ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

কিছুদিন ধরেই ভাবছি কিছু একটা লিখব। ব্লগে সবেমাত্র যোগ দিয়েছি। নিয়মিত না লিখলে হয়ত আর কোন লেখাই প্রকাশ করবে না! সেই তাগাদা থেকেই লেখার চেষ্টা। লেখালেখি করার ইচ্ছা মনের মধ্যে উকিঁ-ঝুকিঁ দিলেও কিছুই গুছিয়ে লিখতে পারি না। সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যায়। মনে হয়, শরবত বানাতে গিয়ে পানি, চিনি, নুন, মরিচ সব মিশিয়ে একাকার করে দিচ্ছি। শেষ-মেশ যা দাঁড়ায় তা ডিম খিচুড়ি তো নয়ই, জগাখিচুড়িও নয়।
আমার এই “গুলিয়ে ফেলা” রোগটা বেশ পুরোনো। ক্লাস নাইন-এ পড়ার সময় একদিন পাড়ার বড় ভাই উত্তমদা আমার হাতে এক টুকরা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন গার্লস স্কুলের বাসটা যখন পাড়ার সামনে আসবে তখন যেন এই কাগজটা আমি শ্রাবণি (ছদ্মনাম)-কে দিই। ওই বয়সে মেয়েদের সাথে কথা বলাটাও ছিল আমার জন্য ব্যাপক সংকোচের বিষয়। তাছাড়া মেয়েটাকে আমি চিনিও না। তারপরও বড়ভাই বলে কথা! তাই প্রচন্ড সাহস বুকে ধারন করে ত্রস্থ পায়ে পৌঁছে গেলাম বাসের সামনে। বাসভর্তি মেয়ে কিচির-মিচির করছে। এত মেয়ে একসাথে দেখে নার্ভাস হয়ে গেলাম। যে মুহূর্তে চিঠিটা দিতে যাব অমনি মেয়েটার নাম গেলাম ভুলে! হাজার চেষ্টা করেও নাম মনে করতে পারছিলাম না। এদিকে কমপক্ষে পঞ্চাশ জোড়া চোখ বাসের জানালা গলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে বলে বসলাম, “ঈশিতা আছে? ঈশিতা?”। ঈশিতা (ছদ্মনাম) আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড রকি’র ক্রাশের নাম! কয়েকটা মেয়ে বলল, “ঈশিতা, তোকে কে যেন ডাকছে!”। মেয়েটা জানালা দিয়ে মাথা বের করতেই চিঠিটা তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দিলাম ভোঁ-দৌড়। উত্তমদা’র লাভ লেটার দিয়ে আসলাম বন্ধুর ক্রাশকে! পরবর্তি এক সপ্তাহ আর উত্তমদা’র সামনে যাই নাই।

বড় হওয়ার পরও আমার এই অবস্থার খুব একটা উন্নতি হল না। প্রথম প্রথম আমার এই “গুলিয়ে ফেলা”’র স্বভাব নিয়ে খুব হীনমন্ম্যতায় ভুগতাম। তবে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করলাম এই দলে আমি একা নই। তবে তাদের গুলানোর সিস্স্টেম গুলো আরো বেশি বিচিত্র ও মজার!

একবার এক নারী অধিকার কর্মী নারীর অধিকার নিয়ে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বললেন, মেয়েদের যেমন ছেলেদের পোশাক পরা উচিত তেমনি ছেলেদেরও উচিত মেয়েদের পোশাক পরিধান করা। এতে নাকি সমতা সাধিত হবে! একটু কল্পনা করে দেখুনতো, দাঁড়ি-গোঁফ ওয়ালা এক মধ্যবয়স্ক পুরুষ রাস্তায় শাড়ি-ব্লাউজ আর হিল জুতা পরে হাঁটছে! ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে? হয়ত পুরুষদের জন্য ব্রা-ও তৈরী হবে। আর আধুনিক পুরুষেরা লোমশ বুকে ব্রা পরে ঘুরে বেড়াবে! ওই নেত্রী নারী-পুরুষ সম-অধিকার নিয়ে বলতে গিয়ে ইকুয়ালিটি এবং ইকুইটি এই দুটি শব্দ গুলিয়ে ফেললেন!

একবার একটা জোকস্ পড়েছিলাম- চারটা মেয়ে গল্প করছে। প্রথম মেয়েটা বলল, আমি ডাক্তার হতে চাই। দ্বিতীয় জন বলল, আমি পাইলট হতে চাই। তৃতীয় জন বলল, আমি প্রফেসর হতে চাই। শেষের জন বলল, আমি ফর্সা হতে চাই! উল্লেখ্য, শেষের জন ছিল একটি ফর্সাকারী ক্রিমের মডেল।

এসব চিন্তা-ভাবনা যে বাস্তবে দেখা যায় না তা নয়। এক প্রয়াত প্রথিতযশা ও অসম্ভব মেধাবী চিত্র পরিচালকের ইচ্ছে হল তিনি ছেলে থেকে মেয়ে হবেন। এই টপিক নিয়ে উনি একটা মুভিও বানালেন আর তার স্লোগান দিলেন, “বি, হোয়াট ইউ উইশ টু বি!”। ছোটবেলা হতে পড়ে আসা “আমার জীবনের লক্ষ্য” রচনার মর্মার্থের পুরোটাই গুলিয়ে দিলেন! হয়ত এখন কোন কোন বালক পরীক্ষায় “এইম ইন লাইফ” রচনা আসলে লিখবে, সে ব্যবসায়ীও হতে চায় না, শিক্ষকও হতে চায় না। সে নারী হতে চায়!

আরো আছে! যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষাবলম্বন অথবা পুলিশের ক্রসফায়ারের সমালোচনা করতে গিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা মানবাধিকারের সংজ্ঞাটাকেই গুলিয়ে দিচ্ছেন। একবার এক মন্ত্রী পিলার ধরে নাড়াচাড়া করে বিল্ডিং ফেলে দেওয়ার থিওরি দিয়ে পুরো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাপারটাকেই গুলিয়ে দিলেন। কিছুদিন আগে বিদেশের মাটিতে পালিয়ে থাকা এক প্রাক্তন রাজপুত্র জাতির জনককে রাজাকার ডেকে নিজের আত্মপরিচয়টা গুলিয়ে দিল। তিন বারের প্রধানমন্ত্রী নিজের জন্মদিনটা গুলিয়ে ফেলছেন বারবার। সামনে আবারো গুলাবেন। ক্রিকেট মাঠে খেলার উত্তেজনা ও ভিনদেশের টিভি সিরিয়ালের প্রতি আসক্তিকে গুলিয়ে তৈরী করা হচ্ছে জাতিবিদ্বেষ ও ঘৃণা। আর তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে রীতিমত বিজ্ঞাপন দিয়ে। আমলাদের চালাকি বুঝতে না পেরে গুলিয়ে ফেলছে সরকার। নিয়ে যাচ্ছে তাদের আইনের উর্ধ্বে। বাক্-স্বাধীনতাকে গুলিয়ে দিয়ে কেউ কেউ দেশের স্বাধীনতাকেই সরাসরি অস্বীকার করে বসছে। সবচেয়ে বড় গুলানোটা দিয়েছিল পাকিস্তানের এক রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশে এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হওয়ার কিছু আগে তৎকালীন সরকার দলীয় এক পোড় খাওয়া এমপি বলে বসল এই ব্যক্তি সেই ব্যক্তি নয় যে একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছে। গুজবপ্রিয় বাঙ্গালির কাছে কথাটা প্রায় মার্কেট পেয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় ওই পাক রাজনৈতিকদল হম্বি-তম্বি শুরু করল তাদের বহুদিনের পুরোনো বন্ধুকে হারিয়ে যে নাকি ছিল পাকিস্তানের প্রতি সর্বদা অনুগত! ব্যস্, সব গুলে গেল। সবশেষ গুলানোটা খেয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রী ও সচিব। খাইয়েছে কলেজগুলো। আধুনিক, দুর্নীতিমুক্ত ও সরকার অনুগত ঠাওরে কলেজগুলোকে ডিজিটাল ভর্তির বুদ্ধি দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ভুলে গেলেন কুকুরের পেটে ঘি সয় না। তাই এত ভাল একটা আইডিয়া দিয়েও নিজেদের নাকটা অক্ষত রাখতে পারলেন না।

এতো গুলা-গুলি’র এইদেশে আমিই বা বাদ যাব কেন? কী নিয়ে যে লিখতে শুরু করেছিলাম আর কীভাবে শেষ করছি কে জানে! থাক্, কিছু লেখা গুলানোই থাকুক!