ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

ভারত আসলে কোথায়? কলকাতা যেতে হলে যশোরের পরের জেলা হলো ভারত। এভাবে দেখি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসতে জ্যাম ছাড়া (৫ ঘণ্টা) যে সময় লাগে, ততটা সময় ঢাকা থেকে পূর্ব বা পশ্চিম দিকে অথবা উত্তর-পূর্ব দিকে গেলেই ভারত। একদিকে ত্রিপুরা অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ আর সিলেটের দিকে আসাম। আর যদি উত্তরবঙ্গের দিকে যাওয়া হয় তো সাত ঘণ্টা পেরোলেই শিলিগুড়ি। যেখান থেকে চীনও কাছে। কোরীয় উপদ্বীপ থেকে দক্ষিণ পূর্বে অস্ট্রেলিয়া। ওদিকে চীনের শেষ হলে রাশিয়া অার রাশিয়ার পশ্চিমে ইউরোপ অার অাটলান্টিক পাড় হলে অামেরিকা। অামেরিকার এ পাড়ে অাফ্রিকা তারপরেই মধ্যপ্রাচ্য।

তাহলে পৃথিবী এত বিশাল ভাবার কি আছে?

ঢাকা থেকে তিন চারটা জেলা পার হলেই ভারত মানে পশ্চিমবঙ্গ। আবার কুমিল্লা মহাসড়কের পাশেই তো আগরতলা। তাই আমি চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে যাওয়ার চেয়ে ভারত (কলকাতা) যাওয়া অনেক কম খরচের ও সহজ। এ জন্যে ভারত যাওয়া বিদেশ যাওয়াও নয়। আর ওই বাংলা, এ বাংলা তো নিজের মতোই। অত কঠিন করে বিদেশ না ভাবলে তো ঘরের উঠোনেই ভারত।

যশোরের শেষ হলো উত্তর চব্বিশ পরগনা। এই জেলা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরেই কলকাতা। তার পাশের জেলা দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা আর আমাদের সাতক্ষীরা। দু’ জেলাই সুন্দরবনের জেলা। বর্ডারে পৌঁছতেই কমলকে ফোন করেছি। ও বনগাঁতে থাকে মামার বাড়ি। এখানেই পড়ালেখা করে। পরিচয় ফেসবুকে। সাইকেলেই চলে এলো বৃষ্টির মধ্যে। এদিকটা হয়েই কলকাতা যেতে হয় তাই আগে অনেকবার আসা হলেও নেমে দেখা হয়নি। কমল সেটা বুঝতে পেরেই বলল হেটে চলো। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় যে স্কুল পড়তেন সেটা দেখালো। তারপর বনগাঁও কোর্ট হয়ে সোজা মামার বাড়ি।

কমলের নিজের বাড়ি উত্তর প্রদেশের মানজারে। বনগাঁওতে বাড়িগুলো ঠিক বাগান বাড়ির মত। সামনের অংশে বাগান। যেরকম বাড়ি আমাদের সীতাকুন্ডেও দেখা যেত এক সময়। জনসংখ্যার চাপে সবুজ মিলিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। কমলের মামা বাড়ি না থাকায় আমি আর কমল বসে পড়লাম মানচিত্র নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র পেলাম কমলের কাছে। শেষ এক বছর ধরে অবসরে মানচিত্র দেখাটাই নেশা হয়ে গেছে। তারপর খেয়ে বিকেলে বের হলাম। সাইকেলে করে সন্ধ্যা অবধি ঘুলাম বনগাঁও এর অনেকটা। ইছামতি নদীর ধারে এক পার্কে গেলাম। নদীর সাথেই লাগোয়া পার্কটা বনগাঁও থানার পাশেই। এ পাড়ের তরুণদের যে বন্ধুত্ব, সহজে মেলামেশা করার যে ধাঁচ ওটা ঠিক ১৫ কিলোমিটার পরে গেলে কতটা বদলে যায়।

তারপর গেছি এক দিদির বাড়ি। ওর বাড়ি গল্প করে সেদিনের মত ঘরে ফেরা। কমলের বন্ধুর বাড়িতে এক দাদার সাথে কথা হলো যার বাড়ি ছিল গোপালগঞ্জে। কমলের দিদার বাড়িও ওখানে। যাতায়াতও আছে। দুজনই এ পাড়ে এলেন কাছাকাছি সময়ে। দাদা এসে শুনলেন পুলিশে লোক নিচ্ছে। পুলিশে চলে গেলেন। এখন রিটায়ার্ড। আর দিদা এলেন বাবা-মার সাথে। আসার কারণ? দুজনের ভাষ্য কাছাকাছি। দাঙ্গা ও দেশভাগ পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জের দিকটায় তাদের জন্যে ঠেকা কঠিন ছিল। হিন্দুরা দলে দলে এদিকে আসছিল তারাও এলেন।

কলকাতা বাসে যেতে যে এলাকাগুলো দেখি বারাসত, বারাকপুর, বিধাননগর সবই উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার। বাংলার ইতিহাসে পরগণা শব্দটা পড়েছিলাম। ১৭৫৭ সালে বাংলার নবাব মীরজাফর কলকাতার দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত অঞ্চলে ২৪ টি জংলীমহল বা পরগনার জমিদারি সত্ত্ব ভোগ করার অধিকার দেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। এই ২৪টি পরগনার মধ্যে কলকাতাও ছিল।

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার আগে যশোর জেলার বনগাঁ ২৪টি পরগনা জেলার মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয় আর সুন্দরবনের বৃহত্তম অংশ খুলনা ও বাখরগঞ্জের মধ্যে চলে আসে। ইংরেজরাই কলকাতাকে এই ২৪ পরগণা থেকে বিভক্ত করে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী করে। পরে ১৯৮৬ সালে ১লা মার্চ জেলাটিকে উত্তর ২৪ পরগণা জেলা ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা নামে দুটি জেলায় ভাগ করা হয়।

ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই অঞ্চলের নদীপথে পর্তুগিজ জলদস্যুরা হানা দিত ইছামতী নদী হয়ে। কদিন আগে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করো বসিরহাটে সেখানে ও বেশি আধিপত্য ছিল এই দস্যুদের। ১৭ শতাব্দীর শুরুতে যশোর,খুলনা, বরিশালসহ গোটা ২৪টি পরগনা জেলার অধিপতি ছিলেন প্রতাপাদিত্য । যশোররাজ প্রতাপাদিত্য পর্তুগিজ জলদস্যুদের ঠিকাতে সাগরদ্বীপ, সরসুনা ,জগদ্দল প্রভৃতি অঞ্চলে দুর্গ তৈরি করেন।

এরপর এ অঞ্চলে মুঘলরা হানা দিলে ১৬১০ সালে মুঘলদের হাতে প্রতাপাদিত্য পরাজিত হন। এই এলকায় জন্মগ্রহণ করা বিখ্যাত মানুষদের মধ্যে আছেন অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার, অধ্যাপক, গবেষক ‍যিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির প্রাক্তন সভাপতি। আর আছেন প্রভাস সরকার ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী ও বাঙালি শ্রমিক নেতা।

পরদিন সকালেই বনগাঁও স্টেশন অবধি সাইকেলে এনে দিল কমল। তারপর রানাঘাটের ট্রেন। রানাঘাট নামতেই প্রতিবার যেটা হয় গোয়েন্দা পুলিশ আমাকে ডেকে বলবে, বাংলাদেশ থেকে এসছো? সেটা এবার হলো না। তারপর কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আবার কৃষ্ণনগরের ট্রেন। রানাঘাট শিয়ালদহ থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে। দেশবিভাগের আগে এই লাইন হয়ে যোগাযোগ ছিল উত্তরবঙ্গের সাথে। ১৮৬৩-১৮৬৪ সালের মাঝে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে তৈরি করে এ লাইন। সেই সময় এই স্টেশনটি কলকাতা (শিয়ালদহ)- কুষ্টিয়া লাইন এর অংশ ছিল। যেটা পরে গেদে হয়ে চলে গেছে। রানাঘাট থেকে কৃষ্ণনগর হয়ে আসার পর সদরেই নামতেই সব সময় যেটা দেখি তুমুল ব্যস্ততা। সামনে পুজো বলে সেই ব্যস্ততা আরো বাড়ছে।

এখান থেকে কলকাতার দূরত্ব ট্রেনে একশ কিলোমিটারের বেশি। ট্রেন আছে বলেই এই দূরত্বটা মানুষের কাছে তেমনটা বেশি নয়। ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার সাথে মানসিক দূরত্ব নেই পাশের জেলাগুলোর। জীবনযাপনে নদীয়ার সীমান্তবর্তী মানুষগুলোর মধ্যে যে ব্যাপারগুলো আছে বলার মত তা হলো পোশাকের স্বাধীনতা ও নারীদের অংশগ্রহণ। ভারতীয় চরিত্র বলতে যদি আমি কিছু বুঝে থাকি সেটা হলো কোন শহরে ঢুকতেই নারী পুরুষ সবার সমান অংশগ্রহণ যেটা আমাদের ওখানে দূরবর্তী জেলাগুলোতে এখনো অধরা রয়ে গেছে। আর বরাবরের মত যোগাযোগের জন্যে ব্যবহার করা স্কুটি ও সাইকেল। যে কারণে ওরা আমাদের সীমান্তবর্তী জেলার চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক হয়ে উঠেছে। সেই সাথে আছে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা।

কৃষ্ণনগর থেকে দেশে ফিরতে আগে ট্রেনেই আসতাম। এবার ট্রেন না ধরে বাসে আসতে বনগাঁও আসতে লেগে গেল চার ঘণ্টা মত। হাসঁখালী, মুরাগাছা, বগুলা হয়ে বাস নামিয়ে দিল দত্তাপুলিয়া তারপর আবার বাস ধরে বনগাঁও। বর্ডারে এসে দেখি বিশাল এক লাইন। চার ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে আবার বাংলাদেশে। সবাইকে দেখাশোনার দায়িত্বে যে ভারতীয় অফিসার আছেন ধমকে উঠলেন একজনকে। কেন ভারতে আসেন এত। এ পাড়ে জায়গা জমি করে নেবেন। আধার কার্ড করে নিন। মহিলাও বললেন করতে দিয়েছি। এরপর একেবারে চলে আসব। আরেকজন আরেক কাঠি সরেস। বললেন আপনারা এত কষ্ট করে না এসে দরখাস্ত করবেন বাংলাদেশকে যেন ভারত করে দেয়। আলাপে অনেকজনকে পেলাম যাদের বাংলাদেশে বাড়ি আছে আবার উত্তর চব্বিশ পরগণাতেও আছে। এ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা কি আমি জানি না। ভারতের অনেক জায়গাতেই মুসলিমদের উপর অত্যাচার হয়। গরু রাজনীতিও বেশ জমজমাট।

তবে সংবাদে কখনো দেখিনি ভারতীয় কোন মুসলিম অত্যাচারিত হয়ে মুসলিম রাষ্ট্র দাবি করা পাকিস্তানে অথবা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র দাবি করলেও সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে। নদীয়া, কাশ্মিরের মুসলিমদের সাথেও কথা বলে দেখলাম ভারতকে তারা নিজের দেশই মনে করেন। মুসলিম বলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রতি আলাদা কোন টান নেই। উত্তর ভারতে যেখানে অত্যাচার হচ্ছে সেদিক থেকেও তো কখনো কেউ আশ্রয় নিতে শুনলাম না। তাহলে নিউজে অনেক সময় বলা হচ্ছে বাংলাদেশে হিন্দু কমছে। সেটার রেফারেন্স দিয়ে বাংলাদেশে হিন্দু অত্যাচারের মাত্রা ছাড়ানোর কথা বলা হয় সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন আছে। ‍দু দেশে বাড়ি থাকা যে হিন্দুরা অার যারা এখন নিজের ইচ্ছেতেই চলে যাচ্ছেন তারাও কি সেই অত্যাচারিত হিন্দুর তালিকার ভেতর পরে যাচ্ছে না?

আমাদের ভূগোল পড়াতেন এক স্যার। বন্ধের পর স্কুলে যাওয়ার পর শুনি সেই স্যার ভারতে চলে গেছেন। সেটা ২০০৬ সালের কথা। অথচ গত ২০ বছরে কোন দাঙ্গা বা অত্যাচারের ইতিহাস তো আমার গ্রামে নেইই বরং হিন্দুরায় সংখ্যায় বেশি। বাংলাদেশী হিন্দুতের এই ভারতে যাওয়ার প্রবণতা আর ভারতীয় মুসলিমদেরও অত্যাচার হোক না হোক নিজেদের ভারতীয় ভাবার যে প্রবণতা দুটোর কোন যৌক্তিক ব্যাখা দাঁড় করাতে পারছি না।

ভীড়ের জন্যে বাস পাব না জানতাম। যশোর সদরে এসে বাস ধরতে হলো। সেই বাস পদ্মা পাড় হতেই রাত ৩ টা। সকালে কল্যাণপুর নেমে বাস ধরে ২০ মিনিটেরও কম সময়ে ওয়ারী ভাইয়ার বাসায়। ভোরের ঢাকা নরম ঘাসের মত নুইয়ে থাকা কিছু মনে হলো। ঢাকায় দিনে যে পথ পাড়ি দিতে তিন ঘণ্টার বেশি লাগে সে পথ ২০ মিনিটে পাড়ি দিয়ে মনে হলো কোন জাদু দেখলাম। ঢাকা নিজেই একটা জাদু। যে শহর এই ভয়ানক জ্যামের পর ও টিকে থাকে সে তো জীবন্ত জাদুই।

দুদিন পরপর ভাইয়ার বাসা থেকে ফেরার পথে রাত ১টায় বাসে উঠে মেঘনা সেতু পাড় হয়ে কুমিল্লা আসতেই সকাল সাতটা। সেখান থেকে চট্টগ্রাম শহরে ঢুকতে দিনের ১২ টা। জিইসি থেকে ২ নাম্বার গেট আসতে ১ ঘণ্টা কারণ পানির জন্যে গাড়ি আটকে ছিল। তারপর বাসায় ফিরে মনে হলা বিশ্ব জয় করেছি। এটা লক্ষণীয় বিষয় বাংলাদেশ অংশে সড়কের ভোগান্তি ছাড়া কোন কিছুই নেই বলার। যশোর থেকে ঢাকা আসতে হয়ে গেল ভোর আর ঢাকায় রাত ১টায় বাসে উঠে দিনের ১টায় চট্টগ্রাম। সমদূরত্বে পশ্চিমবঙ্গে মানুষ দিনে আসা যাওয়া করে চাকরিও করছে। আমি মা কে দেখে অবাক হই মা কখনো ঢাকা দেখেনি। মা নয় আমার বাড়ি থেকে চট্টগ্রাম শহর ৩০ মিনিটের দূরত্বে। নানা কারণে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ শহরে যায়নি। যেতে হয় না। মূল ধারার যে স্রোত তা থেকে বহু দূরে রয়ে গেছে যেমনটা ঢাকা চট্টগ্রাম ৪ ঘণ্টার পথ হয়ে যায় ১২ ঘণ্টার। মা কি জানে কয়েকটা জেলা পাড় হলেই মানুষের জীবন কতটা গতিশীল ও দূরত্ব গুলো কতটা নুইয়ে পড়েছে মানুষের শক্তির কাছে।