ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বসে আছি ঢাকা শহরের অত্যন্ত প্রভাবশালী হাসপাতালের একটি কেবিনে, আমার হাত ছুঁয়ে আছে ৭২ বৎসরের না্নির হাত। বয়সের কারনে কেমন কুঁচকে আছে চামড়াগুলো, পেথেড্রিনের আসক্তি এখনো সারা শরীরে বয়ে চলেছে। আমাকে দেখে আলতো করে চোখ মেললেন –কিরে তোর নানারে পান দিসশ? আমি প্রথমটা হকচকিয়ে উঠলাম, কারন নানা তো বাসায়। গতরাতে নানির অবস্থা এতোটাই খারাপ হয়ে গেছে, ডাক্তার বলেছে কিডনি দুটো অকেজো, তাই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। নানার বয়স ৮৫, তাকে তো আর টেনে হিঁচড়ে হাসপাতালে আনার দরকার নাই, কিন্তু নানির মস্তিষ্কে এখনো নানার খাওয়া দাওয়া হয়েছে কিনা সেই বিষয়টিই ঘুরে বেরাচ্ছে। 

সামনে বসা মেঝখালা আমাকে ইশারা করে কিছু বলতে মানা করলেন। আমি নানির মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চলে গেলাম আরো ত্রিশ বছর আগে। নানিকে ছোট বেলায় আমি দেখেছি কেবল রান্না ঘরে চুলোর পাশে আর খুব আগ্রহ করে দেখতাম বছর বছর বাচ্চা দিতে। একে একে দেখলাম, আমার পাঁচটা মামা এবং ছয়টা খালা। তার মানে আমার নানা-নানির বারোটা সন্তান। ভাবলেই এমন অবাক লাগে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে আমার নানা মনে হয় গো-মূর্খ ছিলেন, মোটেও তা না। নানা (জনাব কিয়াস উদ্দিন মিয়া) তথ্য মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। নানার বাসায় বসেই আমি প্রথম চিত্রালী পড়া শুরু করি। সাদা কালোতে ববিতা সাবানার ছবি যেমন আমার নজর কেড়ে নিত ,তেমনি বড় বড় মন্ত্রী মিনিস্টারদের বাড়িতে পদচারনা আমাকে মুগ্ধ করতো।নানাই আমাকে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয় বেগম পত্রিকার সাথে,এতো ছোট ছিলাম যে কোন সম্পাদকের নাম এই মূহুর্তে আমার মনে নেই।তবে সবার সাথেই আমাদের ভালো যোগাযোগ ছিল। 

নানি ছিল পুরোটাই অন্ত:পুরবাসিনী। আমরা যখন দল ধরে সিনেমা হলে যেতাম তখন নানি তার জুনিয়রদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। তাদের মধ্যে বড় ধরনের ঝগড়া আমি কমই দেখেছি।নানার রিটায়েরমেন্টের পর তার দুটো কাজ ছিল।একটা বাজার করা আর অন্যটি ঢাকা শহরের সব পেপার পড়া।নানি রান্না ঘরে গেলেই মনে পরতো –কাঁচামরিচ নেই অথবা ভাতের চাল নেই।নানাকে দেখতাম বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন,কিন্তু ঠিকি পাঞ্জাবী গায়ে চেপে বউয়ের কথা মতোন চলে যেতেন বাজারে আর ফিরতেন এক গাদা পত্রিকা হাতে।একবারতো দু’জনের মধ্যে কথা বার্তা প্রায় বন্ধ।নানি টেবিলে চা দিয়ে বার বার ভাব বাচ্যে নানাকে উদ্দেশ্য করে বলছে-ওরে পড়ুনিরে,আইজকাই দেশের সব পেপার পইড়া শেষ করে ফেলবো,চাটা যে ঠাণ্ডা হয়। 

কে শোনে কার কথা,নানার এমন ভাব যেন কিছুই শুনেনি।তারপর পত্রিকা পড়া শেষ করে যখন চা মুখে নিতে গেছে অম্নি নানি কাপটা টান দিয়ে বলে-থাক,এইটা আর গিলতে হবে না,আমি গরম কইরা দিচ্ছি।এইভাবে কেটে গেছে প্রায় ৬৩ বছর।কিন্তু এখনো নানা ,নানিকে ছাড়া নাস্তা করেন না। রাতে নিজের অষুধ খাবার আগে তিন তিন বার জিজ্ঞেস করেন-তোর নানিরে খাইসেতো ?এখানে বলে রাখা ভালো ,নানার মনে রাখার শক্তি এখন কমে গেছে।গতকালকেই উনাকে যখন চেকাপে নেওয়া হলো ডাক্তারের কাছে তখনো বলছিলেন-তাড়াতাড়ি কর,কি জ্যামের মধ্যে বইসা আসিশ। তোর নানি না খেয়ে থাকবে। 

সত্যি তাই ,এই বয়সে কেউ কাউকে না রেখে খান না । এই ব্যাপারটি আমার কাছে চরম একটা ম্যাজিক ছাড়া আর কিছু না।দুটো ভিন্ন চিন্তার ,ভিন্ন রুচির মানুষ কি করে এতগুলো বছর এক ছাদের নীচে ভিন্ন ভিন্ন মতামত নিয়ে একসাথে বাস করে আসছেন তা কি কেবল সংসার টিকিয়ে রাখতে, নাকি কোন ম্যাজিক আছে যার বলেই তা শক্ত কাঠামোতে এখনো টিকে আছে কে বলতে পারে ? 

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে খণ্ড খণ্ড আকারে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। নানা তখন পত্রিকার কাজ নিয়ে ব্যস্ত, কারণ যা কিছুই ঘটুক দেশে; পাকিস্তান আর্মির কড়া নির্দেশ- “দেশের পরিস্থিতি খুবি ভালো” এই বক্তব্য সারা দেশে পৌঁছাতে হবে। এক সময় নানার কাছে পুরো বিষয়টা বিরাট চাপের সৃষ্টি করলো।তিনি পালিয়েও গেলেন, জিঞ্জিরা পাড় হয়ে টাঙ্গাইলের পথে । তখনি পাকহানাদার বাহিনী নানাকে আর তার শালাকে ধরে নিয়ে গেল। লম্বা সারিতে নানাদের দাঁড়া করানো হয়েছে নদীর তীর ঘেঁষে ,একজন একজন করে গুলি করা হচ্ছে। কিছু কথাবার্তাও নাকি চলছিল এর ফাঁকে। অম্নি নানা খেয়াল করলো তার শালা মানে আমার গনি নানা তার লুঙ্গি ধরে টানছেন। ওম্নি দে ঝাঁপ নদীতে, সাঁতরে সোজা ওপাড়ে। 

কিন্তু গ্রামের অবস্থাও তখন ভয়ঙ্কর। আমার মা তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী। নানি আম্মাকে আর অন্য মামা-খালাদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজাকারদের সব চোখ তখন নানার বাড়ির দিকে। একটা ছাউনির মতো ঘর ছিল যেখানে গোবর লেপা হতো, আম্মাকে সেখানে লুকিয়ে রাখতেন নানি। অন্য খালারা অনেক ছোট,কিন্তু মা তখন একদম কিশোরী। আমার অশিক্ষিত নানির মুখে শুনেছি গন্ডগোলের গল্প, কিন্তু ওটাই যে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ সেটা উনি বুঝেছিলেন অনেক পরে। দেশ স্বাধীনের পর নানা সবাইকে নিয়ে ঢাকার বাসায় ফিরে দেখলেন তালা ভাঙ্গা, ভেতরে সব লুটপাট হয়ে গেছে। নানির সমস্ত গহনা আর মূল্যবান জিনিস নাই হয়ে গেছে, দখল হয়ে গেছে বাসাটিও। এতগুলো বাচ্চা নিয়ে নতুন করে আবার সেই দম্পতি নতুন আর এক যুদ্ধে নামলেন। সে সময় মিরপুর এক নম্বরে একটি পরিত্যক্ত বাসাতে সরকার নানাকে থাকতে দেয়, আমরা ওখানেই বড় হয়েছি, সাঁতার শিখেছি নানার হাত ধরে।সে অনেক পরের কথা। 

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আমি যখনি নানার কাছে জানতে চাইতাম স্বাধীনতার ঘোষনা নিয়ে কেন এ্তো দ্বিমত? নানা কেবল উত্তরে বলতেন-যে যার মতোন করে ইতিহাস সাজায় । আমি বই পড়ে, ছবি দেখে ইতিহাস বোঝার চেষ্টা করেছি। কেবল একটি বইয়ের কিছু কথা আমাকে অন্যভাবে ভাবতে সাহায্য করেছে সেটা হলো-বাংলাদেশের ইতিহাস –পর্যালোচনা বইটি। এখানে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের কিছু উক্তি আমি কোট করে দিলাম –“অনেকে বলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন। আমি খোলাখুলি বলছি, আমি কিন্তু ওই ঘোষনা শুনি নাই। তাহলে আমি যুদ্ধে গেলাম কিভাবে? সাত মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণ এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এর একটা প্রভাব হতে পারে। তাছাড়া ২৫ মার্চের যে ঘটনা আমাকে তুমুল আন্দোলিত করেছিল। তার ফলে আমি বুঝলাম যুদ্ধ অনিবার্য এবং যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হবে। তিন নম্বর যেটা সেটা হলো ,আমার পক্ষে তখন বাংলাদেশে থাকা সম্ভব ছিল না। থাকলে ওরা মেরে ফেলতো। ওই সময় যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমার মনে হয় শেখ মুজিব যদি চাইতেন পাকিস্তানের সাথে আঁতাত করে একটা দফারফা করে যুদ্ধ বন্ধ করতে তা তিনি পারতেন না। জাতি যখন স্বাধীনতার পক্ষে মুভ করে তখন কোন নেতার পক্ষেও তার গতিরোধ করা সম্ভব না। জিয়ার ঘোষনা সম্পর্কে একটি কথা বলবো, সেটা হলো আমাদের মধ্যে একটা চিন্তা ছিল বেঙ্গল রেজিমেন্টের যারা ছিলেন তারা যুদ্ধে যোগ দিল কিনা। তার ঘোষনাটায় আমরা আস্বস্থ হয়েছি যে ,আমাদের বেঙ্গল রেজিমেন্ট আমাদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছে। এটা আমাদের সাথে থেকে সাহস যুগিয়েছে। আমাদের গতিবেগ আর উদ্দীপনা বাড়িয়েছে। এইটুকুই আমি বলবো – তাকে তার স্থানে রাখা ঠিক। বঙ্গন্ধুকেও তার স্থানে রাখা উচিৎ।“ 

তার এই যুদ্ধ দিনের বর্ননায় তিনি বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছেন ভারত আমাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু মূল যুদ্ধটা আমারাই করেছি।তার মানে ,সেই সময়ও ভিন্ন ভিন্ন মতের মানুষ ছিলেন,লক্ষ লক্ষ লোকের ভাবনাতো আর এক হতে পারে না ।কিন্তু সবার একটাই চাওয়া ছিল-যে করেই হোক দেশ স্বাধীন করতে হবে।আমি সেই ম্যাজিকটাই বুঝতে চাই,কোন সে ম্যাজিক যার কারনে এতোগুলো মানুষ মূহুর্তের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়লো অস্ত্রের মুখে।উত্তরতো একটাই-দেশের প্রতি ভালোবাসা। 

এ্মনি একটি মাত্র ম্যাজিক বছরের পর বছর দুটো সম্পূর্ন ভিন্ন মানুষকে এক করে রাখে কেবল দুইজন দুই জনের জন্যে।  দেশ স্বাধীনের পর অবাধে পাশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীদের ।অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট গলায় ঝুলিয়েছে,যার বদৌলতে তাদের উত্তরসূরিরা এখন বড় বড় আসনে আসীন।এই বইয়ের ১৪৮ পৃষ্ঠায় মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান আরো বলেছেন-বাংলাদেশে তিন ধরনের মুক্তিযোদ্ধা আছে। দুই ধরনের মুক্তিযোদ্ধা খুব সন্মানের সাথে আছেন। এক হল যারা মারা গেছেন।ওর সম্পর্কে যাই বলা হোক ও আর ফিরে আসবে না। দুই ধরনের মুক্তিযোদ্ধা হল যে হুইল চেয়ারে বসে আছেন।কোনদিন দাঁড়াতে পারবেন না।কুমিরের বাচ্চাদের মতো তাদের বঙ্গভবনেও দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর অফিসেও দেখা যায়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও দেখা যায়। আর আমাদের মতো যারা দুই পায়েই দাঁড়িয়ে আছেন, তাদের অবস্থা আপনারা ভালোই জানেন।“ 

বইটি পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে ২০১১ সালে ।তার মানে খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে আমি চিনি না, তার এই কথাগুলো আমার নানার সেই সময়কার কথাগুলোর সাথে মিলে যায় বলেই আমি এইগুলো উল্লেখ করলাম ।যুদ্ধ তো কেবল হাতে গোলা নিয়েই হয়না, যুদ্ধ অনেক ভাবেই হয়। যে ভিক্ষুক সেজে ম্যাসেজ চালান দিত সেও মুক্তিযোদ্ধা, যে মেয়েটি হায়েনাদের হাতে ধর্ষিত হয়েছে সেও মুক্তিযোদ্ধা।কারো অবদানকে খাটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই। 

আমি আর কোন যুদ্ধ খুঁজিনা, কেবল সন্ধান করে চলেছি সেই ম্যাজিকটির। যেই ম্যাজিকটির শক্তির বলে আমাদের সব কিছু বদলে যাবে। আমাদের ভাবনা,আমাদের চাওয়া,পারষ্পরিক বোধ, সর্বোপরি সমস্ত রাষ্ট্র এক কাতারে এসে দাঁড়াবে আর সেটা হল-“দেশের প্রতি মমতা ,মানুষের প্রতি ভালোবাসা।“সেটা কিভাবে হবে তা আমার জানা নেই।