ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

“উফ মা ,এই রুম থেকে যাও তো”–এই ধরনের কথার সাথে আমাদের দেশের মায়েরা কম- বেশি সবাই পরিচিত এখন। কেবল কি মা, কোন কারণে বাবাও যদি অফিস থেকে ফিরে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া সন্তানের রুমে উঁকি মাড়েন তাহলেই তাকে শুনতে হয় সেই প্রচলিত কথা-“একটু ব্যস্ত আছি বাবা, তুমি খেয়ে নাও।”

কিন্তু কি সেই ব্যস্ততা? রাতের পর রাত মোবাইলে কথা চলছেইতো চলছেই, এখন কেবল মোবাইলেই কথা আটকে থাকেনা। তার মধ্যে দিয়েই হাত–পা বিস্তার করে আছে ফেইসবুক, স্কাইপে, ইমো এমন অনেক পপুলার সামাজিক মাধ্যম। সেই মাধ্যমের মধ্য দিয়ে আবার নিজেদেরকে দেখাও যায়, আনন্দ-রাগ–অভিমান সমস্ত কিছু শেয়ার দেওয়াও যায়। সন্তানদের মনের ভেতর যতো কথা আছে তা নিমিষেই স্ট্যাটাস হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ইথারে।

-“উফ, ফিলিং বোর!”

-“ফিলিং লোনলি!”

dizital

এই সমস্ত আবেগীয় অনুভূতি যখন চারদেওয়ালের বাইরে অন্য কারো ঘরে গিয়ে পৌঁছে যায় তখন আর তা নিজস্ব থাকে না। আবেগে আপ্লুত টিন এজে-র ইনবক্সে জায়গা করে হাজার রকম মুখোশধারী মানুষ। একটা ছোট্ট বাক্সের মধ্যেই ভাব বিনিময় চলতে থাকে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।কেউ কাউকে না জেনে, না বুঝেই ক্রমশ কাছাকাছি আসতে থাকে। কিন্তু, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এই কাছে আসাটা মেয়েদের জন্য অনেক বেশী বিপদ ডেকে আনে। কিছু দিন আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তার বন্ধুকে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করে নিজেরই প্রেমিকাকে। খবরে প্রকাশ, মেয়েটির সাথে মাত্র চার মাস আগে তার ফেইসবুকে পরিচয় হয়।

তাদের ঘনিষ্ঠতা কোন পর্যায়ে গেলে একটা মেয়ে কেবল ফেইস বুকে পরিচয়ের মাধ্যমে অল্প পরিচিত ছেলের সাথে দেখা করতে আসতে পারে সেটা গভীর ভাবে ভেবে দেখা উচিৎ। যেখানে মেয়েটির ভালো লাগা, মন্দ লাগার সমস্ত অনুভূতি শেয়ার করা উচিৎ ছিল তার বাবা-মায়ের সাথে  কিংবা বাড়ির অন্য কোন সদস্যের সাথে সেটা নানি-দাদি যেই হন না কেন। কিন্তু আমাদের অতি মাত্রায় প্রাইভেসি লাইফ ঘরের ভেতরের শেয়ারিংটার মাঝেও দেওয়াল দিয়ে রেখেছে ।

ফেইসবুকে ঘোষণা দিয়ে মডেল সাবিরার আত্মহত্যা জাতিকে একদম থমকে দিয়েছে। মেয়েটি প্রেমিকের কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে কেবল আত্মহত্যাই করেনি, রীতি মতন শেয়ার করে দিয়ে গেছে ভিডিওটি। দেখা গেল, এই ঘটনা তার বাবা – মা জানার আগেই বাইরের সবাই জেনে বসে আছে  যেখানে ঘরের ভেতর ঘোটে গেল এতো বড় ঘটনা তার কিছুই পাসে থাকা পরিবারের কেউ জানতেই পারলো না সাথে সাথে। প্রাইভেসি কোন পর্যায়ে গেলে তা বিধ্বংসী হয়, এটাই তার বড় প্রমাণ।

প্রশ্নটা আপনা থেকেই চলে আসছে, বাবা-মা দের ব্যস্ত লাইফ স্টাইল কি এর জন্য দায়ী? নাকি আজকের দিনের আধুনিক সন্তানেরা তাদের কোন বিষয় নিয়ে কথা বলাটাকে নাক গলানো মনে করে? এখানে আরো একটি বিষয় নিঁখুত ভাবে খেয়াল করা দরকার। আগের দিনে যৌথ পরিবারের সংখ্যা ছিল বেশি, তখন বাচ্চারা বড় হতো নিজের চাচা বা মামাদের পরিবারের সাথে। তখন কোন ঘটনা ঘটার আগেই বাচ্চারা কাজিনদের মধ্যে সহজেই আলাপ করতে পারতো। কিন্তু এখনকার এই ইউনিক পরিবার গুলোতে তার সুযোগ কোথায়?

শুধু ভুল বন্ধু বেছে নেওয়ার মধ্যেই এই সব বাচ্চাদের সময় আটকে থাকছে না। তারা নিজেদের উপর বিভিন্ন রকম এক্সপেরিমেন্টও চালাচ্ছে, তার মধ্যে আত্মহণন অন্যতম। ইউটিউবে অনেক ধরণের বিকৃত ভিডিও দেখা যায়, এগুলো সাধারণত অসুস্থ মানুষদের কর্মকান্ড দিয়ে ভরা থাকে। কিন্তু টিন এজ বাচ্চাদেরকে এই সব ভিডিও খুব আকর্ষণ করে, কারণ তাদের আছে অবাধে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ।

gp

দেশের মোবাইল কোম্পানিগুলো তো কেবল বিভিন্ন অফার দিয়েই খালাস, সামাজিক ভাবে তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। তাদের ব্যবসা হলেই চলবে, এই সব মনকাড়া অফার গুলো সাধারনত ছাত্র-ছাত্রীরাই লুফে নেয়। আজকাল গ্রামীণের বিজ্ঞাপনে দেখলাম মোবাইল চালু রেখেও প্রেমিক প্রেমিকাকে ঘুম পাড়াচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞান বলে-ঘুমানোর সময় মাথার পাশে ডিভাইস রাখা ক্ষতিকর। তাহলে বাণিজ্য করতে গেলে কি যুক্তি গুলোকে ধুলিস্যাত করতে হবে?

সে কারণে বাবা মাকেই তার নিজ বাচ্চাদের উপর নজর রাখতে হবে। কেবল ছড়ি ঘুরিয়ে না, তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্নসম্পর্ক তৈরি করতে হবে এবং তারা যে সব বন্ধুদের সাথে মিশছে প্রয়োজনে তাদেরকেও নিজের বন্ধু বানাতে হবে। অনলাইনে বন্ধুত্ব গ্রহণ বা বর্জনের বিষয় থাকে, কিন্তু অফলাইনে অর্থাৎ বাস্তব জীবনে কাউকে বন্ধু বানানো কেবল সময়ের ব্যপার মাত্র। আর সেই বাড়তি  সময় যদি আপনার সন্তানকে অনিশ্চিত জীবন থেকে রক্ষা করতে পারে তাতে এমন কি ক্ষতি!