ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

প্রায় আড়াইশো বছরের ইতিহাসকে ধারন করে দুটি অতৃপ্ত হৃদয় তিলে তিলে কিভাবে একটি সুন্দর পৃথিবীর নরকে পতিত হতে হয়েছিল তা তুলে ধরেছেন ‘দোজখনামায়’। দোজখনামা এমন একটি বই যেখানে মৃতরা ঘুরে বেড়ায়; তার আপন কর্মফলের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়। একমাত্র মৃত্যুই মানুষকে সব মালিন্যের হাত থেকে মুক্তি দিতে পারে। মৃত্যু যে দেশ মানে না; সবার ঠিকানা যে এক সুতোয় মিলে যায় তা বারেবারে ফুটে ওঠে। ভারত-পাকিস্তান দুই বৈরি দেশ বারেবারে সীমানার বেড়াজালে আটকে থেকে প্রমাণ করে তারা আলাদা। কিন্তু মৃত্যু যে দেশের সীমানা মানে না তা রবিশংকর বল অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার ‘দোজখনামা’ বইতে।

_20171120_211020

উর্দু সাহিত্যের দুই দিকপাল মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিব এবং সাদাত হাসান মান্টো। ভারত আর পাকিস্তানের কবরে শুয়ে তাদের জীবনগাঁথা তুলে ধরেছেন। এ কাহিনির ভেতরে কোথাও কোথাও লেখক স্বয়ং প্রবেশ করেছেন আবার তবসুম মির্জার বয়ানে গল্প এগোয়। বেশিরভাগ কাহিনি মান্টো কিংবা গালিবের জবানীতে এগিয়ে যায়।

কাহিনির সূত্রপাত পুরানো লখনউতে ফরিদ মিঞা নামক এক অতি সাধারণ ব্যক্তির কাছে একটি পুরনো পান্ডুলিপি পাবার মাধ্যমে। যদিও লেখক সেখানে গিয়েছিলেন তবায়েফ বা বাঈজীদের নিয়ে কিছু একটা লেখার আশায়। কিন্তু ততদিনে তবায়েফদের সেই জৌলুশ কিংবা পেশা আর অবশিষ্ট ছিল না। ফরিদ মিঞার সাথে আলাপচারিতার এক ফাঁকে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কিসসা লেখেন?’ জবাবে লেখক হাঁ সূচক উত্তর দিলে তিনি আবার বলতে শুরু করেন, ‘কিসসা লিখলে বড় একা হয়ে যেতে হয়, জনাব। আল্লা যাকে কিসসা লেখার হুকুম করেন, তার জীবন জাহান্নম হয়ে যায় জি। জীবনটা কারবালা হয়ে যায়, কারবালা মানে মহরমের কথা নয়। কারবালা মানে জীবন যখন মৃত্যুর প্রান্তর হয়ে ওঠে।’

এভাবেই একজন সাধারণ ফরিদ মিঞা তার জীবনের কঠিন আঘাত থেকে বুঝতে পেরেছেন জীবন কখনো কখনো দোজখের আজাব হয়ে দেখা দেয়। ফরিদ মিঞা একটি পুরনো পান্ডুলিপি লেখকের হাতে তুলে দেয় যা কিনা স্বয়ং সাদাত হাসান মান্টো লিখেছেন। কিন্তু তা লেখা ছিল উর্দুতে। লেখক উর্দু জানতেন না। তিনি দমে যাননি। কলকাতা ফিরে এসে তবসুম মির্জার কাছে উর্দুর পাঠ নিচ্ছিলেন। তবসুম লেখকের খেয়ালের কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়েছিলেন। শুধু একটি বই অনুবাদের জন্য কেউ উর্দু শিখতে চায় তা তিনি ভাবতে পারেননি।

সাদাত হাসান মান্টো উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি সারাজীবন শুধু একজন মানুষের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন। তিনি মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিব। কিন্তু তারা দুজন জন্মেছেন দুই প্রজন্মে। মৃত্যু তাদের দুজনকেই এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে। পাকিস্তানের কবরে শুয়ে আছেন সাদাত হাসান মান্টো আর ভারতের কবরে মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিব। গজল বলতে যার নাম সর্ব প্রথমে উঠে আসবে তিনি মির্জা গালিব। যিনি এখন ঘুমিয়ে আছেন দিল্লীতে, নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগার কাছে সুলতানজির কবরে। আর মান্টো যিনি তার কবরে এপিটাফ লিখতে চেয়েছিলেন, ‘সাদাত হাসান মান্টো এখানে চিরনিদ্রায়, তার সঙ্গে সঙ্গে গল্প লেখার সব রহস্য ও কবরে চলে গেছে। টনটন মাটির নিচে শুয়ে সে ভাবছে, কে সবচেয়ে বড় গল্প লেখক, মান্টো না আসাদুল্লা।’

চলুন এবার মান্টো আর গালিবের আলাপচারিতায় আমরা প্রবেশ করি। কবরে তাদের কথাবার্তা শুরু হয় আদাব দিয়ে। একজন সেই ১৮৬৯ সাল থেকেই কবরে শুয়ে আছে আর আরেকজন ১৯৫৫ সাল থেকে। মির্জা গালিব প্রত্যক্ষ করেছে সিপাহী বিপ্লব আর মান্টো দেশভাগ। মৃত্যু ছাড়া যে বিপ্লব হয় না তা গালিব দেখেছেন। আরো দেখেছেন ব্যর্থ বিপ্লব কিভাবে মানুষকে পশুর পর্যায়ে নিয়ে আসে। মির্জা তাও তো অন্য জাতির অন্য লোক দ্বারা মৃত্যুর বিভীষিকা দেখেছেন। কিন্তু মান্টো সে তো দেখেছে স্বজাতির হাতে স্বজাতির খুন। ধর্মের নামে দেখেছে রক্তের হোলি খেলা। শেষ জীবনে এসে দুজনকে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। এমন কি দুজনের অত্যন্ত প্রিয় সুরাও কপালে জোটেনি। কি নিদারুণ মিল তাদের জীবনের দস্তানে। মির্জা গালিব যে কিনা গজলের জন্য বেঁচেছিল তাকে সেই গজলও ছেড়ে গেল। গালিবের ভাষায়:

‘য়া রব জমানা মুঝকো মিটাতা হৈ কিসলিয়ে
লওহে্-এ জাঁহা-পে হরফ্-এ মকর্ রর নহিঁ হুঁ মৈঁ’।।’

‘হে ঈশ্বর, কাল আমাকে মুছে ফেলছে কেন? পৃথিবীর পৃষ্ঠার উপর আমি বাড়তি হরফ তো নই।’

মির্জা গালিবের পূর্বপুরুষ সমরখন্দ থেকে ভারতবর্ষে এসেছিল। তার বাবা আবদুল্লা বেগ খান বিভিন্ন নবাবের ভাড়াটিয়া সৈন্য হিসেবে কাজ করেছেন কিন্তু তাদের ছিল মির্জার রক্ত যা অত্যন্ত সম্মানের। সেই সম্মানটুকু মির্জা গালিবের ভাগ্যে জোটেনি। তাকে বাঁচতে হয়েছিল বিভিন্ন নবাবের দয়া আর বৃটিশদের পেনশনের টাকায়। তবু তিনি গজলকে ছাড়তে পারেননি। বারে বারে মীর তকী মীরের গজল আর শায়ের তাকে পাগল করে তুলত। মীর তকী মীর যে ছিল আরেক দুর্ভাগা। গজল তাকে উন্মাদ করে ছাড়ল। শেকলে বেঁধে রাখতে হয়েছিল তাকে। মীরের ভাষায় তবুও বলতে হয়:

‘বা রে দুনিয়ামেঁ রহো গমজদহ্ য়া শাদ রহোহো,
অ্যায়শা কুছ করকে চলো যাঁ কেহ্ বহুদ ইয়াদ রহো।।’

‘মানুষের মধ্যেই থাকো, দুঃখ পাবে আবার সুখও পাবে, এমন কিছু করে যাও যেন সহজে তোমায় লোকে ভুলতে না পারে।’

না, মীর সাহেব মিথ্যে বলেন নি। মির্জা গালিব তো দুঃখের আরেক নামই ছিল। কিন্তু তিনিও কখনো কখনো সুখী মানুষ ছিলেন। বিশেষ করে বানারসে কিংবা মণিকর্ণিকায় আবার কলকাতার কথাও বলা যায়; যখন তিনি মামলা করতে গিয়েছিলেন। এ এক আজব জীবন ছিল। গজল বেচে নিজের জীবন চালাতে হত। সাচ্চা সাধু মানুষ থাকলে তার কলম দিয়ে একটি শব্দও বের হতো না। যখনই পেটে মদ পড়ত সঙ্গে সঙ্গে কলমে ফুলকী ফুটত। তার খামখেয়ালীর খেসারত দিত উমরাও বেগম। তার বিবির সঙ্গে ওই অর্থে ভালবাসা ছিল না বললেই চলে। দুটি মানুষ এক সাথে থাকার জন্য যতটুকু ভালবাসা থাকা দরকার ছিল সেই তুলনায় তা ছিল নিতান্ত ম্যাড়মেড়ে। যন্ত্রণা ছাড়া নাকি দুনিয়ায় কোন সৌন্দর্য তৈরী হয়নি। সেই যন্ত্রাণায় একজন পুরুষ কখনো কখনো ঈশ্বরের কাছে হাত না পেতে নারীর কোলে মাথা রেখে সান্ত্বনা পেতে চায়। গালিবের মনে যে সে বাসনা আসেনি তা বলা যাবে না। কিন্তু পেটের ধান্দা আর প্রেম তো হাত ধরাধরি করে চলে না।

দেশভাগের বিভীষিকা নিয়ে মান্টো লিখেছিলেন ‘ঠান্ডা গোশত’ যা অশ্লীলতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়। সত্য লিখন যদি অশ্লীলতা হয় তবে কৃষণ চন্দর, আহামদ নাদিম কাসমী, রাজেন্দ্র সিং বেদী, খুশবন্ত সিং, খাজা আহামদ আব্বাস, রাম লাল কিংবা ইসমত চুঘতাই এরাও অশ্লীল সাহিত্য রচনা করেছেন। এত হত্যা, এত লুন্ঠন, এত ধর্ষণ দেখে কোন বিবেকবান মানুষই চুপ করে থাকতে পারেনি। মান্টো কি করে চুপ থাকেন! তাই তো তিনি একে একে লিখে গেছেন টোবাটেক সিং, শরিফন, খুলে দাও, ঠান্ডা গোশত কিংবা গাঞ্জে ফেরেশতার মত কালজয়ী লেখা। জীবন মান্টোকে নিয়ে নানান খেলা খেলেছে। কখনো পত্রিকার সম্পাদক, কখনো বম্বের চকচকে দুনিয়ার ফিল্মের লেখক কিংবা চাকুরে। বম্বে ফিল্মের কদর্য দিক তিনি নিজে দেখেছেন। নিজের সাথে সমঝোতা করতে করতে তিনি নুয়ে গিয়েছিলেন। তাই তো বন্ধু কৃষণ চন্দর কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন ফিল্মের জন্য যে কাহিনি তিনি লেখেন তা পেটের জন্য, তার মাঝে শিল্প মূল্য খুঁজতে যাওয়া বোকামি।

গালিব এবং মান্টো দুজনই ফ্যান্টাসি খুবই পছন্দ করতেন। তারা নতুন নতুন কাহিনি কল্পনা করে রাজা উজির কিংবা জ্বিন পরির কাহিনির সাথে নিজেদের মিলিয়ে জল্পনা করতে ভালবাসতেন। কখনো মীর কখনো হাফিজের শের আউরাতেন। হাফিজের ভাষায় বলা যায়:
‘শিগুফতা শুদ গুলে হম্ রা
ব গশ্ ৎ বুলবুল মস্ত
সদা এ সর খুশি ঐ
আশিকানে বাদা পরস্ত।’

‘বাগানে ফুটেছে রক্ত গোলাপ, মাতোয়ারা হল বুলবুল সব; হে সুরা প্রেমিক কোথায় তোমরা, তোলো চারদিকে আনন্দরব।’

গালিবের গজল আর মান্টোর গল্প দুটোই কালকে উত্তীর্ণ করতে পেরেছিল। গালিবের গজলকে ফারসি গজলের অনুরূপ বলা হত, যা অত্যন্ত দূরহ। আর মান্টোর গল্প ছিল সমাজের নিচু জাতের কাহিনি নিয়ে যা ভদ্র সমাজে খাতির পায়নি। মান্টোর গল্পের চরিত্ররা বেশ্যা, যারা শরীর বিকিয়ে কামাই করে। তারা ধর্ষক, যারা মৃতদেহের সাথে সঙ্গম করে কিংবা তারা মাগীর দালাল। আর তাই সমাজ তা মেনে নিতে পারেনি। আর সমাজ যখনই কাউকে মেনে নিতে না পারবে তখনই তার গায়ে পাগলের ছাপ্পা মেরে দিবে। যেমনটা মীর তকী মীরের বেলায় দেখেছি।

ভারতবর্ষকে লুন্ঠনের ইতিহাস অতি পুরনো। বখতিয়ার খলজী, নাদির শাহ থেকে শুরু করে সর্বশেষ সংযোজন ছিল বৃটিশ। ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন, যে দিন ভারতের স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হল, সে দিন থেকে শুরু হল বৃটিশরাজ। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একটি পুরো জাতির মাঝে কিভাবে বিবেধ সৃষ্টি করতে পেরেছিল তা আমরা প্রত্যক্ষ করতে পেরেছি ঠিক একশ বছর পর। সিপাহী বিপ্লবের মাধ্যমে। বাঙালি পল্টনের সিপাহীরা এবং অন্যান্য দেশীয় সিপাহীরা পরাজয়ের একশ বছরকে সামনে রেখে মোঘল সাম্রাজ্যের অস্তমিত সূর্যের শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফরকে তাদের নেতা বানিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিল।

বাহাদুর শাহ জাফর যে কিনা নিভে যাওয়া প্রদীপের শেষ সলতেটুকু মাত্র, আলো নয়। সে কিভাবে এ তুফান সামাল দিবে! তিনি তা পারেন নি। আর তাই একুশ দিনের প্রহসনের বিচারে তিনি রেঙ্গুনে নির্বাসিত হলেন। ইংরেজের চরম প্রতিশোধের শিকার হলেন অন্যান্য রাজা কিংবা নবাবরা। ধরে ধরে প্রত্যেক নবাব কিংবা শাহাজাদা যে যেখানে ছিল সবাইকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিল।

মির্জা গালিব তখন জাফরের সভার একজন কবি। গালিব দেখলেন মৃত্যুর বিভীষিকা, হত্যা, লুন্ঠন, ধর্ষণ। এখানে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার ছিল, মুসলমানেরা বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। সেই তুলনায় হিন্দুরা বেঁচে গিয়েছিল। অর্থাৎ, জাতিতত্ত্বের ছাপ্পা তখন থেকেই লেগে গেল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জিন্নাহ আর নেহেরুরা মিলে ভারত আর পাকিস্তান দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম দিলেন, যার প্রতিহিংসার বীজ বুনে দিয়ে গিয়েছিল বৃটিশরা। সেই বীজের চমৎকার ফসল হিন্দু -মুসলিম দাঙ্গা।

মান্টো এবং গালিব দুজনের কথাতেই বারবার উঠে এসেছে দিল্লীর কথা। সেই দিল্লী যে বারবার ভেঙ্গেছে আবার গড়ে উঠেছে। কখনো ফারসি, কখনো আফগানী আবার কখনো মারাঠাদের দ্বারা বারবার লুন্ঠিত হয়েছে। মীরের ভাষায় বলা যায়:

‘অব খরাবহ্ হুয়া জহান্-এ আবাদ
বরনহ্ হরেক কদমপে যাঁ ঘর-থা।’

‘আজ উজাড় হয়ে গেল যেখানে জমজমাট নগর ছিল, নইলে এখানে তো প্রতি পদেই বাড়ি ছিল।’

মীর সাহেব কেন জানি মান্টো আর গালিবের মনের কথা অনেক আগেই লিখে গেছেন। নইলে এই দিল্লীর মতই তাদের হৃদয়ও কি উজাড় হয়ে যায়নি। মির্জা গালিব তো এই গজলের পিছনে ছুটতে ছুটতে সংসার ধর্মটাই ভুলে গিয়েছিলেন। গালিব বিশ্বাস করতেন, ‘গজল মানে সুন্দর সুন্দর শব্দ নয়, হৃদয় থেকে রক্ত না ঝরলে গজল লেখা যায় না।’ আসলে যা সাজিয়ে সাজিয়ে মির্জা গজল লিখেছিলেন সেই ভাষা কিংবা ভিতরের খুশবুটুকু তো কেউ ছুঁতে পারবে না। গালিব বারেবারে তার হৃদয় নিংড়ে গজলের নির্যাসটুকু আমাদের জন্য রেখে গেছেন। তাই তো মির্জা লিখে গেছেন:

‘দিলকী বিরানীকা কেয়া মজকুর হ্যয়
য়হ্ নগর সও মর্ তবা লুটা গয়া।’

‘আমার উজাড় হৃদয়ের কথা কি আর বলব, এই নগরীটি বার বার লুন্ঠিত হয়েছে।’

অন্যদিকে মান্টো, যে তার পিতার আদর কিংবা স্বীকৃতি কোনটাই উপভোগ করতে পারেন নি। সেইভাবে পড়াশোনাটাও এগিয়ে নিতে পারেনি। একমাত্র বোন ইকবাল আর মা ছাড়া তেমন কেউই ছিল না। বেশ্যাপাড়ায় যাতায়াত ছিল তার কাছে ডালভাত। আর মদ ছিল নিত্যসঙ্গী। এই সেই মান্টো যে নিজের মেয়ের জন্য ঔষধ না কিনে নিজের জন্য মদ কিনে এনেছিল। মদ ছাড়া যে তার কলমে একটি শব্দও বের হতো না। তার বিবি শফিয়া এ পাগলামোটুকু সহ্য করে গেছেন বলেই তো একজন সাদাত হাসান মান্টোকে আমরা পেয়েছি।

আসলে মান্টো তো সেদিনই মরে গেছে যে দিন ভারত ছেড়ে তাকে পাকিস্তানে চলে যেতে হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ধিক্কারটা পেয়েছে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ইসমত চুঘতাই’র কাছে। ইসমত কিছুতেই মান্টোর এরকম কাপুরুষের মত চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি। ইসমত, যে ছিল মান্টোর বন্ধু, বহিন আর কোন দিনই মান্টোর সাথে যোগাযোগ রাখেনি। পত্রিকাওয়ালারা যখনই মান্টো আর ইসমতের মাঝে মন দেয়া নেয়ার সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করেছে তখনই মান্টো তাকে বহিন বলে কাছে ডেকে নিয়েছে। অবশ্য মান্টোর আর কিইবা করার ছিল, চারদিকে দাঙ্গার ডামাডোলে ছোট ছোট তিনটি বাচ্চা আর বিবিকে নিয়ে ঝুঁকি নিতে চায়নি। তাই তো তার দেশ ত্যাগ যা তাকে আরো বেশি একাকী করেছে, বারেবারে পর্যুদস্ত করেছে।

পাকিস্তানকে মান্টো কখনোই নিজের দেশ বলে আপন করে নিতে পারেনি। আর পাকিস্তানও তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করেনি। তাই তো বারেবারে মদের কাছে ফিরে যেতে হয়েছে। এই দুনিয়াতে মানুষের পাপ-পূণ্যের বিচার হয় না, তা হবে কেয়ামতের দিনে। কিন্তু মানুষ তার নিজের মাঝে এমন এক কারাগার বানিয়ে রাখে যে কারাগারে তাকে অহরহ জাহান্নামের শাস্তি পেতে হয়। আর দুনিয়া তখন তার কাছে দোজখে্র মতই মনে হয়।

আসলে মান্টো আর গালিব দুজনই বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভালবাসা শব্দটাকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেছে। ভালবাসাটাকে অবিশ্বাস করার সাথে সাথে তারা বুঝতে পারে তাদের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে। অন্য কিছুতো তারা ভালবাসতে পারেনি। শুধু গল্প আর গজল তাদের ভালবাসার সবটুকু জায়গা দখল করেছিল। তাই তো মীরের ভাষায় বলা যায়:

‘ক্রীতদাস হও, জেলে পঁচে মরো, কিন্তু ভাবাসার খপ্পরে পড়ো না,
প্রেমে একদিন আগুন জ্বলে উঠেছিল, তারপর তো পড়ে আছে শুধু ছাই।’

না, গালিব কিংবা মান্টো কেউই ভালবাসার বাঁধনে জড়াতে পারে নি। যে বাঁধনে জড়িয়েছিল তা হল গল্প আর গজল। এ ভালবাসার আরেক ধর্ম। এই গজল আর গল্প তাদের পুড়িয়ে শুধু ছাই-ই করেনি; তাদের জীবনটাকে দুনিয়াতেই দোজখে্র বাসিন্দা করে তুলেছিল। কিভাবে একজন শিল্পী এতবড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, যখন নিজের জীবনকে পুড়িয়েই কেউ শিল্পের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে রাখে।

আসলে একজন শিল্পীকে জীবন সহজেই হারিয়ে দিতে পারে কিন্তু শিল্পীর আসল জীবন তো শুরু হয় তার মৃত্যুর পর। তার শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে। তাই তো মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিবের গজল আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। আর মান্টোর গল্পের তল খুঁজতে আজও তাবৎ বুদ্ধজীবী তল হাতড়ায়। হয়ত ওমর খৈয়ামের কথাই ঠিক, খৈয়াম সাহেব তার রুবাইতে লিখেছিলেন:

‘এই বিশ্বে যখন আমার থাকার মত জায়গা নেই, তখন মদ আর আশিককে ছেড়ে থাকা ভুল।’

খৈয়াম সাহেবের কথা সত্য প্রমাণ করতে কিনা কে জানে, গালিব কিংবা মান্টো কেউই তার অন্যথা করেন নি।

এই নশ্বর জীবনটা তো আল্লাহ্‌ একেবারে মুছে দিবেন কিন্তু জীবনের কয়েকটি মুহূর্তের স্বাদ নিতে চেয়েছিলেন গালিব, তার গজলের মাধ্যমে। এই জীবনে যাকে দেখতে পাওয়া যায় না, তাকে তিনি দেখেছেন। যা শোনা যায় না, তা তিনি শুনেছেন। আর যা অনুভব করা যায় না, তা তিনি অনুভব করেছেন। আর এর শাস্তি খোদা তাকে দিয়েছেন। অনন্তের স্বাদ পাওয়ার জন্যই তাকে দেখতে হল নরক-জীবন।

এই দুনিয়ার প্রেম হচ্ছে ইশক-এ-মজাজী আর আল্লাহ্‌র প্রেম হচ্ছে ইশক-এ-হকিকি। মান্টো কিংবা গালিব কেউই ইশক-এ-হকিকির পথে যাননি, গিয়েছিলেন ইশক-এ-মজাজীর পথে। আর তাই তো তাদের জীবনে নেমে এসেছিল দোজখ্। কিন্তু আসলেই কি তাই, ইশক-এ-মজাজীর যে উপাদান তা কি স্রষ্টার সৃষ্টি নয়? তা কি কেবলই ছায়া পুতুল? দুনিয়া প্রেম তো আসলে খোদা প্রেমও যেখানে প্রত্যেক সৃষ্টিই তাঁর। জীবনকে যে বাজী ধরতে পারে সেই-ই একমাত্র পৌঁছাতে পারে ইশক এর কাছে।

মান্টো এবং গালিব দুজনই জীবন নিয়ে জুয়া খেলেছে, বারেবারে বাজী ধরেছে। নশ্বরতা ছেড়ে অবিনশ্বরের দিকে যেতে চেয়েছে। আর তাই তো তারা জীবনের রূপ সুধা গ্রহণ করেনি, গ্রহণ করেছে অবিনশ্বরতাকে। যেখানে খোদার দুনিয়াদারির সৌন্দর্যই অবিনশ্বর সেখানে তারা গল্প দিয়ে, গজল দিয়ে আরেক সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। আর সেই সৌন্দর্যের সৃষ্টির জন্য বারেবারে দুনিয়ারূপ দোজখনামায় প্রবেশ করেছে।

শেষ বয়সে এসে মির্জা গালিব এবং মান্টো পাগল হয়ে গিয়েছিল। গালিব অভাবের তাড়নায় উমরাও বেগমের সব গয়না, আসবাবপত্র এমনকি ঘরের থালাবাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিল। দেনা শোধ করতে না পারায় জেলে যেতে হয়েছিল। আর রাস্তায় রাস্তায় কুকুরের সাথে ঘুরেছে। কুকুরের ঘেউ ঘেউ তার কাছে কথা, বাক্য মনে হয়েছে। নিজে নিজে কুকুরের সাথে কথা বলেছে আবার নিজেই তার জবাব দিয়েছে।

এই তো উর্দু সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত গজল স্রষ্টা মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিব যিনি ঘুমিয়ে আছেন দিল্লীতে। তার সাথে ঘুমিয়ে আছে তার জীবনের হাহাকার, দুঃখ, বঞ্চনা, না পাওয়ার বেদনা আর তার গজল। না, গজল ঘুমায়নি। গজল বেঁচে আছে বেগম আখতার, মেহেদি হাসান, জগজিৎ সিংদের কন্ঠে, লোকের মুখে মুখে। জীবন তাকে দোজখে্র যন্ত্রণা দিলেও মৃত্যু তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে তার গজলের মধ্য দিয়ে।

আর মান্টো যে পরিবারের জন্য এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাঞ্জাব মেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি করেও তার পাগলামী দূর করতে পারেন নি। বারবার ঘুম থেকে চিৎকার করে ইসমতকে খুঁজতেন, যে তার সামনে বসে আইসক্রীম খাচ্ছে। কেবল এ কথাই বারবার শফিয়াকে বলতেন তিনি লাহোর থেকে বম্বে চলে যাবেন। যেখানে তার বহিন ইসমত তার চাকরীর ব্যবস্থা করবে। তারপর একদিন ঘুম থেকে উঠে বমি করলেন আর পেট থেকে নীলচে-হলুদ জলের সাথে বেরিয়ে আসল রক্ত। তারপর শুধু রক্ত আর রক্ত। মান্টো ঘুমিয়ে আছে লাহোরে মিঞাসাহেতার কবরে।

মৃতদের কোন দেশ নেই। মাটির গভীরে তো একটাই দেশ, একটাই পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে ঘুমিয়ে আছেন মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিব আর সাদাত হাসান মান্টো। জীবন কখনো কখনো মানুষকে এমন যন্ত্রণা দেয় যা মানুষ তার এক জীবনে সইতে পারে না। আর তখন সেই জীবন মানুষের কাছে হয়ে যায় দোজখ্। সেই দোজখে্ পুড়ে খাক খাক হয়ে তবেই তার জীবনের পরিসমাপ্তি হয়। এপারের দুনিয়াতে পুড়ে কয়লা হয়ে ওপারের দুনিয়ার জন্য খাঁটি সোনা হয়ে গেছেন। সেই খাঁটি সোনার দুনিয়ায় জান্নাত কবুল হোক। ঘুমাও মির্জা মহম্মদ আসাদুল্লা খান গালিব। ঘুমাও সাদাত হাসান মান্টো।

রুবু মুন্নাফ
দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা।