ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমি দেশপ্রেমিক, একথা হলপ করে বলতে পারব না । তবে, “দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা,  কারো দানে পাওয়া নয়”– গানটি শুনলে আমার চোখ ভেঙ্গে পানি আসে । “পুর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল,  রক্ত লাল,  রক্ত লাল” – আমার লাল রক্তে আগুন ধরায় । “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছারব…”– আমার শরীরের প্রতিটি কোষ জেগে উঠে । ২৬ মার্চ, ছিল বাংলাদেশের ৪৫ তম মহান স্বাধীনতা ও লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত জাতীয় দিবস । স্বাধীনতার ৪৫ তম দিবসে এসেও আমরা স্বাধীনতার মানে খুঁজে চলছি;

 

স্বাধীনতা তুমি কি বীরাঙ্গনাদেরকে গণধর্ষণ আর লুণ্ঠিত দ্রব্য হিসাবে পরিণত করার জন্য?
স্বাধীনতা তুমি কি বীরদেরকে বলির পশু আর পিতামাতাকে সন্তান হারা করার জন্য?
স্বাধীনতা তুমি কোন এক ধারার ভয়ে মোদের না বলা সব কথা চোখ বুঝে মেনে নেওয়ার জন্য?

 

আমরা প্রতিদিন খবরের পাতা চোখ খুলতেই দেখতে পাই কোন না কোন কলামে ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ আর গুম হয়ে যাওয়ার কথা লিখা থাকবেই । প্রতিটি পত্রিকা, সংগঠন, এমনকি দেশের আমলারা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তিতায় বীরাঙ্গনাদের নিয়ে বলে থাকেন । এত কিছুর মাঝে অনেকের মনে হতে পারে দেশে অমূল পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, আমার মা-বোনদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য রাস্তা এখন থেকে পুষ্পপুঞ্জিত কিন্তু আমার মনে হয় তাতে কোথাও শুক্লপক্ষ বদলে কৃষ্ণপক্ষ হয়ে যাচ্ছে না, বরং আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ আর গুম বেড়েই চলেছে ।

এখনও স্পষ্ট মনে আছে সেই সময়টা, সেই ভয়াবহ সময়টা; সারারাত ধরে আমি আর আমার বড় মামা জেগে থেকে টেলিভিশনে নির্বাচনের প্রতিটা আসনের ফলাফল দেখছিলাম, রাত ৩ টার মামা ঘুমিয়ে পরলেন কিন্তু সারানিশি আমি এক মিনিটের জন্য দুটি নয়ন পাতা এক করিনি । সবে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে । তারিখটা ছিল ১ লা অক্টোবরের ২০০১ সাল, আমি তখন সোনারগাঁ থাকতাম; ১৯৩ আসন নিয়ে বিএনপি নির্বাচনে বিশাল জয় লাভ করেছে, অন্যদিকে মাত্র ৬২ আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ তখন লুকিয়ে আছে । একদিকে বিএনপি বিজয় উল্লাস করছে, কিন্তু সারাদেশে একটা থমথমে পরিবেশ, আর অন্য দিকে বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর আসছে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর বর্বরোচিত হামলা হচ্ছে ।

স্বাধীনতা তুমি কীসের জন্য

সেই সময়ে আমি সবচেয়ে বেশী বিস্মিত হয়েছিল এটা দেখে যে পরবর্তী এক সপ্তাহের মত কোন বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট বা সুশীল সমাজ এ বিষয়ে মুখ খোলেন নি । এক্ষণকার মতো তখন কোন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, এখন তো কিছু একটা হলেই আমরা ফেইসবুক, টুটটার, গুগুল প্লাস নিয়ে অনলাইনের মাঠে সংগ্রামে নেমে পরি; সেই সময়ে একমাত্র পত্রিকা এবং বিবিসি বাংলা খবরের প্রানে অপেক্ষা করতাম । আক্রমণের তীব্রতা যখন বাড়তে থাকে তখন, হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে ভিটা-জমি জলের দামে বিক্রি করে পাড়ি জমাতে শুরু করে প্রতিবেশী দেশে । যারা পারছিল না,  তাদের হতে হচ্ছিল নির্যাতিত,  নিপীড়িত এমনকি লুণ্ঠন আর ধর্ষণের জনপদে পরিণত হয়েছিল সোনার বাংলা । আজও আমার শরীরে কাঁটা দেয় ঐ হিন্দু বাবার আকুতি; “আমার মেয়েটা ছোট। তোমরা একজন একজন করে যেও”।

 

এইবার ২০০১ থেকে বের হয়ে এসে ২০১৪ নিয়ে একটু বলি; আবার আমার প্রিয় জন্ম ভূমিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, জনগণের ভোটের নির্বাচন । এবার বিএনপি নির্বাচনে আসেই নি কারণ বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে এবারো ক্ষমতায় আসেন । কিন্তু নির্বাচন শেষে মনে হলো, যে আমরা আবার সেই ২০০১ ফিরে গেছি, বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা খবর দিতে লাগলো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে; কোথাও কয়েক দিনের কোলের বাচ্চাকে নিয়ে মা পালাচ্ছে, কোথাও হত-দরিদ্র মহিলার কোনক্রমে টিকিয়ে রাখা বাড়িটাকে গুড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা, এমনকি ১১ জন এসে ধরশন করেছিলো সেই পূর্ণিমা রাণীর বিচারের রায়টা কি দেখতে পাবো?

 

আজ সারাদেশে যাকে নিয়ে আলোচনা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী তনু যাকে ধর্ষণের পর নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেই কলেজছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর গ্রামের বাড়ি যে উপজেলায় আমি অধম সেই একি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেছি; তনুর বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা পশ্চিম ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে । খবরের কাগজে যখনি দেখলাম তনু আমার পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের আমার আকাশটা যেন আর ছোট হয়ে আসলো এমনকি ফেইচবুকে লগইন করতেও সাহস পাচ্ছিলাম না কারণ আমার বোনের ধর্ষিত দেহের বিভত্স ছবিতে লাইক আর কমেন্ট দিয়ে স্বাধীনতার স্বাদ নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে পারছিলাম না । তনুকে ধর্ষণ করার পর রাজশাহী আর বরিশালে আমার আরো দুটো বোনকে ধর্ষণ করা হয়েছে । লক্ষ তনুর স্বাধীনতা আর নিরাপদ পথচলার অধিকার কক্ষনো কি আমরা দিতে পারবো না ?

 

সময় পেরিয়েছে কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা এতটুকু বদলায় নি । আমার জানা মতে, ধর্ষণের মতো আদিম সমস্যা থেকে পৃথিবীর কোনো দেশই পুরোপুরি মুক্তি পায়নি আজও; কিন্তু অনেক শিক্ষিত দেশই ধর্ষণের সঠিক কারণগুলো উদঘাটন করতে পেরেছে, ধর্ষকের শাস্তি আর অন্যদিকে ধর্ষিতার চিকিৎসা এবং সম্মান আর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে । শুধু আমরা পারি নি আজও, এমনকি আগামীতে পারবো বলেও মনে হয় না; বরং উল্টো আমরা ধর্ষণকে বৈধতা দিতে নিজ নিজ মতো করে ধর্মের দিক-নির্দেশনা খুঁজে খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করাতে বেস্ত থাকি, ধর্ষিতার আচরণ আর পোষাকের দোষ খুঁজি, ধর্ষককে বীরের মর্যাদা দিই আর ধর্ষিতাকে অপদস্ত করি।

 

আমরা পারিনি কারণ, আমরা ধর্ষণের কারণ আর সমাধান নিয়ে আলোচনা করি না কক্ষনো, উল্টো আমরা ধর্ষণকে বৈধতা দিতে খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেই, বীরাঙ্গনাদের আচরণ আর পোষাকের দোষ খুঁজি, সেই কাপুরুষদেরকে আমাদের সমাজ ধর্ষক হিসাবে না গণ্য করে বীরের মর্যাদা দিয়ে থাকি এবং আমার সেই মা-বোনদের অপদস্ত করে তারপর ক্ষান্ত হই । এইসব কাপুরুষদের ধারা শুধু মা-বোনরা ধর্ষণের শিকার হয় না, কচি মনের ছোট ভাইয়েরা ও সেইসব অমানুষদের হাত থেকে রক্ষা পায় না ।

 

যে জন্মভূমিতে পাকিস্তানি সৈন্যরা অত্যন্ত নির্মম ও বর্বরভাবে চার লাখের বেশি নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করেছে মাত্র নয় মাসে, সেই দেশের পুরুষ জাতি কী করে এই পবিত্র ভূমির নারীদের এবং শিশুদের ধর্ষণ করে করছে প্রতিনিয়ত । একাত্তরের যুদ্ধে নির্যাতিত আমাদের দেশের বীরাঙ্গনাদের প্রতি সম্মান দেখিয়েই তো আমাদের এই কাপুরুষদের উচিত ছিল ধর্ষণকে “না”  বলা, ধর্ষণ রুখে দেওয়া এবং মা-বোনদের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অবস্তানে অধিষ্ঠিত করা । তাহলে কি বলতে হবে আমাদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবার মনোভাব কম

 

ছোট-বড় অথবা মাঝবয়সি সবাই শিকার হচ্ছে যৌন হয়রানির । থেমে থেমে প্রতিবাদের ঝড় উঠছে সারাদেশে কিন্তু প্রতিকার যেন অসম্ভব ! আজ এখানে,  কাল সেখানে । ধর্ষণ আজ উত্তরাঞ্চলে তো কাল দক্ষিণাঞ্চলে । গতকাল উপজাতির ঘরে, আজ হিন্দুর ঘরে তো আগামীকাল মুসলমানের ঘরে । আজ গ্রামে কাল শহরে, হয় তো পরের দিন কোন বিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বা হাসপাতালে ঘটছে এই জঘন্য ধর্ষণের ঘটনা । আজ ১০ বছরের শিশু তো কাল ৫০ বছরের নারী ধর্ষিত হচ্ছে ।

 

প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ তার প্রিয়জনকে নিয়ে আতঙ্কিত, এই বুঝি কোন দুঃসংবাদ এলো মোবাইল ফোনে যার অপরপ্রান্তে কক্ষনো পুলিশ অথবা হাসপাতালের কোন সেবিকা আবার হয়তবা কোন সাধারণ অপরিচিত মানুষ । অজানা বিপদ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের সবাইকে প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে । কখন কোথায় কবে ঘটে যায় যেন দুর্ঘটনা । আর এমন একটি দুর্ঘটনা যে শুধু সারা জীবনের কান্নাই নয় কষ্টও বটে । ঘরে-বাইরে, শহর-গ্রামে কোথায় নেই এই হয়রানি কেউ কি আমাকে বলতে পারেন ? ধর্ষণ, হত্যা আর নিখোঁজের খবর দেখে মনে হচ্ছে আমরা আজও স্বাধীনতা পাই নি; এখন যেন প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ।

 

২০১৪ সালের ২৭শে ঘটে যাওয়া দেশের সবচেয়ে আলোচিত অপরাধ ছিল নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা, আমরা কি আজও তার বিচার পেয়েছি ? দেশের প্রতিটি মা-বাবা, স্ত্রী সন্তানরা কি নিশ্চিত থাকতে পারছে যে সকালে ঘুম থেকে বাইরে বের হবার পর রাতে আবার পরিবারের সবাই এক সাথে রাতে খাবার খেতে পারবেন ? আমি আজ শুধু ধর্ষণ নিয়ে ভীত হয়ে থাকতে পারছি না, আমি আজ গুম, হত্যা নিয়ে সমান ভাবে উৎকণ্ঠিত ও ভীত ।

 

বাংলার রাস্তা-ঘাট ভোটের উৎসবের জন্য নানান রঙে সাজে, কিন্তু আমার মা-বোন এবং বাপ-ভাইদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না; তাই আমি এই উৎসবের মাঝে এমনকি নাগরিক ভোটের অধিকারের মাঝে ও যেন এক ব্যতিক্রমী স্বাধীনতার স্বাদ পাই । আমাদের নিজ নিজ বিবেকের কাছে প্রশ্ন করার সময় এসেছে আজ, এজন্যই কি আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম?  চেয়েছিলাম মুক্তি? আমার বিবেক থমকে যায়,  আর চিন্তার চৌহদ্দি জুড়ে শুধু থাকে ধর্ষণ এবং হত্যা

 

উৎসবে, আড়ম্বরে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিচ্ছি অথচ প্রতিদিন ধর্ষিতা হচ্ছে মা-বোনের আর বাপ-ভাই কে নির্মম ভাবে হত্যা করা হচ্ছে এবং সেই রক্তে স্নাত হচ্ছে আমার পবিত্র সেই লাল সবুজের পতাকা । প্রিয় স্বাধীন রাষ্ট্র এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আপনাদের কাছে আমার আকুল মিনতি দয়া করে একটি বারের জন্যও চোখ খুলে দেখুন আজ কতটা অসহায় আপনাদের প্রানের প্রিয় সেই মাতৃভূমি বাংলাদেশ, আপনাদের রক্তের বিনিময়ে যে দেশকে স্বাধীন করে দিয়েছেন সেই দেশটি এবং দেশের সাধারণ মানুষগুলো কতটুকু স্বাধীন !  

 

জাতি হিসেবে মাঝে মধ্যে খুব গর্ববোধ করি । কেননা অনেক রক্ত আর লাশের বিনিময়ে পেয়েছি দেশ, হয়েছি স্বাধীন । তবে স্বাধীনতা পেলাম কোথায় ? হয়তো চিৎকার করে বলতে চায় রাষ্ট্র আমাকে, তোমাকে এবং তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, পারেনি দিতে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ । কিন্তু আমাদের সকল নৈতিকতা কি সরকারকে এবং রাষ্ট্র গড়ে দিতে হবে ?

 

যদি আমরা চিন্তা করি যে, আমি নষ্ট হবো, তুমি নষ্ট হবে, এমনকি সেও নষ্ট হবে যদি না কোন দিন আমরা আমাদের ভেতরের পশুত্ব ভাবটাকে না মারতে পারি, আর তখন দেখা যাবে আস্তে আস্তে একদিন আশেপাশের সবকিছু নষ্টদের অধিকারেই চলে যাবে । আপনি আপনার ভেতরের পশুটাকে মারেন, সে তার টাকে মারুক, আমি আমারটাকে মারছি; আমার ভেতরের পশুত্ব ভাবটাকে মারা যেমন আমার দায়িত্ব তেমনি আপনার দায়িত্ব আমাকে সাহায্য করা । মনে রাখবেন সমাজের একটা মানুষের ভেতরের ও যদি সেই পশুত্ব ভাব বেঁচে থাকে তাহলে কেউ নিরাপদ নন আপনার এবং আমার মা-বোন এবং বাবা-ভাই । তাই আবারো অনুরুধ করে বলছি, এখনি সময় নিজেকে বদলানোর, নিজের দৃষ্টিভঙ্গী বদলানোর; আপনি বদলান, দেখবেন সমাজ এবং প্রিয় মাতৃভূমি বদলাবেই ।

 

 

রনি ভৌমিক
লেখক এবং প্রভাষক
,
ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়

বর্তমানে পিএইচডি গবেষক
,
ইউনিভার্সিটি অব চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্স
,
বেইজিং
, চীন