ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীর যৌন পেশায় আসার একটি কারণই হচ্ছে যে, নিজেদের পেটের দায় মেটানো। আর এদের অধিকাংশই হলো গরীব। তবে বর্তমানে মধ্য ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীর অনেক নারীই এ পেশায় জড়িত হয়ে পড়ছে অতিরিক্ত অর্থ লাভের আশায়। তাই যৌন পেশা একসময় নিম্নবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ব থাকলেও এখন তা উচ্চবিত্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে।

41

যৌনজীবীর সংজ্ঞা 

যারা যৌন কর্মের বিনিময়ে অর্থ উপার্জন করে তাদের সাধারণভাবে যৌনজীবী বলা হয়। অনেক স্থানে একাডেমিক টার্ম হিসেবে যৌনকর্মী (Sex Worker) শব্দটি ব্যবহার করা হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতিতে এই শব্দার্থটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সাধারন বাংলা ভাষার মত অন্যান্য স্থানেও এদের পতিতা (Prostitute) বলা হয়। তাই এখানে যৌনকর্মী বা পতিতা বিতর্কে না বলে মাঝামাঝি শব্দ যৌনজীবী বলা হলো।

পতি অর্থ পুরুষ ও পতিতা অর্থ নারী। এই অর্থটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে আমার কিছুই বলার থাকত না। পতি স্বামী বা পরিবারের প্রধানকে বোঝান হয়েছে কিন্তু পতিতা নারী হলেও সে নারী আর দশটা নারীর মত নয়, তার আছে অনেক দোষ, সে পয়সার বিনিময়ে শরীর বিক্রি করে বা ভাল করে বলতে গেলে বলতে হয় যৌন সুখের ফেরীওয়ালী। পতি পদবাচ্যে যেমন সমস্ত পুরুষ মানুষকেই বোঝানো হয় ঠিক তেমনি নারী মাত্রই পতিতা। পুরুষ ও নারীর পরস্পরের প্রতি যে আশক্তি তা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির অর্ন্তরভুক্ত।

ঐ শরীরটা কিনছে কারা, কি তাদের পরিচয় তারা অবশ্যই পুরুষ। এই পুরুষ গুলিকে আপনি কি বলবেন বা কি নামে ডাকবেন? আমার এই জীবনের অভিজ্ঞতায় আমি এমন একটি পুরুষও দেখিনি, যে সুযোগ পেলে নারী ব্যবহার থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে এই ব্যবহার বলতে শুধুই যে যৌনতা তা বলা হয়নি, কেউ পেছন থেকে সুন্দরী নারী কিংবা স্কুল কলেজ পড়ুয়া মেয়েদের কুদৃষ্টি দেয়, এটাও কি সেই পর্যায়ে পড়ে না। সুন্দরকে দেখে সৃষ্টির শুকরিয়া আদায় করেছে? আমার মনে হয় .৫% পুরুষ শুকরিয়া করে কি না সন্দেহ আছে।

আবার অন্য দিকে এই চিত্রটি কত সুন্দর…যেসব মেয়েরা সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে দেহ বিক্রি করে সমাজ তাঁদের বলে পতিতা । অপরদিকে, যেসব মেয়েরা হাজার টাকার বিনিময়ে লুকিয়ে দেহ বিক্রি করে সমাজ তাদের বলে সোসাইটি গার্ল । যারা আর একটু বেশী দামে দেহ বিক্রি করে সমাজ তাদের বলে পার্টি গার্ল ।

আর সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে তথাকথিত শিক্ষিত মেয়েরা যখন রাস্তা দিয়ে দেহ দেখিয়ে-দেখিয়ে হাঁটে TSC,NSU, KFC, ধানমণ্ডি লেকে বয়ফ্রেন্ডের কোলে বসে আড্ডা দেয়, মাঝে মাঝে টিপ খায় (কপালের টিপ না), কিস খায় এবং মাঝে মাঝে সেই বয়ফ্রেন্ডের সাথে লিটনের ফ্ল্যাটে যায়, পয়লা বৈশাখে লাল-সাদা শাড়ী পড়ে হাজারটা ছেলের সাথে ঢলাঢলি করে, পান্তা খায়, আর রিক্সায় হুড তুলে দিয়ে টিপ খায় (একবার কিন্তু কইছি যে এটা কপালের টিপ না), আবার বলে আমরা শুধুই ফ্রেন্ড! সমাজ তখন তাঁদের বলে আধুনিক মেয়ে !

দেহ ব্যবসায় যারা শুধুমাত্র পেটের দায় করে বা জোরপূর্বক তাদের করানো হয়, তারাই বেশ্যা বলে আখ্যায়িত। কিন্তু কেন? তাঁদের এত টাকা-পয়সা,পাওয়ার নেই বলে ? থুতু মারি সুশীলদের এই দ্বৈত নীতিকে । যারা পেটের দায়ে এই ঘৃণ্য কাজটি করে তাঁদেরকে আমি পতিতা বলি না, আমি পতিতা বলি তাদেরকে যারা অর্থ বা কাজের লোভে পর পুরুষের সামনে বিবস্ত্র হতে দ্বিতীয় বার ভাবে না ।

ওরা ও ভালোবাসা চায়। ওরা ও মানুষ। ওদের কে আমরা ঘৃণা করি। আমাদের সমাজে ওদের জন্য তিল মাত্র জায়গা আমরা রাখতে চাই না। ওরা পাপী। ওরা আমাদের কাছে ঘৃণিত। আমরা ওদের দেখে থুথু দেই। বেশ্যা কিংবা ছিনাল বলে সম্বোধন করি। ওদের কে আমরা পিছন থেকে মাগী এবং কি আরও ভাষা যদি থাকতো তাই বলে ডাকা হতো। কিন্তু কেন? আমরা ওদের বাইরের দিকটা দেখে এত মন্তব্য করি, কিন্তু আমরা কি কখনও ওদের বুকে জমিয়ে রাখা দুঃখ গুলু অনুভব করার চেষ্টা করেছি। সস্তা মেকাবে ওরা ওদের ঢেকে রাখে। ওরা যেখানে বাস করে আমরা সেটাকে পাড়া বলি। নটি পাড়া, মাগী পাড়া, পতিতালয় ।

“I am not a prostitute”, এমন করে যে মেয়ে উচ্চস্বরে বলতে পারে সে কি ইচ্ছে করে এই অন্ধাকারে এসেছে? কখনোই নয় তাকে বাধ্য করা হয়েছে। পুরুষ শাসিত সমাজে কিছু হায়েনা আছে তাদের জন্যই আজ সমাজ ধবংসের পথে। সেই মেয়েটির ভাষ্য, “আমি English Medium এর ছাত্রী।  আমি একটা ছেলেকে ভালবাসতাম। ছেলেটা আমার জন্য অনেক কিছু করতে চেয়েছিল বলে আমি জানতাম। কিন্তু প্রেমের নামে সে আমাকে ধোকা দিয়েছে। আমার বাবা একজন বড় ব্যবসায়ি ব্যক্তি। আমি সবার অজান্তে এক সময় ছেলেটাকে বিয়ে করি। বিয়ের পর সে আমাকে নিয়ে বেরাতে নিয়ে গিয়ে আমাকে একটা লোক এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেদিন সন্ধার পর আমি তাকে আর খুজে পায়নি। আমার সাথে সে দেখা না করে আমাকে রেখে চলে আসে। তারপর থেকেই আমি এখানে (পতিতালয়)।’’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পতিতা কবিতার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো তিনি কি বলেছেন দেখুন। দেবতারা কি কখনো ঘুমায় ? তিনি তো দেবতা ঘুমালেই বলেছেন তাদের জন্য রাত্রিটা। আরও বলেছেন বিনিময় কি শুধুই কর্মটাকে বলা যায় ?

পতিতা
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ধন্য তোমারে হে রাজমন্ত্রী,
চরণপদ্মে নমস্কার।
লও ফিরে তব স্বর্ণমুদ্রা,
লও ফিরে তব পুরস্কার।
ঋষ্যশৃঙ্গ ঋষিরে ভুলাতে
পাঠাইলে বনে যে কয়জনা
সাজায়ে যতনে ভূষণে রতনে,
আমি তারি এক বারাঙ্গনা।
দেবতা ঘুমালে আমাদের দিন,
দেবতা জাগিলে মোদের রাতি–
ধরার নরক-সিংহদুয়ারে
জ্বালাই আমরা সন্ধ্যাবাতি।

বেশ্যা শব্দটি শুনলেই আমরা মুখ বাকাঁয় ছিঃছিঃ করি। কোন মেয়ে যদি অন্যায় কিছু করে তখন তাকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে নিজের রাগ মেটায়। ব্যভিচারের সংজ্ঞা কি? সামাজিক স্বীকৃত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে কারো সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন। বেশ্যাবৃত্তি কি কোনো সামাজিক সম্পর্কের পর্যায়ে পড়ে? বেশ্যাবৃত্তি কি ব্যাভিচারের বাইরের কোনো নিয়ম? মক্কা-মদিনায় কি সে সময়ে বেশ্যাবৃত্তি প্রচলিত ছিলো? ইসলামে কি পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধ নয়? লালনের গান মনে পড়লো,

গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়,
তার জাতের কি ক্ষতি হয়।

নজরুলের একটি দু’ চারটি পংক্তি স্মরণ করি….

“স্বর্গবেশ্যা ঘৃতাচী পুত্র হল মহাবীর দ্রোন,
কুমারীর ছেলে বিশ্ব-পূজ্য কৃষ্ণ দ্বেপায়ন,
কানীন পুত্র কর্ণ হইল দানবীর মহারথী,
স্বর্গ হইতে পতিতা গঙ্গা শিবেবে পেলেন পতি,”

ভারতীয় মন্দির গুলোতে এক সময় পতিতাবৃত্তির করানো হতো মেয়েদের প্রায় জোর করেই । অতীপ্রাচীন কালথেকেই ভারতে দেবদাসী প্রথার প্রচলন ছিল । এই সময় বিভিন্ন গগ্রাম থেকে সুন্দরী মেয়েদের ধরে এনে দেবতার সাথে বিবাহ দেওয়া হতো । এই সময় তাদের এই মন্দিরেই থাকতে হতো । এই সময় মন্দিরের পুরোহিত এবং স্থানীয় ধনীক সম্প্রদায় এই সকল দেব দাসীদের সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত হতো ।এর উপরে ভিত্তি করেই বৎসন্যায়ের কামসূত্র প্রথম রচিত হয়েছিল।

নারী দেহ, নারী যৌনতা এবং মানবজাতির যৌনতা সাধারণ ভাবে বলতে গেলে নেতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করার কথা না। স্বভাবগত কোন কারণে নয়, অভাবের তাড়নায় পতিতাবৃত্তি করা হয়। এই দেশে যদি পতিাতদের কোন প্রয়োজন না থাকতো তবে অনেক আগেই পতিতাবৃত্তিবন্ধ হয়ে যেতো । বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তিকে বৈধতা দেওয়া হয়েচে, তবে এখন পর্যন্ত এর সামাজিক স্বীকৃতি বাংলাদেশে দেওয়া হয় নি । এদের কোন ভোটাধিকার নেই । এদের পেশাকে জাতীয় পরিচয় পত্রে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয় হয় নি। কলগার্লরা পতিতালয় নির্ভর নয়। তারা চলমান এবং অদৃশ্য। দেখা যায়, কিন্তু জানা যায় না। ঢাকার কলগার্ল বিজনেস খুবই সুসংগঠিত। এ পেশাটি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের নেটওয়ার্কও শক্তিশালী।

যে কারনে নারীরা এই পেশায় আসে:

– নিতান্তই পেটের দায়ে
– ভালো চাকরীর প্রলোভনে প্রতারিত হয়ে
– প্রেম বা বিয়ের মিথ্যে আশ্বাসে পুরুষ সঙ্গী কতৃর্ক প্রতারিত হয়ে
– ব্ল্যাক মেইলড হয়ে
– সংসারের বাড়তি খরচ সামাল দেবার জন্য
– নিজের বাড়তি হাতখরচ মেটানোর জন্য
– প্রেমে ব্যর্থতা কিংবা মানসিক হতাশার জন্য (?)
– সময় কাটানোর জন্য
– নেশার খরচ যোগাবার জন্য
– যৌনতা/ বহুগামীতা উপভোগ করার জন্য

কারা এই পেশায় আসে:

– গ্রামের সহজ সরল কিশোরী
– গ্রামের বিধবা
– গার্মেন্টস কর্মী
– শহরের রাস্তা ও উদ্যান ভিত্তিক মহিলা (বিশেষত: কিশোরী) হকার
– বাসা বাড়ীর কাজের ছুটা বুয়া
– ছাত্রী (স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের)
– নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ঘরের গৃহবধূ
– ফিল্ম বা মিডিয়া লাইন সম্পর্কে উচ্চাকাঙ্খী সহজ সরল রমনী

যৌনজীবীদের খদ্দের

 

যৌনকাজ করার জন্য যারাই যৌনজীবীদের দ্বারস্থ হয় তারাই খদ্দের। তারা সাধারনত পুরুষ। নিদির্ষ্ট কোন পেশাজীবী নয় তারা। তারপরও যৌনজীবীদের মতানুসারে যারা সাধারনত বেশী পরিমানে খদ্দের হয় তারা হলোঃ

১. রিক্সাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, হকার, গার্মেন্টস শ্রমিক।
২. গাড়ী-ট্রাক-বাস ড্রাইভার।
৩. স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
৪. মাদকাসক্ত ব্যাক্তি।
৫. শিল্প-সংস্কৃতিক/ মিডিয়ার লোকজন।
৬. স্থানীয় মাস্তান।
৭. আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যবৃন্দ ইত্যাদি।

শেষ দুই দল সাধারনত বিনামূল্যে যৌনসেবা পেয়ে থাকে।

যে কারনে যৌনজীবীরা সহজে তাদের পেশা ছাড়ে না

 যৌনজীবীরা মূলত কাঁচা অর্থ এবং স্বল্প পরিশ্রমে বেশী অর্থ পাবার ফলে তারা এ পেশা সহজে ছাড়তে চায় না। নিম্নে কয়েকটি কারণ দেয়া হলোঃ

১. যৌনজীবীরা মূলত পেশা ছাড়ে না কাঁচা অর্থের ব্যপক ছড়াছড়ির জন্য।

২. একবার যখন নষ্ট হয়েই গেছি তখন আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবো না। (তাদের মতামত অনুযায়ী)

৩. ফিরে গেলে বাবা-মা/পরিবার গ্রহণ করবে না।

৪. ফিরে গেলে সমাজে টিকে থাকা যাবে না।

৫. প্রতিদিন নতুন নগ্নতা ও নতুন যৌন বৈচিত্রের নেশায়।

১৮৬৪ সালে ঢাকা প্রকাশিত পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন উদ্ধিত হয়েছে,”ঢাকায় ক্রমে ক্রমে বেশ্যার সংখ্যা অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিয়াছে বিগত ১০ বত্‍সর পূর্বে এখানে যে পরিমান ছিল এক্ষনে তাহার চুর্তগুন বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিলে অত্যুক্তি হয় না।সদর রাস্তার উভয় পার্শ্বের উত্তম উত্তম যে সকল একতালা ও দোতালা দালান আছে তাহার সমুদয়ই প্রায় বেশ্যাপূর্ণ হইয়াছে।” আর এখন টঙ্গী থেকে আজীমপুর পর্যন্ত হাজারটা পতিতাপল্লী।চলুন হিসেব নিয়ে আসি ময়মনসিংহের ১৯১২ সালে প্রকাশিত বিসি এলেনের ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারঃ ঢাকাতে উল্লেখ্য করা হয়েছে ঢাকা শহরের সব বাজারেই গণিকা পাওয়া যাবে এবং তা উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক তবে তা ময়মনসিংহ জেলার মত এত প্রকট নয় ১৯০১ সালে মাত্র ২ হাজার ১শ ৬৪ জন এ ধরনের মহিলা ছিলেন। ৪ লাক্ষ ৮৭ জন নারী লিপ্সু পুরুষের বিপরীতে।পুঁজিবাদ নিজেই পুরুষতান্ত্রিক তাঁর আর তাঁর কাছে সব ই পন্য বিদ্যা বুদ্ধি জ্ঞান বিবেক আবেগ তাই পুরুষের গোপন কামনা চরিতার্থের নিমিত্তে পতিতাবৃত্তি সমাজে লালন করা হতো কিন্তু প্রকাশ্যে এই পেশাকে ধিক্কার জানায় সবাই।

অর্থের বিনিময়ে যৌনতা বিক্রির ইতিহাস সুপ্রাচীন। ওয়েবস্টার অভিধান মতে, সুমেরিয়ানদের মধ্যেই প্রথম পবিত্র পতিতার দেখা মেলে। প্রাচীন গ্রন্থাদিসূত্রে, যেমন ইতিহাসের জনক হিসেবে খ্যাত হিরোডেটাস (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৪-খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০/২০)-এর লেখায় এই পবিত্র পতিতাবৃত্তির বহু নমুনা পাওয়া যায়, যেটি প্রথম শুরু হয়েছিল ব্যাবিলনে। সেখানে প্রত্যেক নারীকে বছরে অন্তত একবার করে যৌনতা, উর্বরতা ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে যেতে হতো এবং সেবাশুশ্রূষার নমুনা হিসেবে একজন বিদেশীর সাথে নামমাত্র মূল্যে যৌনসঙ্গম করতে হতো। একই ধরনের পতিতাবৃত্তির চর্চা হতো সাইপ্রাস এবং করিন্থেও। এটি বিস্তৃত হয়েছিল সার্দিনিয়া এবং কিছু ফিনিশীয় সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে ইস্টার দেবতার সম্মানে। ফিনিশীয়দের মাধ্যমে ক্রমশ এটি ভূমধ্যসাগরের অন্যান্য বন্দর শহরগুলোতেও সংক্রমিত হয়, যেমন সিসিলি, ক্রটন, রোসানো ভাগলিও, সিক্কা ভেনেরিয়া এবং অন্যান্য শহরে। এক্ষেত্রে অনুমান করা হয় এশিয়া মাইনর, লাইদিয়া, সিরিয়া ও এট্রাকসনের নামও। ইসরায়েলে এটি একটি সাধারণ ব্যাপার ছিল, যদিও কয়েকজন প্রফেট, যেমন ইজাকেইল, এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সমাজে পতিতারা ছিল স্বাধীন এবং তারা বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করা ও কর দেবার ব্যাপারে আদিষ্ট ছিল। গ্রিক হেটায়েরার মতো জাপানে ছিল জেইসার।

কৌটিল্যের “অর্থশাস্ত্র” থেকে পতিতা ও পতিতাবৃত্তি সংক্রান্ত ভারতবর্ষীয় চিত্র পাওয়া যায়। কী বলছে অর্থশাস্ত্র ? অর্থশাস্ত্র বলছে দেহব্যাবসা একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা। পুরোপুরি ঘৃণিত বা গোপনীয় নয়। কৌটিল্যের সময় দেহব্যাবসা শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয় বলে জানা যায়, যে শিল্পের নাম ছিল বৈশিক কলা। বিশেষজ্ঞরা এ শিল্পের চর্চা করতেন এবং শিক্ষা দিতেন। অর্থশাস্ত্রে, এমনকি গণিকাধ্যক্ষেরও উল্লেখ আছে। তাঁর কাজ ছিল রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে গণিকাদের সংগঠিত ও দেখভাল করা।

পাশ্চাত্য সভ্যতার জতুগৃহ প্রাচীন গ্রিকের এথেনাইয়ের কবি সোলোন , যিনি তৎকালীন গ্রিকের সাতজন জ্ঞানী লোকের একজন হিসেবে গণ্য হতেন, খ্রিষ্টপূর্ব ছয় শতকে এথেন্সে প্রথম পতিতালয় স্থাপন করেন। এই পতিতালয়ের উপার্জন দিয়ে আফ্রোদিতিকে নিবেদন করে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। মধ্যযুগে ইউরোপে ব্যাপকভাবে পতিতাবৃত্তি ছড়িয়ে পড়ে এবং পৌরসভার মাধ্যমে পতিতালয়সমূহ পরিচালিত হতে থাকে।প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিক মেগান্থিনিস এক ধরনের পরিদর্শকের কথা বলেছেন, যারা রাজ্যের সকল কার্যক্রমের ওপর গণিকাদের সহায়তায় নজর রাখতেন এবং রাজার কাছে গোপন রিপোর্ট দিতেন।

অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এর এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ৪৯.১০ শতাংশ যৌনকর্মী এ পেশায় এসেছেন সীমাহীন দারিদ্র্যের নিষ্পেষণের কারণে, ২১.৫৬ শতাংশ এসেছেন পারিবারিক ডামাডোলের শিকার হয়ে, ১৫.৫৬ শতাংশ অন্য জীবিকার মিথ্যা আশার হাতছানিতে, ৮.৬৭ শতাংশ জেনেশুনে স্বেচ্ছায় এসেছেন এবং বলপূর্বক ধরে এনে এ ব্যাবসায় লাগানো হয়েছে ০.৪৪ শতাংশকে। যারা মনে করেন যৌনকর্মীরা কেবল বংশপরম্পরায়ই এ পেশায় আসে, তাদের জন্য এই তথ্যটি দেওয়া যায় যে কলকাতার মোট যৌনকর্মীর মধ্যে সে হার মাত্র ৪.৬৭ শতাংশ।

পাশাপাশি কৌতূহলী পাঠকদের জন্য এখানে আরেকটি চিত্র তুলে ধরা যায়, যে-চিত্রটি ধারণা দেবে যে এদের এ পেশায় আসার মাধ্যম কারা। এসব যৌনকর্মীর ৬০.৬৭ শতাংশই এ পেশায় এসেছেন বন্ধু ও প্রেমিকের প্রতারণার শিকার হওয়ার মাধ্যমে, ৭.১১ শতাংশ দালালদের মাধ্যমে, ৭.৩৩ শতাংশ দালালদের দ্বারা বিক্রিত হয়ে, ৪ শতাংশ আত্মীয়দের মাধ্যমে, ২.২২ শতাংশ আত্মীয়দের দ্বারা বিক্রিত হয়ে এবং নিরুপায় হয়ে নিজেরাই এ পেশায় আত্মসমর্পণ করেছে ১৮.৬৭ শতাংশ। এইসব যৌনকর্মীদের ক্রেতা কারা ? সবাই, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। এক আলাপে জানা গেছে, রাজনীতিক-নেতা, অভিনেতা, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশেষ বাহিনী, কোনো টক শোয়ে যৌনকর্মের বিরুদ্ধে লম্বা লম্বা লেকচার মারা ব্যক্তিত্ব, উর্দি-পরিহিত পুলিশসহ সমাজের কথিত অভিজাত থেকে নিচুতলার সব শ্রেণির মানুষই এখানকার নিত্য অতিথি, খরিদ্দার, বাঁধা-বাবু।যৌন-ব্যাবসায় জড়িত এমন অনেক মেয়েও পতিতা প্রথার পক্ষে কথা বলছেন। তারা বলছেন, ‘অন্য যে-কোনো শ্রমের মতো বেশ্যাবৃত্তিও শ্রম’। আরও এক ধাপ এগিয়ে কেউ কেউ বলছেন, এই শ্রম নাকি সমাজে মেয়েদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করছে।

বর্তমানের নিউ অফিসিয়াল ডাটা মতে, ব্রিটেনের ইকোনোমিতে পতিতা বৃদ্ধি ও এসকর্ট সার্ভিসের মাধ্যমে বছরে ৫বিলিয়নের উপরে রাজস্ব সংগৃহীত হয়ে থাকে বা যোগান দিয়ে চলে। এ হিসেব খোদ ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক ব্যুরো এবং একজন প্রোস্টিটিউট ব্যবসায়ের সাবেক কর্তা ব্যক্তি নিজে বর্তমানে একজন ডক্টরেট ডিগ্রীধারী-সেই ডঃ ব্রোক ম্যাগন্যান্টির তথ্য মতেই প্রকাশিত হয়েছে আনুষ্ঠানিক ডাটা।

ডঃ ব্রোক(মিস) এর মতে এই খাতে অর্থাৎ প্রোষ্টিটিউশন এর খাত থেকে ব্রিটেনের ইকোনোমি ৫বিলিয়ন নয়, বরং ১০বিলিয়ন পর্যন্ত আয় করে থাকে। কারণ তিনি বলেছেন, ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক ব্যুরো যাদের ইন্টারভিউ নিয়েছে, ডঃ ব্রোক এর মতে প্রচলিত পতিতা ছাড়াও এসকর্ট সার্ভিস এবং নেদারল্যান্ডস কেন্দ্রিক বা ভিত্তিক পতিতা ব্যবসা এবং বর্ডার কেন্দ্রিক পতিতা ব্যবসাও রয়ে গেছে এই হিসেবের বাইরে। যা থেকে তিনি মনে করেন ১০ বিলিয়ন পর্যন্ত আয় হয়ে থাকে, যা রয়ে গেছে ন্যাশনাল ব্যুরোর হিসেবের ডাটার বাইরে।

পতিতাপ্রথাকে বৈধ করা মানে নারী নির্যাতনকে বৈধ করা। যে রাষ্ট্রে পতিতা প্রথা বৈধ সেই রাষ্ট্র সত্যিকার কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। গণতন্ত্র মানবাধিকার নিশ্চিত করে, নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করে। কোনও সভ্যতা বা কোনও গণতন্ত্র মানুষের উপর নির্যাতনকে ছল-ছুতোয় মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে না। করতে পারে না। যদি করে, সেই গণতন্ত্রের নাম নিতান্তই পুরুষতন্ত্র, আর সেই সভ্যতার নাম বর্বরতা ছাড়া অন্য কিছু নয়”।

পতিতাবৃত্তি বা বেশ্যাবৃত্তিকে রোধ করতে হলে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সরকারকেও এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিকভাবে সকলে মিলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে আশা করা যায় বেশ্যাবৃত্তি বা বেশ্যালয়কে সমাজ থেকে ধ্বংস করা যাবে। লাস ভেগাস, ম্যাকাউয়ের বিখ্যাত বেশ্যালয়গুলি অতীত হয়ে যাক।

তবে জেনে রাখুন  ৯২% যৌনজীবী কোন না কোন যৌন রোগে আক্রান্ত। যার মধ্যে বেশীরভাই মারাত্নক ও দীর্ঘমেয়াদি। বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস ইত্যাদি একজন পেশাদার যৌনজীবীর শরীরকে নিরাপদ পোষক হিসেবে ব্যবহার করে। ক্ষতযুক্ত প্রশস্ত যৌনাঙ্গ যৌনজীবীদের একটা সাধারন বৈশিষ্ট্য। যতই কনডম বা অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়া হোক না কেন এই সকল জীবাণুগুলো অতি উচ্চমাত্রার সংক্রামক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কোন লাভ হয় না।