ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

আমরা আগে যে পাড়ায় থাকতাম সে পাড়ায় সুলতান ভাই নামে এক ছুতার মিস্ত্রী থাকতেন। তিনি সারাদিন কাজ করতেন আর সন্ধ্যার পর মদ খেয়ে রাস্তায় নেমে একে-ওকে গালি-গালাজ্ করতেন। এক-একদিন এক-একজনকে। সেখানে পাড়ার সবচেয়ে ধনী ও গণ্যমাণ্য লোক হতে শুরু করে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনও বাদ যেতেন না! এমন ক্রিয়েটিভ ও আজগুবি অ্যাপ্রচে গালি পাড়তেন তাতে বোধহয় ভিকটিমের (যাকে গালি দেয়া হত) বিগত, আগত ও অনাগত চতুর্দশ প্রজন্মের একসাথে নরকোদ্ধার হয়ে যেত! তিনি তার গালি শুরু করতেন এভাবে-

“আমার নাম সুলতান! ভারতবর্ষে আমার এখনও দশ লক্ষ সৈন্য আছে!…”।
তারপর শুরু হয়ে যেত কীর্তন।

উনি সারাসন্ধ্যা পাড়ার এ-মাথা হতে ও-মাথা গালি দিয়ে বেড়াতেন আর আমরা, সুবোধ বালকেরা, যে কানে তুলা দিয়ে বসে থাকতাম তা নয়। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তার বুলি হতে দু-এক প্রস্থ গালি আমরাও আত্মস্থ করে নিতাম। আর পরদিন পাড়ার আন্ডা-বাচ্চারা আগের রাতে শেখা “পাঠ”-গুলো বুঝে না-বুঝে মহানন্দে পরস্পরের উপর প্রয়োগ করা শুরু করত!

২০০৬ সালে আমি যখন প্রথম মোবাইল কিনি তখন আমাকে এক নতুন রোগে পেয়ে বসেছিল। যখন-তখন জানা-অজানা নাম্বারে যাকে-তাকে মিসকল দেয়া। এন্ড টিট্ ফর ট্যাট্। তারাও কল-মিসকল দিত। বাক-বিতন্ডা হত। রূঢ় বাক্য প্রয়োগে আমি পারদর্শী নই। তাই “উচিত জবাব” দিতে না পারার ক্ষোভ বুকে নিয়ে দ্বারস্থ হতাম পাড়ার এক্সপার্টদের কাছে! গালি এক্সপার্ট! গালি-গালাজে তারা ছিল মাস্টার-ব্লাস্টার! সিস্টেমটা ছিল, আমি তাদের টার্গেট করা নাম্বারটা দিতাম সাথে দশ টাকা তাদের মোবাইলে ইজিলোড করে দিতাম। তারপর সেই নাম্বারে কল্ দিয়ে তারা এমন ভাষায় চড়াও হত যা শুনলে যেকারও কান দিয়ে শুধু গরম ধোঁয়া নয়, গলিত লোহাও বের হয়ে আসার উপক্রম হত। তাই আমি আগে থেকেই সটকে পড়তাম। কাজও হত তড়িৎ গতিতে। এরপর হতে “নো ডিস্টার্ব”!

গালি-গালাজে আমরা চট্টগ্রামবাসীর সুনাম দেশজোড়া! এখানকার ভাষার ছয়টি শব্দের একটি বাক্যে নাকি কম-সে্-কম তিনটি গালি থাকে। শালার ছেলেকে শালা (কোন কোন ক্ষেত্রে “তালা”..!!) বানানোর কর্তৃত্ব পুরান ঢাকার চাইতে আমাদের বেশী! কিন্তু আমাদের প্রসিদ্ধি এখন হুমকির মুখে!

সারাদেশে ধানের মত গালিবাজদের এখন বাম্পার ফলন। ফেইসবুকের কমেন্টবক্স গুলো পড়ে দেখলেই তা টের পাওয়া যায়। তা পোস্টটা যা-ই হোক না কেন, যেমনই হোক না কেন, তার কমেন্টবক্স ঘেঁটে দেখলে নূন্যপক্ষে একটা গালিযুক্ত কমেন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯৯%! এই গালিবাজরা আবার একইসাথে ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির এবং গালি-এক্সপার্ট। প্রায় প্রতিটা পোস্টেই তারা এক লাইন ধর্মবাক্যের সাথে তিন লাইন গালি অনায়াসে দিয়ে দিতে পারে।

তাদের দৈনন্দিন হতাশার বিষ্ফোরণ ঘটে কমেন্টবক্সগুলোতে। ক্রিকেটারদের মত অল্প বয়সে বিখ্যাত হতে না পারার হতাশা; মেয়েদের ললিপপ্, কলা ইত্যাদির মত ঢেকে রাখতে না পারার হতাশা; আই.এস জঙ্গিরা এসে কেন বঙ্গদেশ দখল করছে না, তার হতাশা; গোপনে তাদের না দেখিয়ে স্পর্শিয়া কেন ফেইসবুকে আমজনতাকে পিঠ দেখালো, তার হতাশা; ক্রিকেটার সরকারের মত রাজনৈতিক সরকারও ভাল খেলতে খেলতে কেন বাজেভাবে আউট হচ্ছে না, তার হতাশা। এরূপ আরো বিবিধ হতাশা গালি হয়ে দরদর করে ঝরে পড়তে থাকে তাদের কমেন্টগুলোতে। ক্রিকেটারদের ফর্ম কখনও কখনও পড়তির দিকে থাকে। কিন্তু তাদের গালি পাড়ার ফর্ম সবসময় সমুন্নত এবং দেশের শিক্ষার হারের মত এটিও এখন সমৃদ্ধির পথে!

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে এদেশের ক্রিকেট। সমানতালে এগিয়ে চলেছে আমাদের গালি-শিল্প! কোনধরনের বিদেশি ঋণ ছাড়া এই সেক্টরে আমরা এখন বিশ্বমানের! গালিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এই কমেন্টেটরদের সামনে আমাদের ছোটবেলার সুলতান ভাইকে এখন নিতান্তই শিশু বলে মনে হয়!