ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, একটি মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র দেশের মাত্র ৬টি হলে মুক্তি দেওয়াতে আক্রোশে ফেটে পড়েছিল বাংলাদেশের দর্শক। তাদের প্রশ্ন ছিল হল মালিকদের প্রতি- কেন দেশি সিনেমা  ভারতীয় সিনেমার চাইলে কম সংখ্যক হলে মুক্তি পেল? দর্শকদের এমন প্রশ্নের জবাব বুঝি আর দিতে হলো না হল মালিকদের। কারন, গত ৬ অক্টোবর থেকে দীপংকর দীপনের ঢাকা অ্যাটাক যখন দেশের ১২৫টি হলে পুরো হাউজফুল চলছে তখন হল মালিকদের হাস্বোজ্জ্ব্যল মুখটাই বলে দিল–সিনেমা এমন চললে মুক্তি দিতে ব্যবসায়িক কোন বাধা নেই। এ সময়কার চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন ‘ঢাকা অ্যাটাক` ছবিটি সাম্প্রতিক কালের অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি হতে যাচ্ছে। ৬ অক্টোবর শুক্রবার ছবিটির নিট সেল ছিল ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। আর গ্রস সেল ছিল ৪ কোটি ২০ লাখ। পরদিন শনিবার ছবিটির নিট সেল ছিল ৭১ লাখ টাকা। গ্রস সেল ছিল দুই কোটি ৮৪ লাখ টাকা, দুইদিনের মোট আয় এক কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এরপর ছবিটি ২৭ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেলে কি ধরণের আয় হবে তা কেবল সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

dh-3

ছবি: সিনেমার একটি দৃশ্যে আরেফিন শুভ ও মাহিয়া মাহি

ঢাকা অ্যাটাক সমগ্র

১৪৮ মিনিট ব্যাপ্তি ২০১৭ সালের এই একশন ধর্মী সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন দীপংকর দীপন। ছোট পর্দার নির্মাতা দীপংকর দীপন তার প্রথম চলচ্চিত্র ঢাকা অ্যাটাক নির্মানের পূর্বে প্রায় এক যুগ ধরে তিনি একাধিক একক নাটক, টেলিফিল্ম ও দর্শকনন্দিত ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করেছেন। ঢাকা অ্যাটাক দীপংকর দীপনের প্রথম চলচ্চিত্র। ২০১৬ সালের গোড়া থেকে তিনি ছবিটির চিত্রগ্রহনের কাজ শুরু করেন। সিনেমাটি রচনা করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার সানী সানোয়ার। ছবিটি প্রযোজনা করেছে থ্রি হুইলারস ফিল্মস, স্প্ল্যাশ মাল্টিমিডিয়া ও কিউ-প্লেক্স কমিউনিকেশন এবং পরিবেশনা করে টাইগার মিডিয়া। এই ছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ, মাহিয়া মাহি, এবিএম সুমন, কাজী নওশাবা আহমেদ, তাসকিন রহমান, আফজাল হোসেন, আলমগীর হোসেন, হাসান ইমাম, শতাব্দী ওয়াদুদ এবং এহসানূর রহমান। মালেশিয়া পুলিশ অফিসার চরিত্রে কাজ করেছে সে দেশের বিখ্যাত দুই অভিনেতা ফাহরিন এবং সায়েলা সাবি। পোশাক ডিজাইন – নাজমি জান্নাত, সানী সানোয়ার এবং  সেট ডিজাইন করেছেন আনন্দ আদ্য।

dh-7

ছবি: পরিচালক দীপংকর দীপন

গল্প সংক্ষেপ

ঢাকায় একাধিক খুন ও বোমা বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অবস্থান চিত্রিত হয়েছে এই ছবিতে।পুলিশ অ্যাকশন থ্রিলার হিসেবে  দেখানো হলেও পরিচালক বলেন-এটি শুধু পুলিশের সিনেমা নয় ,এটি অপশক্তির বিরুদ্ধে দেশের সমস্ত মানুষের ঘুরে দাঁড়াবার সিনেমা। সিনেমার শুরুতে দেখানো হয় অজানা একটি সন্ত্রাসী চক্র কর্তৃক ঢাকার বিভিন্ন স্থান আক্রান্ত হচ্ছে । কে বা কারা ঢাকার কয়েকটি মূল পয়েন্টে বোমা পুতে রাখে , নাজেহাল  হয়ে ক্লু খুঁজে  পুলিশ এবং সাংবাদিক। একের পর এক খুন হতে থাকে মানুষ ,লাশের গায়ে পাওয়া যায় স্মাইল চিনহ ।সেই চিনহের উৎস ধরেই আবিদ রহমান (আরেফিন শুভ), ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং বোমা নিষ্ক্রিয় বিশেষজ্ঞ খুঁজতে থাকেন  খুনীকে ।তার সাথে যোগ দেন আশফাক হোসেন (এ বি এম সুমন ), ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ বাহিনী সোয়াটের কমান্ডার ; তার পুরো টিমকে সাথে নিয়েই। সাজেদুল করিম (শতাব্দী ওয়াদুদ)- বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তার নির্দেশে প্রত্যেকে তার নিজস্ব বাহিনী নিয়ে খুনী চক্রকে খুঁজতে থাকে, এমন কি মালয়শিয়ায়  ট্রেনিং- এ ব্যস্ত পুলিশ অফিসার শিপন মিত্র বাদ পড়ে না। পুলিশের পাশাপাশি খুনীর ক্লু খুঁজতে যোগ দেন চৈতী(মাহিয়া মাহি), একটি টেলিভিশন চ্যানেলের তদন্তকারী সাংবাদি্ক ।বিভিন্ন ক্লু থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আবিদ সোয়াট বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হন বান্দারবানে ,সেখানে ভয়ংকর  সন্ত্রাসীর খোঁজ মেলে (এহসানূর রহমান ।) তার দেওয়া গাড়ি বিক্রির তথ্য থেকেই বের হয়ে আসে আরো অনেক সাংঘাতিক ঘটনা ।হাসপাতাল উড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা চলতে থাকে ,আবিদ জীবন বাজি রেখে বোমা নিষ্ক্রিয় করতে থাকেন ,সোয়াট বাহিনী ঘিরে থাকে সেই সন্ত্রাসী জিসানকে (তাসকিন রহমান ), নাটকীয়তা চরমে রূপ নেয় । ঢাকার আরো একটি স্কুল তখন বোমার আঘাতে ভূমিস্মাৎ হয়ে যাবার সম্মুখীন। মুখোমুখি দাঁড়ায় আবিদ এবং জিসান ।

dh-4

ছবি: সিনেমার পোস্টার

নামকরণের সার্থকতা

এই সিনেমার নামকরণ ছবির প্রথম ১৫ মিনিটেই সার্থকতা পেয়েছে ।কারন ঢাকাকে ঘিরে যে ধ্বংসের  জাল এই সন্ত্রাসী তৈরী করেছিল তা পরিচালক নিঁখুতভাবে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। তারপরো একে পুরোপুরি একশন থ্রিলার মুভি বলতে আমি নারাজ।কারন এই ধরণের সিরিয়াস কোন অপারেশনে এই দেশের কোন নারী সাংবাদিক বার বার এসে ধর্ণা দিয়েছেন কীনা সেটা সন্দেহ। তাও আবার আবিদ যখন খালি হাতে বোমা নিষ্ক্রিয় করছিলেন, তার ঠিক দশ মিনিট আগেই চৈতীর মাঠে ঢুকে যাওয়াটাকে খুবই কেয়ামত থেকে কেয়ামত টাইপ প্রেম কাহিনী মনে হয়েছে। পরিচালক যদি দাবাং বা সিঙ্ঘাম টাইপের ইন্ডিয়ান ট্রিপিক্যাল একশান মুভি বানাতে চাইতেন তাহলে এই নারীর কাঁদো কাঁদো চোখ আমাদের ভালো লাগতো। কিন্তু প্রথম থেকেই দর্শক যেখানে হলিউড একশন মুভির টেস্ট নিচ্ছে তখন ছবির অর্ধেকে এসে ক্রাইম রিপোর্টারের এই নায়িকা সুলভ আচরন ভালো লাগেনি। তাই ঢাকা অ্যাটাক দেশিয় একশন থ্রিলার হয়েই রয়ে গেল। সাংবাদিককে সাংবাদিকতার জায়গায় থাকতে দিলে এটা হতে পারতো আন্তর্জাতিক মানের একশন থ্রিলার মুভি ।

dh-6

ছবি: গোয়েন্দা পোশাকে অভিনেতারা 

চরিত্রায়ন

পুলিশের পোশাকে আরেফিন শুভকে চমৎকার ভাবেই একজন দক্ষ পুলিশ অফিসার হিসেবে মানিয়ে গেছে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যখন দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত এই অফিসার মাহির সামনে দাঁড়িয়েছেন, তখন ছন্দপতন ঘটেছে তার অভিনয়ে।এই ধরণের অফিসাররা তাদের আবেগ কোন ভাবেই বাইরে প্রকাশ করেন না। বিশেষত বোমা নিষ্ক্রিয় করণের মতোন একটি জটিল মুহূর্তে তো নয়ই। কিছু সংলাপ বাদ দিলে আরেফিন শুভ ভীষন দক্ষতার সাথে বোমা নিষ্ক্রিয় বিশেষজ্ঞ্র চরিত্রটি সফলতার সাথেই ফুটিয়ে তুলেছেন এবং নাট্যকার সানী সানোয়ার যে তাকে নিজ হাতে প্রশিক্ষন দিয়েছেন সেই বিষয়টিও ছিল স্পষ্ট ।এর আগে ‘মুসাফির’ (২০১৬) ছবিতে সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টের কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক অপরাধী চরিত্রে শুভ কাজ করেন। সুতরাং এই ধরণের পেশাদার কাজের অভিজ্ঞতা তার আগেও ছিল, সে তুলনায় তার এবারের কাজটাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যায় না। কাহিনীর প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে মাহির সাথে কথোপকথনে মনে হয়েছে তিনি চরিত্র থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। মুসাফিরে কিন্তু মারজানের পাশাপাশি তাকে তা মনে হয়নি।

এ বি এম সুমন এক কথায় বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অভিনেতা। তাকে আমি নায়ক হিসেবে চিন্হিত করবো না। তিনি আপাদমস্তক একজন অভিনেতার পরিচয় দিয়েছেন এই ছবিতে। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর জন্য নিজের হাতে খাবার পরিবেশনের সময় তাকে আমরা একজন আদর্শ স্বামী হিসেবে পাই, আবার যখন খুনী জিসানের দিকে বন্দুক তাক করেন তখন বুঝতে পারি তার চোখে মুখে দেশের মানুষের জন্য কী ভীষন মায়া। কোন সংলাপের বাহুল্য নয়, সুমন তার কমান্ডার চরিত্র ফুটিয়েছেন তার অভিব্যাক্তিতে এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজে। সোয়াটের দক্ষ অভিসারের চরিত্রে সুমনকে কাস্ট করে দীপংকর  দীপন একটি অসাধারণ কাজ করেছেন।

কাজী নওশাবা, যাকে এতোকাল জেনে এসেছি খুব নরম-কোমল অভিনেত্রী। কিন্তু স্বামী ডেঞ্জারাস জোনে আছেন বুঝতে পেরে চোখের যে চাহনি তিনি প্রকাশ করেছেন, সেই চাহনি কোটি কোটি দর্শকের হৃদয় কাড়তে সক্ষম হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আমরা চলে গেছি বিগত দিনে ঢাকায় ঘটে যাওয়া অনাকাংখিত অনেক ঘটনায়। যেখানে অনেক পুলিশ অফিসারদের জীবন চলে গেছে দুর্বৃত্তদের গুলির আঘাতে। এতোকাল কেবল পত্রিকায় পড়েছি সেসব সংবাদ, কিন্তু নওশাবার ছোট্ট পরিসরে হৃদয় কাঁপানো অভিনয় দিয়ে বুকের অধ্যে এক অজানা আর্তনাদের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। কমান্ডো অফিসার পত্নী সন্তান প্রসবের প্রাক্কালে নিজের যন্ত্রণা উপেক্ষা করে বলেছেন- ওকে সাবধান থাকতে বলবেন। শুরু থেকে সন্তানের ভূমিষ্ট হওয়া অব্দি যেটুকু সময় নওশাবা পর্দায় ছিলেন তার চরিত্রের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সনর্থ হয়েছেন।

শতাব্দী ওয়াদুদ অর্থাৎ সাজেদুল করিম, যিনি এই ছবিতে কম সময় উপস্থিতি থাকলেও এডিসির নির্দেশেই পুরো পরিকল্পনা চালায় স্কোয়াড ও পুলিশ বাহিনী । যারা গেরিলা দেখেছেন তারা জানেন অভিনেতা শতাব্দীর অভিনয় দক্ষতা সম্পর্কে।গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা সাজেদুল করিম চরিত্রে শতাব্দী ওয়াদুদের চৌকস অভিব্যক্তি ও বিচক্ষণতা দিয়ে তিনি নিজের কাছে পুনরায় নিজেই প্রতিদ্বন্দী হয়ে রইলেন বাংলা সিনেমার ইতিহাসে।

মাহিয়া মাহির ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে পর্দায় আবির্ভাব খুব জাঁকজমকের সাথেই ঘটেছিল। এর আগে তদন্তকারী সাংবাদিক চরিত্রে তাকে দেখা গেছে  দুটি ছবিতে , ‘দেশা : দ্যা লিডার’ (২০১৪) ও ‘ওয়ার্নিং’ (২০১৫)। সে তুলনায় এবারের চরিত্রে অভিনয়ে কোন পরিপক্কতা আসেনি। এক তীক্ষ্ম গতিতে আবিদকে সে প্রশ্নের জালে ফেলে দিচ্ছিল; মনে হচ্ছিল সাংবাদিক-পুলিশ ক্ল্যাশ ঘটতে যাচ্ছে।কিন্তু সিনেমা অর্ধেকে গিয়েই বান্দারবানে তারা দেখে  প্রেম হয়ে গেল। তীক্ষ বুদ্ধি সম্পন্ন সাংবাদিক ভূমিকায় মাহিকে কিছুটা মানিয়ে গেলেও প্রেমিকা  মাহিকে দেখতে মোটেও ভালো লাগেনি। হয়তো গল্পের প্রয়োজনে তাকে আদিখ্যেতা দেখাতে হয়েছে কিন্তু তার  সাথে এপিয়ারেন্স বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এবং সংলাপ বলা অনেক খানি পড়া মুখস্থের মতোন মনে হয়েছে ।শুধুমাত্র টুপটাপ গানের দৃশ্য ছাড়া মাহিকে তেমন  সাবলীল লাগে নি । দীপন সিকুয়াল বানালে এই চরিত্র নিয়ে আবার ভাববেন আশা করি ।

দীপংকর দীপনের সবচাইতে বড় উপহার ছিল তাসকিন রহমান অর্থাৎ জিসান ।এমন হ্যান্ডসাম তরুণ ভিলেন তিনি কোথায় পেলেন এই নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখলাম ছেলেটি থাকেন অষ্ট্রেলিয়ায়। তাসকিন রহমান পেশায় অষ্ট্রেলিয়ান কারেকটিভ সার্ভিসের ক্রাইম স্টপার হিসেবে নিযুক্ত আছেন। তিনি বেশ শুদ্ধ করে বাংলা এবং ইংরেজী বলতে পারেন।এর আগেও কয়েকটি নাটকে তাকে দেখা যায় ।একটি মিউজিক ভিডিও-তে কন্ঠ মিলিয়েছেন তখন বুঝিনি এই তাসকিন বাংলা সিনেমার পর্দা কাঁপাবে ।যেমন ঠান্ডা হিম হিম তার কন্ঠস্বর তেমন তীক্ষ্ম তার নীল চোখ ।বাংলাদেশ একজন হ্যান্ডসাম ভিলেন পেয়ে গেল এ ব্যাপারে কোন  সন্দেহ নেই । সিনেমার এক দৃশ্যে স্কুলগামী বাচ্চার ব্যাগে বোমা রাখার সময় তিনি যেভাবে তার সাথে চকলেট দিয়ে ভাব বিনিময় করছিলেন  তখন আমার  ভেতর ভয়ের সঞ্চার ঘটেছিল নিজের বাচ্চার অনিরাপত্তার কথা ভেবে। একজন অভিনেতা কতোটা বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়  করলে  দর্শকের ভেতর এমন প্রতিক্রিয়া হয় তা ভেবে সত্যি মুগ্ধ হয়েছি।

আফজাল হোসেনকে দেখে বেশ ভালো লাগছিল যে বহু দিন বাদে বাংলা সিনেমায় তাকে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তার উপস্থিতি খুব কম ছিল; আরো কম ছিল নায়ক আলগীরের পর্দায় আবির্ভাব। হাসান ইমামকে  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চরিত্রে বেশ মানিয়ে গেছেন। এহসানুর রহমান সব সময়ই নেগেটিভ চরিত্রে ভালো করেন। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। মনে বেশ দাগ কেটেছে ছোট জিসানের অভিনয়। ছোটবেলা থেকে  বখে যাওয়া সন্তান হিসেবে পর্দায় আবির্ভাব স্বাভাবিক লেগেছে, বিশেষ করে পুলের ভেতর বাড়ির কাজের ছেলেকে বিদ্যুৎপৃষ্ট করে মেরে ফেলা্র দৃশ্যটি; দর্শক মনে রাখবে তার কুটিল হাসি। মালয়শিয়ার লেডি অফিসারের অভিনয় দেখে মনেই হয়েছে তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা।পার্শ্বচরিত্রের সব অভিনেতাদের অভিনয় স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল যা বিগত দিন গুলোতে তেমন দেখা যায়নি।

সংলাপ

সারাদিন জটিল সব গোয়েন্দাগিরির কাজে ব্যস্ত থেকেও সানী  সানোয়ার যেভাবে  সিনেমার চিত্রনাট্য এবং সংলাপ সাজিয়েছেন তাতে কিছু সময়র জন্য হতবিহ্ববল হতে হয়। কারন অনেক চিত্র নির্মাতার সিনেয়া দেখা যায় দৃশ্যের ধারাবাহিকতার সাথে সংলাপ যাচ্ছে না। ঢাকা অ্যাটাক দেখে এই বিষয়  উপলব্ধি করিনি।একজন গোয়েন্দা  কর্মকর্তা যখন তার টিমকে ইন্স্ট্রাকশন দেন তখন তার পেশাদার  সংলাপ কি হবে এটা তিনি পরিষ্কার ভাবে লিখেছেন এবং তার পাশাপাশি একজন বিচলিত স্ত্রী তার  স্বামীকে কাছে পাবার জন্য কতো্টা আকুল হতে পারেন নওশাবার মুখ দিয়ে তাও বলিয়ে নিয়েছেন। নেগেটিভ চরিত্র যাদের ছিল তাদের পোশাকের ধরণ অনুযায়ী এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা মাথায় রেখেই আঞ্চলিক ভাষার  ব্যবহার করা হয়েছে ।সব চাইতে ভীতিকর সংলাপ ছিল জিয়ানের মুখে–বুম বুম … ।বোঝাই যাচ্ছিল সে একজন ঠান্ডা মাথার খুনী। মাহিয়া মাহির অতি আবেগীয় সংলাপ গুলো চিত্রনাট্যের প্রয়োজনেই এখানে আনা হয়েছে তা ছিল পরিষ্কার।তাই হয়তো আবিদের মুখে  শোনা যায়-ফিরে এলে তোমার কাছেই ফিরবো। আফজালের ডাবিং এর ব্যাপারে সানী সানোয়ার বলেছেন- আফজালের ডাবিং করা ফাইলটা কমপ্লিট করা যায়নি। পূজার ছুটি আর রিলিজ ডেট কাছাকাছি হওয়াতে এমন হয়েছে।

20842129_10213657792902196_8080610441878103271_n

ছবি: নাট্যকার সানী সানোয়ার

পোশাক ও মেকাপ

ঢাকা অ্যাটাক সিনেমার অন্যতম আকর্ষন ছিল পোশাক। একজন পুলিশ কর্মকর্তা, সোয়াট বাহিনী, একজন এডিসি, একজন মন্ত্রী, একজন সাংবাদিক,  লুকিয়ে থাকা ক্রিইন্যাল ঠিক যে যে রূপে পর্দায় আসা উচিৎ ঠিক তাই রাখা হয়েছে। টিকাটুলির মোড়ে গানে সবার পোশাক বেশ নজড় কেড়েছে। জিসানের ভিন্ন ভিন্ন চেহারায় এসেছে  ভিন্ন টাইপের পোশাক।

জিসানের মেকাপে বোঝার উপায় ছিল না সেই খুনী। কখনো দাড়ি আবার কখনো সাদা চুলে মেকাপে জিসানের আসল চেহারা ঢেকে গেছে। আর সোয়াট বাহিনীর মেকাপ দেখে মনেই হয়নি সিনেমা হলে আছি ।পোশাকের সাথে কোন বাড়তি রঙ চং দেখা যায় নি। টুপটাপ গানের দৃশ্যেও শুভ এবং মাহিকে লাবণ্যময় লেগেছে ।তবে মাহির হঠাৎ কার্লি চুল আবার হঠাৎ করে বড় বড় কানের দুলের আগমন বিরক্ত লেগেছে ।আবিদ প্রথমবার বোমা ডিস্টোজাল থেকে ফিরে এলে তার কানে দুল ছিল না, কিন্তু পরের দৃশ্যেই এই দুলের আবির্ভাব ঘটে। শুভর যেমন চুলের কন্টিনিউটি ঠিক ছিল না, মাহির ছিল না দুলে ।

dhaka-attack-2

ছবি : গানের দৃশ্যে মাহি ও শুভ

দৃশ্যায়ন

প্রায় সাড়ে তিন কোটির বাজেটের ছবির শ্যুটিং হয় ঢাকা, বান্দরবন, সিলেট, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ,মালেশিয়া: কুয়ালালামপুর, পেনাং সহ দেশের কয়েকটি জায়গায়।দৃশ্যায়নের জন্যও নির্বাচন করা হয়েছে গল্প উপযোগী লোকেশন, বিশেষ করে বান্দরবানের রাতের আকাশে  তারা দেখে দর্শকের হৃদয়ে কিছু সময়ের জন্য ভালো লাগা দোলা দিয়েছে ।এহসানুল করিমের পেছনে পুলিশের ছুটে যাওয়ার দৃশ্য খুব কঠিন ছিল নিঃসন্দেহে । ভিলেনের লম্বা চুল উড়তে থাকা  খুব উপভোগ করেছে দর্শক। ভিএফএক্সের দৃশ্য গুলো  করে তুলেছে আরো জীবন্ত ,কোন দৃশ্য জোর করে আরোপিত মনে হয়নি । অন্তঃস্বত্তা নওশাবার জ্যামে পড়া রাস্তায় চিৎকার করে কান্নার দৃশ্য খুব দাগ কেটেছে দর্শক মনে ।এই ছবির অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পুলিশের ব্যবহৃত ৪৫ পাউন্ড ওজনের বোমা স্কোয়াডের বিশেষ পোশাক এবং ৫ কিলোগ্রাম ওজনের হেলমেট। অভিনেতারা তা সাবলীল ভাবেই ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন।

dh-5

ছবি: পোস্টারে শুভ ও মাহী

গান

ছবির খুব আকর্ষনীয় দিক ছিল আবহ সঙ্গীত, যা  দৃশ্যের সাথে প্রতি মুহূর্তে টান টান উত্তেজনা ধরে রেখেছে। গানের ক্ষেত্রে অরিজিৎ সিং ও সোমলতার গাওয়া ‘টুপটাপ’ গানের ব্যবহার ভালো লেগেছে এবং দৃশ্যায়নও সুন্দর ছিল।  মনের ভেতর অস্থিরতা এনে দিয়েছে অদিতের গাওয়া ‘পথ যে ডাকে’। মতিন চৌধুরীর কাওয়ালি ধাঁচের ‘টিকাটুলির মোড়ে’ গানটিকে নতুনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ছবিতে। গানটি আগে থেকেই জনপ্রিয় ছবির দৃশ্যায়নের সাথে এর আবেদন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে । সব চাইতে বড় কথা এমন একটি আইটেম গান বাণিজ্যিক ছবিতে এখন অবধারিত ,এই গান না থাকলে মনে হয় ছবি দেখার পূর্ণ আনন্দ মাটি হয়ে যেত ।

dh-1

ছবি: জনপ্রিয় গান -টিকাটুলির মোড়ে

বাংলাদেশের হলগুলো  অনেক দিন পর এমন  একটা  সিনেমা পেল যা কীনা সত্যিকার অর্থেই দেশের কথা বলে । বলে যৌথ পরিবারের অভাবের কথা ।একটা আধুনিক একক পরিবারে বেড়ে ওঠা জিসান  দিন দিন বাবা মা -র অগোচরে কতোটা হায়েনা হয়ে ওঠে তারই একটি জলোজ্ব্যান্ত উদাহরণ ঢাকা অ্যাটাক  ।ঢাকা অ্যাটাক টিম একে একশান থ্রিলার মুভির গন্ডিতে ফেলে রাখলেও আমি বলবো -ঢাকা  অ্যাটাক একটি  পারিবারিক  শিক্ষনীয় সিনেয়া ।এমন সিনেমার সিকুয়েল হবে , বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা পয়সা দিয়ে এ সব সিনেয়া তাদের ক্যাম্পাসে বিনা টিকিটে দেখাবেন –এমন চাওয়ার সময় এসেছে এখন । বাবা মা-য়েরা তাদের সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক করবেন ,নিজে সময় দিতে না পারলে বড় কাউকে পরিবারে এনে রাখবেন এমন প্রত্যাশাই করছি এই সিনেমার মাধ্যমে ।সিনেমার জিসান যেন বাস্তব জীবনে আবির্ভূত না হয় ।

 

 

রোদেলা নীলা
কবি ও গল্পকার
বাংলা চলচ্চিত্র সমালোচক
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউট পত্রিকা