ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

20074166_SS

দীপাবলী সনাতনধর্মীদের একটি বিশেষ উৎসব । দীপাবলী অনেক নামে পরিচিত আছে;  দীপান্বিতা, দীপালিকা, সুখরাত্রি, সুখসুপ্তিকা এবং যক্ষরাত্রি নামেও অভিহিত হয় । দীপাবলি হল একটি পাঁচ দিন-ব্যাপী হিন্দু উৎসব । আজ স্টার প্লাস এর যুগে বেশীর ভাগ বাংলাদেশী ভাইবোনেরা শুভ দীপাবলি না বলে “হ্যাপি দিওয়ালী” । তারা আমার চেয়ে অনেক বেশী অগ্রগমনী কিন্তু আমার কাছে আজও দীপাবলি বলতেই বেশী ভালো লাগে, তার জন্য যদি কেউ আমাকে খেত বলে তাতে আমার কোন সমস্যা নেই; মাতৃভাষা নিয়ে এখানেই আমার গর্ব । আমি হিন্দি বলতে পারি না অথবা বুঝিনা বলতে আমার বিন্দু মাত্র খারাপ লাগে না ।

 

যাই হোক, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীর দিন ধনতেরস অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দীপাবলি উৎসবের সূচনা হয় তা ধ্রুব সত্য । কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে ভাইফোঁটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই উৎসব শেষ হয় । দীপাবলি ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, মরিশাস, গুয়ানা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, সুরিনাম, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিজিতে একটি সরকারি ছুটির দিন; কিন্তু আমাদের দেশে এই বিশেষ দিনটিতে এখনো কোন সরকারি ছুটির দিন হিসাবে ঘোষণা করেনি ।  আশা করবো হয়তো কোন এক সময় হয়তো আমাদের দেশের সরকার এই দেশের হিন্দু ধর্মাবলীদের কথা মাথায় রেখে দীপাবলির এই দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করবেন ।

 

দীপাবলীর তাৎপর্যতা দীপে বা বাতি’তে যা হলও “প্রদীপের সমষ্টি”। এই বাতি কোন সাধারণ বাতি নয়, এই বাতি বিশেষ কারো উদ্দেশ্যে জ্বালানো হয় একটা নিদিষ্ট সময়ে, এই বিশেষ বাতি জ্বালানো পূর্ব পূরুষদের উদ্দেশ্যে । হিন্দু সংস্কৃতিতে একটি কথা প্রচলিত আছে  “বাতি দেয়ার ও লোক বংশে নেই” অর্থাৎ “নির্বংশ”, যা কিনা সাধারণ কোন কারণে হয় না  ।

 

মহালয়ায় শ্রাদ্ধগ্রহণের জন্য যমলোক ছেড়ে যে পিতৃপুরুষগণ মর্ত্যে আগমন করেন বলে, তাঁদের পথ প্রদর্শনার্থে উল্কা জ্বালানো হয় । এ কারণে ঐ দিন আলোকসজ্জা ও বাজি পোড়ানো হয় । কেউ কেউ রাত্রিতে নিজগৃহে দরজা-জানালায় মোতবাতি জ্বালায়, কেউ বা লম্বা বাঁশের মাথায় কাগজের তৈরি ছোট ঘরে প্রদীপ জ্বালায়; একে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় আকাশপ্রদীপ । দীপাবলি মানে আলোর উৎসব ।

 

দীপাবলির এটাই তাৎপর্য ও গর্বের বিষয় যে ছেলে-মেয়ে তার পিতা-মাতার নামে বাতি জ্বালাবে । বংশের সবার আত্নার উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করবে, আমরা  সবাই বাতিটাকেই মূল উৎসব হিসেবে ধরে নেই, অনেকে নিরামিষ খেয়ে বাতি জ্বালায়, আর অনেকে উপাস থেকে বাতি জ্বালায় তার পূর্বপূরুষদের আত্নার শান্তির উদ্দেশ্যে,  স্মরন করে । রামায়ণে আছে যে, শ্রীরাম  দীপাবলী দিনে ত্রেতা যুগে শ্রী রাম রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করেন । শ্রী রামের চৌদ্দ বছর পরের প্রত্যাবর্তনে সারা রাজ্য জুড়ে প্রদীপ জ্বালানো হয় । রাম এইদিন রাজ্যে ফিরে তার পূর্ব পূরুষদের উদ্দেশ্যে বাতি দিয়েছিলেন ।

 

সমাজের “দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন” বা “ন্যায়ের কাছে অন্যায়ের পরাজয়” কথাটায় দৃঢ় বিশ্বাস। দীপাবলির মাধ্যমে উপনিষদের আজ্ঞায় এটা চরিতার্থ হয়ে ওঠে যে,  “অসতো মা সদ্গময় তমসো মা জ্যোতির্গময় মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়” । অর্থাৎ “অসৎ হইতে সত্যে লইয়া যাও, অন্ধকার হইতে জ্যোতিতে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে অমৃতে লইয়া যাও”।

 

প্রাচীন প্রথা অনুসারে দীপাবলির সন্ধ্যায় তেল দিয়ে সহস্র মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয় । এখনো অনেক স্থানে এই প্রথা চালু আছে । তবে বর্তমানে শহরাঞ্চলে অনেকে তেলের প্রদীপের পরিবর্তে মোমবাতি ব্যবহার করেন । ছোট বেলায় এই দীপাবলির রাতে কত যে আনন্দ করতাম আজ প্রবাসে বসে সেই দুরন্তপনা দিন গুলো মনে পরছে,  গ্রামের বন্ধুরা মিলে নারকেলের খোলে মোমবাতি জ্বালিয়ে পূজা দেখতে যাওয়া টা আমি এখনো সবচেয়ে বেশি মিস করে থাকি । আবার দীপাবলির রাতে মোমবাতি জ্বালানোর পর যখন একটা সময়পর মোমবাতি গুলো শেষ হয়ে যেত তখন সেই গুলোর পদলিত অংশ সংগ্রহ করতাম সবাই মিলে; তারপর সেইগুলো নিয়ে পেঁপে গাছের ডাল দিয়ে আবার মোমবাতি বানাতাম আর মা’র বকা-ঝকা খেতাম……তারপরও দুষ্টামি কোন ভাবেই থামাতাম না ।

লেখকের বোন (দীপা ভৌমিক)

ক্যাপশন: লেখকের বোন (দীপা ভৌমিক)

ভাইফোঁটা হিন্দুদের একটি উৎসব বা আচার, কারণ এটি কোন প্রচলিত পূজা-পার্বণ নয় । আমরা সবাই জানি, বারো মাসে তের পার্বণে বাঁধা আমাদের বাঙ্গালী হিন্দুসমাজের জীবনাচার, যা নিয়ে অনেক গল্প এবং গান আছে । এই উৎসবের পোষাকি নাম ভ্রাতৃদ্বিতীয়া অনুষ্ঠান। ভাইফোঁটার দিনে ভাইবোনদের মধ্যে অনিন্দ্য সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি হয়, যাকে এককথায় বলা যায় আনন্দময়, নির্মল একটি পার্বণ ।

 

ভাইফোঁটা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় পার্বণ । কার্তিক মাসের শুক্লাদ্বিতীয়া তিথিতে (কালীপুজোর দুই দিন পরে) এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয় । বাঙ্গালী হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, এই উৎসব কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের ২য় দিন উদযাপিত হয় । মাঝেমধ্যে এটি শুক্লপক্ষের ১ম দিনেও উদযাপিত হয়ে থাকে । কার্তিক মাসের শুক্লা পক্ষে দ্বিতীয় তিথিতে বোন তার ভাইকে পরম যত্নসহকারে একটি সুন্দর আসনে বসান । শিশির ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে হাতের তিন আঙুলের সাহায্যে বোন তার ভাইয়ের কপালে ধুয়ে দেয় । কথিত আছে, এই দিন মৃত্যুর দেবতা যম তাঁর বোন যমুনার হাতে ফোঁটা নিয়েছিলেন। অন্য মতে,  নরকাসুর নামে এক দৈত্যকে বধ করার পর যখন কৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রার কাছে আসেন,  তখন সুভদ্রা তাঁর কপালে ফোঁটা দিয়ে তাঁকে মিষ্টি খেতে দেন। সেই থেকে ভাইফোঁটা উৎসবের প্রচলন হয় । ভাইফোঁটার দিন বোনেরা এই কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে একইভাবে চন্দন তিলক এঁকে দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করে—

 

“ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।

যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা॥

যমুনার হাতে ফোঁটা খেয়ে যম হল অমর।

আমার হাতে ফোঁটা খেয়ে আমার ভাই হোক অমর”॥

 

হেমন্তের পবিত্র শিশির দিয়ে বোন তার ভাইয়ের সব অশুভ অমঙ্গল ও অকল্যাণকর শক্তিকে ধুয়ে দেয় । সুগন্ধি চন্দন তিলক ললাটে এঁকে দিয়ে এনে দেয় সৌভাগ্যের পরশমণি । তারই সঙ্গে অমরত্বের প্রতীক দুর্বা আর ধনের প্রতীক ধান দিয়ে প্রার্থনা বা আশীর্বাদ করে ভাইয়ের সব কল্যাণের জন্য । অন্যদিকে ভাই বোনকে আশীর্বাদ বা তার মঙ্গল কামনা করে । ভাই-বোনের এই আকুতিতেই তো ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া ।এই সময় শঙ্খ্যবাজানো হয় এবং হিন্দু নারীরা উলুধ্বনি করেন । এরপর বোন তার ভাইকে আশীর্বাদ করে থাকে (যদি বোন তার ভাইয়ের তুলনায় বড় হয় অন্যথায় বোন ভাইকে প্রণাম করে আর ভাই বোনকে আশীর্বাদ করে থাকে) ।

 

আমার বোন দীপা দিদি আমার চেয়ে বড়, তাই দিদি আমাকে আশীর্বাদ করত এবং প্রতি বছর কিছু উপহার দিত । দিদি’র বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরেও তার ভাঁটা পরেনি ; ভাঁটা পরেছে আমি দেশ ত্যাগ করার পর থেকে । কিন্তু দিদি তার দায়িত্বটি ঠিকই পালন করে যান, তার বাসার পূজার ঘরে আমার জন্য ঠিক আগের মত করে আশীর্বাদ করেন, আমিই পারি না দিদি’র কাছে থেকে সরাসরি আশীর্বাদ নিতে সাথে উপহার ।

 

পৌরাণিক ব্যাখ্যা অথবা আমাদের সমাজের প্রচলিত কথন যাই হোক না কেন ভাইফোঁটা একটি সামাজিক উৎসবে আমাদের সবার কাছে পরিচিতি পেয়েছে । ভাইফোঁটার ধর্মীয় গুরুত্ব অপেক্ষা করে ভাইবোনের মধ্যকার প্রীতি-ভালোবাসার সম্পর্কটি মূর্খ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । অনেক মিস করি দিদি তোমাকে ; আর দীপাবলি এখন নিজের রুমে একটা দুইটা মোমবাতি জ্বালিয়ে কিছুটা মনে করার চেষ্টা করে থাকি মাত্র । হে মানব সমাজ আসুন চেষ্টা করি , অসৎ হইতে সত্যের পথে দাবিত হই,  অন্ধকার জগত হইতে শিক্ষার জ্যোতিতে আলোকিত করি আমাদের সমাজকে, মারামারি-মানুষের ক্ষতি সাধন করা বাদ দিয়ে মানব সমাজের উপকারে নিজেদের জীবন উৎসর্গিত করে অমৃতের স্বাদ গ্রহণ করি”

 

সবাইকে দীপাবলির এবং ভাইফোঁটার শুভেছা ।

 

 

রনি ভৌমিক
লেখক এবং প্রভাষক, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় । বর্তমানে পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ একাডেমী অব সাইন্স, বেইজিং, চীন ।