ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

_20180104_172913

প্রায় তিন হাজার বছরের চিন্তার ইতিহাসকে অত্যন্ত সাবলিল ভাষায় বর্ণনা করেছেন ইয়স্তেন গার্ডার। ‘সোফির জগৎ’ একটি উৎকৃষ্টমানের দার্শনিকতার প্রামাণ্য দলিল। নরওয়েজিয়ান লেখক গার্ডার দর্শনের একজন শিক্ষক। প্রায় সারে পাঁচশ পৃষ্ঠার ঢাউস আকৃতির বইটি পড়তে হলে আপনাকে যথেষ্ট ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দর্শনের মত একটি কাঠখোট্টা বিষয়কে সহজ-সরলভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরা চাট্টিখানি কথা নয়। লেখক এখানে সুনিপুণভাবে উৎরে গেছেন।

কার কথা নেই এখানে; একটি ১৪ বছর বয়সী নরওয়েজিয়ান কিশোরী সোফি যে তার দর্শনের শিক্ষক আলবার্টো নক্সের সাথে আলাপচারীতায় তা তুলে ধরেছেন। মূলত আশ্চর্যজনক দুটি চিঠি তার ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। চিঠি দুটোতে শুধু দুটো প্রশ্ন লেখা ছিল: “তুমি কে?”, আর “পৃথিবীটা কোথা থেকে এলো?” এই আশ্চর্যজনক চিঠির দুটো প্রশ্নই সোফির কৌতূহলকে উস্কে দিল। শুরু হয়ে গেল প্রাক-সক্রেটিস যুগ থেকে শুরু করে পাশ্চাত্য দর্শনের রাজ্যে অভিযাত্রা।

মানুষের জীবনে সবচেয়ে জরুরী জিনিস কী? অনাহারীর কাছে খাদ্য, শীতে মরণাপন্ন ব্যক্তির কাছে উষ্ণতা, নিঃসঙ্গ ব্যক্তির কাছে অন্যের সাহচর্য। এ কথা অস্বীকার করার যো নেই যে, মানুষ মাত্রই মৌলিক চাহিদা নির্ভর। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ভালোবাসা, আদর-যত্ন এসবই সবায় চায়। কিন্তু এসবের বাইরেও কিছু জিনিস রয়েছে যা সবারই জানা দরকার। আর তা হচ্ছে আমরা কে এবং আমরা কেন পৃথিবীতে রয়েছি। আর এখানেই দার্শনিকতা আমাদের চোখ খুলে দেয়। কেন শূন্য থেকে কিছুই সৃষ্টি হতে পারে না তা দার্শনিকতার আলোকে তুলে ধরেছেন।

এশিয়া মাইনরের মিলেটাস নামক স্থানের একজন প্রকৃতিবাদী দার্শনিক হচ্ছেন থেলিস যিনি বিশ্বাস করতেন পানিই সবকিছুর উৎস। মিলেটাসের আরেকজন দার্শনিক অ্যানাক্সিম্যান্ডার যিনি বিশ্বাস করতেন এই পৃথিবী ‘অসীমেই’ উদ্ভব আর ফের অসীমেই মিলিয়ে যাবে। মিলেটাসের তৃতীয় দার্শনিক ছিলেন অ্যানাক্সিমেনিস যিনি মনে করতেন সব কিছুর উৎস নিশ্চয়ই বাতাস কিংবা বাষ্প। মোদ্দা কথা হলো, প্রায় ৫৭০ খ্রি.পূ. প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার লোক কম সংখ্যকই ছিলেন। এরপর একে একে ইতালির পার্মেনিদেস, এশিয়া মাইনরের হেরাক্লিটাস, সিসিলির এম্পিডক্লেস, অ্যানাক্সগোরাস প্রভৃতি দার্শনিকগন প্রকৃতির চারটি মৌলিক উপাদান মাটি, বাতাস, আগুন আর পানি নিয়ে তার ধারণাকে তুলে ধরেছেন। প্রকৃতিবাদী দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত যিনি তিনি হলেন ডেমোক্রিটাস। তিনি অনুমান করলেন যে সবকিছুই ক্ষুদে ক্ষুদে অদৃশ্য ব্লক দিয়ে তৈরী, আর এই ব্লকগুলোর প্রত্যেকটিই শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয়। ক্ষুদ্রতম এই একক গুলোকে তিনি বললেন পরমাণু বা ‘অ্যা-টম’।

ফ্যাটালিজম বা নিয়তিবাদ নিয়ে আলোচনা করেন বিখ্যাত ঐতিহাসিক হেরোডোটাস আর থুসিডাইডিস। যদিও গ্রীক চিকিৎসাশাস্ত্রের স্থপতি ও দার্শনিক হিপোক্রেটিস নিয়তিবাদকে পরিমিতিবোধ দ্বারা বিচার করতে চাইলেন।

যে জানে যে সে কিছুই জানে না সে-ই সবচেয়ে জ্ঞানী। এমন কথা সম্ভবত সক্রেটিস ছাড়া কেউ দ্বিধাহীন ভাবে বলতে পারত না। সক্রেটিসের সময় থেকেই এথেন্স ছিল গ্রীক সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল। প্রকৃতিবাদী দর্শন থেকে সমাজে ব্যক্তিমানুষের উদ্ভব হলো। আর এর ফলাফল দাঁড়াল গণতন্ত্র, সঙ্গে এলো গণ-পরিষদ আর আইন আদালত। যদিও সক্রেটিসের চিন্তা চেতনা তার কাল ধারণ কিংবা গ্রহণ করতে পারে নি। আর তাই প্রহসনেরর হেমলক পানে মৃত্যু।

সক্রেটিস যে সময় হেমলক পান করেন, প্লেটো ছিলেন ২৯ বছরের যুবক এবং তার ছাত্র। প্লেটোর কাছে সক্রেটিসের মৃত্যু ছিল বাস্তবের সমাজ এবং খাঁটি বা আদর্শ সমাজের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আজকের পৃথিবীতে আমরা যে একাডেমি বলে থাকি তা প্লেটোর হাত দিয়ে সৃষ্টি। গ্রীকের কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব অ্যাকাডেমাস-এর নামে এথেন্স থেকে সামান্য দূরে তরুবীথিতে স্থাপিত প্লেটোর দর্শনের স্কুলটির নাম ছিল একাডেমি নামে। এরপর তো সারা পৃথিবী জুড়ে হাজার হাজর একাডেমি স্থাপিত হয়েছে।

প্লেটোর একাডেমির সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি ছিল অ্যারিস্টটল যিনি প্রায় বিশ বছর প্লেটোর একাডেমির ছাত্র ছিলেন। যদিও অ্যারিস্টটল এথেন্সের অধিবাসী ছিলেন না তিনি জম্মেছিলেন মেসিডোনিয়ায়। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণেই বেশি উৎসাহী ছিলেন তিনি। তিনি কেবল গ্রীসের শেষ মহান দার্শনিকই ছিলেন না, ছিলেন ইউরোপের প্রথম মহান জীববিজ্ঞানী।

গার্ডার শুধু প্রকৃতি, নিয়তিবাদ, চিকিৎসাবিদ্যা কিংবা বাস্তববাদিতা নিয়েই থাকেন নি। একে একে যুক্তিবিদ্যা, নীতিবিদ্যা, রাজনীতি, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান, মরমীবাদ, নব্য-প্লেটোবাদ ইত্যাদি বিষয়াদি নিয়ে দার্শনিকতার আলোকে তুলে ধরেছেন। এভাবে ক্রমান্বয়ে ‘বিরাগী’ দর্শনের জনক অ্যান্টিস্থেনিস, ‘মানবতাবাদ’ ধারণার জনক সিসেরো কিংবা সেনেকা, আর আনন্দবাদের এরিসটিপাস এবং এপিকিউরাসের ধারণা তুলে ধরেছেন। আমরা আরো দেখতে পাই ধর্মের আলোকে দার্শনিকতা কেমন পরিবর্তিত হচ্ছে।

দার্শনিকতার ইতিহাস কেবল প্রাচীন যুগেই থেমে থাকেনি। ধীরে ধীরে মধ্যযুগে প্রবেশ করে ইউরোপীয় রেনেসাঁস-এ মিলে যায়। রেনেসাঁ-র অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন মার্সিলিও ফিসিনো, যিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের ছদ্মবেশধারী হে স্বর্গীয় বংশ, নিজেকে জানো!’ আরেকজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন পিকা দেলা মিরান্দোলা। তিনি লিখেছিলেন মানুষের সন্মান সংক্রান্ত বক্তৃতা, যা ছিল মধ্যযুগে একটি অভাবিত বিষয়। এভাবে পরপর কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, কেপলার, নিউটন, মার্টিন লুথার, ইরাজমাস, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ দিয়ে মধ্যযুগের দার্শনিকতার পাঠ তুলে ধরেছেন।

রেনে দেকার্ত বিশ্বাস করতেন কোন কিছুকে পরিষ্কার ও আলাদাভাবে ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত আমরা সেটাকে সত্য বলে মেনে নিতে পারি না। অন্যদিকে বারুচ স্পিনোজা ছিলেন ধর্মবিরোধী। তিনি মনে করতেন খ্রিস্ট আর ইহুদি ধর্মকে টিকিয়ে রেখেছে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান। ইংরেজ দার্শনিক জন লক দুটো প্রশ্ন করেছেন; প্রথমত, আমরা আমাদের ধারণাগুলো কোথা থেকে পাই, আর দ্বিতীয়ত, আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো আমাদেরকে যে সব তথ্য দেয় সে সবের ওপর আমরা ভরসা করতে পারি কিনা। মূলত লক আমাদের ভাবনার জগতে করাঘাত করেছেন যে, আমাদের মন কী ‘টেবুলা রাশা’ বা শূন্য স্লেট নাকি চারপাশের জগৎটাকে দেখি, শুনি, গন্ধ নিই, স্বাদ নিই, স্পর্শ করি। লক যাকে ‘ইন্দ্রিয়ের সরল ধারণা বলেছেন’। আস্তে আস্তে আমরা ডেভিড হিউম, ইমানুয়েল কান্ট, বার্কলে, ভলতেয়ার, রুশো, মঁতেস্কু, কন্ডর্সেট প্রমুখ ফরাসী ও ইউরোপীয় দার্শনিকের আলোকপ্রাপ্ত ও নারীবাদ নিয়ে মতামত জানতে পারি।

রোমান্টিকতা ও যে দার্শনিকতায় মিলানো যায় তা দেখিয়েছেন কান্ট আর জার্মান কবি শিলার আর তার সাথে যুক্ত হয়েছিল বেঠেভেনের সঙ্গীত। আর ইংরেজ রোমান্টিক কবি বায়রন, শেলি আর কোলারিজের ফ্যান্টাসি। যদিও আঠারশো সালের রোমান্টিক আন্দোলনকে পরবর্তী একশো পঞ্চাশ বছর পরের হিপ্পিদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিল। বল হতো, ‘আলস্যই হচ্ছে প্রতিভাধরের আদর্শ, শ্রমবিমুখতা রোমান্টিকের গুন।’ অন্যদিকে গ্যেটে রোমান্টিক ভালোবাসা বাদ দিয়ে প্রতিদানহীন ভালোবাসার প্রচলন করেন। এভাবেই আমাদের অনুভূতি নিয়ে দার্শনিকতার খেলা দেখিয়েছেন কালে কালে দার্শনিকেরা। হেগেল, লাইবনিজ, কিয়ের্কেগার্ডরা ছিলেন বিপরীত মেরুতে।

কম্যুনিজম আর পুঁজিবাদ নিয়ে কার্ল মার্ক্সের চিন্তাধারা থেকে ডারউইনের বিবর্তনবাদ কি নিয়ে আলোচনা করেন নি সোফির সাথে তার শিক্ষক। একজন আলবার্টো নক্স সদ্য কৈশোরে পা দেয়া সোফিকে ঘুরিয়ে এনেছেন দর্শন রাজ্য থেকে যাতে সিগমন্ড ফ্রয়েডের একেশ্বরবাদ, জাঁ-পল সার্ত্রে আর সিমন দ্য বুভোয়ার অস্তিত্ববাদ কোন কিছুই বাদ যায় নি।

‘সোফির জগৎ’ যতখানি না উপন্যাস তার চেয়ে বেশি দর্শনের প্রামাণ্য দলিল। মন জগৎ- এর খেলা নক্স কখনো নিজে, কখনো সোফির পোষা কুকুর হার্মেসের মাধ্যমে চিঠি দিয়ে উন্মোচন করেছেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা অতীত আর বর্তমানকে আলাদা করতে পারে না। দর্শনগত প্রহেলিকায় আটকে যায়। উপন্যাসের আদলে আমাদের মন জগৎ-কে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। গ্রীক বৈজ্ঞানিক আর্কিমিডিসের ভাষায় বলতে পারি, ‘দাঁড়াবার মতো একটা শক্ত জায়গা শুধু দাও আমাকে, পৃথিবীটাকে নাড়িয়ে দিচ্ছি আমি’। হ্যাঁ, ইয়স্তেন গার্ডার ‘সোফির জগৎ’ তথা আমাদের চিন্তার ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিয়েছেন।

রুবু মুন্নাফ
দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা।