ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
1

ও মোর রমজানের ওই রোযার শেষে এলো খুশির ঈদ …

খুশির ঈদ ,আনন্দের ঈদ, অপেক্ষার ঈদ-এই বিশেষণ কবেই যেন মরে ভূত হয়ে গেছে।সেটা কি কেবল বয়সের ভাড়ে দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নাকি চারপাশ থেকে ধেয়ে আসা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি ,আমি ঠিক জানি না।হবে হয়তো দুটোই,তবু ঈদের এই গানটা কানে বাজলেই মন ছুটে যায় স্মৃতিময় শৈশবে।

সেলুলয়েডের ফিতার মতোন একটা একটা করে আমার চোখের সামনে ভাসতে থাকে দূরন্ত বেলার দিন। এখনকার বাচ্চাদের মতোন ইট-পাথরে শহুরে জীবন আমাদের ছিল না।বাবা সরকারী চাকরী করতেন , বড় হয়েছি সরকারী কলোনীতে। তিন ভাই-বোন ছিলাম পিঠা পিঠি ,বাবা তখনো প্রমোশন পেয়ে বড় অফিসার হননি।আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন নামক কোন যন্ত্র ছিল না।তাই ঈদের দিন রাতে একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান-আনন্দ মেলা দেখার জন্য একজনের বাসায়ই পুরো কলোনী ঝাঁপিয়ে পড়তাম।

বিরক্ত?নাহ, ওই শব্দটি কা্রো জানা ছিল ্বলে কোন দিন অনুভব করিনি।মনে পড়ছে সুরভী,সূবর্না আর বিন্তি আপু-দীপা আপু্র কথা ,একটা একটা করে মুখ আরো স্পষ্ট হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে । ওই সময় আম্মা কিছুতেই রোযা রাখতে দিতেন না,তাই সেহরীতে যেন ঘুম না ভাঙ্গে সে জন্য শব্দ না করেই ভাত খেয়ে নিতেন আব্বা-আম্মা।কিন্তু আমি ঠিকি জেগে থাকতাম, রোযা রাখার কম্পিটিশন ছিল বন্ধুদের মধ্যে ।কে কয়টা রাখতে পারে সেই কম্পিটিশন,এমনো হয়েছে যে চুরি করে পানি খেয়ে বন্ধুদের কাছে ধরা দেইনি,পাছে আবার দাম কমে যায় ।

এমন বাহারি রঙের ইফতার আমি ছোট বেলায় দেখিনি,আব্বাকে দেখতাম অফিস থেকে ফিরেই চিড়া ভেজাতে।সাথে কলা আর গুড়।খেজুরতো ছিল একদম সাধারণ বিষয়,এর বাইরে যাদের অবস্থা ভালো তারা হালিম করতো ,কেউ বা নুডলস করতো।আমার স্পষ্ট মনে আছে ,এক ঈদে সকালে কিছুই খেলাম না।কারন ,একটা আন্টি ছিলেন যিনি খুব মজা করে পুডিং আর কাস্টার্ড করতে পারতেন,আমাদের মায়েরা অতোটা তখনো এ ব্যপারে রপ্ত ছিলেন না।আমরা পাঁচ বন্ধু(সুরভী-সূবর্না-বানী-তানিয়া আর আমি) সেই আন্টির বাসায় নামাজের পর পরই উপস্থিত হতাম,আন্টি বিষয়টা বুঝতে পারতেন ।প্রত্যেক বছর আমাদের জন্য স্পেশিয়াল পুডিং থাকতো, এমন আর একটা আন্টি ছিলেন যার হাতের চটপটি না হলে আমাদের ঈদ সম্পূর্ন হতোনা।এভাবে কেটে যেত সকাল থেকে সন্ধ্যা।

ঈদের জামা কেউ কাউকে দেখাতাম না -এটা খুব প্রাচীন একটা প্রচলন ছিল।আমাদের মায়েরাও নাকি তার বান্ধবীরা বাড়িতে এলে বালিশের নীচে বা খাটের তলায় নতুন জামা লুকিয়ে রাখতেন।এমন জমকালো মার্কেটতো তখন ছিল না, একই রঙের কাপড় কিনে আম্মা তিন ভাই-বোনকে জামা বানিয়ে দিতেন।মনে আছে আমি কলেজে পড়ার সময়ো মায়ের হাতে শেলাই করা কাপড় পড়েছি।তখন রোযার দিনেও মানুষের মধ্যে যেমন সংযম দেখতাম,তেমন ঈদ নিয়ে বাড়াবাড়ি রকম আদিখ্যেতাও চোখে পড়েনি।অবশ্য অতিরঞ্জিত কোন কিছু ছিল না বলেই হয়তো।পাড়ায় পাড়ায় হিন্দী গান বাজিয়ে ছেলেরা আড্ডা দিত না, মার্কেটের সামনে রঙের প্রলেপ লাগিয়ে কেউ গলা কেটা চাঁদা চাইতোনা। টিন এজ ভাই-বোনরা খুব সুন্দর করে সাংস্মৃতিক অনুষ্ঠান করতো।চুনোপুটি হিসেবে আমাদের মাঝে মধ্যে মাইক্রোফোন দেওয়া হতো ছড়া  বলার জন্য।পুরো কলোনী নেমে আসতো সেই সব অনুষ্ঠান দেখার জন্য।এভাবেই আনন্দময় ঈদ কখোন ভোর হয়ে যেত, রাতে ঘুমানোর সময় কাঁদতাম আর আল্লাহকে বলতাম-ঈদ কেন দুই দিন হয় না?

Eid-ul-Fitr_National+Eid+Gah_170715__0010+(2)

এখন আমার কাছে ঈদ মানে -গাধার কাঁধে চল্লিশ মণ ওজনের একটা বোঝা।।আর আমার মায়ের কাছে অপেক্ষা, তার বধূ জীবনে আব্বা তাকে আহামরী শাড়ি বা অলংকার দিয়ে ভরিয়ে দেননি,সেটা নিয়ে কোন দিন তাকে আফসোস করতে দেখিনি।কিন্তু ,বড় হবার সময় অনেক আন্টিকে দেখেছি একটা ভালো শাড়ির জন্য স্বামীর সাথে ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে যেতে।আম্মা তখনো যেমন শান্ত ছিলেন, এখনো তেমন।এখনো ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে তার কোন প্রত্যাশা নেই,দিলে ভালো ;না দিলে ক্ষতি নেই।তার সমস্ত আগ্রহ নাতীদের নিয়ে, ছেলে মেয়েরা নাতি-নাতনীদের কাপড় ঠিক মতো দিল কিনা সেটা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন।আমি নিজের জন্য কখনো শপিং-এ যাই না, ঈদ হোক আর কারো বিয়ে; কয়েক গজ কাপড় এক সাথে কিনে ফেলি, তারপর ধারাবাহিক ভাবে সেটা বানাতে থাকি।

কিন্তু এবার যে হারে আমাকে মার্কেটে হাঁটতে হয়েছে,আর ধাক্কা ধাক্কি শামলাতে হয়েছে তাতে করে এক দিনে ওজন কমেছে কম করে হলেও দুই কেজি।আমাদের তিন ভাই-বোনের মাশাল্লাহ তিন তিনটে কন্যা।আম্মার ইচ্ছা তারা একই রকম কাপড় পড়ে ঈদ করবে, ঠিক আমরা যেমন করতাম।কিন্তু তার বয়স হয়ে গেছে,শেলাই মেশিন নিয়ে বসা সম্ভব না।আর তাছাড়া আজকালকার বাচ্চা এই সব পুরনো ডিজাইনে মন ভরবেনা।কি আর করা ! একটার বয়স চার ,আরেকটার সাড়ে চার আর বড়টার আট।ছোট দুই কন্যার ড্রেস ধানমন্ডি পাওয়া গেল,কিন্তু বড় কন্যার জামা আর মিলাতে পারিনা।

ঈদ শপিং নিয়ে আমার একটা গবেষণা আছে। যেমনঃ একটা শ্রেনী আছে যারা শবেবরাতের পর পরই ঈদের কেনা কাটা শেষ করে ফেলে, আর একটা শ্রেনী আছে যারা করে প্রথম রোযার দিকে,আর বড়লোক শ্রেনী পাড়ি জমায় বিদেশে এবং সবচাইতে শেষের গুলা জম্মের আরাম প্রিয় তারা যায় শবে-কদরের পরের দিন।আমি সেই শেষ কাতারের মানুষ, যেই আউট লেটেই ঢুকছি, একটাই কথা-আমাদের কালেকশনতো শেষ ম্যাডাম ,এখন ওই সব কিছু হবে না।কিন্তু আমার কন্যার আবদার-প্রজাপতি জামা,তার সাথে তাল মিলিয়ে অন্য দুই বো্নদের যদি প্রজাপতি জামা না দেই তাহলে কেমন হবে?এই চিন্তায় প্রথমে মিরপুরের সব গুলো শো-রুম ঘুরলাম,তারপর গেলাম গাউসিয়া।আমি এই মার্কেটের একটা নামকরণ করেছি বহু আগেই ,গাউ-ছুইয়া মার্কেট।যেখানে গেলেই গা ছুঁয়ে দেওয়া যায়, এখানে সব প্রোডাক্ট মেয়েদের কিন্তু কিছু ছেলেরা শুধু শুধুই এই মার্কেটের গলি ধরে হাঁটে আর মেয়েদের গায়ে ধাক্কা দেয়।মার্কেটে ঢোকার মুখেই ওয়েলকাম টিউন কানে এল-পকেট,মানিব্যাগ সাবধান।কি ভয়ংকর ওয়েলকাম টিউন স্বয়ং নিরাপত্তা কর্মীর মুখে ,আমি ভেতরে আর প্রবেশ করলাম না,চলে এলাম ধানমন্ডি।একটি এলাকায় কয়টা শপিং মল করতে পারলে ভালো ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি করা সম্ভব তা একমাত্র ধানমন্ডিওয়ালা্রাই বলতে পারবেন।ঝিগাতলার রাস্তায় কোন রিক্সা চালানো সম্ভব না,বিশেষ করে ইফতারীর আগ মুহূর্তে।রাস্তার উপর যংযোম ভাঙ্গনের যে অসংযোমি পায়তারা চলতে থাকে রীতিমতোন ভয় লাগে আমার-মানুষ এতো খায়,কেমনে খায় এতো কিছু???

যাই হোক আমাদের বড় কন্যার জন্য জামা কেনা হয়েছে,প্রজাপতি না হলেও এম্ব্রয়ডারী করা ফ্রক।দাদীর মুখে হাসি,আমার স্বস্তি।কিন্তু একি হায় !!!তারা তিন কন্যা ঈদের জামা পড়ে প্রজাপতি হয়ে এক তলা থেকে চার তলা উড়ে বেড়াচ্ছে।এদের তো আবার এক ড্রেসে ঈদ হয় না,একেক জনের তিনটা চারটা করে জামা।সকালে একটা পড়ে, দুপুরে পড়ে আর একটা,ঘুমানোর আগেও দেখি কন্যারা জামা বদলিয়ে নতুন জামা পড়ে ঘুমাতে যায়।ঈদের জামা কাউকে দেখাতে হয় না-এই প্রাচীন ধারণা তাদের মোটেও ছুঁতে পারছেনা।বার বার এসে আমাকে জিজ্ঞেসও করছেনা-মা তুমি ঈদের দিন কি রান্না করবা?কারন,তাদের জন্য বাহারী পদ সাজানো থাকবে টেবিলে, তারা ভুলেও পুডিং বা পায়েশ চেখেও দেখবেনা।বেলা হতেই তাড়া দেবে-মা , কে এফ সি চলো।ওখানে বাচ্চাদের খেলার জন্য এক ফুটের একটা গেমস জোন আছে,আর আছে কালো রঙের পেপসি।

ঐ এক চিলতে খেলার জায়গাতেই আটকে গেছে আমাদের বাচ্চাদের শৈশব।