রের প্রটেকশনে আঘাত হেনেছিল, সেনাবাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করেছি।

’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীরা বাঙালির অর্জিত শাসনতন্ত্রকে নিক্ষেপ করল শ্রেণী স্বার্থের অন্ধকূপে। ক্ষমতাকে রাজপথ থেকে সেনানিবাসের গন্ডিতে বন্দি করে রাখল। বন্দুকের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করল বাঙালির স্বাধীকার। শুরু হলো পাকিস্তানি কায়দার শোষণ, অত্যাচার, অবিচার, দলন-মর্দনের রাজনীতি। শেষ হয়ে গেল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটার সম্ভাবনা। শাসনতন্ত্রের মূলনীতি ও মৌলিক অধিকারের আদর্শকে নির্বাসনে পাঠাল ষড়যন্ত্রকারীরা। ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হলো পবিত্র ইসলামকে। শাসনতন্ত্রহীন দীর্ঘ দিনের সামরিক শাসন, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শাসনতন্ত্রকে জাতীয় জীবন থেকে ঠেলে দিল অনেক দূরে। রাজনীতি হয়ে উঠল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক পেশা। শ্রেণীস্বার্থ আর প্রগতি বিলাপ চেপে বসল জাতির জীবনে। শ্রেণীস্বার্থের যাঁতাকলে পিষ্ট হলো জাতিস্বার্থ। ক্ষমতা নিঃকণ্ঠক করতে শাসনতন্ত্রকে করা হলো ক্ষত-বিক্ষত। শাসনতন্ত্রের মূলনীতি ও মৌলিক অধিকারের ধারাগুলোকে ঘিরে ফেলা হলো ক্ষমতা প্রয়োগের ধরন আর বিধি-নিষেধের বেড়া জালে। আইনের অনুশাসন, রাজনৈতিক শিষ্ঠাচার, মানবিক মূল্যবোধ বলে কিছুই অবশিষ্ট রইল না। দখলদার সরকারগুলো নিজেদের ক্ষমতার গদিকে টিকিয়ে রাখতে শুরু করে বিরুদ্ধবাদীদের ক্ষমতার অপব্যবহার, অত্যাচার, অবিচার, হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা প্রদানসহ নানাভাবে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা। যা আইনের অনুশাসন, মানবতা, মানবীয় মূল্যবোধ ও শাসনতন্ত্রের মূলনীতিগুলোর প্রতি চরম অবমাননা।
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আজও আইনের শাসনের প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রদান করে না। ফলে জনগণের মনে শাসনতন্ত্রের প্রতি পূর্ণ সম্মানবোধ জাগ্রত হয় না; জনগণ দেশের শাসনতন্ত্র জানা ও বোঝার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে না। এ সুযোগটা কাজে লাগিয়েই স্বার্থান্বেষীরা অধিকার অসচেতন জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভাঙে।

এ দেশের রাজনীতিকদের বক্তৃতায়, ভাষণে, বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ মন্তব্যে শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান করতে দেখা যায়। যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচন, কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত কার্যক্রম, জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শাসনতন্ত্রের মূলনীতির সঙ্গে আদৌ সঙ্গতিপূর্ণ কি-না তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।