ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

নতুন বই হাতে পেয়ে আনন্দিত যে শিক্ষার্থী, কিছুদিন পরেই তার মাঝে সেই আনন্দ আর থাকে না। বরং বইয়ের চাপে দিশেহারা হয়ে ওঠে তারা। বোর্ডের বইয়ের পাশাপাশি সরকারি বেসরকারি স্কুলগুলোতে সহায়ক বইয়ের বাড়তি চাপেও রয়েছে কোমলমতি শিশুশিক্ষার্থীরা।

বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত তিনটির বাইরে আরও ছয় থেকে দশটি বই প্রায় সব বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়গুলোতে দেওয়া হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বোর্ডের বাংলা, ইংরেজি, অংক – এ তিনটি বিষয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে ধর্ম, পরিবেশ-পরিচিতি, বিজ্ঞান, ওয়ার্ড বুক, চিত্রাঙ্কন, বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা শেখার, সাধারণ জ্ঞান, নামতা-গুণ-ভাগ-জ্যামিতি আছে এমন একটি গণিত বই, ব্যাকরণ, গ্রামার, গল্প ও কবিতার এবং কম্পিউটার শিক্ষা সংক্রান্ত বই দেওয়া হয়ে থাকে।

তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, বিজ্ঞান ও ধর্ম – এ ছয়টি বোর্ডের বইয়ের সঙ্গে সহায়ক হিসেবে দেওয়া হয় মূলত ব্যাকরণ, গ্রামার, কম্পিউটার, চিত্রাঙ্কন এবং দ্রুত পঠন ধরনের দুই থেকে ছয়টি বই। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণিতে এসব বইয়ের সংখ্যা আরও অনেক বেড়ে যায়।

স্কুলপড়ুয়া শিশু ও তাদের মা-বাবারাও বলেন, প্রতিদিন অনেক ক্লাস থাকে। প্রতিটি ক্লাসের জন্য বই, প্রতিটি বিষয়ের আলাদা ফিডব্যাক ও ক্লাসওয়ার্ক খাতা সঙ্গে নিতে হয়। আর পরীক্ষার জন্য আলাদা খাতা তো আছেই। স্পেশাল স্টাডি প্রোগ্রামের বাড়তি বই ও খাতাও নিতে হয় মাঝেমধ্যে।

স্কুল থেকেই সরাসরি কোচিংয়ে যায় অনেক শিশু, সঙ্গে বয়ে নিয়ে যায় সেসব বই-খাতাও। নোট বই, গাইড বইও সঙ্গে নিয়ে আসে অনেকে। বই, খাতা, কলম, ডায়েরি, পেনসিল বক্স, জ্যামিতি বক্স, স্কেলেই ব্যাগ ভারি হয়ে যায়, টিফিন বক্স ও পানির বোতল তো আছেই।

কষ্ট করে ব্যাগ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অথবা মা- বাবা সন্তানের পেটমোটা ভারি ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন- এমন দৃশ্য প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে।

এত বই শিশুদের প্রয়োজন, না কি এর পেছনে বই ব্যবসায়ীরা সক্রিয়?

স্কুলপড়ুয়া শিশুশিক্ষার্থী মিজান বলেন, “ব্যাগ বহন করতে করতে হাতে ফোসকা পড়ে যায়, পিঠে অনেক ব্যথা করে। রাতে ঘুমাতে অনেক কষ্ট হয়।”

আরেক শিক্ষার্থী আশরাফুল হক বলেন, “বই বা খাতা না নিয়ে এলে শিক্ষকরা বকাবকি করেন। এমনকি এ কারণে মারধরও করেন বলে জানায় ছাত্রছাত্রীরা।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, “বই ছাড়া ক্লাস করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা বই ছাড়া ক্লাসের পড়া বুঝে উঠতে পারে না। এসব বিষয়ে তারা কিছু বলতে পারবেন না।”

আমরা জানি, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধির সময়  ১৮ বছর পর্যন্ত। এ সময়টাতে শিশুদের হাড় ও মাংসপেশি অপরিণত ও নরম থাকে।

এদিকে ভারি স্কুলব্যাগ নিয়ে বাচ্চাদের সিঁড়ি বেয়েও উঠতে হয়। এতে ঘাড় সামনে বা পেছনের দিকে কুঁজো হয়ে যায়। ভারি স্কুলব্যাগ বহন করার কারণে শিশুদের ঘাড়, পিঠ ও মাথা ব্যথা হতে পারে। শ্বাসকষ্ট হতে পারে, মেরুদণ্ড বাঁকা হয়ে যেতে পারে, এমনকি শিশুর স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তারপরও দিনে দিনে শিক্ষার্থীদের ওপর বইয়ের চাপ বাড়ছেই। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারই ত্রুটি। ঠিকঠাক সব কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বাড়তি বই। পুঁথিগত বিদ্যার ওপরই বেশি জোর দেওয়া হয়। তাই বয়সের তুলনায় বেশি বই ছাত্রছাত্রীদের শুধু বহন করতেই হয় না, মুখস্থও করতে হয়।

এভাবে আনন্দময় না হয়ে পড়াটা শিশুদের কাছে হয়ে ওঠে কষ্টকর কোনো কিছু। ক্লাস, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, বাড়ির কাজ- এত চাপ সামাল দেওয়া শিশুর পক্ষে অনেক কঠিন। এভাবে বেশি চাপে শিশুরা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। নষ্ট হতে পারে সৃষ্টিশীল মেধা।

কোনো কিছু চাপিয়ে দিলে তা শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক অভিভাবকও বোঝেন, বাচ্চাদের ওপর বেশি বিষয়ের বই চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু তারপরও বর্তমান প্রতিযোগিতার যুগে টিকে থাকতে তারা উঠেপড়ে নামেন। আমরা হয়তো ভুলেই যেতে বসেছি, পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা, বিনোদন ও পর্যাপ্ত ঘুমেরও দরকার আছে।