ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 
suiside

আজ সারাদিন ধরে কেন জানিনা সবার সাথে মৃত্যূ নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে গেছে, এটা পুরনো গল্প আর আমরা এটাও জানি যে নারীর সংখ্যাই এই লিস্টে সব চাইতে বেশি। আমি কখনো আত্মহত্যার চেষ্টা করিনি, কলেজ পড়াকালীন সময় একবার ঘুমের অষুধ খেলাম। না,সুইসাইড করার জন্য না সেটা।অভিনয় করার জন্য,ইচ্ছে করেই বেশী খাইনি। কেবল একটু খানি ঘুম ঘুম এসেছিল।ওতেই দেখি বাড়ি শুদ্ধ মানুষ অস্থির। সন্তানকে বাবা মা কতোটা ভালোবাসেন তা পরখ করবার জন্য ওই জিনিস না করলেও চলতো।কিন্তু আমি ছোট বেলা থেকেই অনেক সেনসিটিভ।কারো একটু অবহেলা পাহাড় সমান অভিমানে রূপ নেয়।

কিন্তু সেই অভিমানী মেয়েটার পূর্ণ বয়সে নিজের স্বামী যখন গলা টিপে ধরলো তখন কেবল ছটফট করেছিলাম বাঁচার জন্য। শেষ নিঃশ্বাস কাকে বলে তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম।কেবল বার বার চোখের সামনে সন্তানের মুখ দুলে উঠছিলো। সত্যি আমার আর কিছুই মাথায় আসেনি।ও তখন খুব ছোট,  আমি মায়ের কথা একবারো ভাবিনি, কেবল ভেবেছি-আমি চলে গেলে ছেলেটার কী হবে। নাইবা থাকলাম ওর পাশাপাশি সব সময়। তবু একটা ফোন করলেই জানতে পারছি-ছেলেটা কী করছে।এই জানতে পারার ইচ্ছেটা আমাকে হায়েনার মতোন শক্তি এনে দিল। কেউ একজন কলবেল চাপ দিতেই টং করে একটা শব্দ হলো। কর্তা সাহেব আমার সুউচ্চ গলা খানা ছেড়ে দিলেন, সে যাত্রা বেঁচে গেলাম।

মধ্যবিত্ত নারীদের বিয়ের পর প্রথম যেই তাবিজটি পড়ানো হয় তা হলো -মেনে নাও মার্কা তাবিজ।তুমি তোমার শ্বশুর বাড়ির লোকদের মনে না নিলেও মেনে নিতে বাধ্য তাদের আচরণ আর এই আচরণ এক সময় পাহাড় সমান ভাড়ি হয়ে যায় মেয়েদের জীবনে।মেয়েটা বাবার বাড়িতে আশ্রয় খোঁজে,কিন্তু সেই আশ্রয় কয়টা মেয়ে পায়।যে পরিবারে বড় ভাই আর ভাবী থাকে সেখানে কোন নারীর সন্তানসহ অনুপ্রবেশ পৃথিবীর সমস্ত গর্হিত কাজের মধ্যে অন্যতম একটি।

খুব সহজ ভাবেই ভাবতে পারিনা, আজ আমি মেয়েকে নিয়ে যদি নিজের ফ্ল্যাটে উঠতে না পারতাম তাহলে আমি কী করতাম। হয়তো সুইসাইড নোট লিখে কন্যাকে বাপের ঘাড়ে দিয়ে চিরতরে টাটা বাই বাই জানাতাম। কিন্তু আমি কাজ করতে সমর্থ এবং আমার পায়ের নীচে মাটি আছে। তার চাইতে বেশী আছে-আত্মবিশ্বাস। সমাজ কোন দিন আমার এই জীবন ব্যবস্থাকে মেনে নেয়নি, মেনে নেয়নি পরিবারের কেউ। তবু এই যুদ্ধটা আমাকে বাধ্য হয়েই করতে হচ্ছে একদম অনিচ্ছাকৃত। যে সব মেয়েরা বড় চাকরি করছেন, তাদের নিজেদের থাকার ব্যবস্থা আছে তাও তারা কেন সুইসাইড করে? অবশ্যই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার জন্য। কিন্তু সে তো মুক্ত হয়ে কোন এক তথাকথিত পরজন্মে পাড়ি দিয়ে চলে গেল আর যে সন্তানকে রেখে গেল তার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে একবার কী ভাবার মতোন মনের অবস্থা তার থাকে? হয়তো না। আমার কাছে মনে হয়,কোন নারী যখন তার চেনা বলয় থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে তখন তার বন্ধুর প্রয়োজন হয় সব চাইতে বেশি।আর সেই বন্ধুটি যদি মুখোশধারী শয়তান হয় তাহলে মেয়েটির জীবনে নেমে আসে চরম বিভীষীকা।

কৈশোরে মেয়েরা খুব আবেগপ্রবণ থাকে তাই হয়তো তাদের মধ্যে  সুইসাইড করার প্রবণতা বেশি। কিন্তু একজন পূর্ণ বয়স্ক মহিলা কেন এই পথ বেছে নেন? অনেক সময় দেখা যায় মায়েরা ছেলে মেয়েসহ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। কিন্তু কেন? কেবল কী মানসিক অস্থিরতা? সামাজিক কোন চাপ নেই তাদের উপর? অনেকেই বলেন-তুই মরবিতো মর, বাচ্চাদের মারলি কেন? তার মানে কী মেয়েটার মরে যাওয়াটাই উত্তম পন্থা ছিল? ওই সময়ে কোনটা ঠিক ছিল আর কোনটা বেঠিক সেটা থার্মোমিটার দিয়ে মাপতে বসবে কে?

যে সব মেয়েরা দেহ ব্যবসা করে পেট চালায়  তাদের প্রতিমুহূর্তে শুনতে হয়-গলায় দড়ি দে। কিন্তু সেই বেশ্যালয়ে যে সব সুপুরুষ যাতায়াত করে তাদের কে বলবে -মরে যাবার কথা। সমাজে যতো অনাচার তার দায় একলা নারী কেন বহন করবে? একজন নারী প্রকাশ্যে পরিচয় দিতে পারে না-আমি ডিভোর্সড। এখনো আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করে- আপনার স্বামী কি করেন? তার মানে কী আমার স্বামী থাকাটা আমার চাইতেও তাদের কাছে অনেক বেশি জরুরি? আমি কী খাচ্ছি, কী পড়ছি, কী ভাবে একটু  একটু করে মেয়েকে বড় করছি তা নিয়ে কারো কোনই মাথা ব্যথা নেই।একটাই প্রশ্ন-রাতে কার গাড়িতে বাড়ি ফিরলাম? এই মধ্যবয়সে এসে আমাকে দাবার গুটির মতোন হিসেব করে পা ফেলতে হয়, কোন পর পুরুষের সাথে আবার বেশি কথা বলা হয়ে গেল কীনা। কিন্তু,তাদের সাথে কাজ করেই আমাকে পেট চালাতে হয়, বই ছাপাতে হয়, লেখা প্রকাশ করাতে হয়। দুনিয়ার তাবত প্রেসে যদি কেবল মেয়েরা থাকতো তাহলে আমার চরিত্র হতো দুধে চোবানো তুলশী। বশ্য লেজবিয়ানের তক্মাটা যে গায়ে পড়তো না তার কোন গ্যারান্টি নাই। কারণ, সমাজের কাজ খালি সিল মারা, সিল তোলার কোন পাঁয়তাড়া নাই।

নারীর চরিত্র হলো-কচু পাতার উপর এক টুকরো পানি, একটু ধাক্কা লাগলেই তা পড়ে যায়।ছেলে কলিগদের সাথে রিক্সায় ঘুরলে হয়ে যায় চরিত্রহীন আর একা একটি ফ্ল্যাটে বাসা ভাড়া করে থাকলে হয় বেশ্যা। নারীর যে কতো রকম বিষেষণ তা বাংলা একাডেমির বই ঘাটলেই বের হয়ে আসবে।

আমার মেয়েটাও একটা মেয়ে। তাকে আমি খাওয়াই, আমিই পড়াই। কিন্তু সারাক্ষণ তাকে প্রশ্ন করা হয়-তোমার বাবা কোথায়?তার বাবা কোথায় সেটা জানাটা আমাদের সমাজের কাছে খুব দরকার। আমার ওইওটুকুন মেয়ে ফ্যালফ্যাল করে প্রশ্ন করে-মা,আমার বাবা কোথায়? গত প্রায় পাঁচ বছরে সে তার বাবার মুখ দেখেনি। জন্মদাতা তাকে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি।তাহলে আমার এখন কী করা উচিত হে মহান সমাজ? একটা বাবা কিনে নিয়ে আসবো বাণিজ্য বিতান থেকে নাকি গলায় রশি লাগিয়ে ঝুলে পড়বো সিলিং ফ্যানের সাথে।

একটা জন্মদাতার অবহেলায়ই নিতে পারিনি এ জন্মে, আর একটা নতুন উপদ্রব (হয়তোবা) এসে যদি আমার মেয়ের শরীরে হাত দেয় তখন সত্যি সত্যি বিষ খেয়ে সুইসাইড নোট বা ফেইসবুক লাইভ ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন গতিই থাকবেনা। বুদ্ধিমান সমাজ ,আমাকে বলে দিন আসলে সুইসাইড করার জন্য এই সময়টাই উপযুক্ত কীনা।