ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

খুব ঘন করে পাতি দিয়ে দু’কাপ চা টেবিলে রেখেই মধ্য বয়স্ক মহিলাটি সামনে থেকে সড়ে গেলেন।আমি খুব অবাক হয়ে স্যারকে উদ্দেশ্য করে বললাম-আমিতো চা চাইনি।স্যার খুব বিব্রত বোধ করছেন,নিজে নিজেই বিরবির করতে লাগলেন-না,আমিও বলিনি ।কেন যে দিল বুঝতে পারছিনা।

-ইচ্ছে করেই দিয়েছে স্যার।আপনি স্পষ্টই মহিলাকে বলেছেন, এক কাপ ঘন চা চিনি ছাড়া আর আমি বলেছিলাম ,যেহেতু আমি কন্ডেন্স মিল্ক খাইনা তাই কোন চাই প্রয়োজন নেই।কিন্তু এই্টা আধুনিক সেলস পলিসি।জোর করে খাওয়ানো মানে সেল করা।

আমার সামনে বসা অতিশয় ঠান্ডা মানুষের পক্ষে এমন জটিল বিষয় বোঝা সহজ না।পুশ সেল বলে যে একটা শব্দ আছে সেটা এই প্রফেসর সাহেবকে বোঝানো যাবে না।তার কাছে পৃথিবীর তাবত মানুষ খুবি নিরীহ শ্রেনীর,খুব সাধারণ । খুব বেশি রাগ হলে তাকে আমি বড় জোর কুকুর শব্দটা উচ্চারণ করতে শুনেছি।কিন্তু আমরা অনায়াসে কুত্তা  বলে হর হামেশাই গাল দেই।এর চাইতেও নীচু শব্দ আমি নিজেই ব্যবহার করি ,স্যারকে আজ পর্যন্ত আঞ্চলিক ভাষায় কেউ কথা বলতে শোনেনি।আমি আর কথা বাড়ালাম না,চুপচাপ জঘন্য চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগলাম।এর মধ্যে স্যার খুব উত্তেজিত হয়ে উচ্চারণ করলেন –বাহ,কি অসাধারণ হয়েছে চা টা।

আমার দু’চোখ পুরাই উলটে গেল।যে মানুষ দীর্ঘ ২৫ বছর ডেইরি ফার্মের দুধের সর ভরা চা খেয়ে এসেছেন তিনি কিনা এই চিনি বিহীন পেট্রোল মার্কা চা খেয়ে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন।কিছু সময়ের মধ্যে তার মুগ্ধতা এতোটাই  প্রবল হয়ে গেল যে তিনি সেই মহিলাকে ডেকে এনে বললেন-শুনছেন আপা,আপনার চা অসাধারন হয়েছে,তা আপনার নাম কি?

এখানে একটা বিষয় বলে রাখা ভালো যে স্যার যখন কোন রিক্সাওয়ালাকে রিক্সা ভাড়া দেন তখন পরিষ্কার বাংলায় বলেন- আপনাকে ধন্যবাদ,আমাদের কষ্ট করে নামিয়ে দেবার জন্যে।রিক্সাওয়ালা প্রচন্ড অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে,এবার মহিলাও খুব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন-নাম দিয়ে কি হবে?স্যার হেসে আত্মস্থ করলেন-আপনি অন্য কিছু ভাব্বেন না,আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই,আপনার হাতের চা ভালো লেগেছে তাই নাম জিজ্ঞেস করলাম।কি একটা নাম বলে মহিলাটি চায়ের কাপ হাতে চলে গেলেন।

আজ আমার মন এমনিতেই খিঁচিয়ে আছে,তার সাথে এই বাড়তি তেতো চা আরো মেজাজ খারাপ করে দিল।চা নিয়ে কেউ যদি থিসিস করতে বলে আমি খুব ভালো পেপার জমা দেব।কারন,আমি নিজে দারূন দুধ চা বানাই।তার সাথে ঢাকা শহরের কোন গলিতে আদা চা,লেবু চা,কমলার চা,পুদিনার চা,মাল্টার চা এমন কি শৃমঙ্গলের সাত লেয়ারের চা সম্পর্কেও আমার ধারনা পরিষ্কার।আমাকে যা তা দিয়ে চা দিলে খুব বিরক্ত লাগে।দিবি যখন আসল জিনিস দে, নইলে নাই।

জয়িতা সম্পর্কে আমার আগে কোন ধারনা ছিল না।আমার মন খারাপ দেখে স্যারই বললেন ২৭ নম্বরে কর্মজীবি মেয়েদের করা একটা রেস্টুরেন্ট আছেক,তখন বুঝতে পারিনি এটার অবস্থা এতোটা করুন।প্রবর্তনার মতোই কিছু একটা আশা করেছিলাম।এখানে ঢুকেই আমার নাকে খুব উটকো গন্ধ লেগেছে,কিন্তু স্যারের মুখে আগ্রহের হাসি বাধ্য করেছে বসতে।এই সহজ সাধারন মানুষটিকে আমি কখনোই জ্ঞানতো কষ্ট দিতে চাই না।কিন্তু এখান থেকে বের হবার একটা পথ বের করা দরকার।তাই বুদ্ধি করে বললাম-স্যার,আজ আমার বাজার করতে হবে।চলেন আপনাকে ভার্সিটির বাসে তুলে দেই।

স্যারের আগ্রহ আরো তিন গুণ বেড়ে গেল।

-বাজার করবে-চলো,মিনা বাজারে যাই।

আমার খুব মজা লাগলো,স্যার এতো দিন আমাকে বই ,শাড়ী,অর্নামেন্টস আরো যে কতো কি উপহার দিয়েছেন তার ঠিক নেই।এবার তাহলে বাজারের পালা।আমিও দিয়েছি,অবশ্য স্যারের অধিকাংশ পাঞ্জাবী –শার্ট ছাত্র ছাত্রীদের গিফট।এখান থেকেই তার ভক্ত সংখ্যা গণনা করা যায়।বাজারে যাবার আগ্রহ দেখে জিজ্ঞেস করলাম-বলেন তো স্যার কড়ল্লার কেজি কতো?

সারাটা দিন যে মানুষটা কঠিন কঠিন ইংরেজীর মানে বোঝান তিনি মুখ কাঁচু মাচু করে বললেন-জানিনাতো।

আমি হেসে বললাম-৮০ টাকা,আচ্ছা বলেনতো একটা পেঁপের দাম কতো?

এবারো স্যার না সূচক মাথা নাড়লেন।আমি আবার বললাম-৪০ টাকা।

আচ্ছা স্যার,ডিম কতো করে ডজন তাতো নিশ্চই বলতে পারবেন?

স্যার খুব উতফুল্ল হয়ে জবাব দিলেন-১০৫ টাকা।

আমি খুবি বিজ্ঞের সাথে জবাব দিলাম-আজ সকালেই ওটা ১২০ টাকায় পৌঁছে গেছে।

আর আমি কিন্তু মিনা বাজার বা আগোরায় বাজার করিনা।কাঁদায় পা ডুবিয়ে বাজার করতেই আমার ভীষন ভালো লাগে।

-আচ্ছা ঠিক আছে,আজকে তোমাকে নিয়ে আমি কাঁচা বাজারেই যাবো।পাঁয়ে কাঁদা মেখে মাছ কিনবো।

স্যার তার শুভ্র পাঞ্জাবি –পাজামা গায়ে জড়ানো অবস্থায় আমার সাথে সাথে বাজারে ঢুকলেন যদিও মাছ সম্পর্কে তার কোনই ধারণা নেই।মাছ চোখের সামনে না নড়াচড়া করলে আমি তাতে হাত দেই না,আজকে বেশ রাত হয়ে গেছে তাই সব মাছ মরে ঝিম ধরে গেছে।আমি একটা একটা করে মাছের কানের লাল অংশ পরীক্ষা করছি আর দর কষাকষি করছি।স্যার অদ্ভূত চোখে মাছের দিকে তাকিয়ে আছেন।হয়তো মরা মাছগুলোর জন্যে তার মধ্যে ভীষন মায়া জন্মে গেছে।এখন যদি তার মায়ার প্রবনতা এতোই বেড়ে যায় যে আমার মাছ খাওয়াই বন্ধ হয়ে যায় ,তাই খুব বেশি সময় নিলাম না।কয়েকটা বাটা মাছ কুটতে দিয়েই দেশি রুই খুঁজতে গেলাম।ফিরে দেখি স্যার স্থির হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে আছেন,আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই বললেন-জানো,ওরা না অনেক সময় মাছ কাটার সময় কম দিয়ে দেয় ,তাই দেখছিলাম।

যাক, মানুষটাকে যতোটা সহজ ভেবেছিলাম সে ততোটা না।অন্যের কুটিলতাও তার চোখের আড়াল হয় না,অন্যের সাথে তার পার্থক্য  হচ্ছে –এই মানুষ কখনই চিৎকার করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেনা।, তিনি খুব স্থির ভাবেই তার প্রাপ্যটা  আদায় করে নেবেন।

রাত অনেকটাই বেড়ে গেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাতের বাস এর মধ্যেই ছেড়ে দিয়েছে।দু’হাতে মাছ নিয়ে আমরা শ্যামলী অব্দী এলাম।এবার দু’জনার দুই দিকে যাবার পালা।টিচার বাস আসাদ গেইট পাড় হতেই এক ঘন্টার বেশি সময় লাগবে।হাতে তেমন কিছু না থাকলে এ সময়টা আমি স্যারের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি,সে সময় নিজেকে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।আমার জান বিবির জন্যে অপেক্ষা করছি।এখন আর তা হয় না,টেকনিক্যাল থেকেই ডানে মোড় নিতে হয়।

আজ একটা প্রশ্ন স্যারকে করেই ফেললাম যা বেশ অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম-আচ্ছা স্যার,আপনি বিয়ে করেননি কেন?

বোঝাই যাচ্ছে ,এই ধরণের প্রশ্নের উত্তর তাকে হামেশাই দিতে হয়।তাই নির্লিপ্ত একটা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে উত্তর দিলেন-সময় পাইনি,আর তা ছাড়া আমাকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়,আমিতো বাড়ীর বড় ছেলে।

-এটা কোন কথা হলো,বাড়ির বড় ছেলেরাইতো আগে বিয়ে করে,দাঁড়ান আপনার জন্যে একটা পাত্রী ঠিক করছি।

– থাক, এই বুড়ো বয়সে আর লোক হাসিও না।

আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় নয় নম্ভর তখন চিৎকার করে ডেকে উঠলো-এই মিরপুর ২,৬,১১ ,১২…

স্যার বললেন –তোমাকে টেকনিক্যাল নামিয়ে দিলে খুব সমস্যা হবে?

বুঝতে পারছি মানুষটা আমার সংগ ছাড়তে চাইছেন না।আমি বুঝিয়ে বললাম- এই মাছের আঁশটে গন্ধে জাবির অন্য শিক্ষকরা আমাকে ঘাড় ধরে নামিয়ে দেবে।একজনের কাছে যা গোলাপ আর একজনের কাছে তা কাঁটাও হতে পারে।

আমি আমার সমস্ত শরীরে হাস্নাহেনার স্নিগ্ধ স্পর্শ মেখে লোকাল বাসে চড়ে বসলাম।

শিমুল তুলোর মতোই তার অনাবিল হাসি আমার চারপাশ ছুঁয়ে যেতে লাগলো,

যতোখনি দৃশ্যটির সীমায় তাকে দেখা যায় আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি,এক অপরিসীম ভালো লাগা আর শ্রদ্ধা মিলে মিশে একাকার হতে থাকে।কিন্তু আমাদের দুটো পথ কখনোই এক সাথে হয় না,কোন দিন তা হবেও না জানি।।