ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

Cholti-pother-goppo

“নানি ছিল পুরোটাই অন্তপুর বাসিনী ।আমরা যখন দল ধরে সিনেমা হলে যেতাম তখন নানি তার জুনিয়রদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।তাদের মধ্যে বড় ধরনের ঝগড়া আমি কমই দেখেছি।নানার রিটায়েরমেন্টের পর তার দুটো কাজ ছিল।একটা বাজার করা আর অন্যটি ঢাকা শহরের সব পেপার পড়া।নানি রান্না ঘরে যাওয়ার পর বিভিন্ন দ্রব্যের কথা মনে পরতো তার এই কাঁচামরিচ নেই অথবা ভাতের চাল নেই।নানাকে দেখতাম বিরবির করে কি যেন বলছেন,কিন্তু ঠিকি পাঞ্জাবী গায়ে চেপে বউয়ের কথা মতোন চলে যেতেন বাজারে আর ফিরতেন এক গাদা পত্রিকা হাতে।একবারতো দু’জনের মধ্যে কথা বার্তা প্রায় বন্ধ।নানি টেবিলে চা দিয়ে বার বার ভাববাচ্যে নানাকে উদ্দেশ্য করে বলছে-ওরে পড়ুনিরে,আইজকাই দেশের সব পেপার পইড়া শেষ করে ফেলবো,চাটা যে ঠান্ডা হয়। “

নানির মুখের সেই ভালোবাসা ভরা অভিমান আজো আমার চোখে লেগে আছে।আমি এই দু’জনের মধ্যকার এমন মাখো মাখো সম্পর্কের ভেতরের রহস্য খুঁজতে গিয়ে এমন এক ম্যাজিকের সন্ধান পেয়েছি যে ম্যাজিকটি আজো আমি খুঁজে বেরাই পথে-ঘাটে,জলে-স্থলে ,সর্বোপরি মানব মনের মনি-কোঠায় ।সেটা আর কিছুই না ,সেটা হলো ভালোবাসা।সত্যিকার ভালোবাসাই পারে একটি সুন্দর দেশ উপহার দিতে ,একটি সুস্থ জাতি উপহার দিতে।“আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি ,কিন্তু দেখেছি ম্যাজিক।“

“দশটার মধ্যে অফিস পৌঁছুতে হবে তা ঝড় হোক আর সাইক্লোন।নইলে পুরো অফিস শুদ্ধাই ভূমিকম্প বয়ে যাবে।আর তার ফলস্বরূপ অফিসটাইম হয়ে যাবে আট’টায়।তার চেয়ে হাঁটু জলে বাসের জন্যে অপেক্ষা করা ঢের ভালো।বৃষ্টির ছাট এসে গায়ে লাগলে মন্দ লাগেনা,কিন্তু তার সাথে যে বোনাস হিসেবে ড্রেনের পানিও ছিটকে আসে সেটা পেতে কার ভালো লাগে বলেন। তাও লাগতে হয়।পূর্নিমার চাঁদ আকাশে উঠলো কি উঠলোনা,কার কবে জন্মদিন হয়ে গেল তা নিয়ে প্রশাসন খুব সচেতন হলেও আমাদের মালিকদের কিচ্ছু যায় আসে না।”

এদেশে অফিস গুলোর একটা অলিখিত নিয়ম চালু আছে।আপনাকে ঠিক সময় মতোন অফিসে পৌঁছতে হবেই,তা আপনার জীবন গাড়ির তলায় যাক নয়তো মাচার নীচে।দশ মিনিট দেরি করেছেন তো হামলা একেবারে বেতনের উপর ,নয়তো বসের লাল লাল চোখ।কিন্তু যাবার জন্যে কোন নির্ধারিত সময় নেই।কেউ রেহাই পায় সন্ধ্যা ছয়টায়,কারোবা বাজে সাতটা ।ভাবছেন কাজে ফেল মাড়লে দেরীতো হবেই,ঘটনা তা না । ডেগিজনেশন যত বড় ,অফিস থেকে তার বেরুতে ততো বেশি দেরী হবে।বেতনটা বেশি নিবেন,অথচ অফিস কে কিছু দিয়ে যাবেন না -তাতো হবে না।আর বসতো পারলে লেপ -তোষক নিয়ে অফিসে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারলেই বেঁচে যায়।কিন্তু উন্নত দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় ,ওরা সময়ের সাথে কাজের কি অসাধারণ সমন্বয় করে ফেলেছে।কিন্তু ,আমাদের মতোন কামলাদের কেবল কলম ঘষা আর ফেইস বুকে দু’চারটা স্ট্যাটাস দেওয়া ছাড়া আর কি বা করার আছে।এই নিয়েই আমার “কামলাগিরি” গল্প।

“কিন্তু আমরা যারা স্যুট টাই পড়ে ,ভাঁজ দেওয়া শাড়ী পড়ে অফিস করতে আসি তারা হচ্ছি মধ্যবিত্ত ভদ্র কামলা ।১৮ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেডের নীচে আমাদের কপালের ঘাম কারো চোখেই পড়ার কথা না।মাঝে মাঝে আমাদের দিকে তীরের মতোন এমন সব শব্দাবলী ছুটে আসে যে নিজেকে আবিষ্কার করি ৮১ ডিগ্রীতে ঘামছি।কিন্তু প্রতিবাদ করবো?কার ঘাড়ে কয়টা মাথা?খাও গালি,যাও ডেস্কে।চুপচাপ কাজ করো।তুমি যে ঢাকা শহরে ভদ্র মতোন একটা জব পেয়েছো-এটা টিকিয়ে রাখাই মোদ্দা কথা।কে বাপ তুলে গালি মাড়লো আর কে অপমান করে ফাইল ছুঁড়ে দিল এইসব নিয়ে ভাবার টাইম নাই।বেটার জ্বী হুজুর জ্বী হুজুর মুখের বুলি আউড়াও ,দেখবে সব খুন মাফ।”

সেল ফী নিয়ে লিখেছি আত্ম প্রেমের কাহিনী।সেলফী যে কি ভয়ঙ্কর রোগে পরিনত হয়েছে তাই লেখার চেষ্টা করেছি-“রোগের নাম আত্মপ্রেম’’গল্পে।

 

“যাদের নাম লিখেছে তাদের বয়স কম করে হলেও ৬০ বছর।একটি ১৯ বছরের মেয়ের পক্ষে এদের কাজের অবদান সম্পর্কে আইডিয়া পাওয়া সম্ভব নয়,কারন এরা বেশীর ভাগ সময়ই দেশের বাইরে থাকেন।এমন বড় মানুষের সাথে আমার নিজেরো পরিচয় নেই।তাহলে তাদের পেয়ে কেন গ্রেটফুল হতে হবে,তাদের নিয়ে মুখে বিগ সাইজের হাসি দিয়ে কেন প্রোফাইল পিক বানাতে হবে-তাই বুঝতে পারছিনা।নাকি সেলিব্রেটিদের সাথে সেলফি তোলাই মহৎ একটা কর্মের মধ্যে পড়ে।”

“বাসা থেকে বের হয়েছি আটটায়,মিরপুর এক পৌঁছতেই লাগলো ৪০ মিনিট।সুতরাং বসের গোল গোল চেহারার কথা আর ভেবে কাজ নেই,যা থাকে কপালে।আগে বাসের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতাম,এখন থাকিনা ।কারন ডিরেক্ট ভাড়ার ইন ডিরেক্ট সার্ভিস আমাকে মোহমুগ্ধ করেছে।তার উপর ভুলেও যদি ইঞ্জিনের সীট ছেড়ে পিছনে কোন মেয়ে বসে তাহলেতো সেই দিন হাজারটা কথা শুনতে হয়-মেয়েদের জন্যে সামনে সিট আছে না,তাহলে পিছনে বসলেন কেন ?লে হালুয়া,ড্রাইভার্রে পাশে চারটা (যদি শুটকী হয়) আর পায়ের কাছে তিনতা।ট্রান্সসিলভা হলে ৯টা, সীটের মাথার ওপর লেখা-“প্রতিবন্ধী এবং মহিলাদের জন্যে বরাদ্দ।“তাও অনেক সময় ওই বরাদ্দকৃত সম্পত্তিরো ভাগ পাওয়া যায় না,যেমন আইনেই বলা আছে মেয়েরা এক তৃতীয়াংশ বাবার সম্পত্তি পাবে।এখন কার স্বামী হতে কে কি পেল সেই বিবেচনা আইনের কাজ না,তেমনি ঢাকা শহরে নারী কর্মজীবির সংখ্যা কতো তা গননা করাও বাস মালিক সমিতির কাজ না।তাই বাদুর ঝুলনতো আর দিতে পারবোনা,লেগুনাই ভালো।মাঝে মাঝে গেটের মধ্যে চার পাশটা দাঁড়ালে উলটে যায় ,সমস্যা নাই- জোড়ে টানে তাই ভালো।”

ট্রান্সপোর্ট রঙ্গ একটি সম্পূর্ন রম্য গল্প।নগর জীবনের এই ভোগান্তিময় চলাফেরাকেই একটু হাস্য রসে তুলে ধরার একটি ক্ষুদ্রপ্রয়াস মাত্র।

“আমি দেঁশালে গেলাম,একনজরেই পার্পেল রঙের একটা জামার উপর চোখ আটকে গেল।ওটার গায়ে হাত রাখতেই পাশ থেকে আর একজন মহিলা বলে উঠলো-“এইযে ভাই শুনছেন,এই পার্পেল কালারের ড্রেসটা আর নেই ?”সেলস ম্যান এগিয়ে এলেন-“এটাই লাস্ট পিস”।আমি ভয়ে তাড়াতাড়ি জামা খানা বগলে নিলাম,এই জিনিস যদি না হাতে রাখি নির্ঘাত এই মহিলা নিয়া যাবে।এইটারে বলে-নিজের জামাই থুইয়া পরের জামাইয়ের দিকে নজর।একবার রঙ-এ একটা শাড়ি আমি প্রায় কিনেই ফেলছিলাম,ওমনি কোথা থেকে এক মহিলা ক্যাশ ছুঁড়ে দিল।আমার আগেই পে করেছে বলে শাড়ি চলে গেল তার কাছে।সারা ঢাকা শহর ঘুরে সেই শাড়ি আমি পাইনি।তাই এই জামা কোন ভাবেই হাত ছাড়া করা যাবে না।আমি কোন রকম ট্রায়াল দিয়ে দেঁশাল ত্যাগ করলাম।”

মন খারাপ লাগলেই আমি শপিঙ্গে চলে যাই।ব্যাগে টাকা না থাকলেও ইউন্ডো শপিং করতেও আমার ভালো লাগে,কেমন একটা অবসন্ন ভাব।চাইছি কিনতে ,কিন্তু পারছিনা।“উৎসব রঙ্গ” -এই গল্পটিতেও আমি কিছুটা হাস্যরস আনার চেষ্টা করেছি।জানিনা ঠিক কতোটা বাস্তব সম্মত হাসি তুলে আনতে পেরেছি।

“টিস্যুতে আজকাল কোন কাজ হয় না,বোশেখ হোক আর আষাঢ় –এই রোদ পোড়া গরমে হাতের রুমাল খানাই ভরসা।ঘাড়ের কাছে ঘাম মুছতে মুছতে বসের মুখখানা ছবির মতন হেসে উঠলো-“আপনার গলায় যে দাগ দেখা যাচ্ছে,তা শরীরের আর কোথাও আছে নাকি? হোয়াট এ কোশ্চেন????আমি প্রথম প্রথম এই ধরনের ইঙ্গিতপূর্ন কথা শুনলে খুব রেগে যেতাম ,এখন রাগি না।পাটকেল খুঁজি,আপাতত যা পেলাম তাই ছুঁড়লাম-সেকি স্যার ,আপনি না রোযা রেখেছেন,মাকরু হয়ে যাবে তো।”

গল্পের নাম “যাপিত সময়”।এটা নিয়ে বেশি কিছু বলবো না।কর্মজীবি নারীদের জীবনে মাঝে মাঝে এমন সব ঘটনা ঘটে যা তাকে একাই আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।এমন আরো একটি গল্প আছে এই বইতে –“ধূলোপথে ফুঁটে আছে আমাদের শিউলীরা”।সদ্য মফস্বল থেকে আসা একটি শিক্ষিত মেয়ের চাকরী খুঁজতে গিয়ে অন্ধকার পথে হেঁটে বেড়ানোর গল্প।আশা করি পাঠক গল্পের ভেতরের গল্পকেউ খুঁজে পাবে এর মধ্য দিয়ে।

“-ভাবী,আপনি আমার বাসার এড্রেসটা লিখেন।আমার চৌদ্দ গুষ্টি মিরপুরে থাকে।আপনি সবার বাসায় যান আর  জনে জনে জিজ্ঞেস করেন-আপনার স্বামী আর আমার মধ্যে কোন লটর পটর আছে কিনা।ও আর একটা কথা ,স্বামী হচ্ছে গলায় রশি বাঁধা ছাগলের মতো।গলার রশি যদি একটু ঢিলা হয় তাহলে অন্য ক্ষেতের ঘাস খায়।রশি জোরে বাইন্ধ্যা রাখেন।”

“স্বামী যখন নির্যাতিত”-এটি আমার বহুল আলোচিত গল্প।স্বামীদের কিভাবে রশি দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় তা পঁই পঁই করে লিখে দিয়েছি এই গল্পে।সুতরাং সচেতন ভাবীগণ একদম মিস করবেন না প্লিজ।

এছাড়াও আছে একজন বাবা আর মেয়ের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ইতিবৃত্ত।এভাবে মোট এগারোটি গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে আমার “চলতি পথের গপ্পো।“

পান্ডুলিপি রেডি করে একরকম হতবিহবল অবস্থাই পড়লাম,কারন প্রকাশনাতো দূরে সঠি্কভাবে প্রুফ দেখে দিবে এমন মানুষটিকেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না।যারা এই বিষয়ে অভিজ্ঞ তাদের হাতে একদম সময় নেই,আর যারা অনভিজ্ঞ তারা চায় পয়সা শর্তবিহীন গ্যারান্টি।কিন্তু বইমেলা ততোদিনে আরম্ভ হয়ে গেছে,একদিন হঠাত ইনবক্স ওপেন করে দেখলাম-আমার জন্য গোটা গোটা অক্ষরে বিদ্যা প্রকাশ আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

আমি যতোদূর জানি মজিবুর রহমান খোকা ভাই ক্যালিফোর্নিয়াতে থাকেন,তিনি কবে দেশে এসেছেন তা আমার জানা নেই।আমি দাওয়াত পেলে আবার মিস করিনা,খাওয়ার গন্ধ যেখানে আমিও সেখানে।মোটেও ভুল করি নাই,বিশাল স্টল ভরে আছে বড় বড় লেখক আর প্রকাশকে।চলছে লাড্ডু আর বাংলাবাজার থেকে আগত চায়ের আড্ডা।এর মধ্যেই আমি কিন্তু পুরো পান্ডুলিপি খোকা ভাইকে ই-মেইল করে দিয়েছিলাম।আমার এক হাতে লাড্ডু আর অন্য হাতে প্রুফ চেক করা পান্ডুলিপি।বিশ্বাস করেন,আমার মাথা কাজ করছিলো না একদমই।সবটা অক্ষর ধরে ধরে কেউ যে লাল লাল অক্ষরে এভাবে চিনহিত করতে পারে তা এবার প্রথম দেখলাম।

মুহূর্তে পুরনো প্রকাশনার দিনগুলো মনে পরে গেল-আচ্ছা ভাই,আমি যদি গল্পে কোন পর্ন চিত্র লিখি ,তাও কি আপনি না পড়েই ছেপে দেবেন।প্রকাশকের তড়িৎ জবাব-আরে আপা,এতো সময় কোথায়?

এই কথাটি বলছি কাউকে খাটো বা বড় করার জন্য না।প্রকাশনা এমন এক শৈল্পিক ব্যবসা যা যেন তেন ভাবে শেষ করা যায় না।তুলিতে রঙ একটু কম লাগলেই ছবির অবস্থা দফা রফা।

তবে মাত্র তিন দিনের মধ্যে ঝক ঝকে “চলতি পথের গপ্প” যখন লাল আভরণে আমার দিকে চেয়ে হেসে দিল তখন বাকরূদ্ধ হলাম আমি।এ কি করে সম্ভব,যে মানুষটিকে আমি জীবনেও দেখিনি কেবল নামে চেনা তিনি কিনা আমার মতোন একজন ক্ষুদ্র লেখককে রীতিমতোন কথাসাহিত্যিক বানিয়ে দিলেন।

উল্লেখ্য ,এই বইটির জন্যে কোন মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থা করা হয়নি সময়ের অভাবেই।কিন্তু ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে উড়ে এসে তৈমুর মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়ে বললো-নীলা আপা,বইটি সম্পর্কে কিছু বলেন”।আমিও প্রকাশককে ফেলেই নাচতে নাচতে চলে গেলাম সাক্ষাতকার  দিতে।আহা,টেলিভিশনে নিজেকে দেখতে এতো ভালো লাগে কেন?

চলতি পথের গপ্পো পাওয়া যাচ্ছে বিদ্যা প্রকাশে,স্টল নং-৩৬১,৩৬২,৩৬৩,সোহরাওয়ার্দি উদ্যান।

খোকা ভাই খুব ভালো ,বইয়ের দাম মাত্র ৭৫ টাকা রাখছেন যাতে ছাত্ররাও বইটি পড়ে পাকনা পাকনা কথা লিখতে পারে।সবাইকে বিদ্যা প্রকাশে লাড্ডু খাওয়ার আমন্ত্রণ । (মিস করলেই পসতাইবেন।)