ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

“ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়”–শ্রদ্ধেয় আব্দুল লতিফ স্যারের গানের কথা গুলো যখন শুনি ঠিক তখন আমার শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরায় রক্তের প্রবাহে অনেক বেশী গতি পায়, লোম খাড়া খাড়া হয়ে যায় এবং গা শির শির করে উঠে, আজ আমাদের এই স্বাধীন দেশেও মাঝে মাঝে নিজেকে পরাধীন মনে হচ্ছে কিছু পশুরূপী মানুষের হাতে আমার প্রিয় মাতৃভূমি আজ বন্দী ।

আমার মনে হয় বাঙালি বড় ধরনের বিস্মৃতিপরায়ণ জাতি, আমরা নিজেদের ইতিহাস ভুলে বসে থাকি কখনো আবার কখনো বিকৃতও করি অহর্নিশি । আমরা বাঙালি জাতি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে, এমন কি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর অবদান নিয়ে এমন কোন বিষয় নেই যা নিয়ে আমরা বাঙালি বিতর্ক করতে পছন্দ করি না । সেই বিস্মৃতিপরায়ণ বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করি, উল্লাসে একে অভিহিত করে থাকি “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে, কিন্তু আমরা সত্যি কারের অর্থে কয়জন জানি একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হবার ইতিহাস টুকু অথবা এই দিনটির গুরুত্ব ? আমরা সবাই জানি যে, ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলন হয়েছিল এবং শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়; পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে ঘোষণা করে । কিন্তু আমার কথা হল, আমাদের ভাষা আন্দোলনের যে প্রত্যাশা ছিল তা কি পূরণ হয়েছে ?

আমাদের গর্বের মাস ফেব্রুয়ারি, আর কিছু দিন পর ২১ শে ফেব্রুয়ারি “আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস”পালিত হবে । ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই ছিল বাঙ্গালী জাতির মুক্তির প্রথম ধাপ, যা পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দেয় । এই একুশই আমাদের তারুণ্যের চেতনা, আমাদের অহংকার । শুধু কি ফুল দিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা শুভেচ্ছা আর ছবি তুলে তা সবাইকে দেখানোই আমাদের দায়িত্ব ? নাকি, আমাদের নতুন কিছু করে দেখাতে হবে এই দেশের অর্থনীতির জন্য, দেশের সাধারণ মানুষের জন্যে ?

বাংলাদেশের অর্থনীতির কথা বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠে দিনমজুর, গার্মেন্ট শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিকদের কথা; আমাদের দেশের বর্তমানের রাজনীতিবিদরা কোনদিন জনগন, দেশ এগুলো নিয়ে চিন্তা করেছেন বলে মনে হয় না । কারন এরা আগে থেকেই আঢেল টাকার মালিক, রাজনীতি এদের কাছে একটি ব্যাবসা যা দিয়ে অনেক টাকা কামানো যায় । এখন দেশে যা হচ্ছে তাহলো এই ব্যাবসা কে নিয়ন্ত্রন করবে তা নিয়ে মারামারি ।

কেউ সারাদেশকে কারাগারে আর গুম খুনের রাজ্যে পরিণত করছে আর কেউ বানাচ্ছে বার্ন ইউনিট আর অন্য দিক থেকে সাধারণ মানুষ হচ্ছে সর্বজনীন শিকার । যার একটা ঘোষণায় সারাদেশে আবার শান্তি ফিরে আসতে পারে, সে তো সেই মহামূল্যবান কথাটা বলছে না । আর কত কুরবানীর বলি হবে আমাদের মত সাধারণ মানুষ, আর কত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের একটা শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে ?

আমি কোন ভাবেই বোঝতে পারি না, যেসব সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র নামক কঠিন শব্দটা বোঝে না, এ দেশের মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, স্কুল-কলেজ, বন, টাকা-পয়সা,—সবকিছু কী করে দখল করতে হয় যারা জানে না, ক্ষমতার-লোভ লালসা যাদের মাঝে নেই, যারা বুঝেনা ইতিহাস নিয়ে কি করে ‘গবেষণা’ করতে হয়, যারা কক্ষনো অন্যের ক্ষতির কথা চিন্তা করে না; তাদের মতো সাধারণ মানুষকে কেন রাস্তায় দগ্ধ করা হচ্ছে এর উত্তর কি কেউ আমাকে দিতে পারবেন ?

বেশ কিছু দিন থেকে দেখছিলাম, একদল সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লিখেছে প্রতিপক্ষের নেতাদের কুকুরের মতো মারবে, অন্যদল বলেছে ক্ষমতার মসনদ থেকে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের টেনে হিঁচড়ে নামাবে, ক্ষমতায় থাকতে দিবে না……এইটা করবে সেইটা করবে । কক্ষনো একবারের জন্য কি তারা বলছে যে, আসুন দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য কাজ করি ? তাঁদের মুখে একটিই কথা ক্ষমতায় গেলে এই করবো সেই করবো; আমার কথা দেশের জন্য কিছু করতে হলে কি ক্ষমতায় যেতে হয় নাকি ইচ্ছে থাকতে হয় ? আর এই দুই দলের ক্ষমতার জিহ্বার ধার অবলোকন করছি আমরা যারা সাধারণ মানুষ আছি; অসহায়ের মতো আমরা দেখতে পাই, বড় নেতারা দগ্ধ হয় না, তাঁদের সন্তানেরা বিদেশে লেখাপড়া করে আরাম-আয়াশ করে নিরাপদে জীবন কাটাছে । শুধু আমাদের সাধারণ পরিবারের মা-বাবা আর ভাই-বোনেরা শিকার হয়ে থাকি এই বর্বরতার ক্ষমতার লড়াইয়ে । আমাদের গ্রামে একটা কথা আছে যে “পাডা পোতা ঘষাঘষি মরিচের মরণ” দুই দলের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে আজ জনসাধারনের অবস্থা আজ করুণ, আমরা যেন আজ মরিচে পরিণত হয়ে আছি ।

বাংলাদেশের অর্থনীতি কেন বারবার রাজনৈতিক সহিংসতার ‘বলি’ হচ্ছে ? ‘বলি’ বলেছি এই জন্য যে, যদি কোনো মানব-শরীর বারবার বাহ্যিক আঘাতের সম্মুখীন হয়, তার যেমন শক্তি ক্ষয় হয়, তেমনি বারবার রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির একই অবস্থা হচ্ছে বলে আমার মনে হচ্ছে এবং তা কিন্তু বারবার ফুটে উঠছে দেশের অর্থনীতিবিদের কলমের কালিতে । চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা অর্থনীতির বর্তমান ও আগামীর নীরব ঘাতকের মতো সংকটাপন্ন করে তুলছে । নীরব বলছি এ কারণে— তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝা যায় না । আমি যতদূর দেখেছি, ক্ষমতা থেকে কাকে হটিয়ে কারা এসেছে তা দিয়ে কিন্তু এ দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসে নি একবারের জন্যে এমনকি আগামীতেও আসবে না । কিন্তু ক্ষমতাবদলের প্রক্রিয়াটি যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, এবং সবসময় তার প্রধান বলি হয়ে থাকি আমরা যারা সাধারণ মানুষ আছি তারা, খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের ঘামের বিনিময়ে একটি দেশের উন্নয়ন হয়; সাধারণ মানুষ কি শুধু সারা জীবন নির্যাতিত হয়ে যাবে ? এভাবে চলতে থাকলে এক সময় দেখা যাবে, গরিব আরো গরিব হবে, আর যারা দারিদ্র্য থেকে কিছুটা মুক্ত, তাহাঁরা দরিদ্র হবে ।

এখন পর্যন্ত যে মানুষগুলো পুড়ে মরেছে এই হিংসার রাজনীতির জন্য কিংবা বিকলাঙ্গ হয়েছে, সে তালিকায় তো কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভাগীদার নেই । সেই তালিকায় নেই কোন ধরনের রাজনৈতিক দলের নেতারা । শুধুমাত্র দেখা যায় খেটে খাওয়া দিনমজুর, গার্মেন্ট শ্রমিক, স্কুল-কলেজগামী কিশোর-কিশোরী আর তাদের পরিবার । এই অস্থিরতা বন্ধে আর বেশী দেরি হলে দেশের অর্থনীতির চাকা থেমে যাবে, আমার সোনার দেশের আগামী দিন অন্ধকার হয়ে যাবে কারণ এই অস্থিরতার মাঝে দেশে নতুন বিনিয়োগ সম্ভব হবে না এমনকি কোন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না ।

“পশুরূপী রাজনীতিবিদরা মা তোর মুখের খাবার কেড়ে নিতে চায়,
ওরা তোর অর্থনীতির চাকা থামায় দিতে চায়”।

কিন্তু আমরা কিছু দিন আগে দেখেছিলাম ভারতের অর্থনীতিবিদ নোবেল বিজয়ী প্রফেসর অমর্ত সেনের লেখায় ফুটে উঠেছিল, তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও এর সামাজিক রূপান্তরকে চমত্কার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে সর্বোত্তম বলে উল্লেখ করেছিলেন । বিশ্ববিখ্যাত ঋণমান নির্ণয়কারী স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর পর পর তিন বছর বাংলাদেশকে পাকিস্তানের তিন ধাপ উপরে, ভারতের এক ধাপ নিচে এবং ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্স-এর সমপর্যায়ে বলে উল্লেখ করেছে । এছাড়া মুডিস ইনভেস্টর সার্ভিসের মূল্যায়নে বাংলাদেশের সামস্টিক অর্থনীতিকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে স্থিতিশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে । বিশ্ব বিখ্যাত গোল্ডম্যান স্যাকস বাংলাদেশকে সাতটি সবচেয়ে অগ্রসরমান অর্থনীতি দেশের মধ্যে একটি দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন । আর গত ২৮ই জানুয়ারি, সিএনএন মানির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে যে, ২০১৯ সাল নাগাদ সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে যেসব দেশ, এর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকবে বাংলাদেশ এবং সেই সময় বাংলাদেশের অর্থনীতি ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ।

অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংক এর সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেছিলেন, “সাম্প্রতিককালে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আহরণের সুযোগে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত । এর একটি বড় জনসংখ্যা রয়েছে যাতে শতকরা ৬৩ ভাগ লোক অর্থাৎ প্রায় দশ কোটি কর্মক্ষম বয়সসীমায় অবস্থান করছেন । বাড়ছে শিক্ষার হার, পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা, বিনামূল্যে আটাশ কোটি নতুন বই বিতরণ, নকলমুক্ত পরীক্ষা এবং ক্ষমতায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ শতকরা ৩০ ভাগে বৃদ্ধি পাওয়া সৃষ্টি করেছে নবতর উন্নয়ন সম্ভাবনা । তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপে বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি উদ্যোগ নেয়া হলেই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের পূর্ণ ফসল ঘরে উঠবে”।

অর্থনীতির বিখ্যাত পণ্ডিত বলে পরিচিত আলবার্ট হারশম্যান বলেছেন যে, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোকে চিহ্নিত করে সে সকল ক্ষেত্রে বেশুমার বিনিয়োগ করে জোগান বাড়ালে অর্থনীতির চাকা সচলতর হতে বাধ্য । বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এ সকল প্রতিবন্ধকতার একটি হলো অবকাঠামোর অপ্রতুলতা, যেমন যাতায়াত, বন্দর, বিদ্যুৎ, গ্যাস, তাছাড়া আরও আছে শিক্ষার বেহাল অবস্থা, ব্যবস্থাপনা, সরকারী চাকরীতে অবৈধ টাকার ছড়াছড়ি এবং সবচেয়ে বড় যে প্রতিবন্ধকতা তাহলো রাজনীতিক অস্থিরতা । অর্থনৈতিক বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে অনিশ্চয়তা, তাই আশা করবো এত সব প্রতিকূলতার পর যেন আর আপন বলয় থেকে কোন আঘাত না আসে, তাহলে যে আমার মাতৃভূমির অর্থনীতির চাকা আবার থেমে যাবে ।

“জয় বাংলা, বাংলার জয়
হবে হবে হবে …হবে নিশ্চয়
কোটি বাঙ্গালী একসাথে , জেগেছে অরুনপ্রাতে
মায়ের অর্থনীতি রবে সুরক্ষিত-অক্ষয়”।

শুনেছিলাম আমরা বাঙালি জাতি নাকি বেশী ঠ্যাকায় না পড়লে অতিশয় প্রহার করা করতে চাই না, যদিও কক্ষনো কক্ষনো আমি নিজেও আমার গায়ে মশা এবং উইপোকা বেশীক্ষণ রক্ত না চুষলে তেমন কিছুই করি না । তবে মশা, উইপোকা এবং তেলাপোকার গুষ্টি অতিরিক্ত বাড়লে তাহাদের অত্যাচার যখন আর সহ্য করতে পারতাম না ঠিক তখন বিষ দিয়ে ওদের গুষ্টি সহ ধ্বংস করে দিতাম; তেমনি বাঙ্গালী জাতি মশা, উইপোকা এবং তেলাপোকার গুষ্টি ধ্বংস করতে কখনো কার্পন্য করেনি বলেই ১৯৭১ সালে আমরা একটা স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার পেয়েছিলাম ।

অনেকে বলে থাকে যে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল নতুন প্রজন্ম শোনেনা, এই কথার সাথে আমি একমত না কারণ আমি নিজেও একজন নতুন প্রজন্মের মানুষ; আমি নিজেও প্রচুর বাংলা গান শুনি, আমার অনেক অনেক সহপাঠী আছে তারাও শোনেন । কারণ আমরা জানি যে সাধারণ সৌন্দর্যচর্চার কোন মানুষ কখনই পরিত্যাক্ত হয় না, রুচিবোধের মাত্রাসীমায় অবস্থিত সৌন্দর্যের দাম ছিল এবং চীরকাল থাকবে ।

বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই আজও সেভাবে সচেতন না । বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেয়ার পর, বাংলা ভাষার সর্বস্তরে ব্যবহার করার সরকারী ঘোষণার পরও বাংলাদেশে তা কার্যকর হয় নি । সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার হতে আমরা দেখছি না বা হচ্ছে না । শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষা কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে সে বিষয়ে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখবো যে, বাংলাদেশের ক্যাডেট কলেজগুলো যেখানে বেশ কয়েক বছর আগে মাধ্যম ছিল বাংলা এখন তা পরিবর্তন করে ইংরেজী করা হয়েছে । মাদ্রাসাগুলোতে মাধ্যম হিসেবে আরবী ও ইংরেজী পড়ানো হচ্ছে । আর ইংরেজী মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতো আছেই । একটু টাকা-পয়সা যারা মালিক তারাই চান তাদের সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করবে । আমি মনে করি ইংরেজীর প্রয়োজনীয়তাকে কক্ষনো অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই কারণ সেটি আন্তর্জাতিক ভাষা । আমি চায়নাতে আছি তাই তাঁদের উদাহরণ দিচ্ছি, চাইনিজরাও কিন্তু ইংরেজী কে অস্বীকার করেনি কিন্তু সবার আগে তারা নিজেদের ভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তাদের শিক্ষার মাধ্যমে ম্যান্ডারিন অথবা চায়না ভাষা ।

বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের রাষ্ট্রভাষা; যে ভাষার জন্যে আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে – প্রাণ দিতে হয়েছে; সেই ভাষাকে সমুন্নত রেখে বা সেই ভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে যে স্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সেখানে আমার নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছি । বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর সবাই কিন্তু সমানভাবে এই ভাষার প্রতি মর্যাদাশীল না । আরেকটা জিনিষ বিশেষভাবে লক্ষণীয় আর সেটি হচ্ছে, বর্তমান মানে আমাদের প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রতি একটা বিরাট অশ্রদ্ধা রয়েছে । আমাদের প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের কাছে রাষ্ট্রভাষা কি বা এর মর্যাদা কোথায় সে ব্যাপারে আমরা উদাসীন ।

বেশ কিছুদিন আগে একটা সংবাদে দেখছিলাম একজন ভিন্ন দেশী ভদ্র মহিলা অনেক সুন্দর করে সাধু ভাষায় কথা বলছিলেন আর আমাদের দেশের সংবাদ-প্রতিবেদক বাংলা আর ইংরেজির জগা খিচুরি বানিয়ে সেই ভদ্র মহিলাকে প্রশ্ন করছিলেন । আরেকটা ঘটনা মনে পরছে, কিছু দিন আগে এক রাতে বেইজিং এর বাংলাদেশী ছাত্ররা মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম, তখন অন্য এক বঙ্গালী ছোট ভাই নতুন এক বাঙ্গালী ছাত্র কে নিয়ে এসে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল । সেই নতুন বাঙ্গালী ছেলেটা সবার সাথে ইংরেজিতে নিজের পরিচয় দেয়, সত্যি তাতে আমি কিছু মনে করি নি কারণ বিদেশের মাটিতে ইংরেজিতে কথা বলতে হবে এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করি যে সেই ছেলে আমাদের সাথে হিন্দি তে কথা বলা শুরু করলো, আমরা সবাই বাংলায় কথা বলছি আর সেই ভদ্র-লোক হিন্দিতে কথা বলছে; তারপর যখন আমি বললাম, আপনি কি হিন্দি আর ইংরেজি ছাড়া অন্য কোন ভাষায় কথা বলতে পারেন তখন চুপ হয়ে রইলেন এবং তারপর থেকে আর কোন দিন আমার সামনে বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষায় কথা বলেন নি; আজ সেই ভাই কে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই তার এই পরিবর্তনের জন্য ।

ব্যকরণের নিয়ম অনুযায়ী আমি হয়তো বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারি না কিন্তু আমি আমার আঞ্চলিক ভাষায় কিন্তু অনেক পারদর্শী, আমিও ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করি তখনই যখন শুধু প্রয়োজন পরে । ব্যকরণের নিয়ম অনুযায়ী কিংবা আঞ্চলিকতার রেশ অনুযায়ী উচ্চারিত ও লিখিত বাংলা সাধারণ সৌন্দর্যমন্ডিত, এর আবেদন চিরকাল ছিল এমনকি থাকবে । আমরা যে বাংলিশ কিংবা বাংহিন্দিশ ( বাংলা+হিন্দি+ইংলিশ ) বাংলা বলে লোকের কাছে বেশি আধুনিক হবার চেষ্টা করি তা হচ্ছে অতিরিক্ত সাজুগুজু করার নামান্তর মাত্র, একটা কথা মনে রাখবেন অতিরিক্ত সাজুগুজু করলে চেহারা নষ্ট হয়ে যায় । এর মাধ্যমে গুটিকয়ের গর্দভের কাছে নিজের মর্যাদা পেতে পারবেন, কিন্তু প্রকৃত বাঙ্গালীদের কাছে আপনি ঠিক হাসির উৎস হয়ে উঠবেন ।

ভাষার বিকাশে বিদেশী ভাষার ব্যবহার ব্যকরণসন্মত, কারন ভাষা সার্বজনীন, এক ভাষার সাথে অন্যভাষার অনেক শব্দের পরিমিত অনুপ্রবেশ ঘটে নানা বাস্তব প্রয়োজনের তাগিদে । কিন্তু কেন জানি আমার কাছে মনে হয়, বাঙ্গালীদের বাংলা ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তা যেন কয়েকগুণ দ্রুত ঘটে ।

মনে পরে স্কুলে থাকতে একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাত-ফেরি যোগ দিতাম, কারণ আমার বাবা আমাকে সেই প্রভাত-ফেরি তে যোগদান করতে উৎসাহ যোগাতেন, শীতের রাতে তুলে দিতেন ফুলের তোড়া বানানোর জন্য কক্ষনো কক্ষনো বড় দিদি আবার বাবা নিজেও বানিয়ে দিতেন একটু বড় হওয়ার পর থেকে বন্ধুদের নিয়ে বানাতাম সেই ফুলের তোড়া, আর সেই ফুলের তোড়ায় লিখা থাকতো “২১ শে ফেব্রুয়ারী, আমি কী ভুলিতে পারি”; ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিতাম পাশের গ্রামে কারণ তখন আমাদের গ্রামে কোন শহীদ মিনারে ছিল না ।

মাতৃভাষা দিবসের মাস ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই ভাষা সৈনিকদের যাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ঢাকার রাজপথ । শহীদ আবুল বরকত, শহীদ রফিক উদ্দীন, শহীদ আব্দুল জব্বার, শহীদ আব্দুস সালাম, এবং শহীদ শফিউর রহমান আরও নাম না জানা অনেক যাদের কে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিতে হলো, অথচ সেই দিনটি উদযাপন করা হচ্ছে ২১ শে ফেব্রুয়ারি বা ইংরেজী তারিখ অনুযায়ী ? এটাকে অনেকের মতো আমিও মনে করি, বাংলার প্রতি এবং ভাষা শহীদদের প্রতি এক ধরনের অপমান করা হচ্ছে ? কেন নয় ১৩৫৮ সালের ৮ ই ফাল্গুন ?

আমরা দেখতে পাই “২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর বিশেষ করে এই কয়টা তারিখ আমাদের জীবনে মিশে আছে, বরাবরই আমরা ইংরেজী তারিখটা ফলো করে আসছি, বাংলা তারিখটা আসলে সেভাবে পালন করি না একমাত্র ১লা বৈশাখ ছাড়া ।

যেহেতু ঐ দিনে অনেককে ভাষার জন্যে প্রাণ দিতে হয়েছিল সে হিসেবে দিনটিকে ইংরেজীতে উদযাপন করায় ভাষা শহীদের প্রতি এক ধরনের অপমান বলে মনে করাই স্বাভাবিক নয় ? এই বিষয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বাংলার অধ্যাপকের সাক্ষাৎকার শুনেছিলাম তিনি বলেছিলেন, “শুরুতেই প্রচলিত যে ধারায় তারিখটি ইংরেজীতে নির্ধারিত হয়েছিল বাংলায় না হয়ে পরে যখন এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলো সে সময়েও হয়তো দিনটিকে বাংলা ভাষার তারিখ অনুযাযী করার ব্যবস্থা করা যেত । বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারতো কোন তারিখটি হওয়া উচিত এবং বাংলা তারিখ অনুযাযী ৮ ই ফাল্গুন হওয়া উচিত ছিল । কিন্তু আবার অন্য একটি বিষয় হচ্ছে যেহেতু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এটি পালিত হবে আর তাই ইংরেজী তারিখটাই বেশী গ্রহণযোগ্য হবে সবার কাছে । আবার আরেকটি বিষয়ও কিন্তু উল্লেখ করেন তিনি বিষয়টি হচ্ছে ধরুন ৮ ই ফাল্গুন রাখা হলো কিন্তু সেটি আমাদের চেতনায় সেভাবে ধারণ করা হলো না তাহলেও কিন্তু সেটি ব্যর্থ হতো” ।

বাঙালি জাতির প্রাণের দাবি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কিন্তু সেই প্রাণের দাবি নিয়ে চলছে নিয়মিত খেলা । ২৬ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখের দ্য ইকনমিস্ট মন্তব্য করেছে যে, “ত্রিশ লক্ষ নারী-পুরুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে একচল্লিশ বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে তাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ হয়েছে, বিরাট জয় হয়েছে তার”। কিন্তু তাঁর পর থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজের গতিপ্রকৃতি কিছুটা মন্থর হয়ে গেছে কিন্তু একজন বাঙ্গালী হিসাবে আমার আকুল আবেদন থাকবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ নিয়ে আর যেন কোন ধরনের রাজনীতি না হয় শুধুমাত্র এর সফল সমাপ্তি কামনা করছি । কেন জানি রাজত্ব ব্যান্ড দলের শ্লোগান শিরোনামের গানটির কয়েকটা লাইন অনেক মনে পড়ছে —

“দেশ দ্রোহী বাংলা ছাড়, পাক প্রেমী বাংলা ছাড়
ভারত দালাল বাংলা ছাড়, সব রাজাকার বাংলা ছাড়
দিন- বদলের সপ্ন বুকে,, প্রজন্মই ভাঙ্গবে দেয়াল
মানবতার মুক্তিযুদ্ধে প্রেম হোক হাতিয়ার”।

এশিয়ান টাইমস এর আর.এম.কাটলার বলেছিলেন, “বাংলাদেশের নি:শ্বাস-প্রশ্বাসে বইছে আশাবাদ, এর অর্থনীতি সদা কর্মচঞ্চলময়”। ভাষার মাসে দেশের দুই দলের ক্ষমতাবান মানুষ গুলোর কাছে আকুল আবেদন থাকবে দয়া করে আমার দেশের অর্থনীতির চাকা বন্ধ করবেন না, পারলে একটু একটু করে আশার কথা শুনান । আর বিকৃত রুচির এবং বাংলা ভাষা ধ্বংসকারীদের বলছি ছাম্মাক ছাল্লু, উল্লালা উল্লালা, হিন্দি নাটক একটু কম করে দেখে পারলে দেশের গান এবং নাটক দেখুন তাতে আমাদের বাঙ্গালী জাতির কিছুটা উন্নতি ঘটতে পারে হয়তো । উল্টা পথে হাঁটা বন্ধ করার সময় এখনই, সোজা পথে চলতে মানুষকে সাহায্য করার দায়িত্ব আমাদের মতো তরুণদেরই; আসুন সবাই মিলে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি মর্যাদাশীল সুখী ও অর্থনীতি সমৃদ্ধ দেশ উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে নিজ-নিজ দায়িত্ব পালন করি ।

রনি ভৌমিক
প্রভাষক ও গবেষক,
ব্যবসা ও অর্থনীতি অনুষদ, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ।
ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ একাডেমি অব সাইন্স ।
বেইজিং , চীন ।