ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

গত বছরের অক্টোবর। পূজার ছুটির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। এবার উদ্দেশ্যহীনভাবে ঢাকা ঘুরবো এই ভেবে উঠলাম ঢাকার বাসে। এরও কয়েক মাস আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সাড়ে চার ঘণ্টায় আসা-যাওয়া করে সরকারকে মন থেকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। সেই একই মহাসড়ক বেশ কিছুদিন ধরে জ্যামের কারণে এতই নাজুক হয়ে উঠেছে যে এখন ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টাও লাগছে যেতে। তাই বাস যাত্রা আমার কাছে সব সময় আনন্দের হলেও সেবার ছিল তা আতঙ্কের।

ঘুম থেকে ওঠার পর দেখি সায়েদাবাদে বাস দাঁড়িয়েছে। না, যতটা ভেবেছিলাম ততটা সময় লাগেনি। প্রায় আট ঘণ্টাতেই ঢাকা।

বন্ধু রাজুর ভাগ্নি তেজগাঁওয়ে জাতীয় নাক-কান-গলা (ইএনটি) ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন। বাসে উঠে তেজগাঁও সাত রাস্তার মোড় নামার পর রিকশা খুঁজছি। সমকাল অফিস কেউই পঞ্চাশ টাকার নিচে যাবে না। আমিও আগে ওদিকে যাইনি। চল্লিশ টাকাতে রাজি হল। অল্প যেতেই সমকাল অফিস, তার বিপরীতেই হাসপাতাল। বন্ধু জানালো বিশ টাকায় আসা-যাওয়া হয়। আমি বুঝলাম, ঢাকায় দিন শুরু হলো।

হাসপাতাল দেখে মন বেশ ভাল হয়ে গেল। সব সময় এটা মনে হয় আমাদের জাতীয়ভাবে বলার মত জিনিস খুব কমই আছে। ক্রিকেটে আমরা এক। এর বাইরে সবাই মিলে যে অর্জনের কথা বলব সেটা কোনটা বুঝতে পারি না। হাসপাতালে এসে জানা গেল এখানে নামমাত্র খরচে চিকিৎসা করা হয়। দশ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে নাক, কান অথবা গলার যে কোন রোগের ডাক্তার দেখানো যায়। আর হাসপাতালের পরিবেশও দারুণ। কেবিনগুলোও বেশ বড়। বারান্দা থেকে ঢাকা শহর দেখা যায়। পূর্ব দিকে কেবিন হলে দেখা যাবে হাতিরঝিল।

না ঘুমিয়ে সকালে হাঁটতে গেলাম হাতিরঝিল। এই এলাকাগুলোতে এক সময় হাতির চলাচল ছিল। ভাওয়ালের রাজাদের পোষা হাতিগুলো পিলখানা থেকে এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল হয়ে গোসল করানোর জন্যে এই ঝিলে আনা হতো। তাই এ ঝিলের নাম হয়ে গেল হাতিরঝিল।

ঢাকায় রমনা পার্কের ঐ দিকে দারুণ সবুজের স্বাদ পাওয়া যায়।  তারপরই এই হাতিরঝিল নগরবাসীর জন্যে এক টুকরো প্রশান্তির অপর নাম। সবুজের সাথে মাঝখানে ঝিল। ঝিলের এমাথা থেকে ওমাথা দিনরাত চলছে ওয়াটার বাস। পানিপথে যানজটের কোনও সুযোগ নেই তাই মানুষ যাতায়াতের জন্যেও এই ওয়াটারবোট বেছে নিল। গুলশান কারওয়ান বাজার হয়ে গেল সহজ একটি পথ।

মুঘল আমলে ইংরেজ ও পর্তুগিজ বণিকদের কুঠিবাড়ি স্থাপিত হয়েছিলো তেজগাঁওয়ে। এখন তেজগাঁও পুরোপুরি শিল্পাঞ্চল। বেশ কয়েকটি মিডিয়ার অফিসও আছে এখানে। ঢাকার অন্য অংশের চেয়ে অনেকটা শান্ত এ এলাকা। শিল্প এলাকা হওয়ার কারণেই জনবসতি তেমন নেই। তাই জ্যামের চাপও নেই।

চারপাশটা হাঁটার পর আবার ফিরলাম হাসপাতাল। সেখান থেকে মিরপুর দশে। হাঁটার সুযোগ খুব একটা হয় না বলে আগারগাঁও অবধি হেঁটে গেলাম। তারপর বাসে। মিরপুরে হলো আপুর বাসা। খাওয়া-দাওয়া করে আবার বাসে কালের কণ্ঠ অফিসে। রাজুকে বিদায় দিয়ে বাসে সায়েদাবাদ এসে ওয়ারীতে ভাইয়ার বাসায়।

পরদিন ঠিক করা ছিল বাড্ডা যাব জাগো নিউজের অফিসে। তার আগেই কল এলো বন্ধুর। স্কুলের তিন বন্ধু পুরান ঢাকাতেই আসছে। আরমানিটোলায় তারা মসজিদের সামনে দেখা হলো। পুরান ঢাকার বিরিয়ানি খাওয়া হলো। তারপর গেলাম বুড়িগঙ্গায়। নৌকায় নদী পার করে আবার ফেরা। সেদিনের মত বেড়ানো শেষ।

পরদিন দুপুরেই বের হলাম বাড্ডা যাওয়ার জন্যে। বাড্ডা থেকে ফেরার পথে দেখলাম টাঙ্গাইলের বাস ঐদিক থেকেই যায়। ফোন দিলাম টাঙ্গাইলের সোহেল ভাইয়া ও রাজু ভাইয়াকে। উনারাও ফ্রি। পরদিন টাঙ্গাইল যাব ঠিক হলো। সেদিনও হাতিরঝিল হয়ে ফিরলাম।

রাতের হাতিরঝিল অন্য রূপে ধরা দেয়। রঙ-বেরঙের আলোর সাথে ফোয়ারা মাতিয়ে রাখছে সবাইকে। কারওয়ান বাজার আসার পর ভাবলাম সিনেমা দেখা যাক। ফার্মগেটেই সিনেমা হল। ওখানে মহিউদ্দীন রাজু ভাইয়ার বাসা। ফেইসবুকে পরিচিত। ভাইয়া এলেন গল্প করলেন। তারপর সিনেমা হলে গেলাম বন্ধু রাজুর সাথে।

ঢাকা অ্যাটাক সেদিনই মুক্তি পেয়েছে। আনন্দ সিনেমা হলে ঢোকার পর মনে হল হারিয়ে গেছি কোথায়। তটস্থ হতে সময় লাগল। মোবাইলের আলোয় সিট খুঁজে নিলাম। সিটগুলো যেন মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি। বসতেই সিট পড়ে যাচ্ছে। আবার তুলে বসতে হলো। পাশের সিটে আবার বসার স্থানটিই নেই, শুধু লোহার পাত দুটো দেখা যাচ্ছে। নিচে ফেলে যাওয়া চিপস, সিগারেটের প্যাকেট। অনেক উঁচুতে অল্প কয়টা ফ্যান ঘুরছে। গায়ে বাতাস লাগছে না। চারপাশটা তাকালাম কেমন ভীতিকর পরিস্থিতি। সব মিলে একটা দমবন্ধ অবস্থা। সিনেমার নামই ঢাকা অ্যাটাক, তাই সিনেমা শুরুর আগেই হলের পরিবেশ দেখে  আতঙ্ক পেয়ে বসল। তবে শেষ অবধি একটা অসাধারণ সিনেমা দেখে বের হলাম রাত ১২টায়।

বন্ধু ইলিয়াছ থাকে মিরপুর দশে। ওর কাছে গেলাম। পরদিন উঠেই বিমানবন্দর রেলস্টেশন। যাব বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পাড়। লোকাল ট্রেনের খোঁজ করে পেলাম না। যা আছে আন্তঃনগর ট্রেন। এটুকু পথ যেতে লাগবে দুই ঘণ্টার মত আর টিকেট মূল্য ১৩৫ টাকা।

এই একটা জায়গাতে খারাপ লাগে আমার। আমাদের ট্রেন নেটওয়ার্ক আছে সারা দেশেই, কিন্তু সেটার সঠিক ব্যবহার কোথায়? ঠিক একই দূরত্ব আমি পশ্চিমবঙ্গে ২৫ টাকাতে গিয়েছি। ওদের সড়কের ওপর চাপ নেই। প্রতি বছর খানাখন্দকে কষ্টও করতে হয় না, আর সড়ক উন্নয়নের নামে অর্থ লোপাটের সুযোগও হয় না।

ট্রেন ছিল আটটার। আসতেই নয়টা হয়ে গেল। পঞ্চগড়গামী ট্রেন, জানালার পাশেই সিট পেয়ে গেলাম। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ আমার কাছে সবটা একই মনে হয়। সবুজ মানেই আমার দেশ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কোনও বাড়ির উঠোন দেখি। দেখি ঐ বাড়িতে যাওয়ার মেঠোপথ। আমার গ্রামটাও এমনি। বাংলার প্রতিটা গ্রামই যেন এরকম।

ট্রেন গাজীপুর পাড় হওয়ার আগেই ঘুম এসে গেল। টাঙ্গাইলের কাছাকাছি ঘুম ভেঙেছে। পথ আরো অনেকটা বাকি। এদিকের এলাকাগুলো নিচু। এ সময়ে পানি উঠে বাড়ির চারদিকে। নৌকা একমাত্র বাহন। সেই নৌকাতে বসে অনেকে মাছ ধরছে। ধর্মজাল বসিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা হচ্ছে যেন। যাদের বাড়ি রাস্তার কাছে তারা নৌকার বদলে দুটো বাঁশ দিয়ে সাঁকো তৈরি করে নিয়েছে।

দেখতে দেখতে চলে এলাম বঙ্গবন্ধু সেতুর এ পাড়ের স্টেশনে। খুব ছোটখাট একটা স্টেশন। তেমন ভিড় নেই। স্টেশনের বাইরেই সিএনজি দাঁড়িয়ে।

যাব ভূঁইয়াপুর। টাঙ্গাইলে কী কী দেখার আছে ড্রাইভার জানালো। উনি নিজের এলাকা সম্পর্কে বলে খুবই খুশি। নিজের মাটির চেয়ে পৃথিবীতে আনন্দ নিয়ে বলার দ্বিতীয়টি কী থাকতে পারে?

উত্তরবঙ্গে যেতে শুরুতেই  টাঙ্গাইল জেলা। এটি আয়তনের ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগের সর্ববৃহৎ এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ জেলা। টাঙ্গাইলের পূর্ব দিকে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর আর যমুনার ঐ পাড়ে মানে পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ জেলা, আর উত্তরে জামালপুর এবং দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ জেলা।

টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক গুণীজন। তার মধ্যে আছেন মৌলবী নঈমউদ্দীন, ধনবাড়ির বিখ্যাত জমিদার নওয়াব আলী চৌধুরী, প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্না, করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, পূর্ব পাকিস্তানের আইন পরিষদের স্পিকার প্রতুল চন্দ্র সরকার বা পিসি সরকার, নিখিল বঙ্গের প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট বেগম ফজিলাতুন্নেসা, নাট্যকার মামুনুর রশীদ, আওয়ামী লীগের পূর্বসূরী আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক সহ আরো অনেকে।

সিএনজি থেকে নামলাম ভুয়াপুরে, ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজ গেটের সামনে। সোহেল ভাইয়াকে ফোন করলাম। ভাইয়ার সাথে পরিচয় ফেইসবুকে। এখন ডিবিসিতে কাজ করেন। বাইকে এলেন। গল্প হলো অনেক। টাঙ্গাইলের ইতিহাস ঐতিহ্যের গল্প। তারপর খাওয়া শেষে ভাইয়ার ছোট ভাই কামালের সাথে গেলাম যমুনা সেতু দেখতে। যখন সেতুর উপরে উঠলাম ওপাশ থেকে ট্রেন আসছে।

সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৪.৮ কিলোমিটার। এটি বাংলাদেশে ও দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম সেতু, আর বিশ্বে ১১তম। এটি পূর্বদিকে যুক্ত করেছে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর (ভুয়াপুর) এবং পশ্চিম সিরাজগঞ্জকে। ১৯৪৯ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রথম এই সেতু তৈরির উদ্যেগ নেন। দীর্ঘ  সময় পাড়ি দিয়ে সেটি বাস্তবায়িত হয়ে কাজ শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। আর যান চলাচল শুরু হয় ১৯৯৮ সালে।

যমুনা নদীর বুকে অনেক জায়গাতে ছোট ছোট চর জন্মেছে। আর তীরের কাছে থাকে কাশফুলের বাগান। সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পরেছে। শেষ আলোয় যমুনা ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হতে শুরু করেছে। দুদিকে পানির স্রোত চলে গেছে চোখের সীমানার বাইরে। সেতু পাড় হলেই তাঁতশিল্পের জন্যে বিখ্যাত সিরাজগঞ্জ।

উপমহাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন, বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী মুসা ইব্রাহিমের দেশ সিরাজগঞ্জ। যমুনার উভয় পাড়ের মানুষ নিজেদের নিয়ে গেছে এক অন্য উচ্চতায়। ক্ষণিকের জন্যে মনে হল, যমুনার ছোঁয়াই কি দুটো জেলাকে এতটা সমৃদ্ধ করেছে?

এ পাড়ে এসে রেল স্টেশন সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠলাম। যাব হাট বাইপাস, করটিয়া। এদিকে রাস্তার বেহাল দশা। পুরো দেশের কোথাও কি আসলে মহাসড়কের সুস্থ্ অবস্থা আছে? ধীর গতিতে গাড়ি চলছে তো আবার জ্যামে আটকে থাকছে। হাট বাইপাস আসতে রাত হয়ে গেল।

রাজু ভাইয়া বাইক নিয়ে আসল। আবার মেঠোপথ ধরে হাঁটা। গ্রামের নাম আলসা। পানি জমে আছে নিচু এলাকাগুলোতে। জঙ্গল বাড়ির মত অনেকটা। চারপাশে গাছে ঘেরা। যেমনটা ছিল আমার গ্রামেও। রাতে খেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।

পরদিন ঘুম ভেঙ্গেছে দেরিতে। মোরগ তখনো ডেকে চলছে। সূর্য অল্প একটু মাথা তুলেছে। ছোট ছোট গাছের পাতার ফাঁঁক গলে রোদ মাটিতে এসে পরছে। সেই মাটিতে পা রেখেছি। কেমন একটা ভাল লাগা কাজ করে। এরকম একটি জঙ্গল ঘেরা বাড়িতেই ছিলাম ছোট বেলায়। সেই ভাল লাগা কতদিন পর খুঁজে পেলাম। শাপলার সবজি দিয়ে ভাত খেয়ে বের হলাম ভাইয়ার সাথে।


রাজু ভাইয়ার বাইকে ঘোরা শুরু


পানিতে ডুবে থাকা জমিগুলোকে প্রকৃতি নিজের খেয়ালমত সাজিয়ে রেখেছে শাপলা ফুলসহ নানা কিছুতে। সাদা শাপলা, লাল শাপলার বাগান যেন।

দেলদুয়ার থানায় এসে পেলাম আতিয়া মসজিদ। মসজিদের কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের উপর স্থাপিত শিলালিপিতে এর নির্মাণকাল লেখা ১০১৮ হিজরি (১৬০৮-৯ খ্রি.)। দশ টাকার নোটে লাল ইটে তৈরি ছোট যে মসজিদের ছবি দেখি সেটি এটিই। মসজিদের নির্মাণ শৈলীর কারণে এটি নজর কাড়তে বাধ্য।

তারপর গেলাম কাগমারী। এই মাটিতে শুয়ে আছেন গণমানুষের নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ‍যিনি আজ আমাদের আলোচনায় নেই। আড়াল করে রাখা হয়েছে এই মহান মানুষটিকে। কাগমারিতে তিনি কলেজ স্থাপন করেছেন। সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছেন।

১৯৫৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি অবধি কাগমারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আজন্ম সংগ্রামী এ নেতা তখন বলেছিলেন, পূর্ববাংলা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকদের দ্বারা শোষিত হতে থাকলে পূর্ববঙ্গবাসী তাদের সালামু ওআলায়কুম জানাতে বাধ্য হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে স্বপ্ন তখন লালিত হয়েছিল উনার বুকেই।

তারপর আবার হাট বাইপাস হয়ে সরু অপ্রশস্ত একটি রাস্তা ধরে গে আতিয়ারচাঁদ খ্যাত জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর জমিদার বাড়ি। লোহার ঘর, রোকেয়া মহল, রাণীর পুকুরঘাট, ছোট তরফ দাউদ মহল এবং বাড়িসংলগ্ন মোগল স্থাপত্যের আদলে গড়া মসজিদ। কোন এক অদৃশ্য কারণে পুরোটা ঘুরে দেখার সুযোগ দিল না নিরাপত্তারক্ষীরা। জমিদার বাড়ির পেছনেে আছে রোকেয়া মহল। স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য রুপ এ মহল। কিন্তু এটি সংরক্ষণের বদলে মহল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তারপর গেলাম করটিয়া সা’দত কলেজ। এই কলেজ অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম কলেজ। ১৯২৬ সালে আটিয়ার চাঁদ ওয়াজেদ আলী খান পন্নী তার পিতামহ সাদাত আলী খান পন্নীর নামে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে কবি নজরুল এসেছেন। তার সম্মানে কলেজের মূল ফটকের সামনেই করা হয়েছে নজরুল স্মৃতি কুটির।

মহাসড়ক থেকে পূর্ব দিকে কয়েক কিলোমিটার যেতেই মহেরা পুলিশ একাডেমি। যেটি আগে ছিল পরিত্যক্ত এক জমিদার বাড়ি। জমিদার বাড়ির ছবি মানে আমাদের কাছে পুরোনো জীর্ণশীর্ণ ভবন, ছাদ ভেঙে যাওয়া, স্যাঁতস্যাতে একটি বদ্ধ জায়গা। সেসব ধারণাকে ভুল করে দিয়েছে পুলিশ। এই জমিদার বাড়ি দেখে মনে হবে সেই জমিদাররা এখনো বর্তমান। পুলিশ সেই জমিদার বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্বে।

কারণ ১৮৯০ সালে যে জমিদার বাড়ির পত্তন হলো, এতকাল পরে এসে এত ঝকঝকে জমিদার বাড়ি কল্পনার চেয়ে বেশি কিছু। প্রায় ১১শ’ ৭৪ শতাংশ জমির উপর অবস্থিত মহেড়া জমিদার বাড়ির চার ভাগে রয়েছে চারটি মূল প্রসাদ, যাদের নাম মহারাজা লজ, আনন্দ লজ, চৌধুরী লজ এবং কালীচরন লজ।

এটি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। জমিদারি করতেন বিন্দু সাহা, বুদ্দু সাহা, হরেন্দ্র সাহা ও কালীচরণ সাহা নামের চার ভাই। মহেড়াদের ছিল ডালের ব্যবসা। তারা এখানে আসে অষ্টদশ শতকের শেষে। স্থানীয় গ্রামবাসীদের মধ্যে দাদন খাটিয়ে টাকা-পয়সা উপার্জন করে।

এর পর ব্রিটিশ সরকার ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করলে করটিয়ার ২৪ পরগনার জমিদারদের কাছ থেকে জমিদারির একটি অংশ কিনে নেন। উনবিংশ শতকের চল্লিশের দশকে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি হয় এরপর দেশভাগ হলে জমিদার বংশের বেশিরভাগই চলে যান কলকাতায়।

তারপরও যে কজন ছিলেন জমিদার বাড়িতে তারা পাকিস্তানী বাহিনীর নির্মমতার মুখে পালাতে বাধ্য হন ভারতে। ১৯৭১ সালের ১৪ মে পাকিস্তানি বাহিনী জমিদার বাড়িতে আক্রমণ করে। চৌধুরী লজেরসামনের লনে দাঁড় করিয়ে জমিদার বাড়ির কুলবধু যোগমায়া চৌধুরানীসহ আরও পাঁচ জনকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদারেরা।

তারপর ১৯৭২ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মান্নানের হাত ধরে এই পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার স্কুল স্থাপন করা হয়।

জমিদার বাড়ির সামনেই বিশাখা সাগর নামে একটি বিশাল পুকুর। পুকুরের পূর্ব পাড়েই কিছু পুলিশ দাঁড়িয়ে। জানালো টিকেট নিতে হবে। টিকেট কেটে প্রাসাদে প্রবেশ করার দুটো সিংহ দরজা আছে। চৌধুরী লজের সিংহ দরজার সমানে বিশাখা সাগরের পারে যে দরজা আছে সেটি হয়ে ঢুকে পড়লাম। গেটের পরের জায়গাটা পার্কের মত করে করা হয়েছে।

প্রথমে ঢুকতেই পরে কালীচরণ ভবন, তার পাশে চৌধুরী লজ, আনন্দ লজ এবং মহারাজা লজ। প্রাসাদগুলোর কারুকাজ নতুন কি না বুঝতে পারছি না। কিন্তু সেটি তাকিয়ে দেখার মতোনই।

কালীচররণ ভবনটি মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে আছে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা কিছু দুর্লভ অস্ত্র, মোঘল আমল থেকে পুলিশের পোশাক বিবর্তন, মহেড়া জমিদার বাড়ির ইতিহাস এবং জমিদারদের ব্যবহার করা তৈজস পত্র।

মহারাজা লজের পরের প্রবেশের যে ফটক আছে সেখানে বাঘ, হরিণ, সারস, ঘোড়া, দোয়েল ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হয়েছে। সেখান থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে কালীচরণ ভবনের দিকে।

তারপর পেছনের দিকে হেঁটে গেলে আছে রানী মহল, যেটির এখন সংস্কার কাজ চলছে। তার পেছনে আছে একটি পুকুর। পুকুরের পাশেই অস্ত্রাগার। অস্ত্রাগারের পেছনে আরো একটি পার্কের মত জায়গা। পুকুরের মাঝখানে ছাউনি দিয়ে বসার জায়গা করা হয়েছে। এখানেও টিকেট কেটে যেতে হয়। বাকি অংশে কর্মচারীদের থাকার জন্য বেশ কয়েকটি ভবন আছে।

ঘোরা শেষে রাজু ভাইয়ার বাড়ি হয়ে আবার ঢাকার বাসে।  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা থাকার কারণে দুই ঘণ্টা  দেরিতে পৌঁছালাম মিরপুর। তারপর বাসে আরো চার ঘণ্টা দেরি করে অবশেষে ফিরে এলাম চট্টগ্রাম।