ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

“কিছু লিখিব”- এই আশায় ব্লগে নাম লিখাইয়াছিলাম! আমাদিগের মত সাধারণের লেখা পত্রিকা ছাপাইবে না আর ফেইসবুকে লিখিলেও সেলিব্রেটি নই দেখিয়া কেহ তাহা তেমন পড়িয়া দেখিবে ন। তাই এই ফন্দি! কিন্তু সম্প্রতি ইহাতেও মারামারি, কোপাকুপি, লিস্টিতে নাম তোলাতুলি ইত্যাদি এহেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে যে মা-বাপ এক প্রকার শপথ করাইয়া ফেলাইয়াছে যে আর কখনো লিখিব না! কিন্তু কবিগুরু তো বলিয়াই গিয়াছেন যে ওয়াদা করাই হয় উহা ভাঙ্গিয়া ফেলিবার জন্যে। অগত্যা আবার ইস্টার্ট লইলাম!

গত বৎসর গ্রামের বাড়িতে বেড়াইতে গিয়াছিলাম। কাকিমা কহিল কাছের কাঁচাবাজার হইতে কিছু কাঁচা তরি-তরকারি খরিদ করিয়া আনিতে। আমিও সহোৎসাহে লম্বা পা মারিয়া গিয়া বাজার করিয়া আনিয়া কাকিমা’র সামনে রাখিলাম। বাজারের ব্যাগখানা ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে কাকিমা হঠাৎ অদ্ভুত আওয়াজ তুলিয়া লাফাইয়া তিন হাত পিছাইয়া আসিলেন! বলিলেন, “ও কি রে জিমি, তুই গরুর শিং কিনিয়া আনিয়াছিস কী করিতে!” আমি তো মহাশূন্য হইতে পিছলাইয়া পড়িলাম! “গরুর শিং আসিবে কোথা হইতে কাকিমা! উহা তে তো সব নিরামিষ বাজার!” পরে তিনি যা দেখাইলেন তাতে আমি থ মারিয়া গেলাম! তিনি দু-খানা চিচিংগা তুলিয়া আনিয়া বলিলেন, “এই দেখ, এইগুলা হইল গরুর শিং!” পরে শুনিলাম চিচিংগা নাকি দেখিতে গরুর শিংয়ের মতো। তাই আমার নিরামিশাষী কাকিমা উহা হইতে শতহস্ত দূরে থাকেন! মনে ভাবিলাম, গ্রামের লোকজনের কুসংস্কার এখনো মারাত্মক পর্যায়ে রহিয়া গিয়াছে। কিন্তু অতিদ্রুতই আমি ভুল প্রমাণিত হইলাম।

তখন সবে চাকুরীতে ইস্তফা দিয়া বেকার দিনাতিপাত করিতেছি। হাত-খরচ জোগাইতে বাসায় টেবিল ব্যবসা, মানে ব্যাচ পড়ানো, আরম্ভ করিয়াছি। একদিন এক ছাত্রী জানিতে চাহিল বাসায় কী রান্না হইতেছে। আমি বলিলাম, “ইচা মাছ (চাটগাঁ ভাষায় চিংড়িকে ইচা মাছ বলিয়া থাকে) রান্না হইতেছে।” ছাত্রী বলিল, “স্যার, আমাদের বাসায় যে হুজুর পড়াইতে আসেন তিনি চিংড়িকে এইরূপ নামে ডাকিতে নিষেধ করিয়াছেন। ইহা আমাদের ধর্মের একজন নবীর নামের সাথে মিলিয়া যায়। তাই এই নামে ডাকিলে পাপ হইবে।” আমি কী বলিব ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না। শুধু বুঝিলাম, কুসংস্কার শহরাঞ্চলেও বেশ ভালোই বাসা বাঁধিয়াছে এবং সুখে-শান্তিতে দিব্যি বংশ-বিস্তারও করিতেছে!

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে এই দেশের মানুষের সম্পর্ক নাতিশীতোষ্ণ ধরনের। তথাপি ওই দেশের কোন চিপায় কী ঘটিয়া যাইতেছে তাহা জানিতে যেমনি আমাদিগের আগ্রহের শেষ নাই, তেমনি এই দেশের সংবাদ-মাধ্যমেরও উহা জানাইতে কাল বিলম্ব নাই। আর যদি তাহা সাম্প্রদায়িক কিছু হইয়া থাকে তবে বিষ্ফোরণ ঘটিতেও দেরী নাই। কিছুকাল আগে ওই দেশে এক নিরীহকে তাহারই প্রতিবেশীরা হত্যা করিল গো-মাংস ভক্ষণ করিবার অপরাধে! কোনো একটা খাবার খাইবার অপরাধে(!)তাহারই চেনা-জানা লোকেরাই কী করিয়া তাহার প্রাণক্ষয় ঘটাইতে পারিল তাহা আমার বোধ-বুদ্ধির বাহিরে। যদিও পরবর্তীতে উহার ঘরে যে কাঁচা মাংস পাওয়া গিয়াছিল তাহা ছিল আদতে ছাগ-মাংস! তো এতবড় মিথ্যা অভিযোগে (মিথ্যাই বা বলি কেন! আসলে উহা কোন অভিযোগই হয় না।) একজন নিরীহকে হত্যার দায়ে পাষণ্ডগুলার প্রাণদণ্ড অবধারিতই হইবার কথা, চারিদিকে আন্দোলন আছড়াইয়া পড়িবার কথা। ভাবিলাম মানব-বন্ধন হইবে, প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারক লিপি দেয়া হইবে, জড়িতদের আটক করিয়া শাস্তি দিতে বিরোধীদলগুলা সরকাররের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করিবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এইসব কিছুই হইল না! যাহা হইল, তাহা অনেকটা এইরূপ যে, চারপাশে গো-মাংস ভক্ষণের কম্পিটিশান পড়িয়া গেল! পিকনিকের মত সারি দিয়া বসিয়া কে কয়প্লেট মাংস ভক্ষণ করিতে পারে তাহার প্রতিযোগিতায় অনেকে লিপ্ত হইয়া গেল! অপরদিকে, গো-হত্যা বিরোধীরা হুংকার দিতে লাগিল যে, গো-মাংস খাইলে প্রাণ যাইবে। কয়েকজন বুদ্ধিজীবী বিদেশে বসিয়া ফেইসবুকে “বিফ খাইতেছি, পারিলে হত্যা করিয়া যাও” টাইপের সাহসী(!) ইস্ট্যাটাস দিয়া পরিবেশ আরও গুমোট করিয়া তুলিল। আর সংবাদ-মাধ্যমগুলা গো-হত্যার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি-তর্ক তুলিয়া তাতে সমানে রঙ চড়াইতে লাগিল। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করিলাম সেই হতভাগার কথা একেবারই আড়ালে চলিয়া গিয়াছে! মনুষ্য-হত্যার মতো একখানা ফৌজদারি অপরাধ কীরূপে সাম্প্রদায়িক তর্কে পরিণত হইয়া “গো-হত্যা ভাল না মন্দ” টাইপের বিতর্কে রুপ লাভ করিল তাহা অবলোকন করিয়া একেবারে বিমূঢ় হইয়া গেলাম।

বিধবা বিবাহ আর সতীদাহ প্রথা রোধের মত ইংরাজরা যদি গো-রক্ষা ও গো-মাংস ভক্ষণের উপর একখানা আইন পাশ করিয়া যাইতেন তাহা হইলে বোধহয় কিছুটা শান্তি পাইতাম। যুগ যুগ ধরিয়া হিন্দু-মুসলমান এই দুই জাতি গরু নিয়া কলহ করিয়া মরিতেছে। ইহাদের একদল পরমেশ্বরের আরাধনার সহিত গরুকে এমনভাবে বাঁধিয়া ফেলিয়াছে যে গো-মাংসের গন্ধ শুঁকিলেও তাহার জাত যাইবে বলিয়া বোধ হয়। অপর পক্ষ, গরুর প্রতি বিপক্ষের এমন শ্রদ্ধাবোধ দেখিয়াই হোক অথবা তাহার মাংসের স্বাদের কারণেই হোক, গো-মাংস ভক্ষণকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে টানিয়া নিয়া গিয়াছে যেন তাহা খাইতে না পারিলে উহাদের আর ধর্ম থাকে না! গো-রক্ষার কথা হিন্দুশাস্ত্রে আছে বৈ-কি। অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ, কিছু কিছু যজ্ঞাদি মাঙ্গলিক ধর্মীয় কর্মে গো-দান হিন্দুধর্মে একটি অতীব পূণ্যের কাজ বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে। তাহা বলিয়া, গো-রক্ষার অজুহাতে কাহারও প্রাণাতিপাত করিতে হইবে এরূপ নির্দেশনা কোথাও নাই। আরো বড় কথা হইল, গো-হত্যা করিলে যদি কেহ মহাপাতক রূপে বিবেচিত হইয়া থাকে তবে মনুষ্য হত্যা করিলে তাকে কী বলা যাইবে? ধর্মবীর? সোজা কথায়, সে নিখাদ খুনী। তাহার শাস্তি অবশ্যাম্ভাবী। কিন্তু সমানে গো-মাংস খাইয়া উদরপূর্তি করিয়া ওই খুনীদের কিরূপে শাস্তি দেয়া গেল তাহা ঠিক আমার নিকট বোধগম্য হইল না। যাহা হইল তাহা হইতেছে, তথাকথিত ধর্মপুত্তুরদের উস্কাইয়া দেওয়া গেল যেন তাহারা আরো কয়েকটা এমন ঘটনা ঘটাইতে পারে। আর যাহারা ধর্মীয় কারণে গো-মাংস খায় না তাহাদের টিটকারি মারা গেল। পরস্পরের প্রতি অশ্রদ্ধাবোধ আরও বাড়িল আর সাম্প্রদায়িকতার কালি গড়াইয়া ছিটাইয়া আরো ছড়াইয়া পড়িতে লাগিল।

তো পাশের দেশের এই ধর্মীয় কম্পন অনলাইন, অফলাইন ইত্যাদি মিডিয়ার কল্যাণে এই দেশেও অনুভূত হইতে লাগিল। অনলাইন মিডিয়াগুলা কোথায় কারা কয় কেজি গো-ভক্ষণ করিল আর কোথায় গো-ভক্ষণের অপরাধে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা বাড়িয়া ওখানকার সংখ্যালঘুরা কীরূপ ঝুঁকির মধ্যে পড়িল তাহা সবিস্তার বর্ণনা দিয়া একই খবর বিভিন্ন ভাবে রঙ মারিয়া প্রতি আধাঘন্টা পরপর পোস্ট করিতে লাগিল। এখানকার ধর্মপুত্তুররাও হুংকার দিতে লাগিল যে, গরু পুজারিদের দেশ ছাড়িতে হইবে (যদিও ইহা একটি চলমান প্রক্রিয়া। তেতাল্লিশ হইতেই চলিতেছে)। এমনি করিয়া তাহারা যে নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের (নির্দিষ্ট করিয়া বলিলে, এদেশের হিন্দুদের) ঘোর অসহিষ্ণুতার মুখে ফেলিয়া দিতেছে তাহা আর কেউ ভাবিয়া দেখিল না। কতিপয়ক্ষেত্রে, নিজদেশের সংখ্যালঘুদের জমি দখল, নারী দখল, মূর্তি ভাঙ্গা ইত্যাদির চাইতে পাশের দেশের কোন শতকোটিপতি চিত্রনায়কের স্ত্রী অনিরাপদ বোধ করিতেছে তাহা গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করিতেছে। মার্কেটে নাকি এইসবই বেশী খাইতেছে। তাহা হইলেও ইহা বুঝিতে পারা যায় এদেশের মার্কেটও ক্রমেই সংখ্যালঘুদের জন্য বিষাক্ত হইয়া উঠিতেছে।

আজ গফুরের কথা খুব মনে পড়িতেছে। গরীব মুসলমান এই চাষাটি একটি ষাঁড় পালিত। নাম দিয়াছিল, “মহেশ”! পুত্রজ্ঞানে তাহাকে লালন করিত। গরীব বলিয়া গরুটাকে খড় কিনিয়া খাওয়াইতে পারিত না। ছাড়িয়াও দিতে পারিত না পাছে কারো ক্ষেতে গিয়া মুখ দেয়। নিজের মুখের অন্ন নির্দ্বিধায় গরুটারে খাইতে দিত আর নিজে জ্বর লইয়াও অভুক্ত থাকিত। গো-রক্ষার মহান ব্রতে (!!) নিয়োজিত পুরুতঠাকুরমশাই গরুর হাড় জিরজিরে শরীর দেখিয়া গফুরকে ভর্ৎসনা করিলেও কখনো নিজের পোঁটলা খুলিয়া দুটো চাল খাইতেও দিত না, নিজের খড়ের গাদা হইতে দুটো খড় কখনো ধারও দিত না। এমনি গো-প্রেম! ক্ষুধা আর হতাশায় সন্তান হত্যার ঘটনা আমরা অহরহ পত্রিকায় পড়িতেছি। গফুরও ক্ষুধার তাড়নায়, হতাশায়, ক্ষোভে নিজের গো-সন্তানকে হত্যা করিয়া অজানার পথে পা বাড়াইয়াছিল। যাইতে যাইতে সে একখানা অভিশাপ দিয়া গিয়াছিল। এই উপমহাদেশ এখনও সেই অভিশাপ হইতে নিজেকে মুক্ত করিতে পারে নাই।

অনুতাপের বিষয় হইল, গফুর আমাদের পত্র-পত্রিকার কোথাও ঠাঁই পায় নাই। অসহিষ্ণুতার শিকার হিসাবে তাহাকে কেহ তুলিয়া ধরে নাই।

কথাগুলো কতক সাম্প্রদায়িক শুনাইতেছে। সাম্প্রদায়িকতা একটা রোগ, ভয়ংকর ছোঁয়াচে রোগ। কি জানি, হয়ত এই রোগ ধীরে ধীরে আমাকেও গ্রাস করিতেছে! তবে এই কথা ঠিক যে, যতদিন লোকে চিচিংগাকে গরুর শিং ভাবিবে, যতদিন মাছের নামের সাথে মহা মনীষীদের নাম জড়াইয়া দিবার মতো লোক থাকিবে আর যতদিন অসহিষ্ণুতার রঙমাখা খবর মার্কেট পাইতে থাকিবে, ততদিন এই রোগ ছোঁয়াচের মত ছড়াইতে থাকিবে। আর তাহা হইতে আমাদের কাহারো কোনো মুক্তি মিলিবে না।

(বি. দ্র.: লেখাটি সাধু ভাষায় লিখিবার দুঃসাহস করিয়াছি। ইহা একখানা প্রয়াস মাত্র। পাঠকগণ গুরুচণ্ডালী দোষ ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখিবেন। ইহাই প্রত্যাশা।)