ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সোনার বাংলাদেশে কি আজও গণতন্ত্র জীবিত? ৭১ যদিও জন্ম হয়েছিল আবার ৭১-ই আমার মনে হয় শেষ হয়ে গেছে। বড় জোর বলা যেতে পারে ৭৪ পর্যন্ত। সেটাও সঠিক নয়। যখন রাজনীতি আর ক্ষমতা নিয়ে লোভ লালসায় আমাদের প্রতিনিধিরা মহরা দিতে শুরু করে তখন থেকেই গণতন্ত্র শেষ বলে আমি মনে করি। খাতা কলমে আমরা গণতন্ত্রীয় বাস্তবতায় আঁধার। রাজনীতির বড় ইচ্ছে ছিল পুরো দেশ নয় অনন্ত নিজের থাকায় ভাল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে পরিচিত করবো। কিন্তু দিনে দিনে রাজনীতির নীতি দেখে মনে হয় আমার মতো অনকেই রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে। আমি প্রধানমন্ত্রী আমি অবসর গ্রহণের পর যদি আমার ছেলে দলের প্রধান হয় নিয়মনীতি ছাড়া তবে কি হলো ? আমরা দেখতেছি যারা আগে রাজনীতি করেছে কিংবা অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছে তাদের ছেলে মেয়েরাই পরবর্তিতে রাজনৈতিক প্রতিনিধি। তৃণমূল পর্যায় থেকে কি আমাদের দেশে কোন সম্ভাবনা আছে যে সে একদিন দেশের প্রধান হবে ? এটা কখনও হবে কি না সেটা বলতে পারছি না, কারন জনগণ পারে না এমন কোন কাজ নেই। জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস। আমাদের দেশে চাটুকার বেশি হয়েছে… নিজেদের পেট ভরা তো তাই অন্যের খবর নেয়ার কোন প্রয়োজন মনে করে না। গণতন্ত্রীয় দেশে জনগণের মতামতের কোন মূল্য নেই।

 g.3

উদোম শরীরে নেমে আসে রাজপথে, বুকে-পিঠ
রৌদ্রের অক্ষরে লেখা অনন্য শ্লোগান,
বীরের মুদ্রায় হাঁটে মিছিলের পুরোভাগে এবং হঠাৎ
শহরে টহলদার ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সীসা
নূর হোসেনের বুক নয় বাংলাদেশের হৃদয়
ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ
বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তার
বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে, ঝরতে থাকে।

— শামসুর রাহমান —

 

সরকারে থাকলে সব আছে, বিরোধী দলে থাকলে কিছুই নেই- এই বৈপরীত্যের কারণে কেউ বিরোধী দলে যেতে চায় না। ক্ষমতায় যাওয়ার এক উদগ্র প্রতিযোগিতায় রাজনীতি থেকে নীতি, নৈতিকতা সব বিলীন-প্রায়। ক্ষমতায় যাওয়ার পর ক্ষমতাসীন দল যে কোনো মূল্যে ক্ষমতাকে ‘তাজমহল’-এর মতো অমর বানিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে বিরোধী দল ক্ষমতা হারানোর পরদিন থেকেই যে কোনো মূল্যে আবার ক্ষমতায় যেতে সব কিছু উজাড় করে দেয়। তাদের সংসদে মন বসে না, আলোচনায় আগ্রহ থাকে না।

কাল মার্কস বলেছিলেন, পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত শোষক আর শোষিত। তিনি বলেছিলেন, ‘শোষিতের হারানোর কিছু নেই, জয় করার জন্য গোটা বিশ্ব।’ ঠিক তেমনি মনে করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো। শোষক আর শোষিত করে কিভাবে ক্ষমতা হাসিল করা যায়। এটাই এখন গণতন্ত্র হয়ে দাড়িয়েছে, যা আমাদের দেশের গুণীজন মনে মনে ভাবেন। এবং ক্ষমতার আদলে তা হাসিলও করেন।

সামাজিক বৈষম্য নিরসন, জনগণের ক্ষমতায়ন, সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গণতন্ত্র রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার পালাবদলের আধুনিক সংস্করণ। বিভিন্ন মনীষী একে সংজ্ঞায়িত করেছেন ভিন্ন ভিন্নভাবে। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো একে আখ্যায়িত করেছেন মুর্খের শাসন হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা পরিচালিত সরকার’ হিসেবে। এছাড়াও গণতন্ত্রের পক্ষে বিপক্ষে নানা রকম বক্তব্য পেশ করেছেন মনীষীরা।

গণতন্ত্র কী?

আমার মতে ‘যে পদ্ধতিতে জনসাধারণের মত সাপেক্ষে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাকেই গনতন্ত্র বলে’। আর গনতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রশাসক থাকলে ঐ রাষ্ট্রকে গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা যায়।

গণতন্ত্র বলতে যদি অধিকাংশ লোকের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা বোঝানো হয়ে থাকে তাহলে আমাদের দেশে নির্বাচিত এমপিদের ক্ষেত্রে সে মতামত কতটা প্রযোজ্য হয়ে থাকে। যেখানে আমাদের দেশের ২৪ শতাংশেরও বেশি লোক দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে, যেখানে আরও কমপক্ষে ২৬ শতাংশ লোক নিম্ন মধ্যবিত্তের অন্তর্ভুক্ত; সেখানে আমাদের দেশে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৬৯ জন ব্যবসার সাথে এবং আরো ৪৪ জন আইন পেশার সাথে জড়িত (রিপোর্ট, প্রথম আলো)/  বলার অপেক্ষা থাকে না যে, এদের সবাই কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির অধিকারী। যদি সত্যিকার গণতন্ত্রই হত তাহলে এমপি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে কিন্তু আমরা দেখতে পাই এখানে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয় উচ্চবিত্ত থেকে। তাই গণতন্ত্র না বলে একে কি আমরা ধনিকতন্ত্র বলতে পারি না?

বইয়ের ভাষায়….

গণতন্ত্র হলো কোন জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোন সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান ভোট বা অধিকার আছে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরীর ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের অংশগ্রহনের সমান সু্যোগ রয়েছে, যা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে। যদিও শব্দটি সাধারণভাবে একটি রাজনৈতিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয় তবে অন্যান্য সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য, যেমন বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিক ইউনিয়ন, রাষ্ট্র-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

আমাদের দেশের গণতন্ত্র সরকার ও জনগণ এ যেন পুতুল খেলা…যে সরকারই আসুক না কেন সবাই তখন গণতন্ত্রের উর্দ্ধে, আর জনগণ পুতুল। আসলে আমরা বাঙালিরা খুব খারাপ, স্বাথের জন্য সব করতে পারি। আপনকে পর আর পরকে আপন করতে একটু সময় খরচ হয় না। তেমনি ক্ষমতায় দেখায় খেলা।

মনে মনে মনকে প্রশ্ন করি সরকার কোথাও নেই ? উত্তরও পেয়ে যাই খুব সহজেই। সরকার জনগণের কাছে নেই, যানজটে নেই, হাসপাতালে নেই, থানায় নেই। সরকার আছে শুধু চাটুকারদের কাছে, স্তাবকদের কাছে। থানায় সাধারণ মানুষ একটা জিডি নিয়ে যাবে, ডিউটি অফিসার দাঁত কেলিয়ে হেসে বিদায় করে দেবে। নেতার চামচা যাবে, চা-কফি খাইয়ে তার কাজ করে দেবে। সর্বত্র একই চিত্র অফিসে, স্কুলে, আদালতে_ সরকার শুধু তার অনুগতদের। যার মন্ত্রী আছে, এমপি আছে, ডাকসাইটে ক্ষমতাসীন দলের নেতা আছে_ তার সব কিছু আছে। জনগণের কিছু নেই। ভোটের পর নেতার চেহারা জনগণ টেলিভিশনের পর্দায় দেখে। আর দেখে আরেক ভোটের আগে। হ্যাঁ নেতারা, এমপিরা এলাকায় যান, আলবৎ যান। সেখানেও গিজ গিজ করে সুবিধাভোগীরা, চাটুকাররা_ জনগণের জায়গা কোথায়?

পরিশেষে বলতে চাই, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য অনেকগুলো শর্ত পূরণ করা জরুরী। যেমন, শিক্ষার আলো প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া, জনগণকে মানবিক প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা ও সমাজের প্রতিটি স্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি যে, দেশে শিক্ষার হার এখনো অনেক কম বর্তমানে যে শিক্ষার হার বাড়াচ্ছে তাকে শিক্ষা বলে না  এগুলো লোক দেখানো বলে। আর দেশকে মেধাশূন্য কিভাবে করা যাবে সেই পায়তারা। নেই সরকারীভাবে মানবিক শিক্ষা দেয়ার কোনো ব্যবস্থা । শুধু তাই নয়, জনগণ যাতে সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে না পারে সেজন্যই যেন সব আয়োজন। কারণ, জনগণকে অজ্ঞতার মধ্যে রাখতে পারলেই রাজনীতিবিদদের স্বার্থদ্ধোর হতে পারে! তাছাড়া যেখানে দলীয় কর্মকাণ্ডেই গণতন্ত্রের কোনো ছোঁয়া নেই, সেখানে তারা কীভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে?

গণতান্ত্রিক এই ব্যবস্থা নিছক প্রহসনের নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি যদি বিদেশি আধিপত্যবাদীদের চাহিদা পূরণ করতে পারেন, যদি পারেন তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। আপনি যদি বৈধ-অবৈধ উপায়ে কালো টাকার অধিকারী হতে পারেন, কিংবা পারেন দেশের প্রখ্যাত কোনো নেতার সন্তান হতে তাহলেই আপনি পারবেন জনপ্রতিনিধি হতে। আপনার মেধা বা সৃজশীলতা কখনোই এখানে নেতৃত্বের মাপকাঠি নয়।

কেউ কেউ বলে থাকেন পাশ্চাত্যেই একমাত্র গণতন্ত্র আছে। গণতন্ত্রের জন্য পাশ্চাত্যই হচ্ছে উত্তম মডেল। কিন্তু আপনি তো আর পাশ্চাত্য হতে পারবেন না। কারণ, আপনার নেই বিপুল ও অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রের অধিকারী সামরিক বাহিনী। আপনি পারবেন না গরিব কোনো দেশকে শোষণ করে তাদের সকল সম্পদ আপনার দেশে নিয়ে আসতে। আপনি পারবেন না তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ করতে। আর সেজন্যই আপনি পারবেন না আদর্শ গণতন্ত্রের মডেল হতে। কারণ শোষণ আপনাকে করতেই হবে। হয়তো নিজ দেশের লোককে, নয়তো ভিনদেশীদেরকে। এটাই গণতন্ত্রের অন্তরালের কথা!

আমাদের মহান রাজনীতিকরা হয়তো কষ্ট পাবেন তবুও বলতে হবে সচেতন বিপন্ন দেশবাসীর কাছে এখন বড় প্রশ্ন চলমান রাজনীতি কী মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে? রাজনীতির অঙ্গন থেকে কী গণতান্ত্রিক আচরণ নির্বাসিত হচ্ছে? প্রতিদিন জনগণের নাম ভাঙ্গিয়ে রাজনীতিকরা আর কত নিজেদের স্বেচ্ছাচার চালিয়ে যাবেন? বিএনপি নেতৃত্ব যেভাবে ক্ষমতায় পৌঁছার সিঁড়ি খুঁজতে অশুভ শক্তিগুলোকে বন্ধু বানিয়ে নিজেকে শক্তিমান করতে চাইছে তাতে দলটির প্রতি জনগণের প্রত্যাশার অপমৃত্যু ঘটছে। বলা হয় অধিক ফলবতী বৃক্ষ বিনীত হয়। তাই নুয়ে আসে ডাল পালা। কিন্তু বিপুল জনসমর্থন বিনীত করতে পারলো না আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে। সুশাসন উপহার দিতে না পারলেও হাম্বরা ভাব থেকে গেল। গণতান্ত্রিক বোধ না থাকায় সরকার দলের নেতা-নেত্রীরা সমালোচনা থেকে পথের দিশা খোঁজার চেষ্টা করলেন না। দলীয় নেত্রী সুযোগ পেলেই স্থান কাল পাত্র বিবেচনা না করেই সমালোচকদের স্থূল শব্দবাণে বিদ্ধ করতে থাকলেন। এসকল আচরণ স্বেচ্ছাতন্ত্র থেকে জন্ম নেয়া। এভাবে রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা এখন টর্নেডোর মত আঘাত করছে। এর আসুরিক তোড়ে গণতন্ত্র ডুবন্ত দশায়। আমরা মনে করি গণতন্ত্র বিপন্ন হলে সবচেয়ে বড় আঘাত সইতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। তাই সীমাবদ্ধ দৃষ্টিতে শুধু সিংহাসনের দিকে তাকালে চলবে না, দেশ এবং দল উভয়ের স্বার্থেই দূরদৃষ্টি নিয়ে তাকাতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে এবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় না আসতে পারলে বা ক্ষমতায় টিকে থাকতে না পারলে সব শেষ হয়ে যাবে না। বরঞ্চ দলের জন্য স্থায়ী লাভ জনগণের আস্থায় ফিরে আসার চেষ্টা করা। প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে হাঁটা ছাড়া সে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়।

সংবিধান বা গণতন্ত্র জনগণের মুক্তির সনদে পরিণত হতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বরং সংবিধান আর গণতন্ত্র ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তারাই নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একে ব্যবহার করে। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সংবিধান সংবিধান করে ১/১১-এর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। বর্তমান সরকার বারবার সংবিধান আর গণতন্ত্রের কথা বলছে। ক্ষমতাসীনদের মুখে সংবিধান আর গণতন্ত্রের কথা শুনলে মানুষ কতটা আশ্বস্ত হয় আর কতটা আতঙ্কিত হয় সেটা নিয়ে গবেষণা হতে পারে।