ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

আমি একজন সাধারণ মানুষ আর পেশায় একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনীতির ময়দানে আমি একজন মূর্খ সূক্ষ্ম মানুষ তেমন কিছুই বুঝি না এবং জানি না । প্রশাসনিক জ্ঞান আমার নেই বললেও চলে, তারপরও জানতে মন চায় একজন মানুষ কি সব বিষয়ে পারদর্শী ? গত কিছুদিন থেকে বাংলাদেশের পত্রিকায় চোখ রাখতেই দেখতে পাচ্ছিলাম মো. শহিদুল হক নামের এক ভদ্র লোককে নিয়ে খুব লেখা-লিখি হচ্ছে, তাহা দেখে কচি হাত এবং ক্ষুদ্র মন কে থামাতে পারলাম না । মাঝে মাঝে কেন জানি মনে হচ্ছে বাংলাদেশে সত্যি টাকার গাছ আছে

 

বিভিন্ন পত্রিকার কল্যাণে যতদূর জানতে পেরেছি, মো. শহিদুল হক নামের এই ভদ্র লোক ছিলেন প্রধান আমদানি-রপ্তানি ঢাকার নিয়ন্ত্রক । আহারে বেচারা ! নিতান্তই অভাগা, তাই ধরা খেয়ে গেছেন, তা না হয়তো কি এমন স্যারের তো অভাব নাই সরকারি অফিসগুলোতে । আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটা অফিসের খোঁজ দিতে পারবেন যেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় ? এটা প্রতিটা অফিসের স্বাভাবিক চিত্র । ভিডিওচিত্র যিনি ধারন করেছেন উনাকে অনেক ধন্যবাদ । এদের মুখোশ এভাবেই খুলে দেয়া উচিৎ,  যারা এমন করে টেবিলের নিচে দিয়ে টাকার পাহাড় বানাছেন তারা সবাই নিচু স্তরের । উনাদের মত মানুষের পরিবার কি জানে না যে উনারা কত টাকা বেতন পান, কোথায় থেকে গাড়ি-বাড়ি-উচ্চ বেতনের বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান খরচ যোগান হচ্ছে  ?

 

আমার মতে প্রতিটা পরিবার সদস্য দায়ি একজন অসৎ কর্মকর্তা হয়ে উঠার জন্য, সন্তানের জানা উচিৎ তাঁহাদের পিতা-মাতা কোন ধরনের চাকুরী করেন, স্ত্রী খোঁজ নেবেন তার স্বামী কোথায় থেকে এত এত গহনা এবং খাবার কিনেন, স্বামী নিবেন কোথায় থেকে তার স্ত্রী প্রতি মাসে এত টাকা দেয় এবং তাদের বেতনের স্কেল কত, প্রতিটা পরিবারের খবর নেওয়া উচিৎ তার পরিবারের আয়ের উৎস এবং তার উপার্জন/বেতন কত । গিন্নির গয়না, গাড়ি-বাড়ি, ফ্লাট কিনে সমাজে কতই না কদর এইসব মানুষের, আমরা সবাই মনে করি, উনাদের মতো মনুষ্যত্বহীন ব্যক্তিরা কতো বড় চাকরী করেন বলার বাইরে । কিন্তু একবারও কি খোঁজ নিয়ে দেখেছি তাদের এত এত গয়না, গাড়ি-বাড়ি করার মতো আয় আছে কিনা ! সরকারি চাকরিজীবীদের ভাবনাটা এমন যে, দেশটা রসাতলে গেলেও তার কিছুই আসে যায় না, শুধু মাত্র কলমের খোঁচা দিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করতে চায় তারা । আর এইসব অসৎ পথের টাকা দিয়ে তারা একসময় শিল্প-কারখানা গড়ে তুলেন, সমাজের মানুষ তখন তাদের অনেক সম্মান করে থাকেন । আসুন আমরা সবাই মিলে সমাজিক ভাবে এইসব নিচু স্তরের মনুষ্যত্বহীন চাকুরীজীবীদের বর্জন করি যাদের অপকর্মের জন্য স্বাধীনতার চৌচল্লিশ বছর পরও আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি নিয়ে বিশ্ব-দরবারে আমরা মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারি না ।

 

সিসিআইই থেকে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) এবং রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি) নিতে হয় আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা করতে হলে । প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে সিসিআইই থেকে একই দিনে এমনকি দুই ঘণ্টার মধ্যে আইআরসি ও ইআরসি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে । কাগজগুলো হচ্ছে ট্রেড লাইসেন্স, চেম্বার বা স্বীকৃত বাণিজ্য সংগঠনের বৈধ সদস্যতা সনদ, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), ব্যাংক প্রত্যয়নপত্র এবং লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয় (আরজেএসসি) থেকে অনুমোদিত সংঘস্মারক ও সংঘবিধি এবং সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন [উৎসঃ প্রথম আলো, অক্টোবর ০৯, ২০১৫, শিরোনামঃ গুনে গুনে ঘুষ খান তিনি ] ।

 

একটা বাস্তব ঘটনা বলছি, বছর দুয়েক আগে আমার এক বন্ধু চায়নার সাথে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য করবে বলে আমাকে জানালো এবং জানতে চাইলো কি কি করতে হবে, আমি তখন বললাম আইআরসি এবং ইআরসি নিবন্ধন সনদ নেওয়ার জন্য । যেই কথা সেই কাজ, বন্ধু আমার কথা মতো সব কিছু নিয়ে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ১০-১৫ দিন ঘুরাফেরা করার পরেও সৎ উপায়ে নাকি নিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছিল; শেষে নাকি অসৎ উপায়ে একদিনের মধ্যে সবকিছু সুন্দর ভাবে পেয়ে গিয়েছিল । আমি তখন তার কথা বিশ্বাস করতে চাই নি কারণ কাগজ-পত্র সবকিছু ঠিক থাকলে কেন অসৎ উপায়ে যেতে হবে ! মনে করেছিলাম বন্ধুর কাগজে হয়তো ভুল আছে তাই তাকে অসৎ উপায়ে যেতে হয়েছিল, কিন্তু বন্ধু আমার বলেছিল কাগজপত্র ঠিক থাকুক আর নাই থাকুক, ঘুষ ছাড়া আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় কাছ থেকে কেউ কোনো সনদই নিতে পারেন না, তারপরও বিশ্বাস হচ্ছিল না; আজ বিশ্বাস হলও এবং নিজেকে অনেক ছোট মনে হল ।

 

প্রথম আলো’র সেই প্রতিবেদনে একটি পংক্তি আমার কাছে অনেক রহস্য লেগেছিল, “কর্মকর্তারা খোলামেলা ঘুষ গ্রহণের ঘটনায় যতটুকু বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, তার চেয়েও বেশি বিস্মিত হয়েছেন এই ভিডিও করা কীভাবে সম্ভব হলো তা নিয়ে” এটি কত বড় লজ্জা আমাদের জন্য যে ভিডিও করাকে পুরস্কৃত না করে বিশ্ময় প্রকাশ করা হচ্ছে, ছিঃ ছিঃ ছিঃ; এত নিচে নেমে গেছেন আমাদের দেশের সরকারি আমলারা ! আমার সীমিত জ্ঞান থেকে মনে হয় বিশ্বের যে কোন দেশে হলে সেই সাহসী ভদ্রলোক গুলোকে যারা তাহাদের সাহস দিয়ে ভিডিও করেছেন তাঁহাদেরকে অবশ্যই বীরত্বের প্রশংসা করত এবং পুরস্কৃত করা হতো এবং শহিদুল হক নামের সমাজের কীট কে তার অপকর্মের প্রমান পাওয়ার সাথে সাথে তার চাকুরী থেকে সারা জীবনের জন্য বরখাস্ত করে এবং তার অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হতো । কিন্তু আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে সরকারি চাকুরী হল আজীবনের কড়ারনামা যা কক্ষনো শেষ হয় না, তাই আমাদের সমাজের সবাই শুধু সরকারি চাকুরী খোঁজে থাকেন, তাদের কাছে সরকারি চাকরী মানে হল সোনার ডিম পারা হাঁসের মতো, যা পেতে হলে মামার খুঁটির জোর এবং মামু লাগে । এমনি প্রথা হয়ে গেছে যে, আমাদের দেশের নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত ভাইবোনদের চিন্তা ভাবনা যে মামা-চাচা ছাড়া কিছুই হয় না, এবং সেই মামা-চাচা’র খুঁটির জোর অথবা মামু দিয়ে যারা চাকরিতে যান তারাই বেশি নিজেদের কে বেশি সুশীল সমাজের মানুষ বানাতে অসৎ পথে চলে যান । তাই গুণী শিল্পী হায়দার হোসেন বলেছেন, আমি সরকারি অফিসার আমি একালের জমিদার…… আসলেই সরকারি চাকরীজীবীরা নিজেদের জমিদার এবং চির অম্লান মনে করে থাকেন ।

 

রাজশাহীর পবা উপজেলার ভূমি কার্যালয়ের ভূমি সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড) শাহাদত হোসেন [উৎসঃ প্রথম আলো, অক্টোবর ১৭, ২০১৫, শিরোনামঃ এসি ল্যান্ডের “মাটির মায়া”] । লেখাটা পড়ে খুবই ভাল লেগেছিল । এমনি হওয়া উচিৎ বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারী-বেসরকারি অফিসের চিত্র । কিন্তু বাস্তবে শাহাদাত হোসেনদের সংখ্যা খুবই নগন্য । বাংলাদেশের অফিস-আদালতগুলো যেখানে নানা ধরনের দুর্নীতির আখড়া হয়ে গেছে, আর ভূমি অফিস হলো দুর্নীতির প্রথম সারিতে থাকা এদের মধ্যে অন্যতম; “যেন অনন্ত কালের গেড়ে বসা খরার মধ্যে এক পশলা অঝোর বৃষ্টি”, সেই ভূমি অফিসে এরূপ জনকল্যাণমূখী বাস্তব কার্যক্রম সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করে তুলেছে । অনেক ধন্যবাদ জনাব শাহাদত হোসেনকে, উনার পরিবার সত্যি একটা গর্বিত পরিবার । বাংলাদেশের প্রতিটা অফিস-আদালতে যদি এমন সৎ কর্মকর্তা থাকতো তাহলে হয়তো আমাদের দেশটা অচিরেই একটা সোনার বাংলা হয়ে উঠত । বাস্তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নাকি জনাব শাহাদত হোসেনের মত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকতে হয় কোনঠাসা হয়ে, এমনকি কোন কোন সময় বিশেষ পেটনীতিবিদের (রাজনীতিবিদের) কাছে নাকি তাদেরকে হার মানতে হয় । কারণ যারা শাহাদত হোসেন হতে চান তাঁদেরকে কারণে-অকারণে তাদের উর্ধতন কর্মকর্তাদের বিরাগ-ভাজন হয়ে অলিখিত শাস্তিমূলক বদলী নামক হয়রানির শিকার নাকি হতে হয় । যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের কাজ সঠিকভাবে না করে জনগণকে ভোগান, অবৈধ সুবিধার জন্য ভিক্ষুকের মতো করে হাত পেতে বসে থাকেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলছি শাহাদত হোসেন যদি পারেন, তাহলে আমরা পারবো না কেন ? চেষ্টা করুন, বদলে ফেলুন অমনুষ্য সেই চরিত্রকে, নিজেকে মানুষ হিসেবে জানান দিন; নিজেকে শহিদুল হকের মতো চুর হিসাবে না বানিয়ে জনাব শাহাদত হোসেনের মতো মডেলে হিসাবে গড়ে তুলুন ।

 

আসলে আমাদের দেশের মন্ত্রীদের এবং সরকারি আমলাদের অবস্থানটা অনেকটা “মিউজিকাল চেয়ার” এর মতো, দেখা যায় আজ যদি কেউ সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকেন কিছুদিন পর তাকে দেওয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের, তার পরের দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে; আজ যিনি বনে আছেন আগামিকাল দেখা যায় উনি খেলায়; তার মানে কি আমলা এবং মন্ত্রীরা সব বিষয়ে পারদর্শী ? নাকি ব্যাপারটা এমন যে কে কোথায় আছেন সেইটা বড় কথা না তার একটা পদবী বা চেয়ার দরকার সেইটায় দেওয়া হচ্ছে, মনে হয় না জনগণের সেবা দেওয়া তাদের কোন কিছু আসে যায়; চেয়ারে বসে সে তার আখেরের হিসাব গুচ্ছানো নিয়ে বেস্ত থাকেন, ভালো সুযোগ পেলে হয়তো তারা দেশকে ও বিক্রি করে দিতে পিছু-পা হবেন না ! আমার মনে হয় আমাদের দেশের উন্নয়ন নিয়ে খুব কম আমলারা চিন্তা করে থাকেন, আর আমরা বোকার মতো পাঁচ বছর পর পর শুধু অপেক্ষা করি মিন্টু নাকি পিন্টু কে ভোট দিব, আমরা কেন ভুলে যাই যে পিন্টু অথবা মিন্টু সবাই এক; সেই ক্ষেত্রে আমাদের আমলারা যদি সৎ থাকে তাহলে দেশের উন্নয়ন কেউ আটকাতে পারবে না । আমি শুধু সেই দিনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, যে দিন দেশের সব আমলারা এক হয়ে নিজেদের পকেটের চিন্তা বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন, আর অন্য দিকে দেশের সরকারি চাকরিজীবীরা শুধু হাজিরা দেওয়ার জন্য অফিসে না গিয়ে প্রতি দিনের কাজ প্রতি দিন শেষ করবেন, যাতে করে ফাইলের পাহাড় না জমে যায়- তাহলে আর সাধারণ জনগণকে সেবা দিতে সমস্যা হবে না ।

 

আমি এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে, সরকারী-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান হবে দুর্নীতি আর ঘুসখোরদের আখরা মুক্ত, বিশেষ করে সরকারী সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, যেখানে দেখা যাবে না আর যোগ্যতা সম্পন্ন লোক নির্লজ্জভাবে মনুষ্যত্বহীন আচরন করছে, কোন কাজের জন্য গেলে বলবে না যে- পরে আসেন । আমরা যারা সাধারণ জনগণ আছি আসুন সবাই একয়ে প্রতি হজ্ঞা করি কক্ষনো ঘুষ প্রদানে আগ্রহী হবো না, কারণ ঘুষ প্রদান এবং গ্রহণ দুইটায় সমান অপরাধ । আসেন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ঘুষ এবং দুর্নীতি মুক্ত একটা সোনার বাংলা উপহার দিয়ে যাই

 

 

 

রনি ভৌমিক
লেখক এবং প্রভাষক, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় । বর্তমানে পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ একাডেমী অব সাইন্স, বেইজিং, চীন ।

slide

প্রতীকী ছবি