ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী নির্ধারণের বিষয়টি এই মুহূর্তে দেশের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু। ২০১৩ সালে দেশের সবচেয়ে বড় এই শেয়ারবাজার ডি-মিউচুয়ালাইজেশনের (ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা পৃথকীকরণ) অনুমোদন দেয় সরকার। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কৌশলগত অংশীদারদের কাছে চার ভাগের একভাগ শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা নেয় ডিএসই, বিশেষ করে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে পারবে ও শেয়ার বাজার আধুনিকায়ন করতে পারবে- এমন অংশীদার চায় তারা। ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আসে। অন্যদিকে যৌথভাবে প্রস্তাব দেয় চীনের সাংহাই এবং শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ। চীনের দুই শেয়ারবাজার শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম কৌশলগত বিনিয়োগকারী হলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আন্তর্জাতিক মানে উন্নিত হবে এবং দেশের শেয়ারবাজারের জন্য খুবই ইতিবাচক হবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। আবার অন্য পক্ষ যুক্তি দেখাচ্ছে যে, যদি  দুটি দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ভাবে অনেক মিল থাকে সেই দেশের সাথে চুক্তিতে যাওয়াই ভাল। কিন্তু আমি কোনোভাবেই যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিনা যে, সাংস্কৃতিকভাবে অনেক মিল থাকলে তার ফলে অর্থনৈতিকভাবে কি কি সুবিধা হবে? এই বিষয়ে আমার হয়তোবা জোরালো যুক্তি এবং পর্যাপ্ত জ্ঞানের যথেষ্ট অভাব আছে।

শেয়ার বাজার নিয়ে অনেকের ‘মূর্খ ভাবনা’ আছে, সেই ভাবনা থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার ভারত অথবা চীনকে কিনবে তা নিয়ে শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞদের মাঝে মহা হুলুস্থুল হচ্ছে গত কয়েক মাস থেকে, এমনকি অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও। আমরা যারা সাধারণ বিনিয়োগকারী আছি তারাও অনেকে বুঝে না বুঝে অযথা দিনরাত টেনশন করছি। ডিএসইর শেয়ার যেই কিনুন তাতে আমাদের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি কোন লাভ-লোকসান নেই। এই টেনশন ডিএসইর মালিক পক্ষের মানে ব্রোকারেজ হাউজের শেয়ারহোল্ডারদের (রিজভী- টিটু- লালি সাহেবদের), আমাদের না করলেও চলবে সাময়িক ভাবে। ডিএসইর শেয়ার কৌশলগত বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রি করতে পারলে তা শেয়ারবাজারের জন্য ভালো। এতে ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই। ডিএসইর শেয়ার যদি আপনি কিনতে পারেন তবেই এই লাভের ভাগ আপনি পাবেন। আশার কথা হল ডিএসইর শেয়ার কৌশলগত বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রির পর ডিএসই’র শেয়ার পাবলিকের কাছেও বিক্রি হবে আইপিওর মাধ্যমে। তবে বলে রাখা ভাল, কবে এবং কত টাকায় আইপিও দিবে সে প্রশ্ন না হয় ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকল।

আমি যেহেতু চীনের শেয়ার বাজার নিয়ে গবেষণা করেছি তাই সেইটা দিয়ে লেখাটা শুরু করলাম। বিগত সাত বছর ধরে আমি অনেক কাছ থেকে দেখছি জনসংখ্যা দ্বারা বৃহত্তম পূর্ব এশিয়ার এই দেশের উন্নয়ন এবং শেয়ার বাজার। চীনের শেয়ারবাজার প্রায়ই হাস্যকর একটা জিনিস। চীনের অনেক মানুষের কাছে এখনো অনুরূপ প্রাচীন চীনা উপকথার মতো, অনেক কারণ দেখা যায় সহজ কিন্তু সহজ জিনিস প্রায়ই খুব জটিল এবং কিছু কিছু মানুষের কাছে এটি হল ‘আলাদীনের চেরাগের’ মতো। তাই যদি না হতো কি করে চীনের অর্থনীতির মতো করে চীনের শেয়ার বাজার এত দ্রুত বিশ্বের প্রথম সারির শেয়ারবাজারে পরিণত হল? প্রফেসর ওয়াং কাছে একদিন গল্প করার ফাঁকে জানতে চেয়েছিলাম, চীনের শেয়ার বাজার এতো অল্প সময়ে সফল হওয়ার কারণটা কি? প্রফেসর ওয়াং এককথায় বললেন, চীনের শেয়ারবাজার হল ‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার’ বাজার। চীনের শেয়ার মার্কেটে দুই হাজারের মতো উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন বিনিয়োগকারী রয়েছে, যারা সারা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে বিনিয়োগ করেন থাকেন। আর এই সত্যকে অনুধাবন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন থেকে শুরু করে সবাই চীনা কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করার বিষয়ে আন্তরিক হবে বলে মনে করি ।

ভারত পাঁচ বছরের জন্য এবং চীন দশ বছরের জন্য ডিএসইর শেয়ার কিনতে চাইছে। এই মেয়াদের পর শেয়ার কৌশলগত বিনিয়োগকারীরা চাইলে তারা অন্য কারো কাছে তাদের শেয়ার বিক্রি করে লাভসহ তাদের পুঁজি তুলে নিতে পারবেন। আমরা খুব ভাল করে জানি যে,  ডিএসইর আয়ের প্রধান মাধ্যম হল শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের কমিশন। আমরা যে ৪৫-৬০ পয়সা শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের কমিশন দেই তা থেকে ৩-৫ পয়সা ডিএসই পেয়ে থাকে। চীন অথবা ভারত যেই কৌশলগত বিনিয়োগকারী হোক না কেন তাকে মুনফা করতে হলে মার্কেট কেপিটালাইজেশন বাড়াতে হবে, সাথে প্রতিদিনের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে। মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ভারত অথবা চীন কেউ ডিএসইতে লোকসান করতে আসবে না। যে পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করবে তার কয়েকগুণ মুনাফা নিয়ে যাবে তাতে আমাদের কারোর মনে কোন সন্দেহ থাকার কথা না।

তাহলে শুধুই মুনাফা অর্জন কি চীন এবং ভারতের মুখ্য উদ্দেশ্য? না, মুনাফা এখন মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন এবং ভারত এখন ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার দখল নিয়ে অদৃশ্য যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। চীন তাদের বহু আলোচিত সিল্ক রোড বা ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড নিয়ে এখন অনেক বেশি কাজ করছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফর করে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি করেন দেশটির রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং। অন্যদিক দিয়ে দেশের বাইরে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমর্থক ভারত। অপরদিকে চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দিন দিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে রাস্তাঘাট, বড় বড় সেতু নির্মাণ, বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, গভীর সমুদ্রবন্দর ইত্যাদি বহু কাজ নিয়েই কাড়াকাড়ি চলছে নিয়মিত। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার দুই দেশকেই ভাগ-বাটোয়ারা করে কাজ দিয়ে খুশি রাখার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের অনেকে মনে করছেন, ভারতকে শেয়ারবাজারের কৌশলগত বিনিয়োগকারী করা ঠিক হবে না। প্রতিবেশীদের প্রতি খবরদারিমূলক মানসিকতার কারণেই হয়তো ভারতের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ।

চীনের শেয়ার বাজারে যে দুই হাজারের মতো উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন বিনিয়োগকারী রয়েছেন তাদের মধ্যে থেকে যদি পনের-বিশ জন বিনিয়োগকারী বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন, তাহলে আমাদের দেশের শেয়ারবাজারের প্রতি অনেক ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠবে। তারা সহজেই ডিএসইকে বিশ্বব্যাপী সংযুক্ত করাতে পারবে। এছাড়া নতুন নতুন ব্যবসায় নিয়ে আসবে। এক্ষেত্রে দেশের শেয়ারবাজার উপকৃত হবে, ক্ষতির কোন সুযোগ নেই। চীনা কনসোর্টিয়াম কৌশলগত বিনিয়োগকারী হলে ডিএসই আন্তর্জাতিক মানে উন্নিত হবে, একইসঙ্গে দেশের শেয়ারবাজার উপকৃত হবে এবং স্টক এক্সচেঞ্জের আয়ের নতুন নতুন রাস্তা তৈরি হবে। চীনা কনসোর্টিয়াম কৌশলগত বিনিয়োগকারী হতে চাওয়ার সবচেয়ে বড় যে কারণ সেটা হল বর্তমানে চীনের অনেকগুলো কোম্পানি বাংলাদেশ সরকারের অনেকগুলো বড় প্রকল্পের সাথে জড়িত, সেই সকল কোম্পানিগুলো তাদের বর্তমান প্রকল্পের কাজ শেষ করে বাংলাদেশে আরো বড় বড় বিনিয়োগের কথা চিন্তা করছে। এরই মধ্যে মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের ২০ শতাংশ শেয়ার কিনছে চীনা বহুজাতিক কোম্পানি আলিবাবা গোষ্ঠী। এছাড়া দেশে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বাড়বে বলেই মনে করা যায়।

এখানে বলে রাখছি, চীনা কনসোর্টিয়াম ৯৯০ কোটি টাকায় ডিএসইয়ের ৪৫ কোটি বা ২৫ শতাংশ শেয়ার (প্রতিটি ২২ টাকা দরে) কিনবে। সেই সঙ্গে ডিএসইয়ের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ৩৭ মিলিয়ন ডলার খরচ করবে। অন্যদিকে এনএসইয়ের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম প্রতিটি শেয়ার ১৫ টাকা করে ২৫ দশমিক এক শতাংশ শেয়ার কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল। পাশাপাশি তারা কারিগরি সহযোগিতার কথা বললেও কত টাকা ব্যয় করবে তার উল্লেখ ছিল না সেখানে। যাতে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হতে এক হাজার ২৪৫ কোটিরও বেশি টাকা পাবে ডিএসই। কৌশলগত বিনিয়োগকারীর সঙ্গে শেয়ারবাজারে পতনের প্রত্যক্ষ কোন কারণ নেই। তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভারত ও চীন নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে আতঙ্কের কিছু নেই। বিষয়টি শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন কারিগরি সুবিধার পাওয়ার প্রস্তাব অনুযায়ী ডিএসইর ব্যয় কমে আসবে, যাতে ডিএসইরও বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ইস্যুতে চার্জ কমানোর সুযোগ হবে। এতে করে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবে।

গত ৩০ এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশষে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসাবে চীনের শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবকে অনুমোদন দিয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) স্টকহোল্ডারগণ। আর এখন শুধুমাত্র এই প্রস্তাব বিএসইসি অনুমোদনের অপেক্ষায়। এর জন্য বিএসইসির চেয়ারম্যান এবং বিএসইসির কমিশনারদের এখন চীনা কনসোর্টিয়ামের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব এবং আন্তরিকতার প্রয়োজন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণ বিনিয়োগকারী হিসেবে আমাদের খুশি থাকা উচিৎ।

শেষ পর্যন্ত চীন অথবা ভারত যে-ই আসুক না কেন তারা নিজেদের লাভের জন্যই বাজারে নতুন নতুন কোম্পানির আনবে, ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ বাড়াবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী আনবে। কৌশলগত বিনিয়োগকারীর সব সময় চেষ্টায় থাকবে বাজারের তেজি ভাব ফিরিয়ে আনতে এবং দীর্ঘসময় সেটা ধরে রাখতে। তাই ভারত অথবা চীন- কে পাবে এই টেনশন বাদ দিয়ে নিজের পোর্টফোলিও জন্য ভাবুন। আপনাকে আগে ঠিক করতে হবে আপনি কি হবেন ব্যবসায়ি নাকি বিনিয়োগকারী? বিনিয়োগকারী হলে দীর্ঘকালীন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। অনেক সময় কম মুনাফা হতে পারে কিন্তু ব্যবসায়ী হতে চাইলে হয়তো ভাগ্য ভালো হলে অল্প কিছুদিনে পকেট ফুলে যেতে পারে আবার বিপরীত দিকে সবকিছু হারিয়ে ‘আত্মহত্যার’ পথও বেছে নিতে হতে পারে। সামনের বুল মার্কেট অপেক্ষা করছে, সেটা দুই-তিন বছর পর যখনই ঘটুক না কেন আপনি তা থেকে কতটুকু নিতে পারবেন সেই নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন।

আমি অনেক ইতিবাচক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ। তাই আমার ছোট জ্ঞানের পরিধি থেকে মনে হচ্ছে, শুরু হয়েছে নতুন দিন, নতুন এক সম্ভাবনার। এই সম্ভাবনাকেই সামনে রেখে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও দেশের পুঁজিবাজার। অপেক্ষায় আছি সেই দিনটার জন্য, যেদিন আমিও প্রফেসর ওয়াং এর মত করে সবার কাছে বলতে পারবো, বাংলাদেশের শেয়ার বাজার ‘বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার’ বাজার। বিনিয়োগকারীদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, হুজুগ আর গুজবে কান না দিয়ে কোম্পানির প্রোফাইল ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করেন, তাহলেই দেখবেন অর্ধেক সমস্যার আপনা-আপনি সমাধান হয়ে যাবে। শেয়ার বাজারে বড় পুঁজির বিনিয়োগকারীরা খেলা খেলেছিল আগেও এমনকি আগামীতে তারা তাদের খেলা খেলে যাবে। বিশ্বের সব দেশেই এমনটি হয়ে থাকে, কিন্তু সবখানে বিনিয়োগকারীরা সর্তক থাকেন। এর মাঝে যারা অন্ধকারে ঢিল মেরে পার পেতে আসেন তারা খুব বেশিদূর যেতে পারে না।