ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 
20171005_163948_1507219431119

নদীয়ার একটি শপিং মল, যার ভেতর অাছে মাল্টিপ্লেক্স

আমার ছোট বেলায় শুক্রবার ছিল একটি পারিবারিক উৎসবের মত। সরকারি ছুটি শনিবার করার পর থেকে সেই উৎসবের মাত্রা বৃদ্ধি পেল।  শুক্রবার আসলে সকালেই খেলাধুলা করে বিকেলে অপেক্ষা করতাম কখন সিনেমা শুরু হবে।  বাবা-মা, চাচী, আমাকে যে চাচা পড়াতেন উনি সহ বাড়ির তরুণ যারা আছে তারা সহ পাশের বাড়ি থেকেও অনেকে আসত সিনেমা দেখতে। আমাদের পুরো বাড়িতে দুই ঘরে টিভি ছিল। সাদাকালো টিভির যুগ তখন। উন্মাদের মত সিনেমা দেখা যাকে বলে। তখন ক্যাবল লাইনের মাধ্যমে ডিশ সংযোগ গ্রামে প্রবেশ করেনি। তাই সিনেমা মানেই ছিল বিটিভিতে শুক্র-শনি দু’দিন সিনেমার জন্যে অপেক্ষা করা।  সিনেমা হলের নাম কখনো শোনা হয়নি। তখন একুশে টিভিতেও সিনেমা দেখা হতো। এর বাইরে দোকানগুলোতে ভিসিআরে সিনেমা চলত, যার বেশিরভাগই অশ্লীল সিনেমা।

তার কয়েক বছর পর আমাদের ক্লাসের কয়েকজন একবার স্কুল পালিয়ে “চাচ্চু” ছবিটি দেখে আসে সিনেমা হলে।  ব্যাপারটা অনেকটা দুঃসাহসের মত হয়ে দাঁড়ায় আমাদের কাছে। সিনেমা হলে কি করে গেছে ওরা! স্যাররাও শুনে বেধড়ক পেটালেন দুজনকে। কয়েক বছর পর ক্যাবল সংযোগ আসল গ্রামে।  ঘরে ঘরে টিভিও আসতে শুরু করল। শুক্রবার আর কোন ঘরে দলবেঁধে সিনেমা দেখা হয় না।  আস্তে আস্তে মানুষ শুক্রবারে বিটিভিতে সিনেমা দেখত সেটাই ভুলে গেল। সিনেমার জায়গা দখল করে নিল পশ্চিমবাংলার কয়েকটি চ্যানেল। সেই সাথে যোগ হলো কয়েকটি হিন্দি চ্যানেল। রিমোটের অধিকার যে পুরুষদের কাছে ছিল তারা দেখত ডিসকভারি নয়ত ন্যাশনাল জিওগ্রাফ। কেউ দেখত খেলার চ্যানেল। এভাবেই হারিয়ে গেল পরিবারের সাথে বাংলা সিনেমা দেখার একটি যুগ। সাথে বিটিভির আধিপত্যও।

ডিশ সংযোগ আসার পর একজন মানুষও দেখিনি যারা বিটিভিতে আগের অভ্যাসে থেকেছে। আমি নিজেই তারপর থেকে আর বাংলা সিনেমা দেখি না। যখন আমরা ঘরে ঘরে শুক্রবারে বিটিভিতে সিনেমা দেখতাম তখন পাড়ার চায়ের দোকানেও চলত সেই সিনেমা।  ডিশ সংযোগ আসার পর দোকানগুলোতে টিভিতে তামিল, তেলেগু সিনেমা বেশি চলত।  সাথে হিন্দি সিনেমা। কেন এমন হলো?

বিটিভি যুগে বাংলা সিনেমার বাইরে অন্য কোন সিনেমার সাথে পরিচয় ছিল না। ডিশ সংযোগ আসার ফলে সাথে সাথেই বাংলা সিনেমা সাধারণের কাছে আবেদন হারালো। তাও ভীনদেশি সিনেমায় আগ্রহী হলো মানুষ। অবশ্যই গল্পের যে গৎবাধা ধরন, পিছিয়ে থাকা প্রযুক্তির ব্যবহারসহ নতুনের প্রতি আগ্রহ সব মিলে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ল বাইরের সিনেমাতে। সিনেমা হলে না গিয়ে বাসায় বসে সিনেমা দেখার পরও বাংলা  সিনেমা না দেখে  যখন অন্য সিনেমা দেখতে শুরু করল তখন থেকেই ভাবার দরকার ছিল সিনেমা নিয়ে।  আজ যখন সব হারিয়েছে তখন কপালে ভাঁজ।

চট্টগ্রাম শহরের যেখানে আমার মায়ের বাড়ি সেখানেও আমি ছোট বেলায় ছিলাম বেশ কয়েক বছর। নানু বাড়ির পাশেই ছিল বিডিআর সিনেমা হল (মূল নাম জানা নেই)। নানু বাড়ির কাউকেও আমি যেতে দেখিনি সিনেমা হলে। তারপর বড় বেলায় এসে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু বান্ধবদের মধ্যেই কারো মধ্যেই দেখিনি বাংলা সিনেমা প্রীতি অথবা সিনেমা হলে যাওয়ার অভ্যাস।

কিন্তু সিনেমা নিয়ে আমার আগের প্রজন্মের সাথে কথা বলে বেশ অবাক হয়েছি। মা সিনেমা হলে গেছেন বেশ কয়েকবার। বাবাও গেছেন দাদীর সাথে। ওদিকে নানা-নানীও নাকি এক সাথে সিনেমা হলে যেতেন। তাহলে সময়টা তো খুব বেশি দিনের পুরোনো নয়!  ষাটের দশক থেকে নব্বাই পরবর্তী সময়ের মধ্যেই তারা সিনেমা হলে যেতেন। পরিবারের সাথেই যেতেন। সেই রঙিন দিনগুলো হারালো কেন এ প্রশ্নের উত্তর হিসেব ঘুরে ফিরে কিছু কথা আসে।  এই যেমন সিনেমা পাইরেসির কথা প্রায়ই শুনি।  মানুষ কম দামে দ্রুত সময়ে সিনেমা তার ফোনে, ল্যাপটপে পেয়ে যাচ্ছে তাই সে আর সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখছে না।  যে কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন হল মালিকরা।  আর মানুষ সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু সিনেমাপ্রেমী যে তার কি পাইরেসি করা সিনেমা দেখে তৃপ্তি আসে?

আমরা কেন সিনেমা হলে টানতে পারছি না? শুধু পাইরেসির দোষ দিয়ে এগোনো যাবে না। আয়নাবাজি সিনেমার ক্ষেত্রে কতজন মানুষ সিনেমা হলে যাওয়ার চেয়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে পরা ঝাপসা ভিডিওটি দেখতে আগ্রহী হয়েছে? মানে পাইরেসির যত গল্পই বলি সিনেমা হলে মানুষ যেতে চায়।  চাই ভাল গল্প। ভাল সিনেমা।

তারপর যেটি আসে অশ্লীলতার কারণে মানুষ পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়।  অশ্লীল সিনেমার যুগ এখন আর নেই বললে চলে।  কিন্তু অশ্লীলতার যে সংজ্ঞায় আমরা দেখি সেভাবে আমাদের আগের প্রজন্ম দেখে না।  যখনি কোন সিনেমা দেখি এখন সেটি যে কোন ভাষারই হোক মা বলেন, এখনেরগুলো সিনেমা না।  আগেরগুলো সামাজিক সিনেমা ছিল। পরিবার নিয়ে দেখা যায় না।  ঠিক আছে অশ্লীলতার যুগ নেই।  কিন্তু অশ্লীলতার যুগ পরবর্তী আইটেম গানগুলো কি মেনে নিতে প্রস্তুত সমাজ? আমার মায়ের কথা বাদ দিই।  আমার কোন বান্ধবীর সাথে দেখতেও স্বাচ্ছনন্দ বোধ করব না।  তাহলে এটাও অন্যতম কারণ এখনো সিনেমা দেখতে না যাওয়ার। বিংশ শতাব্দীর আগের সিনেমা যে কয়টা দেখার সুযোগ হয়েছে তাতে মনে হলো এরকম কিঞ্চিৎ আপত্তিকর কোন দৃশ্য সে সময় প্রচারিত হতো না। হলেও সেগুলো সাধারণের নাগালে আসেনি।  তাই তারা সিনেমা দেখাকে একটা সুস্থ সংস্কৃতির ব্যাপার মনে করতে পারতেন।  সে সুযোগ এখন আর নেই।

তবে এসবের মধ্যেও সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখার একটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে।  তবে সেটা বিশেষ শ্রেণীর মধ্যেই আবদ্ধা। সিনেমার যে সর্বশ্রেণীর দর্শক তারা সেখানে অনুপস্থিত।  ঠিক এই জায়টিতেই এগিয়েছে পশ্চিম বাংলার দূরবর্তী জেলাগুলোও।  সেখানে পুরোনো সিনেমা হলের পাশাপাশি সিনেপ্লেক্স গড়ে উঠছে। সর্ব শ্রেণীর মানুষ হাজির হচ্ছে সিনেমা দেখতে। কেন তারা সিনেমা দেখতে যায়? প্রশ্নটা করেছিলাম কলকাতা ও নদীয়ার কয়েকজনকে।

ওদের কাছে সিনেমাটা হলো জীবনের একটি অংশ। সিনেমাকে এড়িয়ে যাবার উপায় কই? সিনেমা ওদের কোথায় নেই? সিনেমার বাজার এতটাই ব্যপক একটা সিনেমা তৈরি হওয়ার বছর খানেক আগে থেকেই সেটা নিয়ে পত্রিকায় প্রচারণা শুরু হয়। তারপর অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এ শহর থেকে ও শহরে যায়।  এরপর অনলাইনে সিনেমার ট্রেলারের মাধ্যমে পুরো দেশে পৌঁছে যায় সিনেমাটি।  আমাদের দেশ খুব বেশি বড় নয়। কিন্তু আমরা বিভাগীয় শহরের বাইরে কি নিয়ে যেতে পারছি সিনেমাকে? তার কোনো চেষ্টা কি আমাদের আছে? ফেসবুকের মাধ্যমে একটা চেষ্টা করা হয়।  কিন্তু মনে রাখতে হবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এখনো ফেসবুকের বাইরে। তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা জরুরি।

সিনেমার গল্প নিয়ে সমস্যা অনেক। কিন্তু সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক যে সমস্যা সেটি আমরা এড়িয়ে যাই।  সমাজে আমরা যা দেখি তার চিত্রায়ন হচ্ছে তো সিনেমায়? বাংলাদেশ কেমন এক কথায় যদি বলতে দেয়া হয় আপনি কি বলবেন? অবশ্যই বেশ ভাল কথা বলবেন না। আপনার অনেক বিষয়ে অস্বস্তি।  এই সমাজ, এই রাষ্ট্র যেমন হওয়ার কথা ভাবেন আপনি তা তেমন নেই।  কিন্তু এই হাহাকারের কোনটিই সিনেমার পর্দায় আসছে না।  যা হচ্ছে তা ঘুরেফিরে একি জায়গায় এসে থামছে।  কিন্তু যদি আমরা বাইরের সিনেমাগুলো দেখি তখন জীবনঘনিষ্ঠ গল্প কেন টানে মানুষকে বোঝা যায়।  সেই জায়গাতে আমরা পিছিয়ে থাকাতে মানুষ কাল্পনিক গল্প বা যা সে দেখতে চায় তা যখন দেখানো হয় না তখন সিনেমা হয়ে উঠে বিশেষ শ্রেণীর জন্যে সংরক্ষিত। ক্রিকেট যেমন আমাদের সবার সিনেমা তেমন সবার হয়ে উঠে না আর।  অথচ সে দিনটা আমাদের ছিল।

পত্রিকা ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে ১৯৯০ সালে চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম শহরতলীতে ৫০টি সিনেমা হল ছিল। সেই সংখ্যাটা ছোট হতে হতে আজ চার এ এসে দাঁড়িয়েছে। আলমাস, দিনার, সিনেমা প্যালেস ও পূরবী সিনেমা হল টিকে আছে চট্টগ্রামে।

বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল গুলোর জায়গাতে শপিং মল, বহুতল বিপণী বিতান, হোটেল, গোডাউন, গার্মেন্টস গড়ে তোলা  হয়েছে। এতগুলো সিনেমা হল চট্টগ্রাম থেকে হারিয়ে গেল তার বিপরীতে সংস্কৃতিকর্মী কিংবা নগরের অভিবাবকের কী অবস্থান ছিল? দেশের এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরে এখনো একটি  সিনেপ্লেক্স গড়ে তোলা গেল না! ফলে ঢাকায় যে  বিশেষ শ্রেণীর দর্শকের কথা বলি তারাও নেই চট্টগ্রামে।  কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায় যেখানে নতুন কোন শপিং মল করা হয়েছে সেখানে সিনেপ্লেক্স ও  করা  হয়েছে।  ভারত বহু ভাষা-ভাষী মানুষের দেশ। ভাল কাজ করেই  প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হয় সেখানে।  মানুষ তার নিজের পছন্দের ছবি দেখতে পাচ্ছে সব সময়। সিনেপ্লেক্সের একদিকে হিন্দি সিনেমা দেখলে অপর অংশে বাংলা সিনেমা।  এ যুগে এসে মানুষ পছন্দ করার সুযোগ খুঁজে।  সে  বাছাই করতে ভালবাসে।  তারা সে সুযোগ দেয়াতে মানুষ দেখতে আসছে।  সিনেমা হল কমার বদলে নতুন সিনেমা হল তো হচ্ছেই সেই সাথে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন সিনেপ্লেক্স গড়ে উঠছে।

সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পর মানুষ আগ্রহী হয়েছে। যে কোন ছুটিতে সিনেমা দেখা হবেই। আর নতুন ছবি মিস করতেও রাজি নয় বেশিরভাগ।  ফলে সিনেমা হল ফাঁকা থাকার চিত্র ওদিকে খুব একটা পরিচিত নয়।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার  একটি শহর বারাসাত।  যেটি কলকাতার  থেকে অনেকটা দূরে।  মাল্টিপ্লেক্সের যুগেও সেই বারাসাতে সিঙ্গেল স্ক্রিন হলগুলো এখনো ভাল চলছে। কারণ ওদের সাউন্ড সিস্টেম সেউ পুরোনো আমলে আটকে রাখেনি।  Dolby Digital নয়, DTS আছে।  বারাসাতে যে দুটি মাল্টিপ্লেক্স আছে সেগুলোর ব্যবসাও বাড়ছে দিন দিন।

এই সময়ে এসে মানুষ জীর্ণশীর্ণ সিনেমা হলে যেতে আগ্রহী নয়। সিনেমাপ্রেমী যে গুটিকয়েক আছে তারা সিনেমা হলের বদলে থিয়েটারে সিনেমা দেখছেন।  ভাল পরিবেশ আর এয়ার কন্ডিশন না থাকাতে সিনেমা হল আবেদন হারাচ্ছে।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গত আগস্টে বলেছেন, কমপক্ষে ৫০০ সিনেমা হল আসছে এই বাংলাদেশে, আমি সেই চেষ্টা করছি।  এই কথাটি উনি কেন বলেছেন এখনো ‍বুঝতে পারছি না।  যদি সত্যিই আন্তরিক হোন তিনি তাহলে এটি আমাদের জন্যে বিরাট সুখবর।

সিনেমা নিয়ে পশ্চিমবাংলার একজন স্কুল শিক্ষক দাদার সাথে কথা হলো।  উনি শেষ যে লাইন টা  বলেছেন সেটা বেশ ভাল লেগেছে। বলেছেন,  মোটের উপর এখনো কলকাতা ও শহরতলিতে সিনেমা হলের প্রতি মানুষের টান রয়ে গেছে।  সেই টানটা  ফিরুক আমাদের গভীরে।  তারপর সিনেমা দেখা হয়ে উঠুক জীবনের চর্চিত অভ্যাস।