ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

আমাদের বাড়ির পূজার ছবি

যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তি রূপেন সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ  

গতকাল রাত থেকে বেইজং এ একটু একটু শীত পরতে শুরু করেছে, এখন তাপমাত্রা চলছে ৬ ডিগ্রি; তাই একটু জরূ-সরু হয়েই পেপার পড়ছি । গতকাল রাতে যখন মা-বাবা’র সাথে ভিডিও তে কথা বলছিলাম, সেই মুহূর্তে ঢাকের শব্দে মনের অজান্তে বুকের ভিতরে কান্নার ঢেউ বইতে যাচ্ছিল, পরের মুহূর্তে মনে হল আমার চোখের অশ্রু দেখলে আমার মা-বাবা তো ঠিক থাকতে পারবে না, তাই আবেগ কে কোন রকম নিয়ন্ত্রণ করে একটু জল খেয়ে কথা বলছিলাম । মায়ের মন কে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা কার আছে, মা আমার তখন জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে বাবা, আমি প্রতি উত্তরে খুব তারাতারি করে বলে উঠলাম তেমন কিছু না একটু কাশি এসেছিল তাই জল খেয়ে নিলাম । সাথে সাথে আমার মায়ের আঁখিতে অশ্রু জড়তে দেখে আমি বললাম কি হয়েছে মা কান্না করছ কেন ? মা আমার বলল বাবা আজ কত বছর ধরে দুর্গা মায়ের চরণে অঞ্জলি দিতে পারিস না তাই তোর খারাপ লাগছে তাই না …… তখন পাশেই বাবা বসা ছিল, বাবা বললেন আমি কি মোবাইলটা নিয়ে মন্দিরের সামনে যাবো, আমি বললাম না বাবা যেতে হবে না । এত আবেগ কেন আমাদের মনে, কেন নিজেদের মন কে শাসন করতে পারি না ! আমরা জানি কক্ষনো আমরা আমাদের সেই হারানো অতীত ফিরে পাবো না, তারপরও নিজের মনের অজান্তে সেই পথেই বারবার ফিরে যেতে চাই ।

একটা সময় ছিল শুধু মনে মনে জল্পনাকল্পনা করে বেড়াতাম ঠিক কবে বড় হব, নিজে নিজে সবকিছুর সিধান্ত নিব; তখন মনে করতাম বয়স বেশি হলে তখন আর কারোর কথা শুনতে হবে না কোন বাঁধা থাকবে না । আজ হারে হারে অনুভব করতে পারছি হাজার হাজার মাইল দূরে বসে যে শৈশব-কৈশোর ছিল সম্ভবত আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময় । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার কোন এক লেখায় বলেছিলেন যে, মানুষের বয়স বেড়ে যাবার মধ্যে এক ধরনের অন্তর বেদনাবোধ কাজ করে, সেই সময়টা শুধু ঘর-সংসার-ক্যারিয়ার নিয়ে পরে থাকতে হয় । শৈশব-কৈশোর অবস্থায় সবাই অনেকটা জাগতিক দুশ্চিন্তা বা জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে সময় পার করে থাকি, তখন সবকিছু যেন বাবা-মায়ের কর্তব্য । সেই অতীতজীবনে ফিরে যাবার উপায়হীন আক্ষেপে বেদনাবোধের অস্তিত্বমানতা তাই অস্বাভাবিক নয় কি ?

আমার মতো এমন লাখ লাখ অভাগা আছেন আমরা যারা শৈশব-কৈশোরের সেই দিন গুলো স্মৃতি প্রত্যাবর্তনের প্রণালীতে বারবার ফিরে যেতে চাই নিজেদের আগের অবস্থানে আর এই বাহনটির নাম স্মৃতিতর্পণ । প্রতি বছর বেশ কয়েকবার আমরা এমন আবেগ পূর্ণ হয়ে ফিরে পেতে চাই অতীতের সেই পহেলা বৈশাখ, ঈদ কিংবা পূজার মতো উৎসবের পথ বারবার স্মৃতি চারণ করে থাকি । দেখতে আজ মহাঅষ্টমী চলে এসেছে, সবাইকে মহাঅষ্টমী এবং সেই সাথে পবিত্র ঈদের আগাম শুভেচ্ছা জানাছি । কারণ ধর্ম যার যার উৎসব আনন্দ সবার ।

শরতের শারদীয় উত্সব। শারদীয় উত্সব মানেই দুর্গাপূজা। মাতৃরূপে, পিতৃরূপে, শক্তিরূপে, শান্তিরূপে, বিদ্যারূপে আবির্ভূতা এক মহাশক্তি । তিনি সম্মিলিত দেবশক্তির প্রতীক । অসুর অর্থাত্ অপশক্তি বিনাশে দেবতারা তাদের সম্মিলিত শক্তিতে সৃষ্টি করেন মহাশক্তি মহামায়া । দুর্গতি হতে ত্রাণ করেন বলেই দেবীর নাম হয়েছে দুর্গা । সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে দেবী দুর্গা মহাশক্তিরই প্রতীক । সেই মহাশক্তিকেই তারা প্রতিমার মধ্য দিয়ে চিন্ময়ী ব্রহ্মশক্তিকে দর্শন করে । তাই এই পূজা প্রতিমাকে পূজা করা নয়, শ্রীরামকৃষ্ণদেব সেই তত্ত্বকেই বলছেন প্রতিমা মাটির কেনো গো ? প্রতিমাতে পূজা করা, প্রতিমাকে নয় । সনাতন ধর্মশাস্ত্রে ‘দুর্গা’ নামটির ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, ‘উ-কার’ বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক ও অ-কার ভয়-শত্রুনাশক । অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন তিনিই হলেন মহামায়ি শ্রী শ্রী দুর্গা ।

যে দেবী অগম্যা, দুষ্প্রাপা তিনিই হলেন– শ্রী শ্রী দুর্গা মা । বাংলাদেশের এবং ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের সব চেয়ে বড় পূজা হলো শ্রী শ্রী দুর্গা মায়ের পূজা । বড়দের মুখে শুনেছি আমাদের বাড়িতে দুর্গা মায়ের পূজার ইতিহাস নাকি বহু পুরাতন, যতদিন দেশে ছিলাম কক্ষনো বাড়ির পূজা রেখে অন্য কোথাও যেতাম না । সারা বছর ধরে অপেক্ষা করতাম দুর্গা মা কবে আসবে আমাদের বাড়িতে, পূজার আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠবো । আমার যতদূর মনে পরে প্রতিটি পূজাতে আমি আর আমার বন্ধু মিলে মধ্য রাতে পার্শ্ববর্তী গ্রাম গুলোতে যেতাম মায়ের পূজার জন্য ফুল কুঁড়াতে, ফুল কুঁড়িয়ে এসে তারপর ঘুমাতে যেতাম । প্রতিটি পূজাতে উপবাস থেকে মায়ের চরণে পুস্পা অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ পেয়ে তারপর পেট পূরিয়া ভূরি ভোজন করতাম ।

প্রতিবছর দুর্গাপূজার বেশ দুই এক দিন আগে থেকে বন্ধুদের প্রস্তুতি চলত বাজী ফোটানোর, আর আমার পূজার প্রধান বায়না ছিল বিভিন্ন ধরনের বাজি কিনে দিতে হতো, বাবা কক্ষনো না করতেন না এবং সবসময় আমার জন্য বেশি করে বাজি কিনে আনতেন । পূজামণ্ডপে আমাদের আকর্ষণ ছিল সন্ধ্যার পরপর বাজি ফোটানো- মূলত চকলেটবাজি, তারাবাজি, রকেটবাজি সাথে ছিল ব্যাঙ্গবাজি । শব্দদূষণের মতো কোন কিছু মাথায় আসতো না সেইসময় আর বাড়ির বড়দের তেমন কোন বাঁধা ছিল না সেই দিন গুলোতে । আরতির সময় ঢাক-কাঁসরের তালে তালে ধূপদানি হাতে নাচের দক্ষতা তো বিরাট বড় গুণ ছিল । ঢাকের বিরতির সময় টেপ রেকর্ডারের সর্বোচ্চ ভলিউমে কলকাতার আধুনিক গান চালানো হতো । সন্ধ্যা-হেমন্তদের মিষ্টি রোম্যান্টিকতার ভীড়ে আশা ভোঁসলের চটুল গানও উঁকিঝুকি দিত একটু একটু পর । যখন একটু বড় হলাম তখন সেইগুলোর সাথে যুক্ত হল বাপী লাহিড়ীর “বৌদি গো” কারণ সেইটা ছিল তখনকার উড়তি বয়সের ছেলেদের হিটলিস্ট । সারাদিন ভরে প্রসাদ বিতরণের দায়িত্ব থাকতো আমাদের উপর; আর সন্ধ্যায় পূজা মন্ডপে মন্ডপে আরতি দেখতে বেড়িয়ে পরতাম, বন্ধুদের সাথে ঘুরে এসে নিজেদের মন্দিরে আরতি করতাম সবাই মিলে । যদি ও আমি ভালো আরতি করতে পারতাম না, কিন্তু সবার সাথে তাল মিলিয়ে চালিয়ে নিতাম । পূজার সময় বাবা-মা’র জন্য খুব কষ্ট হতো আমাকে খোঁজে বের করতে, আর আমাকে শুধু খাবার খাওয়ার জন্য খোঁজা হতো, কেন জানি মায়ের পূজার দিন গুলোতে খিদে থাকতো না বেশি ।

এসব করতে করতেই কিভাবে যে দশমী চলে আসতো বোঝতেই পারতাম না । দশমীতে মা কে দুঃখভারাক্রান্ত মনে বিদায় দেওয়া আর মার কাছে একটাই চাওয়া সবাই যেন ভালো থাকে । আমার বাবা অনেক শক্ত মনের মানুষ, যদিও ইদানীং অল্পতেই অনেক ভেঙ্গে পরেন; বাবা’র চোখে দাদু এবং ঠাকুর মা’র দেহ ত্যাগ করার সময় ছাড়া আগে কক্ষনো অশ্রু দেখতে পাই নি, একমাত্র বেতিক্রম ছিল মায়ের পূজার দশমীর দিন, সেইদিন দেখতাম বাবা’র দুই চোখ ভরে যেত অশ্রুতে । বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শুরু হয়ে যেত রং এবং সিঁদুর লাগানোর ধুম । মা কে সিঁদুর লাগিয়ে তারা একে অপরকে সিদুর লাগিয়ে দিতেন, তারপর চলে আসতো সেই কষ্টের মুহূর্ত মায়ের বিসর্জন । এই দশমী তিথি বিজয়াদশমী নামে খ্যাত । মায়ের বিসর্জনের পর গুরুজনদের প্রণাম করার ধুম পড়ে যেত ।

সময় আসলে অনেক দ্রুত বদলে যাচ্ছে, মাঝে মধ্যে মনে হয় এইতো সেই দিন পূজাতে আরতি করেছি; কিন্তু আজ আসলেই অনেকটা বছর হয়ে গেল মায়ের চরণে অঞ্জলি দিতে পারছি না । আজ শুধু দূরে বসে স্মৃতিচারণে পুরনো দিনের অনেকটুকু উত্তাপ অনুভব করে থাকি । যদিও অনেক দূরের অতীত এখনো হয় নি, কিন্তু আগের সেই মানুষগুলো আজ অনেক দূরে চলে গেছে, সবাই আজ আমরা যার যার মতো বেস্ত হয়ে পরেছি, কিন্তু আমার মনের মন্দিরের স্মৃতি গুলো সেই রকম অতীত হয়ে যাচ্ছে যা স্মৃতির মানসপটে ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে বিস্মৃতপ্রায় হতে চলেছে । সেইদিন আমার অর্ধাঙ্গিনী বারবার করে বলতেছিল পারলে অধ্যাপকে (সুপারভাইজার) বলে এক সপ্তাহের জন্য চলে আসো না, মনে মনে তখন বললাম আমারও কি মন কম চায় সবার সাথে আবার পূজা করি । নিজের হারানো শৈশবকে একঝলক দেখলাম আজ আবার, আজ আমার অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়; তাই মন চাইলেও ফিরে যেতে পারছি না শৈশবের সেই আনন্দময় দিন গুলোতে, আমার প্রিয় পরিবার এবং আমার সেই প্রিয় পূজা মন্ডপে ।

পৃথিবীতে শুভ-অশুভর যুদ্ধ চলছে প্রতিনিয়ত, কার চেয়ে বেশি কে ক্ষমতাবান হবে, কার কত টাকা হবে এই নিয়ে যুদ্ধ চলছে প্রতিনিয়ত । কিন্তু আমরা কেউ একবারের জন্য ও ভেবে দেখি না, সাধনার মহাযুদ্ধে জয়ী হতে পারলেই মানুষ মহাশক্তি দুর্গার সন্ধান পেয়ে থাকেন । সাধনার দশম স্তরে উন্নীত হতে পারলেই পরমবিদ্যা মহাশক্তির নাগাল পাওয়া যায় । মানুষের এ স্তরে আসতে পারলেই অপরাজিত হন অন্তরাত্মার যুদ্ধে । এ যেন দশমীর মহাদশা যা মানুষ কখনও ভুলতে পারে না । আসুন সবাই মিলে হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে মায়ের নামে সাধারণ জনগণের সেবায় নিজেদের নিয়জিত রাখি, কারণ এই টাকাপয়সা, পেশী শক্তির ক্ষমতা আজ আছে তো কাল নেই; জগতে এমন কিছু করে যান যার জন্য অনন্ত কাল সবাই আপনাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে । সকলকে আবারো শারদীয় শুভেচ্ছা ।

 

 

রনি ভৌমিক
লেখক এবং প্রভাষক, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় । বর্তমানে পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ একাডেমী অব সাইন্স, বেইজিং, চীন ।