ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

বইয়ের মলাটে যদি বিশেষণটি না দেয়া থাকত বোধকরি এটা যে লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ তা বুঝা দুষ্কর হত। কেননা মাওলা ব্রাদার্স কথাসাহিত্যে নবীন লেখকদের জন্য পুরস্কার ও বই প্রকাশের ব্যবস্থা করে আসছে। ‘কয়েকটি বিহবল গল্প’ ডা. শাহাদুজ্জামানের প্রথম গল্পগ্রন্থ। বইটিতে চৌদ্দটি গল্প স্থান পেয়েছে। বাংলা সাহিত্যে একজন শক্তিশালী লেখকের আগমনী বার্তা এই বইটি। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে আমরা ‘একজন কমলালেবু’ কিংবা ‘ক্রাচের কর্নেল’ এর মতো কালজয়ী বই উপহার পেয়েছি।

‘এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প’ দিয়ে বইটি শুরু হয়। যেখানে মানুষ স্বপ্নের জাল বুনে কিন্তু জানে না সে জাল ছিড়ে একদিন সবাইকে চলে যেতে হয়। মাটি চায় কাঁঠাল পাতাকে আকড়ে ধরতে আর কাঁঠাল পাতা চায় মাটিকে ছায়া দিতে। কিন্তু নিদারুণ ঝড় তাদের দুজনকেই উপড়ে ফেলে দেয়। আসল সত্যি হলো কেউ কাউকে চিরদিন ধরে রাখতে পারে না।

‘অগল্প’ নামক গল্পটি মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র তুলে ধরেছে। আর সবচেয়ে বাহবা পাবার যোগ্য ‘মৌলিক’ গল্পটি। মানুষের ক্ষুধার চাহিদা যে কী ভয়ানক হতে পারে তা তুলে ধরেছেন। লাজ-লজ্জা ভুলে গিয়ে সবাই যে এক কাতারে দাঁড়াতে পারে সে ক্ষুধার জন্য। মানুষের যৌনতার চেয়েও যে ক্ষুধা সত্য তা অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।

 

 

‘ক্যালাইডোস্কোপ’ গল্পে মানুষের লোভের চিত্র ফুটে উঠেছে। আমরা হয়তো অনেকেই ভুলতে বসেছি ডোডো নামের একটি পাখি ছিল। ‘ডোডো পাখির জন্য নস্টালজিয়া’ আদতে আমাদের হারাতে বসা পাখ-পাখালির আখ্যান। ‘হারুনের মঙ্গল হোক’ গল্পটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর চপেটাঘাত। চাকুরী হারানোর ভয়ে তটস্থ হারুন নামক যুবক তার বিবাহিত নববধূর সাথে সঙ্গমের অনীহা কী নিদারুণভাবে তুলে ধরেছেন!

সেনাবাহিনীতে প্রবেশ করে এক যুবকের চিঠির আদলে তার মা, বন্ধু এবং প্রেমিকার কাছে বয়ান হলো ‘মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া।’ যেখানে প্রবেশিকা পর্বের দুঃখ-কষ্ট মাতার কাছে তুলে ধরেছেন। সেই নাজুক যুবকই আবার দেশমাতৃকার জন্য জীবন বাজী ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

‘ক্ষত যত ক্ষতি তত’ গল্প পড়ে আমি নির্বাক বসে রই। কেননা লেখক সম্ভবত ভবিষৎ দেখতে পান কিংবা অনুধাবন করতে পারেন। আমরা রূপার ধর্ষিত হওয়ার পর হত্যার ঘটনা এখনো অবাক হয়ে ভাবি। কেউ কেউ যে পৃথিবীকে পাল্টে দেবার জেদ ধরে তা আমরা ‘জ্যোৎস্নালোকের সংবাদ’ গল্পে দেখতে পাই। লেখক সর্বহারাদের নিয়ে লিখতে চেয়েছেন সম্ভবত। আবার নারী মনের বিচিত্র খেয়ালের কথাও এই গল্পে উঠে আসে। যেখানে নম্রতার চেয়ে কাঠিন্যকেই নারী ভালোবাসতে চেয়েছিল।

‘স্যুট টাই অথবা নক্ষত্রের দোষ’ আটপৌরে চাকুরীজীবির কথোপকথন। অন্যদিকে ‘কারা যেন বলছে’ তে লেখক আমাদের নষ্ট রাজনীতির কথাই বলেছেন। অতঃপর ‘কতিপয় ভাবুক’, ‘কিছু শিরনামা’, এবং ‘মারাত্মক নিরুপম আনন্দ’ গল্পগুলো এগিয়ে যায়।

সাধুবাদ জানাতে হয় লেখককে অত্যন্ত নিপুণহাতে গল্প বুননের জন্য। বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে হয় রাইসা তাসনুভা ম্যাডামকে, তার চমৎকার উপহারের জন্য। সর্বোপরি বলা যায় ‘কয়েকটি বিহবল গল্প’ একটি সুখপাঠ্য বই।

রুবু মুন্নাফ
দক্ষিণ বনশ্রী, ঢাকা।