ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

খুব জোর বাতাস বইছে সকাল থেকেই। হঠাত ঘুম ভেঙ্গে গেল কাঁচের গ্লাসে কিছু একটা পরার শব্দে। সেই যে ঘুম ভাংলো, আর এলোনা। মাথাটা খুব ব্যাথা করছে। ভাবলাম, হাতে যা কাজ আছে বাড়িতে বসেই শেষ করে নেই। তাই আর বের হইনি। বৃষ্টি হলে এমনিতেই আমার ঝিম মেড়ে বসে থাকার অভ্যাস। গরম চায়ের কাপ ঠোঁটে ছুঁয়ে টেলিভিশন ছেড়ে বসলাম। ফরিদপুরসহ প্রায় প্রত্যেকটি অঞ্চলে খুব ঝড় হচ্ছে,কিছু হতাহতের খবর দেখছি স্ক্রলে। প্রায় সাড়ে এগারোটায় দেখলাম -শহরের মাঝখানে বসুন্ধরা সিটি পুড়ছে। এমনিতেই এমন আটশাট একটা শপিং মল, তার উপরে প্রায়ই থাকে উপচে পরা ভীড়। দুইবছর আগেও এই মলে আগুন লেগে মানুষ মারা গেছে। সেই একই ঘটনা কিভাবে  দু’বার ঘটলো সেটা এক রহস্য ,আবার যে ঘটবেনা তার কোন গ্যারান্টি নেই।

বন্যা বা ঝড় অনেকটাই প্রাকৃতিক আঘাত, ওটা ইচ্ছে করলেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু আগুন লাগার ঘটনা কারো না কারো আসাবধানতা থেকেই হয়। উত্তরার মার্কেটে আগুন,গার্মেন্স গুলোতে প্রায়শই আগুন, বনশ্রীতে আগুন, বসুন্ধরায় আগুন-এর সবটাই মানুষের সৃষ্টি। কিন্তু কেন যে মানুষ এখনো সচেতন না, কে জানে। এমনিতেই একুশে আগস্ট আসার আগেই মন কেমন বিষন্ন লাগে, আজ যেন বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে পুরো শহরে জুরে।

b

কিছু সময়ের মধ্যেই স্পেনে মৃত লাশের খবর এলো। এবার আমি উঠে টিভিটাই বন্ধ করে দিলাম। এই বাক্সটা খুব খারাপ, আমাকে কোন দিন ভালো খবর দেয় না। খুব বৃষ্টি শুরু হলো আচমকা, মনে হলো- অনেক দিন ভিজি না। যদিও ভাদ্রের পানি খুব ভালো না, তবু আমি ছাদে উঠে গেলাম। এই এক চিলতে চিলেকোঠায় কেটেছে আমার কলেজ বেলা। আকাশে বিকেল নামতেই বাড়ির সব মেয়েরা এখানে বসে যেতাম পাটি বিছিয়ে, কেউ গান করতো, কেউ নাচ দেখাতো। কি তুমুল আড্ডা জমতো রাতের পর রাত, আর চাঁদ রাতে বিদ্যুৎ না থাকলেতো আরো পোয়া বারো। রাতের খাবার দাবার আমরা সেড়ে নিতাম ছাদেই, তখন ঘাড়ের উপর এমন বাসা হয়নি। ছাদে হাঁটতে গিয়ে অনুভব করলাম-শত শত চোখ ঘুরে বেরাচ্ছে। চারপাশে কেবল মেস বাক্সের মতোন ফ্ল্যাট বাড়ি। কারো বাড়ির বেডরুম কারো বাড়ির রান্না ঘরের মুখোমুখি। একজনের বাড়ির বারান্দা আর একজনের সাথে লাগানো।

আধুনিকতার আর কোন স্তরে পৌঁছলে নিজেকে পুরোটা আধুনিক বানানো সম্ভব? বাচ্চাগুলোযে খেলবে তার জন্য একটা মাঠ পর্যন্ত ছাড়িনি আমরা। ছাদের উপরই যতো লম্ফ -ঝম্ফ। বার বার মানা করতে হচ্ছে-ছাদের কোনায় যেও না। এদেরকে বল দিয়ে দিলেও খেলতে পারবে না, ছাদের বাইরে চলে যাবে। কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে কম্পিউটারে গেমস খেলতে নীচে চলে গেল। ছেলে মেয়েদেরকে ব্যস্ত রাখার জন্য আমরা একটা সংগঠন করেছিলাম তা প্রায় দশ বছর আগে। বেশ কিছু মঞ্চ নাটক আর সাংস্মৃকিত অনুষ্ঠান হয়েছিল সেই সুবাদে। পরেতো দেখলাম, এতো চ্যানেল; সবাই স্টার হবার জন্য ছুটছে। আমি চলে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে, সিনিয়র অনেকেই ছিলেন তখন ঙ্কিন্তু সময় আর কেউ দিতে পারলেন না। এখন তাদের সাথে আমার কথা হয় ফেইস বুকে, কি আশ্চির্য যাদের বাড়ি দেখা যায় আমার বাড়ির ছাদ থেকে।

কি এক অজানা গন্তব্যে আমরা ছুটছিতো ছুটছিই। আধুনিক জীবন-যাপন কি দিচ্ছে আমাদের? এক রাশ ব্যস্ততা। আর নিয়ে নিচ্ছে মানবিক স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। নিজের জন্য প্রতিদিন জমা করে রাখছি- একরাশ শূণ্যতা।