ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

গত মঙ্গলবার দুপুর। সেদিন ঢাকার রাস্তা অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশ ফাঁকাই ছিল বলা চলে। বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই বিভিন্ন জায়গায় মেলা আরম্ভ হয়। কিন্তু এবার ধানমন্ডি ৩২ -এ তেমন কোনও আয়োজন দেখতে না পেয়ে পত্রিকা ঘেঁটে জানলাম বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ও বাংলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে ১৪ এপ্রিল থেকে বৈশাখী মেলা চলছে। আমার গন্তব্য ওই দিকেই।

আসলে ছোট বেলা থেকে মেলা শব্দটি আমাকে তীব্র ভাবে আকর্ষণ করে। বাবার হাত ধরে ঘুরে ঘুরে চকলেট খাওয়া, ভয়ে ভয়ে নাগড়দোলায় ওঠা, বায়োস্কোপে চোখ রেখে পুলকিত হওয়া – সে সময়টা অনেক পেছনে ফেলে এসেছি।

এখন মেলা মানে হচ্ছে ব্যাগ ভর্তি করে পয়সা নিয়ে বের হওয়া। আমি অবশ্য টাকা-পয়সা তেমন আনিনি। ডিএসএলআর সাথে নিয়ে এসেছি বৈশাখী মেলার ছবি তুলবো বলে। কিন্তু হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে সে কি  ঝড়। মনে হলো রিক্সাসহ উড়ে যাব। আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। শেষ অব্দি মেলা হবে কি না! এতোগুলো মানুষ এতো দূর থেকে কতইনা কষ্ট করে এসেছে!

      

রিক্সা নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ঢুকছি। চারদিকে তাকিয়ে দেখি সমস্ত স্টল প্রায় লণ্ডভণ্ড। কয়েক জায়গায় পানি উঠে গিয়েছে। আমার ভেতরে এক অজানা ব্যাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। মানুষগুলোর অক্লান্ত কষ্ট আমাকে ছুঁয়ে গেল। ঝড়ে ভেঙে পড়া বাঁশ, প্লাস্টিক দু’হাত দিয়ে দাঁড়া করাবার চেষ্টা করছে।

এমন অবস্থার ছবি নিতে আমার ইচ্ছে করলো না। আমি সময় নিলাম । কিছুক্ষন ক্যান্টিনে বসে কফি খেলাম আর হেঁটে হেঁটে পুরো একাডেমি দেখতে থাকলাম।

এখানে অধিকাংশ উদ্যোক্তা নারী। কেবল ঢাকার ভেতরে নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও এসেছেন অনেক নারী। কেউ এনেছেন সালোয়ার-কামিজ বা শাড়ি, কারো হাতে শোভা পাচ্ছে মাটির বা পুঁতির গহনা, টেরাকোটাতো আছেই। আছে বাঁশের তৈরি নানাবিধ সামগ্রী, কাপড়ের বা চটের ব্যাগ, চাদর, হাতে তৈরি খাবার, নকশী কাঁথা, জামদানী, এমন অনেক নজরকাড়া সব পণ্য।

      

ঝড় শেষে বৃষ্টি হলো কিছুক্ষন। বেলা গড়িয়ে তখন দুপুর দু’টো হবে। এরই মধ্যে দেখলাম হস্তশৈলি কারিগরেরা চমৎকার নৈপুণ্যে কিছু সময়ের মধ্যেই তাদের যার যার স্টল সাজিয়ে ফেলেছেন। আমার হাত আর বেকার বসে থাকবে কেন? অনবরত চললো ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক। বেশ কিছু স্টলে শিল্পীরা নিজ হাতে পণ্য তৈরি করছেন, সেটা দেখতে কিন্তু দারুণ লাগলো।

ছবি তোলার ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু নারী উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে নিলাম। তাদের অনেকেই গৃহিনী। কেউ আছেন পুরোদমে ব্যবসায়ী। তারা নিজেদের পার্লার চালানোর পাশাপাশি হাতের কাজের সালোয়ার-কামিজ, শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং ফতুয়া করেন। কিন্তু বেশির ভাগ উদ্যোক্তাদের চোখে-মুখেই ছিল হতাশা।

অনেকেই বললেন, তাদের নিজেদের কোনও আউটলেট নেই, বিসিক বা এসিমি এই জাতীয় মেলাই তাদের ভরসা। এতে তাদের আসলই ওঠে না, লাভ অনেক দূরে।

পণ্য নিয়ে আসা-যাওয়া এবং থাকা-খাওয়া এটা একটা বিরাট খরচের ব্যাপার। তারপরও এমন কারুকার্যে নিজের মেধাকে কাজে লাগানোর এই যে প্রচেষ্টা তার কিছু ঘাটতি ছিল না। কেউ কেউ ফেসবুক পেইজ চালান। কিন্তু বেশিরভাগই এই ধরণের ডিজিটাল মার্কেটিং বোঝেন না।

       

এবারের মেলায় প্রায় ২০০টি স্টলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হস্ত, কুটির ও কারুশিল্পীগণ তাদের উৎপাদিত নানাবিধ পণ্যসামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন। তাদের মধ্যে যাদের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে – আলো শিখা হ্যান্ডিক্রাফটস, রংদারু, কেয়া’স ক্রিয়েশান, অপরূপা বুটিক হাউজ, সাবাহ বাংলাদেশ, টুইংকেল বুটিক হাউজ, বিন্যাস, নকশি বুনন ইত্যাদি। বিন্যাস গহনা শিল্পীর নিজ হাতে বানানো গলার মালা পড়ে নিজেই মডেল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম শিল্পীর পাশে।

 

একাডেমির বাগান, ভাষা সৈনিক চত্বর, বয়রা তলা, পুকুর পাড় জুড়ে বৈশাখী মেলার এই স্টলগুলো গড়ে উঠেছে। এছাড়া বৈশাখী মেলা মঞ্চে রয়েছে হৃদয়গ্রাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে নানা পরিবেশনায় অংশ নিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের খ্যাতিমান শিল্পীরা।

      

শুধু হাতে তৈরি দেশীয় পণ্য নয়, যারা কম খরচে বই পড়তে চান তাদের জন্য রয়েছে বইয়ের আড়ং। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত দুই হাজার বই সর্বোচ্চ ৫০ ভাগ কমিশনে বিক্রি হচ্ছে আড়ং থেকে। বাংলা একাডেমির ভেতরে রবীন্দ্র চত্বরে, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবনের নিচতলায় এবং ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবনের নিচতলায় আড়ং-এ এসব বই বিক্রি চলছে।

       

হাতে গড়া কাঠের পালকি, ঘোড়া-আয়না, ঝুড়ি দেখলেই মনে হয় সব এক সাথে কিনে বাড়ি নিয়ে যাই। এই ধরণের সামগ্রী দিয়ে ঘর সাজাতে কার না ভালো লাগে।

এই পণ্যগুলোর উন্নত বিশ্বে বেশ চাহিদা। কিন্তু এই হস্ত শিল্পীরা তাদের পণ্য দেশের বাইরে রপ্তানি করার সেই সুযোগটা সরাসরি পাচ্ছেন না বলেই আমার মনে হলো। আমি নিজেও কিছু বাঁশের তৈরি জেলেদের সামগ্রী কিনলাম।  কানাডায় পাঠানোর জন্য। ওরাও ওই দেশে বৈশাখী মেলা করে। বাংলাদেশের শিল্পীদের হাতে করা এমন অসাধারণ সৃষ্টি প্রবাসীদের ভীষন রকম আকর্ষণ করে।

 

 

মেলা চলছে সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। শেষ হবে আগামী ২৩ তারিখ। আমি মনে মনে ঠিক করে নিলাম আর একদিন আসতে হবে ক্যামেরা রেখে। সেদিন শুধু মাটির গহনা কিনবো। এক এক শাড়ির সাথে এক এক গহনা- মন্দ না!