ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

ধানমন্ডি ১৫ নম্বর ধরে হেঁটে এগুচ্ছি একটি সিএনজির জন্য। এমনিতেই ঢাকা শহরে এই বস্তুটি এমন বিলুপ্ত হয়ে গেছে যে ইয়েলো ক্যাবের মতোই এটাকেও ঢাকা জাদুঘরে পাঠানোর কথাও ভাবতে হবে। এইসব আকাশ কুসুম ভাবতে ভাবতে এক খানা রিক্সা নিয়ে ধানমন্ডি ২৭ মীনা বাজারের কোনায় দাঁড়ালাম। যতোদূর চোখ যায় দুই ধারে কোন সিএনজি নেই। খালি প্রাইভেট আর প্রাইভেট, রাস্তায় নামলে বোঝা যায় –ঢকা শহরের মানুষের পকেটে অনেক পয়সা। নইলে এই স্কুল ছুটির সময় এতো প্রাইভেট কোথা থেকে আসে? এইগুলোতো আর অফিসের গাড়ি নয়। বাচ্চাদের আনা নেওয়ার জন্যে বাবা অথবা মা কর্তৃক নিয়োককৃত চার চাকা।বাচ্চাদের নিজ এলাকায় ভর্তি করতে যদি বাধ্য করা হতো তাহলে নগরীতে তিনটি জিনিষ কার্যকরি হতো-

১।জ্যাম কমতো বহুল অংশেই।

২।কে কাকে স্কুল থেকে আনতে যাবে এই নিয়ে বাবা মায়ের মধ্যে যুদ্ধ হতো না।

৩।বাচ্চাদের কাঁচা ঘুমে আর অতর্কিত হামলা দিতে হতো না।

এই তিনটি কাজ যখন আর সম্পন্ন হলো না,তখন ম্যাডামরা তো চার চাকা দৌঁড়িয়ে স্কুল টু মার্কেট, মার্কেট টু বাসা করবেই। আমাদের মত মধ্যবিত্ত এক খানা সিএনজির জন্যে হা-পিত্তেশ করবে প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে।

বনানী ১১ নম্বর যাবার সোজা সোজি কোন বাস নেই এ পথে ,আর থাকলেও আজকালকার অতিথি বাসে আমার সময় কুলাবেনা।মিটিং বেলা ১২ টায়,সময় হাতে আর আধ ঘন্টা।অতিথি কেন বললাম তা একটু ব্যাখ্যা করি।একদিন বি আর টিসিতে করে সাভার যাচ্ছি,একটু পর পর সেটা থামিয়ে কন্ট্যাক্টর খালি ডাকতেই থাকে—“এই নবীনগর।“ কিন্তু ভাড়া দিলাম গুনে গুনে গুলিস্থান থেকে ৫০ টাকা।আমার পাশে বসা ভদ্র মহিলা বললো-“বুঝলেন আপা,এরা হলো অতিথি বাস।আপনাকে ডেকে নিয়ে বাসে তুলবে আর হাতে একটি চিরকুট ধরায় দিয়ে বলবে –বসেন ,চা চুলায় গরম হচ্ছে।হা হা হা…”

চিরকুট মানে হচ্ছে টাকার  রশীদ। চা মানে হচ্ছে গন্তব্য। আমি মহিলার রসিকতায় মুগ্ধ । কিন্তু আমাকে আরো বেশি মুগ্ধ করতেই যেন আমার দিকে একটি ফাঁকা সিএনজি এগিয়ে এলো। আমি ধরেই নিলাম সে আগের ড্রাইভারের মতোই ২৫০ টাকা হাঁক ছাড়বে।বরং আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো-সি এন জিতে যা ওঠে তার চেয়ে ২০ টাকা একটু বাড়ায় দিয়েন।আমি আমাকে তিন বছর পেছনে দেখতে পেলাম, যেখানে সিএনজি ট্রাফিক জ্যামে পড়লে আমরা খুশি হয়ে টাকা বাড়িয়ে দিতাম। আমি বললাম-ভাই, আপনার মতোন ভালো মানুষতো অনেক দিন দেখিনা । ড্রাইভার মুচকি হাসলো, এই হাসির অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না।

সে মিটারে টিপ দিল, সেখানে লাল অক্ষরে লেখা-৪০ টাকা।আমি জিজ্ঞেস করলাম-এখন কি প্রথম দুই কিলো ৪০ টাকা?সে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।আমি নিশ্চিন্তে বসে আছি।তেলের দাম বেড়েছে তাই বাস ভাড়া বেড়েছে,সি এন জি বেড়েছে কি হারে তা অর্থ মন্ত্রী ভালো জানেন।আমার জানা নেই।

সিএনজি আটকে গেলো সানরাইজের সামনে।এই ট্রাফিক কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা স্বয়ং ঈশ্বর বলতে পারেন কিনা সন্দেহ । মিনিট অতিক্রম করছে,আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি মিটারের দিকে।কিছুই বুঝতে পারছিনা-মিটারে টাকা উঠছে কেন? গাড়িতো চলছে না। এটা কি ওয়েটিং বিল? প্রশ্ন গুলো ড্রাইভারকে করা। কিন্তু ওই পাশে হাসি ছাড়া আর কোন উত্তর নেই। আমি মোবাইলে দেখলাম প্রতি এক মিনিটে দুই টাকা উঠে যাচ্ছে। আধ ঘন্টায় উঠেছে ৬০ টাকা।তার মানে আমি মীনা বাজার থেকে সানরাইজে অর্থাৎ মাত্র ৫-৬ কিলো আসছি ১০০ টাকায়। এখন আমার কি করা উচিৎ? সিএনজি থেকে নেমে আমি কোথায় যাবো? বাস? সেটা কই পাবো? রিক্সা?ভিআইপি রোডে ওই জিনিস কেমনে পাবো? আমি প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম যখন বনানী এসে দেখলাম- মিটারে বিল এসেছে ৩২০ টাকা।যেখানে ২০০ টাকা দিলেই এইটুকু পথ আসা যায় সেখানে আমার লাগলো ৩২০ টাকা ,যদিও পুরোটাই অফিস বেয়ার করবে তবু বুকের ভেতর কেমন খচ করে বাঁধলো ছুড়ির মতোন।

বাড়ি ফেরার সময়ও আরো একবার ছুড়ির ফলা খেলাম, কারণ বনানীর কাজ শেষ করে গেলাম মহাখালি  ডিওএইচএস। ওটা সংরক্ষিত এলাকা,তার মানে যাদের গায়ে ব্লাডি সিভিল লেখা তারা এখানে সহজে প্রবেশ করতে পারবে না।আমি করলাম অফিসের কাজে, আর বিকেল চারটায় মিরপুর স্টার্ট করে ছয়টায় পৌঁছলাম ২৫০ টাকার বিনিময়ে। সংযোগ করা ভালো, এই পথে ডাইরেক্ট কোন সার্ভিস নেই।

স্বপ্ন থেকে শপিঙ্গের অভ্যাস আমার বহু পুরনো,ওদের একটি কার্ড আছে যেটায় কি সব পয়েন্ট টয়েন্ট দেয় , যদিও ওটা আমার তেমন কাজে লাগেনি।সাপ্তাহিক বাজার আমি অরিজিন্যাল বাজার থেকে করতেই পছন্দ করি।কেবল বাচ্চার দুধ আর বাটার কিনতেই এই আউটলেটে প্রবেশ।বেশ লম্বা লাইনে দাঁড়িয়েই পে করার সুযোগ পেলাম।একতা নিডো ফর্টিফাইভ ৭০০ এম জি,এটাই বিক্রেতা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছেন।আমি বেশ আগ বাড়িয়েই বললাম-“আমি কিন্তু ১০ টাকা কমেই নেই বাইরের দোকান থেকে ,কিন্তু আজ খুব তাড়া তাই এখানেই এলাম।“তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বল্লেন-“কম মানে,আমি দেখছি ভ্যাট কতো আসে।“

-মানে কি ,বাচ্চার দুধ কিনবো ভাই,এটাতে ভ্যাট আছে?

-কি বলেন,সবটাতেই আছে,এইযে বাটার নিয়েছেন এইটাতেও ভ্যাট আছে।

আমি হাতে  ৭ টাকার ম্যাঙ্গোবার নিয়ে বললাম-এইটাতেও আছে?

তিনি খুব বিজ্ঞের সাথে বললেন-অবশ্যই।

আমি প্যাকেট থেকে সমস্ত খাবার নামিয়ে রাখতে রাখতে বললাম-“সরি ভাই,আমার বাচ্চার খাবার কিনতে আমি কাউকে ভ্যাট দেব না, আমার কষ্টের টাকা। কষ্ট করে আর্ন করি, বাড়তি খরচের কোনই চান্স নেই।“

সেলস ম্যান ভূত দেখার মতোন চমকে উঠলো আমার কথায়। আমি পাত্তা দিলাম না,যা ইচ্ছা ভাবুক।যে দিন আমার চলার পথ সহজ হবে,যেদিন কাজ আদায়ের জন্যে কাউকে ঘুষ  দিতে হবে না, যে দিন নিশ্চিত হবে নিরাপদ মৃত্যুর সে দিন আমি ভ্যাট দেব।

বাসার সামনে থেকেই উইদ আউট ভ্যাট আরো বেশি বেশি সদাই করে আজকের মতোন বাসায় ফিরলাম।