ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

গেল রোজার শুরুর দিকের কথা। সেদিন রাতে হলে সেহরির পর সিনেমা দেখে ঘুমাতে যেতেই ভোর হয়ে গেল। আধঘন্টা কাকঘুমের পর সবাই হাজির জিরো পয়েন্টে। ওখান থেকে বড়দীঘিপার হয়ে ভাটিয়ারী। তারপর পিকআপ ধরে সীতাকুণ্ড সদরে।

সীতাকুণ্ড সদর আসতে আসতে লোকজনের অদ্ভূত তাকানোতে অস্বস্তি হচ্ছিল। স্পষ্ট পড়ে নেওয়া যাচ্ছিল ওদের ভাবনা – এই সকাল সকাল এতগুলো ছেলেমেয়ে যাচ্ছে কোথায়?

প্রেমতলা ছাড়িয়ে মন্দির পেরোনের পর হাঁটাপথ ‍শুরু। তখনো খুব বেশি রোদ উঠেনি। হালকা বাতাস চারপাশে। আমরা নিজেদের মত হাঁটছি দুজন দুজন করে।

অল্প যেতেই পার্থদা বলল ছবি তোলার কথা। সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম।

দু’চার জন করে পাহাড় থেকে নেমে আসছে। ভোরেই তারা উঠে গেছে। আমরা ছবি তুলতে তুলতে উপরের দিকে উঠে গেলাম। ইট বিছানো পথ নতুন করে নির্মাণ হবে তাই বাম পাশের পথে সিঁড়িও ছিল না তখন।

পথে পথে দেখা মিলছিল হরেক রকম ফুলের। এর বেশিরভাগেরই নাম জানা নেই।

ঘন সবুজের পাহাড়ের অন্য অংশে রোদ নেমেছে। অল্পস্বল্প রোদ যে পশ্চিম অংশেও ছড়িয়ে পড়ছে না তা নয়।

বিশাল খাড়া খাড়া সব পাহাড় পুরো পথে। দুয়েক জায়গাতে পথ অনেক বেশি খাড়া তাতে অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠছে সবাই। বসে-হেঁটে উপরে উঠতে সময় লাগল বেশ খানিকটা। তারপর পেছনের দিকে তাকাতেই ধরা দিল সমুদ্র। সেই সঙ্গে পুরো সীতাকুণ্ডের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা আর দূরের সন্দ্বীপ।

অল্বস্বল্প বাতাস তখন গায়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ক্লান্তিও তেমন আর নেই। আমরা এসে বসে পড়লাম ছনের ছাউনি দেয়া এক দোকানে।  ওখান থেকে পুরো এলাকা ভাল করে দেখা যাচ্ছিল। পশ্চিমে সমুদ্র আর বাকি চারদিকে পাহাড়ের পর পাহাড়।

মুহূর্ত যেন থমকে যায় এখানে। জগতের সকল ভাবনা হারায় ভেতর থেকে। ওখানেই প্রিয় দিদি গাইল, ‘আমি তোমারি গান গাই’। বাতাসে ভেসে যাচ্ছিল সব শব্দ। ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে পাখির শব্দ।

এমন করেই কাটল অনেক সময়। আবার মন্দিরের পথ ধরে আরো উপরে। ওখানে বাতাস আরো বেশি ঠাণ্ডা। প্রথম মন্দির থেকে দক্ষিণের পথ ধরে এবার চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায়। এই পাহাড়ের চূড়াতেই চন্দ্রনাথ মন্দির।

১১৫২ ফুট উঁচুতে এসে মেঘ ধরতে পারার কথা বলেছিল এক বন্ধু। মেঘ ধরা না গেলেও দূরের পাহাড়েই মেঘের আলোছায়ার খেলা দেখা যাচ্ছিল। সব যেন হাতের কাছেই।

এই পাহাড় চট্টগ্রাম জেলার সর্বোচ্চ পাহাড়। এটি হিমালয় হতে বিচ্ছিন্ন হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ। এই পাহাড়টি হিমালয়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক ঘুরে ভারতের আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্য দিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে মিশেছে। ফেনী নদী থেকেই শুধু এর দৈর্ঘ্য ৮০ কিলোমিটার।

সীতাকুণ্ডের এই সারি সারি পাহাড়ই বিচ্ছিন্ন করেছে বেশ কয়েকটা উপজেলাকে। ওদিকে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি। এদিকে সীতাকুণ্ড, মীরসরাই। দুই পাহাড়ের এপিঠওপিঠ।

ফেনী হয়ে শহর পর্যন্ত এই পর্বতশ্রেণি থেকে উৎপত্তি ঘটেছে অনেক ছড়ার। এগুলো সমতলে নেমে খাল হয়ে পশ্চিমে বঙ্গপোসাগরে গেছে। আর পূর্বে গেছে হালদা নদীতে। এর মধ্যে সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা আর সুপ্তধারা এক সময় জনপ্রিয় ছিল।

মীরসরাই অংশে রয়েছে খৈয়াছড়া, হরিণমারা, হাঁটুভাঙ্গা, নাপিত্তাছড়া, বাঘবিয়ানী, বোয়ালিয়া, অমরমানিক্যসহ আরো অনেক অনেক ঝরনা ও জলপ্রপাত। মহামায়া, মিঠাছড়া এগুলো এই পাহাড় থেকে নেমে গেছে বঙ্গপোসাগরে।

পূর্বদিকে এই পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে কয়েকটি ঝরনা হালদা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। যেমন, গজারিয়া, বারমাসিয়া, ফটিকছড়ি, হারুয়ালছড়ি এবং বোয়ালিয়া ।

মন্দিরে পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেছে তখন। দর্শনার্থীদের বেশিরভাগ এসেছে পূজা দিতে। কেউ কেউ আমাদের মত মন্দির দেখতে।

উইকিপিডিয়া ঘেঁটে জানতে পারলাম, সত্য যুগে দক্ষ যজ্ঞের পর সতী মাতা দেহ ত্যাগ করলে মহাদেব সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করলে বিষ্ণু দেব সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর মৃতদেহ ছেদন করেন।

এতে সতী মাতার দেহখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত হয় এবং এ সকল স্থানসমূহ শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিতি পায়।

চন্দ্রনাথ পাহাড় এলাকায় বসবাসকারী হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর বাংলা ফাল্গুন মাসে (ইংরেজী ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাস) শিবচতুর্দশী মেলার আয়োজন করে।

মেলায় আমার কখনো আসা হয়নি। মেলার ভিড় সামলায় কী করে এই পাহাড়ি পথ তাই ভেবে পাইনা। এত সরু পথ ধরে উঠাও বেশ সহজ না। দুপুর গড়াতেই আমরা নামতে শুরু করি। ফিরতি পথটাও বেশ খাড়া কিন্তু নামার পথ বলেই সহজ হয়ে গেল। খুব দ্রুত নেমে আবার সদরে।

সদর থেকে লেগুনা ধরে এবার বড়দারোগারহাট বাজারে। বাজার পাশের পথ ধরে লোকালয় পেরিয়ে রেললাইনের পর বিলের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া মাটির রাস্তা। তারপর শুরু পাহাড়ের।

দুয়েক মিনিট হাঁটার পর দেখা মিলল ছড়ার। কোনও শক্ত পাথর নেই আর নেই ঘন জঙ্গলের পথ। খুব হেসেখেলে মিনিট বিশেক সামনে হাঁটতেই পেলাম কমলদহ ঝরনা। বর্ষার দিন না হওয়াতে পানি পুরোটা জুড়ে পড়ছে না।

বিশ ফুট মত উঁচু থেকে পানি পড়ছে এক অংশে। তাতে নিচে মোটামুটি আকারের পুকুর হয়ে গেছে। তার দু’পাশে বিশালাকার পাহাড়।

আমরা উপরে উঠে গেলাম। আবারো একটা ঝরনা। ছুটির দিন হওয়াতে লোকজনও নেই। দুটো ঝরনা মাঝমাঝি জায়গাতে অনেকটা জায়গায় পানি জমে গেছে। খাড়া পথ বেয়ে সরু পথ ধরে দ্বিতীয় ঝরনার উপরে গেলেই এবার বিশাল খাল। পুরোটাই পাথুরে পিচ্ছিল পথ। কিছুটা দূর যাওয়ার পর নিরাপত্তাজনিত অস্বস্তি থেকে সামনে এগোইনি আমরা।

তারপর  ওই দ্বিতীয় ঝরনার নিচে নেমে গোসল শেষে হাইওয়েতে। হাইওয়ে থেকেই সিএনজি ধরে চললাম গুলিয়াখালী সৈকতের দিকে।

বেলা পরে এসেছে তখন। ইফতারেরও সময় হয়ে গেছে। কিছু ইফতার নিয়ে আমরা পৌঁছলাম চরের শেষ মাথায়।

কয়েক সেকেন্ড পর পর ভেঙ্গে যাওয়া ঢেউয়ের শব্দ কানে আসছে। মাগরিব শেষে আঁধার নামল খুব দ্রুত। কিন্তু চাঁদের আলোয় তখন বহুদূর অবধি দেখা যাচ্ছে। চন্দ্রনাথের চূড়ায় মন্দিরের যে আলো জ্বলছে সেটা এত দূর থেকেও স্পষ্ট করে দিচ্ছে চন্দ্রনাথ পাহাড়কে।

আমরা সিএনজি পাইনি শুরুতে। ভাড়া বেশি হাঁকাতে হাঁটা ধরি সবাই। চাঁদের আলোতে বিলের মাঝখানে যাওয়া পাকা রাস্তা ধরে হেঁটে চলি আমরা। দু’পাশে বাড়িঘর তেমন নেই। বাতাসের সাথে রাস্তার দু’পাশের গাছের পাতা নড়চড়ার শব্দও বাড়ছে। অনেকটা পথ হাঁটার পর একটা সিএনজি এলো। সেটার আলোয় পরিবেশটাও বদলে গেল; সঙ্গে দিনভর ভ্রমণের আনন্দও মিলিয়ে গেল ফেলে আসা বাতাসে নয়ত চাঁদের আলোয়।