ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

গতকাল  দুপুরবেলা সিলেট রেলস্টেশনের পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির অপেক্ষা করছিলাম।  হঠাৎ পিছন থেকে ভাইয়া ডাক শুনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখলাম প্রায় ১০-১২ বছরের একটি ছেলে হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে।

ছেলেটির একটি হাতে ব্যাগ থাকায় সে এক হাত পেতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, ভাই ১০০ টাকা দিবেন?

১০০ টাকা শুনে আমি তো অবাক।১০০ টাকায় কাপড়  পাওয়া যায় কি না তাও জানা ছিল না। ৫ টাকা নয়,  ১০ টাকা নয়,  পুরো ১০০ টাকা শুনে আমার চোখ কপালে উঠে এলো। জিজ্ঞাসা করলাম, এতো টাকা দিয়ে কী করবি?

ভাই,  ঈদের কাপড় কিনব। সারা বছর  এই দুইটা ছেঁড়া কাপড় পরতে আর ভাল লাগে না। দেখেন একটা প্যান্ট আর একটা শার্ট  পড়ে আছি।

আমি দেখলাম, প্যান্টটা নিচের দিকে ছেঁড়া আর অনেক ময়লা। শার্টের রঙ হয়ত একসময় সাদা ছিল; মাটি লাগতে লাগতে এখন পুরো গায়ের শার্ট মাটি রঙা হয়ে গেছে।

কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এই বয়সে তো তোমার স্কুলে যাওয়ার কথা। তুমি ভিক্ষা করছ কেন?

ছেলেটা কাতর কন্ঠে বলল, আমি ইচ্ছে করে ভিক্ষা করি না, শুধু দুই বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্যে ভিক্ষা করি।

এটুকু বলে সে চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু আমার কৌতুহল তখনও মেটেনি; ছেলেটার  জীবন সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে হল।

সে হয়তো আমাকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাই আমার কথার উত্তর না দিয়ে  হাঁটতে শুরু করলো। আমিও তার পিছু ছাড়লাম না।হাঁটা শুরু করলাম। বার বার ডেকেও যখন লাভ হলো না তখন একশ টাকা দেওয়ার শর্তে তাকে  রাজি করানো গেল।

ছেলেটি নিজের নাম কী  তা জানে না। একেক জন একেক নামে ডাকতে ডাকতে এখন সবাই  ‘মনু’  বলেই ডাকে।

বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান মনু জানে না তার বাড়ি কোথায় মনে করতে পারে না।  যতটুকু মনে করতে পারে, তার মা সন্তান জন্মদানের সময় মারা গিয়েছিল। তখন তার  বয়স কত তাও বলতে পারলো না মনু।

কিছুদিন যেতেই মনুর বাবা  আরেকটা বিয়ে করে। সৎ মা আসার পর থেকে বাবা মনুর আর কোনো খবর রাখেনা।

মনুর বাবা রিকশা চালানোর পাশাপাশি অবৈধভাবেও টাকা উপার্জন করতো। রাতে মাদক সেবনসহ মাদকের ব্যবসাও করত। একদিন তার বাবাকে পুলিশ অনেক পেটায়। তারপর থেকে মনুর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেকদিন হাসপাতালে থাকার পর তার বাবাও মারা যায়।

বাবার মৃত্যুর খবর শুনে  সৎ মা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং নিজের বাপের বাড়ি চলে যায়।

একা মনু আত্নীয়স্বজনদের বাসায় আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু সেখানে জায়গা হয় না তার।  অনেকদিন নিজের নানা বাড়ি থেকেছিল। তবে মাদকসেবীর ছেলে বলে মামী তাকে পছন্দ করতো না।

প্রতিদিন মামীর খোঁটা শুনতে হতো মনুকে। তারপর একদিন রাগ করে অন্য ছেলেদের সঙ্গে একটা রেল স্টেশনে চলে আসে মনু।

এখানে এসে দেখে অনেক ‘টোকাই’ কাজ করে রেল স্টেশনে। তারপর তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় মনুর। মনুও হয়ে যায় তাদের মত টোকাই। রেল স্টেশনে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে  মহাজনের কাছে বিক্রি করাই তার কাজ।

একদিন রোদের মধ্যে মালবাহী  ট্রেনের বগিতে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো সে। কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারেনি। যখন ঘুম ভাংলো দেখলো ট্রেন চলছে।

মনু তখন ভয়ে  অনেক কান্নাকাটি করেছিল। একটা সময় ট্রেন থামল মনুর অচেনা এক জায়গায়। লোকজনকে  জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে,  ট্রেনটা সিলেট এসে থেমেছে।

সারাদিনের যাত্রা, অচেনা জায়গা আর কান্নাকাটিতে ক্ষুধা পেয়েছিল তার। ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে  দোকান থেকে রুটি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল সে। চোর ভেবে দোকানদার অনেক মেরেছিল তাকে।

এরপরও চুরি করতে হয়েছিল মনুকে। ধরাও পড়েছিল।  রড দিয়ে হাতে মার খেয়েছিল। এখনো এক হাতে ভারী কোনো কাজ করতে পারে না।

তারপর সিলেটেও অনেক শিশুকে  ভিক্ষা করতে দেখলো মনু। তখন থেকে এই সিলেট স্টেশনটাই তার ঘরবাড়ি।  রাতে এই স্টেশনের যেখানে জায়গা পায় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে।

এইটুকু বয়সে এত এত দুঃখের  কথা শুনে আমি বললাম, আচ্ছা, তোমার জীবনের স্বপ্ন কী?

মনু বলল, আমার জীবনের স্বপ্ন ভাল কিছু খাবো, ভাল কিছু পড়বো, ভাল বিছানায় ঘুমাবো।

মনু কথা আমাকে ভাবায়। যারা দুমুঠো ভাতের জন্যে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে তারা এর চেয়ে বড় স্বপ্ন দেখে না।