ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ভ্রমণ

‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে/ পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি’ – বৈশাখের তপ্ত দুপুর বেলা কবিগুরুর চার লাইন মিলে গেল নিমিষেই। শীতলক্ষ্যা নদীর একটি ধারা হালকাভাবে ঢুকে গিয়েছে এই আকুলিচালা গ্রামে। কিন্তু সে নদীতে হাঁটু জল তো অনেক দূরে, নদী শুকিয়ে খটখটে।

চন্দ্রা থেকে মাত্র পনের কিলোমিটার ভেতরে গাজীপুর জেলার এই ঠাকুরপাড়া ইউনিয়নে ঘন বসতি নেই বললেই চলে। অনেক জমি খাঁ খাঁ শূন্য পড়ে আছে। বয়োবৃদ্ধদের  মুখে শুনলাম আফসোসের সুর; “অনেক বাড়ি আসাল চাইরমুরা, জমি দখল দিবার জইন্য হেগো বাড়ি পুরায় দিসে।”

প্রশ্নটা করেই ফেলি; “তারা এখন কোথায় থাকে? জমির টাকা ফেরত পেয়েছিল কী?”

কৃষকের অসহায় চোখ যেন এলোপাথাড়ি উত্তর খোঁজে। “নাহ, তা কি আর পায় রে মা! এপিলে ওইপিলে চালা কইরা থাকতাসে কুন রহম।”

 

আকুলিচালা গ্রামের ধু-ধু প্রান্তর, পাশে শুকনো শীতলক্ষ্যা 

 

সুনসান নিরিবিলি গাছের আড়ালে ডাহুকের করুণ কান্না ভেসে আসে দূর থেকে। আমি ক্যামেরা তাক করি। আকাশের বুক চিরে উড়ে বেড়াচ্ছে সাদা সাদা পায়রা। দিগ্বিদিক ঘুরতে ব্যস্ত চড়ুই একমুঠো ধানের খোঁজে অস্থির।

আমার দেখা শৈশবের সেই গ্রাম এখন আর নেই। ক্ষেত ভরা ধান কিংবা পুকুর ভরা মাছ, সে শুধু গল্প-উপন্যাসে পড়া কিছু পরিচিত কথা। গ্রামের লোকের হাতের মুঠোয় শোভা পাচ্ছে মুঠোফোন। গরুর গাড়ির জায়গায় দখল করে নিয়েছে ইঞ্জিন চালিত ভ্যান। জীবনকে আরো সহজ করতে গিয়ে গ্রাম ছেড়ে লাখ লাখ মানুষ আজ কাজের খোঁজে শহরে। এই সুযোগে ভূমিদস্যুরা অট্টালিকার নামে গড়ে তুলছে আধুনিক বস্তি। গ্রাম না পাচ্ছে গ্রামীণ আবহ, না হয়ে উঠছে পুরোটা শহর।

সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ে তখন ফেরার কথা মনে হলো। ফিরতে গিয়েই চোখ আটকে গেল এক বাগান বাড়িতে। কালিয়াকৈর থেকে আসবার পথে দেখেছি বাঁশের উপর সারি করে অনেকগুলো টং দোকান। ঢাকার মিরপুর বেড়িবাঁধে যেসব দম্পতিরা ঘুরতে যান তারা জানেন কী রকম ব্যবসায়িক প্রয়োজনে লোকে জমির ওপর বাঁশ দিয়ে এই খুপড়ি ঘর বানায়। তাই বলে এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসে এমন রেস্তোরাঁ  দেখবো তা ভাবিনি। কারা আসে এখানে ঘুরতে?

অটোওয়ালা এক গাল হেসে বলেন, “আসে বর্ষারসুম,স্কুল-কলেজের পোলাপানেরা।”

– তোমাদের এখানে স্কুল কয়টা?

– আকুলিচালা হাই স্কুল। সবাই শহীদুল্লাহ পার্ক বললেই চেনে। তার বাদে মৌচাক বাজারে আরো স্কুল আছে।

 

 

নয়নাভিরাম বাগানবাড়ি বেলাভূমি

 

যদি দম্পতিরা এখানে ঘুরতে আসে তবে তো ভালোই ব্যবসা হবার কথা। আগ্রহ নিয়ে বাগান বাড়ির কড়া নাড়লাম আমি। ভেতর থেকে দরজা খুলে দিল একজন তরুণী। সাথে তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে তিন বছরের কন্যাশিশু।

মেয়েটিই আমাকে পুরো বাড়ি ঘুরে দেখালো। বেলাভূমির মালিক দেশে থাকেন কম। এই বাড়ি মূলত করা হয়েছে তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং অবকাশ যাপনের জন্য। বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া হয়, তবে সেটা পরিচিতজনের মধ্যে। ঢাকা থেকে কেউ আসতে চাইলে আগে থেকে নিজেদের পরিচয় জানিয়ে বুকিং দিয়ে আসতে হয়। তাই দেখা যায় বছরের বেশিরভাগ সময় ঘরগুলো ফাঁকাই থাকে।

আমি মেয়েটিকে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে বললাম।  মাছ ভাজা আর ভর্তা। বাজার দূরে বলে বাড়তি কিছু সম্ভব নয়। নিজের পরিচয় দিতে নীতু আশ্বস্ত হয়ে তার স্বামীকে বলে একটি রুমে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিল।

বাগানে বসার ব্যবস্থা আর দোলনা

নীতুর ছোট্ট কন্যা

দুই বিঘা জমির ওপর বাড়ির বিশেষত্ব হলো ঘরগুলো সারি সারি সাজানো। লম্বা বারান্দা দিয়ে পার হয়ে গেলে প্রত্যেকটি ঘর চোখে পড়বে। দেওয়ালে বড় বড় হরফে লেখা আছে  ‘নিজের কাজ নিজে করুন’।

কল ঘোরাতেই বেশ ঠাণ্ডা পানি পেলাম। মাটির নীচ থেকে তোলা বলেই হয়তো এই গরমে এমন শীতল পানি সম্ভব হলো।

বাড়তি কাপড় নিয়ে এলে হয়তো ত্রিশ ফিট লম্বা  সুইমিং পুলে নামা যেত। তবে সে সুযোগ হলো বলে ক্যামেরা নিয়ে চলে গেলাম পুলের পেছনে বাঁশ ঝাড়ে। সেখান থেকে শীতলক্ষ্যা দেখা গেল। আর বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত ইশারা দিয়ে বলে যাচ্ছিল, আসছি এই পার্বণেই।

নিতুর হাতের রান্না দারুণ লাগলো আমার। বহুদিন বাদে মোটা চালের ভাত খেলাম।  সাথে মিষ্টি দইয়ের স্বাদ আর দেশি কলা। খুব ঘুম পেয়ে গেল । বিদ্যুত চলে গিয়েছিল বলে বাইরে একটা চেয়ার পেতে দেওয়া হলো বিশ্রামের জন্য। আমি অবশ্য দোলনায় দোল খেয়ে নিলাম খানিক।

 

 

শুনেছি শহরের চাইতে গ্রামে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয় বেশি। আজ তা ভালোই টের পেলাম। দক্ষিণের বাতাস অবশ্য বারবার শীতল করে দিয়ে যাচ্ছিল।

গেইটের পাশে পত্রপল্লবহীন প্রকাণ্ড একটি গাছ দেখলাম। বাগান বাড়ির দেওয়াল জুড়ে ছোট ছোট গাছ লতিয়ে উঠেছে। আমার কাছে অবশ্য সব চাইতে ভালো লাগলো  এখানকার বিরামহীন নিস্তব্ধতা।

বহু বছর পর একটি অকৃত্রিম নিরবতার মধ্যে আমি ডুব দিলাম। কোনো ট্র্যাফিক জ্যাম নেই। চিৎকার চেঁচামেচি নেই।  একটি নির্ভেজাল সময় কাটাছি।

নীতুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানকার মেয়েরা পড়ালেখা করে কেমন করে?

উত্তর যেন তৈরিই ছিল নীতুর। “স্কুল তো কাছেই। কলেজেও যায় দূরে; মৌচাক-কোনাবাড়ি যাওয়া লাগে, কালিয়াকৈরেও কলেজ আছে।”

– আর গ্রামে এনজিও কেমন? চিকিৎসা দেয় তারা কিংবা কোনো সরকারি হাসপাতাল?

সরকারি হাসপাতাল শুনে  নীতু  খানিক হাসে। ” চলেন, আপনেরে আমাগো হাসপাতাল দেখায় আনি। হা হা হা …। আশা আছে, গ্রামীণ আছে। তারা লোন দেয়। একটা ফোন দিলেই ভ্যান আইয়া পড়বো।”

বুঝলাম এখানে বেসরকারি সংস্থাগুলো ভালোই পরিচিত। সরকার থেকে লেখাপড়া বা চিকিৎসার কী উদ্যোগ তা ঠিক পরিষ্কার হলো না।

কথা বলতে বলতে চারদিকে অন্ধকার নেমে এলো। ঝিঁঝিঁ পোকাদের কান্নার সুর তখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। সেই সাথে ব্যাঙের ডাক মিলেমিশে একাকার অবস্থা । আমি চার চাকার ভ্যান গাড়িতে উঠে বসলাম। নীতু আর ওর মেয়ে এগিয়ে দিল অনেকটা পথ। বেলাভূমি পেছনে রেখে এগিয়ে গেল ভ্যানটা।

 

মন্তব্য ০ পঠিত