ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

শীত এখনো পুরোপুরি কাটে নাই; সেচ মৌসুম ও পুরোদমে শুরু হয় নি; শহরাঞ্চলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রগুলো সব চালু হয় নাই, তারপরও এখনই বিদ্যুত সমস্যা দেখা দিয়েছে। ঢাকাতে সমস্যা প্রকট না হলেও মফস্বলে সমস্যা প্রকট। যেখানে বসে বিদ্যুত সমস্যার কথা লিখছি- টাঙ্গাইল সদর এর আশেকপুর এ বসে, সেখানে বিদ্যুত থাকাটা চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। যেসময়টুকু বিদ্যুত থাকে তাতে মোবাইল, ল্যাপটপ অথবা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য দয়া পরবশত দেয়া হয়। বরিশাল এর মুলাদি থেকে কিছুদিন আগেও ঘুরে আসলাম, একই অবস্থা। এখনই এ অবস্থা হলে চরম গরমে এবং সেচ মৌসুমে কী হবে সেটা কল্পনাতেও আসছে না। বিদ্যুত না থাকার একটা যৌক্তিকতা তুলে ধরা যায়, বিদ্যুতের দাম আবার বাড়ানো হলো, অর্থাৎ এটা আমাদের মনে রাখা উচিত দামি জিনিস সবার ভোগের জন্য নয়। যার যতটুকু সামর্থ তার ততটুকু প্রাপ্য। এক্ষেত্রে আরেকটি সুবিধাও কিন্তু আছে- বিদ্যুত যত কম থাকবে বিদ্যুত বিল তত কম আসবে। আমাদের অর্থের সাশ্রয় হবে; বিদ্যুত থাকলেই লাইট জ্বলবে, ফ্যান ঘুরবে, এসি চলবে, আমরা বিদ্যুতের অপচয় করব। বিদ্যুত ব্যবহারে যেহেতু আমরা সচেতন নয় তাই হয়ত সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। দামি জিনিসের মর্যাদা পাগলেও বুঝে।

তবে সরকার বিদ্যুত সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট আন্তরিক। বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে রেন্টাল বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে সহযোগিতা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহ প্রদান, পাশ্ববর্তী দেশ থেকে বিদ্যুত আমদানির পরিকল্পনা, আরো কত কি! কিছু দিন পরপর খবরের কাগজে আর টেলিভিশন বা রেডিও তে দেখতে বা শুনতে পাই জাতীয় গ্রিডে এত মেগাওয়াট বিদ্যুত যুক্ত হলো। কিন্তু তারপরও সমস্যা থেকেই যাচ্ছে, কমছে না বরং বাড়ছে। কেন? আমাদের বড় বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্রগুলো এতটাই পুরনো যে এর থেকে তো পুরো মাত্রায় বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব নয়, তারপর বয়সের ভারে প্রায়শই অসুস্থ থাকতে হয়। তখন যেই লাউ সেই কদু অবস্থা দাঁড়ায়।

বিদ্যুত সমস্যা সমাধানে বেসরকারি বা বর্তমান পদক্ষেপের চেয়ে আরো বেশি কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেটা কী? আমার অপ্রতুল জ্ঞানে যা মনে হয় তা হলো সরকারিভাবে স্বল্প খরচে নতুন বেশি উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। স্বল্প খরচে কীভাবে সম্ভব? ছোট দুই একটি উদাহরণ দেই। ঠাকুরগাঁও এ যে বিদ্যুত কেন্দ্রটি রয়েছে সেটি ডিজেল চালিত, কিন্তু সেখানে কয়লা ভিত্তিক একটি বড় বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করা যায় স্বল্প খরচে, যেহেতু সেখানে একটি বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে তাই নতুন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য নতুন করে জায়গার কথা ভাবতে হবে না, এমনকি কেন্দ্রের কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থারও কোন ঝামেলা নেই। বেশি কর্মীর জন্য বর্তমান আবাসন এলাকাতেই নতুন করে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। দেশেই মানসম্মত সিমেন্ট, রড, পাথর, বালি থাকাতে টেকসই স্থাপনা এর জন্যও খুব একটা খরচ হওয়ার কথা নয়। আর দেশীয় স্থাপনা প্রকৌশলীদের অবমূল্যায়ন করার কোন কারণ নেই। তাদের সর্বোচ্চ মেধা ও পরিশ্রম তারা দিতে প্রস্তুত। আর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র বলার একমাত্র কারণ দিনাজপুর কয়লা খনির কয়লা ব্যবহার করা, দিনাজপুর কয়লা খনি থেকে রেলপথে খুব সহজেই কয়লা আনা যাবে কম খরচে। রেলপথ স্থাপনের ঝামেলা নেই কারণ রেলপথ আগে থেকেই আছে হয়তো কিছু সংস্কার লাগতে পারে। ঠিক একই ব্যবস্থা করা যাবে রংপুরে অবস্থিত বিদ্যুত কেন্দ্রের বেলাতেও। আর দিনাজপুর বড়পুকুরিয়াতে যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রটি রয়েছে তাতেও আরো নতুন একটি বা দুইটি ইউনিট চালু করার মতো ব্যবস্থা আছে। তবে এখানে একটি বাঁধা সেটি এখনও জাতীয় কয়লা নীতি চূড়ান্ত না হওয়া।

এতো গেলো জায়গা, স্থাপনা ও জ্বালানী বিষয়ক কিছু দেশীয় পদক্ষেপ। বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের জন্য যে যন্ত্রাংশ লাগে এবং যে লোকবল লাগে তা বিদেশ নির্ভর এবং এটা সহজেই দেশীয় করার সম্ভাবনা কম। বিদেশী কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বলা হলে তারা বিভিন্ন শর্ত দেয় যা খরচ বৃদ্ধিতে সহায়ক। আবার যেহেতু দাতাগোষ্ঠীর মাধ্যমে বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের অর্থ আসে তাদের বিভিন্ন শর্তও খরচ বৃদ্ধি করে। কিন্তু একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদেরও তো কিছু শর্ত থাকতে পারে। আমাদের শর্ত সাপেক্ষে তাদের কাজ করতে বাধ্য করতে হবে। যতটুকু সম্ভব আমাদের দেশীয় সম্পদ ও লোকবল ব্যবহার করে কাজ করলে খরচ অনেকাংশেই কমে আসে।

ছোট ছোট বিদ্যুত কেন্দ্র অথবা রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যে বিদ্যুত সরবরাহ করা হয় তা সরকারকে উচ্চমূল্যে ভূর্তিকি দিয়ে কিনতে হয়। তাই এভাবে সাময়িক বিদ্যুত সমস্যার সমাধান করতে যেয়ে ভবিষ্যতের সমস্যা মোকাবেলা করার মতো অর্থ আমরাই অপচয় করছি। সরকারি দল নয়, সরকার হলো সরকার, সরকার কোন রাজনৈতিক দলের নামকরণের সাথে একাত্ব হয় না, সরকার জনগণের, কোন রাজনৈতিক দলের নয়। একথা মাথায় রেখে সকল রাজনৈতিক দলকে জনগণের জন্য কাজ করতে হবে। একে অপরের দোষ দিয়ে নয় জনগণের জন্য ভালো কাজ করেই জনগণের মনের মাঝে স্থান করে নেয়া সম্ভব।

দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্বটুকু পালন করাও কিন্তু আমাদের নৈতিক কর্তব্য। আসুন যেকোন দেশীয় সম্পদ ব্যবহারে সচেতন হই। বিদ্যুত ও গ্যাস অপচয় রোধ করি। আমরা নিরাশা হতে চাই না, চাই উজ্জ্বল ভবিষ্যত।