ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

আমরা গ্রামে ছিলাম। গ্রাম বলতে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে বাড়ি ছিল আমাদের। বাবার ছোটখাটো ব্যবসা ছিল। বাবা মাঝে মধ্যে যেতেন খাগড়াছড়ির কিছু এলাকাতে। বাঁশের গাড়ি আসত। তারপর অর্ডার এলে বেড়া তৈরি করে দেয়া। এভাবেই চলছিল সব। মাঝখানের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় পারিবারিক বিরোধের কারণে নানা ঝামেলায় জড়িয়ে যায় পরিবার। না আমাদের আর গ্রামে থাকা হলো না!

সবাই চলে এলাম শহরে। আমার ছোট বয়সে বাবা ট্যাক্সি চালাতেন। সেগুলোকে তখন বেবি ট্যাক্সিই বলতাম। তার অনেক পরে এলো সিএনজি। পরে এক্সিডেন্ট করে বাবা গাড়ি না চালিয়ে গ্রামে চলে যান। এবার অনেক বছর পর শহরে এসে বাব আগের পেশাতেই ফিরলেন। বাবার শরীরের অবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। ওদিকে নেই লাইসেন্স। প্রতিদিন রাতে বের হন ফিরেন সকালে। কিন্তু দেখা যায় বেশিরভাগ সময় মালিকের টাকাও জোগাড় হয়নি। কখনো ভাঙ্গা রাস্তার গর্তে পরে গাড়ি আটকে গেলে সেদিন আর গাড়িই চালানো হলো না। সেটা গ্যারেজে নিতেই দিন শেষ। এই যে সিএনজি অটোরিকশা চালকদের ধর্মঘটের ঘোষণার পর ফেসবুকে সহ বিভিন্ন মাধ্যমে অনেক মন্তব্য দেখছি। এই যেমন এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন,

‘আমেরিকায় যেখানে উবারের এয়ার সার্ভিস চালু হতে যাচ্ছে সেখানে আমাদের বাংলাদেশের নবাব সিএনজি ড্রাইভাররা উবার বন্ধ করার জন্য আন্দোলনের ডাক দেয়!  উন্নত দেশগুলোর সাথে উন্নয়নশীল দেশের এটাই পার্থক্য’।

dhaka-autorikshaw

আমার বাবাও একজন নবাব। কিন্তু মাস শেষে দেখা যাচ্ছে ্ঘর ভাড়া দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু পত্রিকায় আসা মন্তব্যে সাধারণ মানুষ কী বলছেন?  তাদের অভিযোগ সিএনজি, অটোরিকশাচালকেরা সাধারণ  মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন। তারা মিটারে না গেলেও ‍পুলিশে ধরলে বলতে বলেন মিটারে যাচ্ছি। এছাড়াও বাড়তি ভাড়া আদায়সহ যেতে না চাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। তবে মূল অভিযোগ একটাই বেশি ভাড়া আদায় করার। এ অভিযোগগুলো তাদের জায়গা থেকে একদম ন্যায্য।

আসুন, আমার বাবা নবাবের ব্যাপারটা দেখি। উনি মাঝরাতে গাড়ি পেলেও মালিককে বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে ৪০০ টাকা। তারপর বাকীটা আমাদের জন্যে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সকাল পর্যন্ত চালিয়ে মালিককে ওই টাকা বুঝিয়ে দিয়ে ভাড়তি টাকা পেতে চান তাহলে তিনি কোনভাবেই মিটার ব্যবহার করতে পারবে না।  মোদ্দাকথা মালিকের ধার্য করা টাকা আদায়ের তাড়নায় বাড়তি ভাড়া নিতেই হবে। তাহলে দিনের বেলাতে যারা চালাচ্ছেন তাদের মালিককে আরো বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সিএনজি চালকেরা বেশি টাকা ভাড়া নিয়ে যদি অন্যায় করেন তাহলে এই ছোট বাহনের জন্যে দিনে এক হাজার টাকা মালিকের নেয়া কি যৌক্তিক? মালিক যদি এক হাজার টাকা ভাড়া ছাড়া সিএনজি দিতে রাজি না হয় তাহরে চালক কী করবে? সিএনজি মিটারে চালিয়ে কি কখনো সম্ভব মালিকের ভাড়া দিয়ে নিজের সংসারের জন্যে টাকা আয় করা?

এর উপর এই সিএনজিওয়ালাদের ‍ট্রিপ কমে গেছে অ্যাপনির্ভর পরিবহন সেবা চালুর ফলে। ফলে মালিকের টাকার বাইরে যে টাকা থাকত তা দিন দিন কমে আসছে। যাত্রীদের সমালোচনার পাশাপাশি এই ধর্মঘটের ঘোষণার পর বিডিনিউজকে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান বলেন, ”তারা যদি মিটারে যায়, যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট দূরত্বে যায় তাহলে যাত্রীরা অটোরিকশায় ঠিকই চড়বে। কিন্তু তারা তো গলাকাটা কাজ করে। এত এত জেল জরিমানা করার পরেও তাদের ঠিক করা যায়নি”। [সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম, ২০ নভেম্বর ২০১৭]

এই ঠিক না হওয়ার ব্যাপারটা কি শুধু চালকদের বেশি ভাড়া আদায় করে কোটি টাকা মাসিক আয়ের জন্যে নাকি তারা সেটা করতে বাধ্য? কজন সিএনজি চালকের জীবন সমালাচকরা ভেতরে গিয়ে দেখেছে?

ওই একি নিউজে খিলগাঁও এলাকায় অটোরিকশাচালক শফিকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অই সার্ভিস আওয়ার পরে আমরা তো মনে করেন খ্যাপ পাই না, পয়সাও পাই না। মটরসাইকেলে, প্রাইভেটকারে যায় গা সব প্যাসেঞ্জার। খুব বেশি ঠেহাত পড়ে হেরা আমাগো সিএনজিতে উঠে। এহন জমা তুইলা দুইশ তিনশ টেকা পাই কোনো দিন, কোনো দিন পাই না। মালিকরাও জমা কমায় না।”
আবদুল হালিম হালিম নামে আরো এক চালক বলেন, ‘দেহেন না গাড়ি নিয়া ঘুরতাসি, খ্যাপ পাই না। কুড়িল মোড়ে দাঁড়াইয়া ছিলাম এক ঘণ্টা, এখন আবার এই দিকে ঘুরতাছি। জমাটমা দিয়া সারা দিনে দুই আড়াইশ ট্যাকার বেশি পাই না। ৫ হাজার ট্যাকা রুম ভাড়া দিয়া, বাজার কইরা পোষায় না। এ্যামনে চললে আমি তো বউ-বাচ্চা নিয়া গ্রামের বাড়ি যামুগা।”
এগুলো আসলে আমার নিউজ পড়ে জানতে হয় না। আমি রোজ দেখি। বাবার চোখ। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় দেশের ফেসবুক ব্যবহারকারী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই দুষছেন চালকদের। তাদের এই কাকুতি মিনতি কিংবা অসহায় অবস্থার কথা কেউ ভাবছে না। এদিকে ঢাকা মহানগর অটোরিকশা মালিক সমিতির সভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা আপাতত ভাড়া কমাচ্ছি না। চালকরা যেন ট্রিপ বেশি পায় আমরা সেদিকে যাচ্ছি”।
কী সুন্দর ব্যাপার না? উনি ভাড়া কমাবেন না কিন্তু আন্দোলনে নামাতে চাইছেন চালকদের। ফেসবুকে অনেক পোস্টই দেখছি কদিন ধরে। সবাই খুব সমালোচনা করছেন চালকদের সম্পর্কে। চারু হকের একটি পোস্ট দেখে মনে হলো, না ব্যথা বোঝার মানুষও আছেন দেশে!
চারু হক বলেছেন, অটোরিকশা চালকদের একচেটিয়া দোষারোপ করে তাদেরকে বয়কটের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কেন সর্বসাকুল্যে ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকা মূল্যের একটা সিএনজি অটোরিকশা ৫.৫ থেকে ৬ লাখ টাকায় বিক্রি হবে? কেন এর সমূদয় যন্ত্রাংশ আমদানি এবং বিতরনের দায়িত্ব কেবল একদল দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের হাতে থাকবে? কেন এত ছোট্ট আর অস্বাস্থ্যকর একটা শকটের (গাড়ির) দৈনিক জমার পরিমাণ ১ হাজার টাকা হবে? এই বাস্তবতাগুলো যদি আমাদের মাথায় থাকে তাহলে এটা বুঝে নেয়া সহজ হবে যে, কেন একজন সিএনজি চালক মিটারে চলতে নিমরাজি থাকে, মিটারে গেলেও প্রদর্শিত বিলের চাইতে বেশি নিতে সচেষ্ট থাকে। কেন যাত্রীদের সঙ্গে তাদের ব্যবহার অনেক সময় অপ্রত্যাশিত থাকে;  এসবের সঙ্গে ঢাকার রাস্তায় গাড়ির গড় গতিবেগটাও মাথায় রাখতে হবে। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে কেবল ৭ কিমি চলে এরকম আরেকটি রাজধানি শহর খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর হবে। আর এমত বাস্তবতা মেনে একজন সিএনজি চালককে তার অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমে ১ হাজার টাকা জমা এবং ফুয়েল খরচ বাদ দিয়ে লাভের হিসাব কিংবা পেটপরিজন চালানোর চিন্তা করতে হচ্ছে। অথচ আমরা দেখছি,  ‘উবার’ এবং ‘পাঠাও’ বন্ধে চালকদের ৮ দফা দাবির কোথাও তাদের ওপর জুলুম হিসাবে চাপিয়ে দেয়া দৈনিক জমার টাকা কমানোর উল্লেখ নাই। তারা আজ যাত্রীদের সুবিধার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে- কিন্তু নিজেদের সুবিধা হবে জেনেও অবিবেচক মালিকদের ব্যাপারে তাদের কোনো প্রশ্ন নেই!