ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

চলন্ত বাসে সোজা হয়ে বসে থাকাটাই বিরক্তিকর। এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ। তার মধ্যেই মোবাইল ফোন বাজতে থাকে, কেউ যখন একবার রিং হবার পর তাকে পরপর আবার ফোন করে তখন খুব রাগ হয়। বেশ ক’বার রিং হলেই বোঝা যায় ওই ব্যক্তি আমার ফোন ধরতে চাইছে না বা কোন কারনে ধরতে পারছেনা, তাকে কিছুটা সময় দেওয়া হোক। কিন্তু এইবার যে ফোন করেছে সে বোধ করি ওই সময়টুকু কিছুতেই দিতে চাইছে না।

অগত্যা ফোন কানে দিয়ে বললাম –হ্যালো?

ওপাশে বিচলিত পুরুষ কন্ঠ-হ্যালো,আপা। আপনার ভাবী একটু কথা বলবে। আপনি যে নেত্রকোনা ডকিউমেন্টারি বানাতে গিয়েছিলেন সেখানে আপনার সাথে আমার পরিচয়, উনাকে একটু ক্লিয়ার করেন আপা।

আমি যার-পর-নাই বিস্মিত-আমি কি ক্লিয়ার করবো ভাই, এইসব স্ক্রিপ্টের কাজ করতে তো আমাকে বহু জায়গায় যেতে হয়। এখানে ভাবীকে বলার কী আছে?

-আপা,আপনার ভাবীকে শুধু বলবেন –আপনার সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নাই।

এই বেলায় আমার হাসা উচিৎ নাকি কাঁদা উচিৎ, কিছুই বুঝতে পারছিনা। ঘাড়ের কাছে কন্টাক্টর ক্যা ক্যা করছে ভাড়ার জন্য। আমি চোখ বড় করে তাকাতেই চলে গেল। এই ধরনের নড়বড়ে সম্পর্কের সাথে এর আগেও পরিচয় হয়েছে আমার । একবার এক অপরিচিত মহিলা বলছে-আপা, আপনি আপনার ফেইসবুক থেকে আমার স্বামীকে ডিলিট করেন। শুনেই আমার মেজাজ খারাপ-সেটা, আপনার স্বামীকে বলেন। আমার ফেইসবুকে কাকে রাখবো আর কাকে রাখবোনা তা কেবল আমি বুঝবো।

আবার অনুনয় বিনয়-আপা,প্লিজ আপনে করেন।ওকে বললে সে আর একটা আই ডি দিয়ে আপনাকে ফ্রেন্ড বানাতে চাইবে।

-বাহ ,ভালোইতো বোঝেন,তাহলে আপনি স্বামীকে ডিলিট করেন।

-না আপা,ও খুব ভালো জব করে।তার উপরে বাচ্চা নিয়ে এতো সিকিউর্ড জায়গায় আছি।আপনি খালি তার সঙ্গে কথা বইলেন না।

-আপনি তো বিরাট সমস্যার মধ্যে আছেন।সব মেয়েদের কে ফোন দিয়ে কি এই এক কথা বলছেন?

-জ্বী আপা,আমার স্বামীর সমস্ত ফ্রেইন্ড লিস্ট ধরে ,মেয়েদের নম্বর বের করে ফোন দিচ্ছি।

সেদিন থেকে তার স্বামীকে আমি ডিলিট নয় ব্লক করেছি। আমি কোন মানুষের বন্ধু হতে চাই, কারো লক্ষ টাকায় কেনা স্বামী নামক সম্পত্তির না।

এবার নিজেকে খুব সংযত করলাম, যতোটা করা সম্ভব-দিন, ভাবীকে দিন কথা বলি।

এবার ওই পাশে জেলা জজ কোর্টের জাজের মতোন নারী কন্ঠ-আপনার নাম রোদেলা?

-জ্বী ভাবি,আপনি ভালো আছেন?

আমার প্রাণ প্রিয় ভাবী ওই পথে হাঁটলেন না।

-আপনি কী করেন?

-আমি একটা এন জি ও-তে কাজ করি আর টুকটাক লিখি।

-দু’মাস আগে আপনি নেত্রকোনা গিয়েছিলেন?

-জ্বী ভাবী, আমাকে অফিসের কাজে অনেক জায়গায় যেতে হয়।

-আপনি সকাল বেলা আমার স্বামীকে ফোন দিলেন কেন?

-জ্বী ভাবী, সকাল ৯ টার পর আমি আপনার স্বামীকে ফোন দিয়েছিলাম একটা অফিসিয়াল কাজে, তার একটি এপ‍য়েমেন্ট নেওয়া দরকার ছিল। আর সকাল ৯ টার পর সমস্ত কার্যক্রম খোলা থাকে। আপনার স্বামী বাংলাদেশ এল জি ডি আর-এর একজন সন্মানিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার সাথে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ন কাজ আছে।

আমার স্টার জলসার ভাবীজানের এই সব শোনার সময় নাই, উনি এখন জেরায় রত-আপনি কোথায় থাকেন?

-আবাসিক, মিরপুর, ঢাকা নগরীতে।

(আমি যে মহা বিরক্ত হয়ে গেছি এটা তার উর্বর মস্তিষ্কে কোন ভাবেই যাচ্ছে না,সে স্বামীর পরকীয়ার গন্ধ খুঁজছে।)

-কে কে থাকে আপনার সাথে ?

-ভাবী আমার বাবা নেই, একটা মেয়ে আছে।মা –ভাই-ভাবী সবাই আছে।

এবার মহিলা উপযুক্ত জায়গায় হানা দিল- আপনার স্বামী কী করে?

-কী আর করবে ভাবী, চাকরী করে।(স্বামী আমার সঙ্গে থাকে না –এই কথা বললে সেতো পুরাই ১০০০ পর্বের সিকুয়েল বানায় ফেলবে।)

-আপনার বাসার ঠিকানা কী?

একজন ভদ্র মহিলা অনর্গল একজন অপরিচিত মানুষকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। এটা যে চরম অভদ্রতা তা সে বুঝতেও পারছে না। আমাদের এই দীর্ঘ কথোপকথনের এক জায়গাতেও স্বামী কল কেটে দেয়নি বা ফোন নিয়ে নেয়নি।এটাতেই বোঝা যাচ্ছে মহিলার স্বামীর অবস্থা খুবই আশংকাজনক। এই লোক মোটেও হামলে পড়া টাইপ না, গো বেচারা টাইপ। এরা ঘরের বাইরে সিংহের মতোন গর্জায় আর ঘরের ভেতর মিউ মিউ করে। অবশ্য কে কী করে তা নিয়ে আমার কোন দরকার নাই। শ্যামলী এসে গেছে, আমাকে ফোন ছাড়তে হবে।

-ভাবী, আপনি আমার বাসার এড্রেসটা লিখেন। আমার চৌদ্দ গুষ্টি মিরপুরে থাকে। আপনি সবার বাসায় যান আর জনে জনে জিজ্ঞেস করেন-আপনার স্বামী আর আমার মধ্যে কোন লটর পটর আছে কিনা। ও আর একটা কথা, স্বামী হচ্ছে গলায় রশি বাঁধা ছাগলের মতো।গলার রশি যদি একটু ঢিলা হয় তাহলে অন্য ক্ষেতের ঘাস খায়।রশি জোরে বাইন্ধ্যা রাখেন।

– হুম,বুঝছেন তাহলে।

আমি ফোন কেটে দিলাম।স্বামী যে ছাগলো না ,গরুও না-সে যে জ্বলজ্যান্ত মানুষ-তা বুঝেছি বলেই রশির সমস্ত বাঁধন বহু আগেই খুলে দিয়েছি।এই স্টার জলসারে তা বুঝায় লাভ নাই।

আমি অফিস ঢোকার পথে ভাবলাম –মাসে শ’খানেক লোকের সাথে আমার কাজ করতে হয়।তাহলে সবার মিসেস যদি একবার করে জিজ্ঞেস করে-আপনি আমার স্বামীকে ফোন দিয়েছেন কেন?তাহলে আমার প্রতিউত্তর কী দেওয়া উচিত। এমন বলতে পারি-আপনি একজন বেকার পুরুষ দেখে বিয়ে করে ফেলেন, তাহলে আর কেউ ফোন দিয়ে ডাকাডাকি করবে না।

আমি অফিসে বসে “বিবাহ” লিখে গুগল সার্চ দিলাম।আমার জানতে ইচ্ছে করছে –আসলে কোন পর্যায়ে গেলে একজন আর একজনের অধীন থাকতে বাধ্য হবে।

এক জায়গায় লেখা-“`বিবাহ` শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো মিলানো, একত্র করা কিংবা সহবাস। ইসলামী আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট একজন নর ও নারীর একত্রিত হওয়ার চুক্তিকেই বিবাহ বলে।

ডি এফ মোল্লা তাঁর ‘মুসলিম আইনের মূলনীতি’ বইয়ে বিবাহের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন “ বিবাহ বা নিকাহ এমন একটি চুক্তি যার উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য হলো বৈধভাবে সন্তান লাভ ও প্রতিপালন।

বিচারপতি মাহমুদ তাঁর ‘আঃ কাদির ও সালিসী মোকদ্দমার রায়ে বলেছেন, “ মুসলিম বিবাহ কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, একটি বিশুদ্ধ দেওয়ানী চুক্তি যার উদ্দেশ্য পারিবারিক জীবন যাপন ও বৈধ সন্তান দান।”

ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী বিবাহ করা সুন্নতে মোয়ক্কেদা। এর থেকে বিরত থাকা বা নিবৃত হওয়া পাপ বা অন্যায়। কারণ বিবাহ নৈতিক চরিত্র ও সতীত্বের হেফাজত করে, পারষ্পরিক ভালবাসা ও প্রশান্তি অর্জনে ভূমিকা রাখে এবং বংশ ধারা অব্যহত রাখে।“লিঙ্ক-https://www.facebook.com/tpv.maldives/posts/551895791533632

অতনু বর্মণ বিবাহবিডি ব্লগে লিখেছেন-আসলে বিয়ে হল অনেকটা তিন-পায়ে দৌড়ের সমগোত্রীয়। বাঁধা পা দু’টো একসঙ্গে আগে ফেলতে হয়। এক ছন্দে দৌড়তে পারলে দিব্যি দৌড়বে, কোনও ঝামেলা নেই। যে যার মতো দৌড়তে গেলেই হুমড়ি খাবে দু’জনেই। সুতরাং হয় নিয়ম মেনে পা ফেলে ছোটো, নয়তো দড়িটা খুলে ফেলে যে যার নিজের পথে হাঁটো।

আসলে আমার লেখার মূল লক্ষ্য মোটেও বিয়ে নিয়ে নয়, আমি আঘাত করতে চাইছি বিশ্বাস শব্দটিতে। যেই সম্পর্কে বিশ্বাস নেই সেটা স্বামী-স্ত্রী হোক ,নয় তো বন্ধুত্বের হোক সেখানে এক ছাদের নীচে অবস্থান খুবই ঝুঁকিপূর্ন। এতে নিজেদের ক্ষতি তো আছেই পাশাপাশি আশে- পাশে যারা থাকে তারাও সমান ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

উপরের ঘটনাতে এই বিষয়টা ক্লিয়ার যে মামুন ভাই অফিস যেতে দেরি করেছিল বিধায় তার স্ত্রী ফোনের রিং শুনতে পেরেছিল। আমি আলোকপাত করছি সেখানে-ঘটনাটা ঘটছে বাড়িতে। অর্থাৎ বাড়িতে উপস্থিত বাবা-মা, এমন কি কাজের লোক তাদের এই ঘটনা নিবিষ্ট মনে দেখছে। আমি অনেক বাচ্চাদের দেখেছি নিজের বাবাকে অবহেলা করে কথা বলতে, এই শিক্ষা তারা পেয়েছে নিঃসন্দেহে মায়ের কাছ থেকে।

যখন স্বামী বা স্ত্রী লাগামহীন ঝগড়ায় ব্যস্ত হয়ে যায় তখন মনেই থাকে না সামনে যে শিশুটি বসে হা করে গিলছে তা তাদের মস্তিষ্কে বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। শিশুটি বড় হতে থাকে এবং তার আচরণ থেকে অনেক নেতিবাচক ব্যবহা্র উঠে আসে যা তার জীবনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

হিন্দী চ্যানেলের আগ্রাসন নিয়ে কার কী মত আমি জানি না, তবে আমার ধারণা খুবি নিম্নমানের। কি গ্রাম –কি শহর একটু ঢুঁ মাড়লেই দেখা যাবে দুপুর কিংবা রাত; কিছু নির্দিষ্ট সময় ঘরে ঘরে স্টার জলসা চলছে। বোঝে না সে বোঝে না-এই গানটা আমি যতো দূর জানতাম সিনেমার গান, তাই মহানন্দে বসলাম টিভির সামনে। এখন দেখছি-দু’টো টিন এজ ছেলে মেয়ে পর্দায় হাঁটাহাঁটি করছে। আমি সোহম আর মিমিকে খুঁজছি পর্দায়,পরে বুঝলাম এটা নাটক। নাটকের বিষয়বস্তু-পরকীয়া,বউ-শাশুড়ি-ননদের ঝগড়া, এ ওর পথের কাঁটা, সে তার পথের কাঁটা।

একদিন এমন হলো-আমার ছোট খালু চাবি দিয়ে দরজা খুলে ডাইনিং-এ বসে ভাত খেয়ে চলে গেল। আমার খালামনি বিকালে স্বামীকে কল দিয়ে বলছে-কি ব্যাপার, আজকে অফিসে নতুন মেয়ে আসছে নাকি? ভাত খেতেও এলা না?

ও পাশ থেকে ঠান্ডা উত্তর-তুমি নিজের ভাত আগে খাও ,তাওলেই বুঝবা তোমার প্লেটে বারা ভাত কম পরেছে কিনা।

সিরিয়ালের এতো জোর যে পেটের ক্ষুদাও তাতে নিবৃত হয় আর স্বামীতো খুঁটিতে বাঁধা ভ্যাঁ ভ্যাঁ করা একটা ছাগল।

(নারীবাদীরা আবার ভেবে বসবেন না,আমি পুরুষদের উস্কানী দিচ্ছি।নিদেন পক্ষে যেসব স্বামীরা প্রতিদিন নানা ভাবে নির্যাতিত হন তাদের হয়ে একটু সাফাই গাইছি-এই আর কি।এই নির্যাতনের কোন স্বাক্ষী প্রমাণ নেই,তাই ঝামেলাও নেই।)